আয়েশা (রা.)-এর বিয়ে নিয়ে বিতর্ক

মুফতি কাসেম শরীফ
বিবাহ মানবসমাজের প্রাচীনতম প্রতিষ্ঠান। যুগে যুগে প্রতিষ্ঠানটি এর আদি রূপ থেকে বর্তমান কাঠামোয় উপনীত হয়েছে। বিবাহপ্রথাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে প্রধানত ধর্ম। বিয়েসংক্রান্ত সব নিয়মকানুন বিধিবদ্ধ হয়েছে ধর্মীয় অনুশাসনে। এ কথা সব ধর্মের জন্যই প্রযোজ্য। বিয়ের প্রথা, পদ্ধতি, বয়স, রীতিনীতি সবই যুগে যুগে পরিবর্তন হয়েছে। কিন্তু সেটা হয়েছে ধর্ম ও সংস্কৃতির হাত ধরে। বিয়ের ক্ষেত্রে যুগে যুগে দেশে দেশে সংস্কৃতির পরিবর্তন ঘটেছে। ভিন্ন ভিন্ন বিধান দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কোনো বিধান ও সংস্কৃতির ব্যাপারে কোনো যুগের মানুষই এ প্রশ্ন তোলেনি যে ‘কেন এই বিধান’ বা ‘অমুক বিধান ও সংস্কৃতি অবৈধ’। আদম (আ.)-এর যুগে নিজ মাতৃজাত বোনকে বিয়ে করা বৈধ ছিল। তাঁর পরের ধর্ম ও সংস্কৃতিতে নিজ মাতৃজাত বোনকে বিয়ে করা নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। হযরত আদম (আ.)-কে এক হাজার বছর বয়স দেওয়া হয়েছিল। রূহের জগতে দাঊদ (আ.)-এর সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে তিনি নিজের বয়স থেকে ৪০ বছর তাঁকে দান করেন। অবশিষ্ট ৯৬০ বছর তিনি জীবিত ছিলেন। (তিরমিযী শরীফ, হাদীস নং ৩০৭৬)
ফলে আদম (আ.)-এর বৈবাহিক জীবনের স্থায়িত্ব ছিল অনেক বেশি। কিন্তু পরে বনী আদমের বয়স কমতে থাকে। কমতে কমতে গড়ে ৬০ থেকে ৭০-এ পোঁছে যায়। (তিরমিযী শরীফ, হাদীস নং ৩৫৫০,২৩৩১; ইবনে মাজা, হাদীস নং : ৪২৩৬)
তাই পরবর্তী লোকদের বিয়ের বয়স, পারিবারিক জীবনের স্থায়িত্ব, বিয়েপ্রথা ও বিয়ের সংস্কৃতি পরিবর্তন হয়ে যায়। এই সংক্ষিপ্ত ভূমিকার সামনে রেখে আমরা হযরত আয়েশা (রা.)-এর বিয়ে নিয়ে আলোচনা করতে চাই।
হযরত আয়েশা (রা.) মহানবী (সা.)-এর স্ত্রীদের মধ্যে স্বাতন্ত্র্য বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ছিলেন। মহানবী (সা.)-এর স্ত্রীদের মধ্যে তিনি ছিলেন সর্বকনিষ্ট। তিনি ছিলেন মহানবী (সা.)-এর একমাত্র কুমারী স্ত্রী। মহানবী (সা.) থেকে তিনি ২২১০টি হাদীস বর্ণনা করেছেন। তিনি কেবল হাদীসই বর্ণনা করেননি, তিনি বিভিন্ন বিষয়ে কোরআন ও হাদীসের ব্যাখ্যা দিতেন, ফতোয়া দিতেন। মহানবী (সা.)-এর সঙ্গে তাঁর বরকতময় বিয়ের সবচেয়ে বড় সুফল হলো, তাঁর মাধ্যমে ইসলামী শরীয়তের এক-চতুর্থাংশ জ্ঞান বর্ণিত হয়েছে। প্রখ্যাত জীবনীকার আল্লামা যুহুরি (রহ.) লিখেছেন : ‘যদি আয়েশা (রা.)-এর জ্ঞানভাণ্ডার একদিকে একত্রিত করা হয় আর অবশিষ্ট নবীপত্নীদের জ্ঞান ও গোটা মুসলিমসমাজের নারীদের জ্ঞান অন্যদিকে একত্রিত করা হয়, তাহলে আয়েশা (রা.)-এর জ্ঞান তাদের চেয়ে অনেক বেশি উত্তম বলে বিবেচিত হবে।’ (সিয়ারু আ’লামিন নুবালা : ২/১৪১)
তিনি ছিলেন ইসলামের প্রথম খলীফা হযরত আবু বকর (রা.)-এর কন্যা। তিনি ইসলামের ইতিহাসের এমন ব্যক্তিত্ব, যাঁর চারিত্রিক উৎকর্ষতা বর্ণনা করে পবিত্র কোরআনে অনেকগুলো আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে। তাঁর সম্পর্কে মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘(পৃথিবীর ইতিহাসে) পুরুষদের মধ্যে অনেকেই পূর্ণতা লাভ করেছে। কিন্তু নারীদের মধ্যে কেবল তিনজন নারী পূর্ণতা ও সফলতা লাভ করেছে। এক. মারিয়াম বিনতে ইমরান। দুই. ফেরাউনের স্ত্রী আসিয়া। তিন. আয়েশা (রা.)। নারীদের মধ্যে আয়েশা তেমনি শ্রেষ্ঠ, খাবারের মধ্যে যেমনি শ্রেষ্ঠ ছরিদ (আবরের বিখ্যাত খাবার)।’ (বুখারী শরীফ, হাদীস নং : ৩৪১১)
তাঁর সম্পর্কে মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘হে আয়েশা! ইনি জিব্রাঈল, ইনি তোমাকে সালাম জানিয়েছেন।’ (বুখারী ও মুসলিম)
তাঁর পবিত্র রানের ওপর মাথা রেখে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব ইন্তেকাল করেছেন। তিনি যে কক্ষে থাকতেন, সেটিকে জান্নাতের টুকরো বানিয়ে দেওয়া হয়েছে। জান্নাতের মুখ সেদিকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। সেখানেই শায়িত আছেন বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)।
মহানবী (সা.)-এর পারিবারিক জীবন
মহানবী (সা.) হযরত আয়েশা (রা.)-কে কত বছর বয়সে বিয়ে করেছেন, কখন থেকে তাঁর সঙ্গে দৈহিক সম্পর্ক স্থাপন করেছেন, তা জানার আগে এ বিষয়টি ভালোভাবে হৃদয়াঙ্গম করা দরকার যে মহানবী (সা.) পূর্ণ যৌবনে পচিশ বছর বয়সে সর্বপ্রথম বিয়ে করেছেন। তাঁর প্রথম স্ত্রীর নাম খাদিজাতুল কোবরা (রা.)। মহানবী (সা.)-এর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার আগে তাঁর আরো দুইটি বিয়ে হয়েছিল। উপরন্তু খাদিজা (রা.) এ সময় পর্যন্ত আরো দুটি বিয়ে করেছিলেন এবং দুই স্বামীরই মৃত্যু হয়। এ ছাড়া এ দুই স্বামীর ঘরেই অন্তত চারজন সন্তান ছিল। সে সময় হযরত খাদিজা (রা.)-এর বয়স ছিল ৪০ বছর, মতান্তরে ৪৫। তিনি ছিলেন মহানবী (সা.) থেকে ১৫ বা ২০ বছরের বড়। তাঁর সঙ্গে মহানবী (সা.) ২৫ বছর ঘর-সংসার করেছেন। এরপর তিনি ইন্তেকাল করেন। তাঁর ইন্তেকালের পর মহানবী (সা.) হযরত সাওদা বিনতে যাম’আ (রা.)-কে বিয়ে করেন। তিনি ছিলেন সাকরান ইবনে আমরের স্ত্রী। সাকরানের মৃত্যুর পর মহানবী (সা.)-এর সঙ্গে তাঁরন বিয়ে হয়।
মক্কা থেকে মদিনায় ইতিহাসখ্যাত হিজরতের মাত্র তিন বছর আগে হজরত খাদিজা (রা.)-এর ইন্তেকাল হয়। এ সময় নবী করিম (সা.-)এর বয়স ছিল পঞ্চাশের কাছাকাছি। খাদিজা (রা.)-এর মৃত্যু পর্যন্ত তিনিই ছিলেন নবী (সা.)-এর একমাত্র স্ত্রী। খাদিজা (রা.)-এর মৃত্যুর পর তিনি একাধিক স্ত্রী গ্রহণ করেন। এঁদের অনেকেই ছিলেন বিধবা বা যুদ্ধে স্বামীহারা অথবা স্বামী পরিত্যক্তা কিংবা দুস্থ। কোনো বিয়ে অনুষ্ঠিত হয় আল্লাহপাকের সরাসরি নির্দেশে। নামের তালিকা নিচে রয়েছে।
১. হজরত খাদিজা (রা.) : নবী করীম (সা.)-এর প্রথম স্ত্রী। তিনি বিধবা, তবে বিদূষী, ধনী নারী ছিলেন। পবিত্র মক্কায় তিনি ‘তাহেরা’ অর্থাৎ পবিত্র বলে পরিচিত ছিলেন। নবী (সা.)-এর চেয়ে কমপক্ষে ১৫ বছরের বড় ছিলেন তিনি। নবুয়তের প্রথম জীবনে নবী (সা.)-এর দাওয়াতের কাজে তিনি বিশেষভাবে পাশে দাঁড়ান।
২. সাওদা বিনতে জাম’আ (রা.) : প্রথমে সাকরান ইবনে আমরের স্ত্রী ছিলেন। সাকরানের মৃত্যুর পর নবী (সা.)-এর সঙ্গে তাঁর বিয়ে অনুষ্ঠিত হয়।
৩. আয়েশা (রা.) : আবু বকর (রা.)-এর কন্যা। কেবল আয়েশা (রা.)-ই কুমারী মেয়ে ছিলেন, যাঁদের সঙ্গে মহানবী (সা.)-এর বিয়ে হয়েছিল। নবী (সা.)-এর ওফাতের সময় আয়েশা (রা.)-এর বয়স ছিল ১৮ বছর। নবী (সা.)-এর বহু হাদিস আয়েশা (রা.)-এর মাধ্যমে মানবজাতির কাছে পৌঁছেছে। তাঁর প্রখর স্মরণশক্তি এ কাজে সহায়ক হয়েছিল।
৪. হাফসা (রা.) : ওমর (রা.)-এর কন্যা ছিলেন তিনি। প্রথম জীবনে উনাইস ইবনে হোজাফা (রা.)-এর স্ত্রী ছিলেন। উনাইস (রা.) যুদ্ধে শহীদ হওয়ার পর নবী (সা.) তাঁকে স্ত্রী হিসেবে বরণ করেন।
৫. জয়নাব বিনতে খুজাইমা (রা.) : তিনি মদিনায় নিঃস্বদের জননী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। প্রথম জীবনে তাঁর বিয়ে হয়েছিল তোফায়েল ইবনে হারিছের সঙ্গে। তালাকপ্রাপ্ত হয়ে তোফায়েলেরই ভাই উবায়দাকে বিয়ে করেন তিনি। উহুদের যুদ্ধে উবায়দা শহীদ হন। পরে অসহায় জয়নাবকে বিয়ে করেন নবী (সা.)। কিন্তু বিবাহিত জীবনের ছয় মাসের মধ্যেই তাঁর ইন্তেকাল হয়ে যায়।
৬. সালামা (রা.) : প্রথম জীবনে তাঁর বিয়ে হয়েছিল আবু সালামা (রা.)-এর সঙ্গে। উহুদের যুদ্ধে আবু সালামা (রা.) শহীদ হন। বিধবা উম্মে সালামাকে অবশেষে নবী (সা.) স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করে নেন। ইতিহাসবিদরা বলেন, নবী (সা.)-এর স্ত্রীদের মধ্যে তিনিই সবার শেষে মৃত্যুবরণ করেন।
৭. জয়নাব বিনতে জাহাল (রা.) : তিনি ছিলেন নবী (সা.)-এর ফুফাতো বোন। নবী (সা.) প্রথমে তাঁর এই বোনকে তাঁর পালকপুত্র জায়েদ (রা.)-এর সঙ্গে বিয়ে দেন। এই বিয়েতে গোড়া থেকেই জয়নাব (রা.)-এর আপত্তি ছিল। ফলে তাঁদের দাম্পত্য জীবন সুখের হয়নি। পরে তাঁদের পারিবারিক জীবনে বিচ্ছেদ ঘটে। যয়নাব (রা.)-এর আপত্তিতে এ বিয়ে সংঘটিত হওয়ায় এবং পরে বিচ্ছেদ ঘটায় নবী (সা.)-এর মনে কিছুটা অনুশোচনা আসে। এ থেকে যয়নাব (রা.)-কে নিজে বিয়ে করার প্রস্তুতি গ্রহণ করলেও তৎকালীন আরবের কুসংস্কারের জন্য তা অনুষ্ঠিত হতে পারেনি। পরে পবিত্র কোরআনের সুরা আহযাবে আয়াত নাজিল হয়। সেখানে পালক ছেলে ও ঔরসজাত সন্তান সমতুল্য নয় বলে ঘোষণা দেওয়া হয়। ফলে অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে কুসংস্কার নির্মূল করার উদ্দেশ্যে নবী (সা.)-এর মাধ্যমে সেই বিধান বাস্তবায়ন করে দেখানোর প্রয়োজন অনুভূত হয়। তখনই যয়নাব (রা.)-এর সঙ্গে নবী (সা.)-এর বিয়ে অনুষ্ঠিত হয়।
৮. জুওয়াইরিয়া (রা.) : একটি আরব গোত্রের সরদার হারিছের কন্যা। যুদ্ধে বন্দিনী হয়ে আসেন। মহানবী (সা.) যুদ্ধবন্দির সঙ্গে বিবাহে আবদ্ধ হন। উপহার হিসেবে গোত্রের সব বন্দি মুক্তি লাভ করে। তাঁর পিতা হারিছও ইসলাম গ্রহণ করেন।
৯. উম্মে হাবিবা (রা.) : মহানবী (সা.)-এর চাচা আবু সুফিয়ানের কন্যা। প্রথমে উবায়দুল্লাহ বিন জাহালের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। দুজনই ইসলাম গ্রহণ করেন এবং আফ্রিকার হাবশায় হিজরত করেন। কিন্তু সেখানে উবায়দুল্লাহ খ্রিস্টান হয়ে যান। উবায়দুল্লাহ থেকে উম্মে হাবিবাকে মুক্ত করতে তিনি হাবশার বাদশাহ নাজ্জাশির মাধ্যমে চাচাতো বোন উম্মে হাবীবা (রা.)-কে বিয়ে করেন।
১০. সাফিয়া (রা.) : তিনি ছিলেন নবীদেরই বংশধর। হজরত মুসা (আ.)-এর ভাই হজরত হারুন (আ.)-এর অধস্তন বংশধারার কন্যা। প্রথমে কিনানা ইবনে আবিলের স্ত্রী ছিলেন তিনি। কিনানার মৃত্যুর পর মহানবী (সা.)-এর সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়।
১১. মায়মুনা (রা.) : তিনি প্রথমে মাসউদ বিন ওমরের স্ত্রী ছিলেন। সে তালাক দিলে আবু রিহামের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। আবু রিহাম মারা যাওয়ার পর মহানবী (সা.)-এর সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়।
মহানবী (সা.)-এর এত বেশি বিয়ে আজকের যুগে অস্বাভাবিক মনে হলেও তৎকালীন আরব জগতে এটা ছিল খুবই স্বাভাবিক। এ ছাড়া আগের নবীদের ইতিহাসে দেখা যায়, সুলায়মান (আ.)-এর ৭০০ স্ত্রী ছিল, দাউদ (আ.)-এর ৯৯ জন এবং ইবরাহিম (আ.)-এর ৩ জন, ইয়াকুব (আ.)-এর ৪ জন, মুসা (আ.)-এর ৪ জন স্ত্রী ছিলেন।
হিন্দুদের গ্রন্থ মনুসংহিতায় পাঁচজন স্ত্রী থাকার কথা উল্লেখ আছে। শ্রীকৃষ্ণের ছিল শত পত্নী ও উপপত্নী। (মনুসংহিতা, অধ্যায় : ৯, শ্লোক : ১৮৩)
হাজার বছর আগে তৎকালীন আরবেও এমন বহু বিবাহ প্রচলিত ছিল। কিন্তু মুহাম্মদ (সা.)-এর বিয়েগুলো প্রায় সবগুলোই মানবিক, একটি কোরআনের আয়াতের বাস্তবায়ন, দু-একটি ইসলামী শরীয়া বাস্তবায়ন। কেউ কেউ ছিলেন মহানবী (সা.)-এর বৃহত্তর পরিবারের সদস্য, ফুফাতো বোন, অথবা চাচাতো বোন। অনেক বিধবা-অসহায় নারীকে তিনি নিজ স্ত্রীর মর্যাদা দিয়ে সম্মানিত করেছেন। একজন বাদে কেউই কুমারী ছিলেন না; বরং মহানবী (সা.)-এর সঙ্গে অনেকের বিয়ে হয়েছিল, যাঁদের অনেক সন্তান ছিল, তা নিয়েই। ওমর (রা.) তাঁর তালাকপ্রাপ্ত দুঃখিনী মেয়েকে বিয়ে করার জন্য অনেকের কাছেই যান, ব্যর্থ হয়ে ফেরার পথে মহানবী (সা.)-এর সঙ্গে পরামর্শ করে তাঁর কাছেই সমর্পণ করেন।
মহানবী (সা.)-এর এসব বিয়ের মধ্যে কোনো শারীরিক চাহিদাও ছিল না। বরং বিভিন্ন গোত্রের সঙ্গে তিনি বিয়ের মাধ্যমে একটি শক্তি সমাবেশও করে থাকবেন, যা দেখে তৎকালীন কাফের-মুশরিকরাও সন্ত্রস্ত্র হয়ে উঠেছিল। ইসলামী শরিয়ায় এ জন্য শারীরিক প্রয়োজনে অধিক স্ত্রী রাখার প্রবণতা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সীমারেখায় অনধিক চার স্ত্রী থাকলেও সবার অধিকার আদায় না করতে পারলে তাকে অন্যায় ও জুলুম বলে সাব্যস্ত করা হয়েছে।
মহানবী (সা.)-এর সঙ্গে আয়েশা (রা.)-এর বিয়ে
মহানবী (সা.)-এর সঙ্গে আয়েশা (রা.)-এর বিয়ের সময় তাঁর বয়স কত ছিল, ইতিহাসবিদদের মধ্যে এ নিয়ে মতনৈক্য দেখা যায়। একদল ইতিহাসবিদের অভিমত হলো, বিয়ের সময় আয়েশা (রা.)-এর বয়স ছিল ১৪ বছর। আর যখন তাঁর সঙ্গে মহানবী (সা.)-এর দৈহিক সম্পর্ক হয়, তখন তাঁর বয়স ছিল ১৭ থেকে ১৮ বছর। (দেখুন আরবী পত্রিকা ‘আশ্ শিরকুল আওসাত’ : ৬-৯-২০০৮; প্রখ্যাত আরবী সাহিত্যিক শওকী জইফের গ্রন্থ ‘মুহাম্মদ খাতামুল মুরসালীন’ : পৃষ্ঠা-১৭১)
তবে আমরা আয়েশা (রা.)-এর বিয়ে বিষয়ে অসংখ্য হাদীসের সামনে ইতিহাসবিদদের অভিমতকে প্রাধান্য দিতে পারি না। আমরা মনে করি এ বিষয়ে হাদীসের কথাই সর্বাধিক বিশুদ্ধ। যাঁর বিয়ে, তাঁর জবানেই শুনুন হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী করীম (সা.) যখন আমাকে বিবাহ করেন, তখন আমার বয়স ছিল ছয় বছর। তারপর আমরা মদিনায় এলাম এবং বনু হারিস গোত্রে অবস্থান করলাম। সেখানে আমি জ্বরে আক্রান্ত হলাম। এতে আমার চুল পড়ে গেল। পরে যখন আমার মাথার সামনের চুল জমে উঠল। সে সময় আমি একদিন আমার বান্ধবীদের সঙ্গে দোলনায় খেলা করছিলাম। তখন আমার মাতা উম্মে রুমান এসেছেন। তিনি আমাকে উচ্চৈঃস্বরে ডাকলেন। আমি তাঁর কাছে গেলাম। আমি বুঝতে পারিনি, তার উদ্দেশ্য কী? তিনি আমার হাত ধরে ঘরের দরজায় এসে আমাকে দাঁড় করালেন। আর আমি হাঁফাচ্ছিলাম। শেষে আমার শ্বাস-প্রশ্বাস কিছুটা প্রশমিত হলো। এরপর তিনি কিছু পানি নিলেন এবং তা দিয়ে আমার মুখমন্ডল ও মাথা মাসেহ করে দিলেন। তারপর আমাকে ঘরের ভিতর প্রবেশ করালেন। সেখানে কয়েকজন আনসারি নারী ছিল। তাঁরা বললেন, কল্যাণময়, বরকতময় ও সৌভাগ্যমন্ডিত হোক। আমার মা আমাকে তাদের কাছে দিয়ে দিলেন। তাঁরা আমার অবস্থান ঠিক করে দিলেন, তখন ছিল দ্বিপ্রহরের আগ মুহূর্ত। হঠাৎ রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে দেখে আমি হকচকিয়ে গেলাম। তাঁরা আমাকে তাঁর কাছে তুলে দিল। সে সময় আমি ছিলাম নয় বছরের বালিকা। (বুখারী শরীফ, হাদীস নং : ৩৮৯৪, ৩৮৯৬, ৫১৩৩, ৫১৩৪, ৫১৫৬, ৫১৫৮, ৫১৬০; মুসলিম শরীফ, হাদীস নং : ১৪২২)
হিশাম ইবনে উরওয়া (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘নবী করীম (সা.)-এর মদিনায় হিজরতের তিন বছর আগে খাদিজাহ (রা.)-এর ইন্তেকাল হয়। তারপর দুইবছর বা এর কাছাকাছি সময় অতিবাহিত হওয়ার পর তিনি আয়েশা (রা.)-কে বিয়ে করেন। তখন তিনি ছিলেন ছয় বছরের বালিকা। তারপর নয় বছর বয়সে বাসর উদ্যাপন করেন।’(সহীহ বুখারী, হাদীস : ৩৮৯৬)
হযরত আয়েশা (রা.)-এর পিতা-মাতাই আয়শা (রা.)-এর বিয়ে মহানবী (সা.)-এর সঙ্গে দিয়েছিলেন। কোনো মুসলিম কিংবা অমুসলিম এ বিয়ের প্রতিবাদ করেনি। কারণ সে সময় মেয়েদের এ বয়সেই সাধারণত বিয়ে দেওয়া হতো। এটাই ছিল স্বাভাবিক বিষয়। এর আসল কারণ হলো, সে সময় আরবের মানুষদের আয়ু ছিল কম। মানুষ ৪০-৬০ বছর বয়সেই সাধারণত মারা যেত। তাই প্রাকৃতিকভাবে ৯ বা ১০ বছরের মেয়েকে বিয়ে করাই ছিল সে সময়ের স্বাভাবিক ঘটনা।
মহানবী (সা.) হযরত আয়েশা (রা.)-কে প্রধানত তিনটি কারণে বিয়ে করেছিলেন। এক. হযরত আবু বকর (রা.)-এর সঙ্গে মহানবী (সা.)-এর বন্ধুত্বের সম্পর্ককে আÍীয়তার বাঁধনে আবদ্ধ করা।
দুই. সব ইতিহাসবিদ এ ব্যাপারে একমত যে আয়েশা (রা.) ছিলেন তৎকালীন আরবের অন্যতম মেধাবী নারী। তাই মহানবী (সা.) তাঁর মাধ্যমে ইসলামের বিধিবিধান, বিশেষ করে নারীদের একান্ত বিষয়াদি উম্মতকে শিক্ষা দিতে চেয়েছেন।
তিন. মহানবী (সা.) তাঁকে বিয়ে করেছেন ওহীর নির্দেশ অনুসরণ করে। ওহীর মাধ্যমে আল্লাহ তা’আলা তাঁকে বিয়ে করার জন্য নির্দেশ দিয়েছিলেন। হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, মহানবী (সা.) তাঁকে বলেছেন, দুইবার তোমাকে আমায় স্বপ্নে দেখানো হয়েছে। আমি দেখলাম, তুমি একটি রেশমি কাপড়ে আবৃতা এবং (জিব্রাঈল) আমাকে বলছেন, ইনি আপনার স্ত্রী, আমি ঘোমটাটা সরিয়ে দেখলাম। দেখি সে মহিলা তো তুমিই। তখন আমি ভাবছিলাম, যদি তা আল্লাহর পক্ষ থেকে হয়ে থাকে, তবে তিনি তা বাস্তবায়িত করবেন। (বুখারী, হাদীস নং : ৩৮৯৫, ৫০৭৮, ৫১২৫, ৭০১১, ৭০১২; মুসলিম, হাদীস নং : ২৪৩৮)
বিভিন্ন ধর্মে বিয়ের ন্যূনতম বয়স
ধর্মীয় গ্রন্থগুলোতে স্পষ্টভাবে বিয়ের ন্যূনতম বয়স খুঁজে পাওয়া যায় না। কিন্তু আকার-ইঙ্গিত ও ঘটনাপ্রবাহের সূত্র ধরে তা নির্ণয় করারও অবকাশ আছে। ইসলাম ধর্ম মতে, প্রাপ্ত বয়স্ক নারী-পুরুষের স্বাধীনভাবে বিয়ে করার অনুমতি আছে। প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়া ছাড়া ইসলামের বিধিবিধান পালন কারো জন্য বাধ্যতামূলক নয়। প্রাপ্ত বয়স হলে মানুষের ওপর শরীয়তের বিধান অর্পিত হয়। এক আয়াতে আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘তোমাদের সন্তান-সন্ততি বয়োপ্রাপ্ত হলে তারা যেন (ঘরে প্রবেশের আগে) অনুমতি প্রার্থনা করে, যেমন অনুমতি প্রার্থনা করে থাকে তাদের বয়োজ্যৈষ্ঠরা।’ (সূরা : নূর, আয়াত : ৫৯)
প্রাপ্ত বয়সের সীমারেখা কী, এ বিষয়ে অবশ্য কিছুটা মত পার্থক্য আছে। উপমহাদেশে প্রচলিত হানাফী মাযহাব অনুসারে ১৫ বছর পূর্ণ হওয়ার পর শরীরে বয়ঃপ্রাপ্তির লক্ষণ প্রকাশ না পেলেও বালক-বালিকা শরীয়তের দৃষ্টিতে বালেগ বা প্রাপ্তবয়স্ক বলে গণ্য হবে। (তাফসীরে মা’আরেফুল কোরআন, ই. ফা. খণ্ড-২, পৃষ্ঠা-২৮৭)
এ বিষয়ে হাদীস শরীফে এসেছে : নাফে (রহ.) হযরত ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, উহুদ যুদ্ধের দিন রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁকে পেশ করলেন, তখন তিনি চৌদ্দ বছরের বালক। (ইবনে ওমর বলেন) তিনি [মহানবী সা.)] আমাকে (যুদ্ধে গমনের) অনুমতি দেননি। পরে খন্দকের যুদ্ধে তিনি আমাকে পেশ করলেন এবং অনুমতি দিলেন। তখন আমি পনের বছরের যুবক। নাফে (রহ.) বলেন, আমি খলীফা ওমর ইবনে আবদুল আযীযের কাছে গিয়ে এ হাদীস শুনালাম। তিনি বললেন, এটাই হচ্ছে প্রাপ্ত ও অপ্রাপ্ত বয়সের সীমারেখা। তারপর তিনি তাঁর গভর্নরদের লিখিত নির্দেশ পাঠালেন যে (সেনাবাহিনীতে) যাদের বয়স ১৫ হয়েছে, তাদের জন্য যেন ভাতা নির্দিষ্ট করেন। (বুখারী, হাদীস নং : ২৬৬৪, ৪০৯৭; মুসলিম, হাদীস নং : ১৮৬৮)
কিন্তু ইসলাম ধর্ম মতে, অপ্রাপ্ত বয়স্ক সন্তানের অভিভাবক যদি তাঁদের সন্তানকে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করেন, তাহলে বিয়ে বৈধ। কিন্তু সন্তান প্রাপ্তপয়স্ক হওয়ার পর এ বিয়ে ভেঙ্গে দেওয়ার এখতিয়ার রাখবে, যদি পিতা ও দাদা ছাড়া অন্য কেউ বিয়ে দিয়ে থাকে। (হেদায়া : ১/১৯৩)
রোমান ক্যাথলিকরা বিশ্বাস করে যে মরিয়ম (আ.)-এর বয়স ছিল ১১-১৪ বছর, যখন তিনি ঈসা (আ.)-কে জন্ম দিয়েছিলেন।
তাওরাত বা ওল্ড টেস্টামেন্টের বর্ণনা অনুসারে ইসহাক (আ.) ৪০ বছর বয়সে মাত্র তিন বছরের কন্যাশিশুকে বিয়ে করেছেন। সেখানে আছে : ‘ইসহাক ৪০ বছর বয়সে রেবেকাকে বিয়ে করেছেন। রেবেকা ছিলেন পদ্দম-ইরাম দেশের সিরীয় বথুয়েলের মেয়ে এবং সিরীয় লাবনের বোন।’ (তাওরাত, সৃষ্টি অধ্যায়, ২৫ : ২০)
ইসহাক (আ.)-এর বংশ থেকে নবীদের আগমণ ঘটেছে।
ইহুদীদের ধর্মীয় বিধানশাস্ত্র বিষয়ের গ্রন্থ হলো ‘তালমূদ’। তালমূদের সানহাদরীনের বর্ণনা মোতাবেক উপদেশ নম্বার ৫৫-তে উল্লেখ আছে : ‘ইহুদীদের জন্য তিন বছরের মেয়েকে বিয়ে করা বৈধ।’
আর তালমূদের খুসুবুসের বর্ণনা অনুযায়ী উপদেশ নম্বার ৫৬-তে উল্লেখ আছে : ‘শিশুর ৯ বছর হওয়া পর্যন্ত তার সঙ্গে দৈহিক সম্পর্ক স্থাপন করা ইহুদীদের জন্য বৈধ।’
তালমূদের বর্ণনাকারী সাঈদ রাবী জুসেফ লিখেছেন : ‘এ কথা তোমার কাছে রেজিস্টার করে নাও যে কন্যাশিশুর বয়স তিন বছর একদিন হলে তার সঙ্গে দৈহিক সম্পর্ক স্থাপন করা সম্ভব।’ (বিস্তারিত দেখুন : : Neusner, The Talmud of Babylonia, vol.B, Tractate Sanherdrin 1984)
উপমহাদেশে হিন্দুদের সমাজজীবন নিয়ন্ত্রিত হয়েছে প্রধানত মনুর বিধান অনুসারে। মনুসংহিতায় বলা হয়েছে, মেয়েদের আট বছর বয়সের মধ্যেই বিয়ে দিতে হবে। মনুশাস্ত্রে বলা হয়েছে, ‘কালেহদাতা পিতা বাচ্যো বাচ্যশ্চানুপযন্ পতিঃ।/মৃতে ভর্তরি পুত্রস্তু বাচ্যো মাতুররক্ষিতা।’ অর্থাৎ বিবাহযোগ্য সময়ে (ঋতুদর্শনের আগে) পিতা যদি কন্যাকে পাত্রস্থ না করেন, তাহলে তিনি লোকমধ্যে নিন্দনীয় হন। স্বামী যদি ঋতুকালে পত্নীর সঙ্গে সঙ্গম না করেন, তবে তিনি লোকসমাজে নিন্দার ভাজন হন। স্বামী মারা গেলে পুত্ররা যদি তাদের মাতার রক্ষণাবেক্ষণ না করে, তাহলে তারাও অত্যন্ত নিন্দাভাজন হয়। (মনুসংহিতা : ৯/৪)
এখানে দেখা যাচ্ছে, একটি কুমারী কন্যা প্রজননযোগ্যা ঋতুমতী হয়েও প্রজননকাজে ব্যবহৃত না-হওয়া মনুশাস্ত্রের লঙ্ঘন। সেক্ষেত্রে যথাসময়ে পাত্রস্থ না করার কারণে কন্যার ওপর পিতার অধিকারও খর্ব হয়ে যায়। তাই বলা হয়েছে, ‘পিত্রে ন দদ্যাচ্ছুল্কন্তু কন্যামৃতুমতীং হরন্।/স হি স্বাম্যাদতিক্রামেদৃতূনাং প্রতিরোধনাৎ।’ অর্থাৎ ঋতুমতী কন্যাকে যে বিবাহ করবে, সেই ব্যক্তি কন্যার পিতাকে কোনো শুল্ক দেবে না। কেননা সেই পিতা কন্যার ঋতু নষ্ট করছেন বলে কন্যার ওপর তার যে অধিকার, তা থেকে তিনি বঞ্চিত হয়েছেন। (মনুসংহিতা : ৯/৯৩)
এখানে দেখা যাচ্ছে যে বিয়ের বাজারে কন্যার একটা বিনিময়মূল্য আছে, যা অধিকার হিসেবে পিতাই প্রাপ্ত হতেন। কিন্তু কন্যার ঋতু নষ্ট না করার সঙ্গে তা সম্পর্কিত। তাই সে বিনিময়মূল্য পেতে হলে কন্যাকে ঋতুবতী হওয়ার আগেই বিয়ে দিতে হবে।
বাল্মিকী রামায়ণের তৃতীয় খণ্ডের ৪৭ শ অধ্যায়ে সীতার বিবৃতি থেকে আমরা জানতে পারি যে সীতা অষ্টাদশ বছর বয়ক্রমকালে বিবাহের ত্রয়োদশ বছরে রামের বনগমনকালে তাঁর সঙ্গে অযোধ্যা ত্যাগ করেছিলেন। পাটিগণিতের সহজ হিসাব মতে, বিবাহের সময় সীতার বয়স পাঁচ-ছয় বছর ছিল। (মোহাম্মদ মতিয়র রহমান, প্রাচীন ভারতে বাল্য-বিবাহ)
যারা মহানবী (সা.) ও আয়েশা (রা.)-এর বিয়ে নিয়ে আপত্তি করেন, তারা কিন্তু রাম আর সীতার বিয়ে নিয়ে টু-শব্দও করেন না। কারণ কী? কারণ, যাকে দেখতে নারী, তার চরণ বাঁকা।
বিভিন্ন দেশ ও সভ্যতায় নারীর বিয়ের বয়স
বিয়ের ক্ষেত্রে দেশ-জাতিভেদে আলাদা বৈশিষ্ট্য দেখা যায়। একজন মানুষ কোন বয়সে বিয়ে করছেন, তা নির্ভর করে ওই দেশের গড় আয়ের ওপর। দেখা যায়, ধনী ও নর্ডিক দেশ বা সুইডেনের মানুষ তিরিশের আগে বিয়ে করেন না। কিন্তু সেন্ট্রাল আফ্রিকায় বিয়ের গড় বয়স ২০। বিভিন্ন দেশের ২০০৯-২০১৪ সালের তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে একটি জরিপ চালানো হয়। এ জরিপের নাম দেওয়া হয় ‘মিন সিঙ্গুলেট এজ অ্যাট ম্যারিজ’। সেখানে বলা হয়েছে, জাতিসংঘের হিসাব মতে, ৩৯টি দেশের ২০ শতাংশ নারী মাত্র ১৮ বছর বয়সে এবং ২০টি দেশে ১৫ বছর বয়সে বিয়ে করে ফেলেন। আবার দুটো দেশের ১০ শতাংশ পুরুষ মাত্র ১৮তেই বিয়ে পিঁড়িতে বসেন।
আবার পৃথিবীর বেশ কিছু দেশে নারীদের বিয়ের বয়স বেড়েছে। সত্তর দশক থেকে ২০০০ নাগাদ এ বয়স ২১.৮ বছর থেকে ২৪.৭-এ উন্নীত হয়েছে।
[কালের কণ্ঠ অনলাইন : ৮ জুলাই, ২০১৬, ১৩:২৭ (সূত্র : বিজনেস ইনসাইডার)]
এখানে আমাদের এ কথা ভুলে গেলে চলবে না যে মহানবী (সা.)-এর সময়ে আরবের লোকদের গড় আয়ু ছিল ৪০ থেকে ৬০ বছর। তাই সে সময়ে তাড়াতাড়ি বিয়ে দেওয়ার প্রবণতা ছিল স্বতঃসিদ্ধ।
১৪০০ বছর তো অনেক দূরে, এই গত ১৮৮০ সাল থেকে ১৯২১ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের দেলোয়ারে বিয়ের সর্বনিম্ন বয়স ছিল ৭ বছর। মাত্র ১৩০ বছর আগে পৃথিবীতে বিভিন্ন দেশে বিয়ের সর্বনিম্ন বয়স কত ছিল? দেখুন-ডেনমার্ক-১২, ইংল্যাণ্ড-১৩, ফ্রান্স-১৩ পর্তুগাল-১২, রাশিয়া-১০, স্কটল্যান্ড-১২, স্পেন-১২, কানাডা-১২, আমেরিকার ফ্লোরিডা-১০, ক্যালিফোর্নিয়া-১০ বছর। লিস্টটা আরো অনেক বড়। আপনি চাইলে এখানে গিয়ে আরো দেখতে পারেন
বর্তমান পৃথিবীতেও এমন বহু দেশ আছে, যেখানে মেয়েদের বেশ কম বয়সে বিয়ে করা হয়। নিচের লিঙ্কগুলোতে দেখুন :
তথাকথিত সভ্য দুনিয়ার লোকেরা ও তাদের কেনা গোলামরা আয়েশা (রা.)-এর বিয়ে নিয়ে প্রশ্ন তোললেও বৈধ পথ বাদ দিয়ে অবৈধ উপায়ে ঠিকই শিশুকন্যাদের ভোগ করছে। পরিসংখ্যান বলছে :
যুক্তরাষ্ট্রে ধর্ষণের শিকার হওয়াদের মধ্যে ৯১ শতাংশ মহিলা ও বাকি ৯ শতাংশ পুরুষ। প্রতি ৩ জনে একজন নারী ধর্ষিত হয়। ১৮ বছরের আগে ৪০ শতাংশ নারী এখানে ধর্ষণের শিকার হয়। প্রতি ১০৭ সেকেন্ডে একজন ধর্ষিতা হয় যুক্তরাষ্ট্রে। ১২-১৮ বছর বয়সী ২ লাখ ৯৩ হাজার শিশু-কিশোরীর ধর্ষিত হবার তথ্য পাওয়া গেছে। এখানে ৬৮ শতাংশ ধর্ষণের রিপোর্ট হয় না। ৯৮ ভাগ ধর্ষকের শাস্তি হয় না। এমনকি কারাগারেও নারীদের স্বস্তি নেই। ২ লাখ ১৬ হাজার নারী প্রতিবছর কারাগারে ধর্ষিত হয়। যুক্তরাজ্যেও ধর্ষণের ঘটনা ঘটে বিস্তর। তথ্য অনুযায়ী, বছরে প্রায় ৮৫ হাজার মহিলা ধর্ষিতা হন গ্রেট ব্রিটেনে। প্রতি বছর যৌন হয়রানির শিকার হন প্রায় ৪০ হাজার নারী। ইংল্যান্ড এন্ড ওয়ালসে প্রতিদিন ২৩০ জন ধর্ষিত হয়। প্রতি ৫ জন নারীর একজন ১৬ বছরের আগেই ধর্ষিত হয়। অন্যদিকে, দক্ষিণ আফ্রিকায় কমবয়সী ও শিশুকন্যার ধর্ষণের ঘটনা ঘটে সবচেয়ে বেশি। সেদেশে ধর্ষণের অপরাধে সাজাও কম। কেউ দোষী প্রমাাণিত হলে মাত্র ২ বছরের জেল দেওয়া হয়। এখানে প্রতিবছর ৫ লাখ ধর্ষণের মামলা হয়। ১১ বছরের নীচেই ১৫ শতাংশ মেয়ে ধর্ষণের শিকার হয়। ৫০ শতাংশ নারী ১৮ বছরের আগেই নিগৃহীত হন। (দৈনিক ইত্তেফাক, ৭ জুলাই, ২০১৫)
শুধু ধর্ষণ নয়, শিশুকন্যাদের বিয়েও রীতিমতো সিদ্ধ আধুনিক পৃথিবীতে। পরিসংখ্যান বলছে, বিশ্বের ৪০ শতাংশ কন্যাশিশুদের বিয়ে হয় ভারতে। সমীক্ষায় দেখা গেছে, ভারতে বাল্যবিবাহের সংখ্যা ২ কোটি ৩০ লাখের মতো, যা বিশ্বের মোট বাল্যবিবাহের প্রায় ৪০ শতাংশ। (ভয়েচ ভেলের বরাতে দৈনিক সংগ্রাম : ২৪-১১-২০১৬)
বর্তমান বিশ্বে ন্যূনতম কত বছর বয়সের নারীদের সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক করা বৈধ, দেখুনÑমেক্সিকোতে ১২, কুরিয়াতে ১৩, কানাডায় ১৪, সুইডেনে ১৫ বছর বয়সী মেয়েদের সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক করা রীতিমতো আইনসিদ্ধ। (বিস্তারিত দেখুন : http://www.avert.org/sex-stis/age-of-consent)
এ ছাড়া আর্জেন্টিনায় ১৩, নাইজেরিয়ায় ১৩, প্যারাগুয়ে ও পেরুতে ১৪, সেনেগালে ১৩, স্পেনে ১৩, পোপের শহর ভ্যাটিক্যান সিটিতে ১২ বছর বয়সী মেয়েদের সঙ্গ দৈহিক সম্পর্ক স্থাপন করা আইনসিদ্ধ। (বিস্তারিত দেখুন : http://chartsbin.com/view/hxj)
বাঙালি সংস্কৃতিতে নারীদের বিয়ের বয়স
১৯ শতকেও বাঙালি নারীদের ছোট বেলায় বিয়ে দেওয়া হতো। বাঙালির বিয়ের ইতিহাস বিষয়ে ‘বাংলাপিডিয়া’ লিখেছে : ‘১৯২১ সালের আদমশুমারিতে বিয়ের গড় বয়স মেয়েদের ১২ এবং ছেলেদের ১৩ বছর উল্লেখ করা হয়েছে। ১৯২৯ সালে বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন (Child Marriage Restraint Act) পাশ হয়। এ আইন অনুযায়ী ১৪ বছরের নিচের পাত্রী এবং ১৮ বছরের নিচের পাত্রের বিবাহ ছিল শাস্তিযোগ্য অপরাধ।’ (বিবাহ, বাংলাপিডিয়া)
কিন্তু তারপরও কি কম বয়সী মেয়েদের বিয়ে দেওয়া বন্ধ হয়েছে? সে বিয়ে কি পিতা-মাতার অসম্মতিতে বা আইনের বাইরে গিয়ে হয়েছে? আমরা দেখতে পাই, ইউনিসেফের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ‘বাংলাদেশে ১৮ বছরের আগে ৬৬ শতাংশ মেয়ে এবং একই বয়সের ৫ শতাংশ ছেলের বিয়ে হচ্ছে। এর মধ্যে শতকরা ২৯ ভাগ মেয়েরই বিয়ে হয় ১৫ বছরের কম বয়সে আর শতকরা দুই ভাগ মেয়ের বিয়ে হয় ১১ বছরের কম বয়সে।’ সেভ দ্য চিলড্রেন-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ‘বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে ৬৯ শতাংশ নারীর ১৮ বছর বয়স হওয়ার আগেই বিয়ে হয়ে যাচ্ছে।’ (ইত্তেফাক ২০ ডিসেম্বর, ২০১৫)
‘হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি’ নামে একটি বই লিখেছেন কট্টর সেক্যুলার গোলাম মুরশিদ। হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতিতে নারীদের বিয়ে কত বছর বয়সে হতো? তিনি লিখেছেন : ‘দ্বারকানাথ ঠাকুর (রবিন্দ্রনাথ ঠাকুরের দাদা) বিয়ে করেছিলেন পনেরো বছর বয়সে। চিন্তার দিক দিয়ে তিনি সে যুগের তুলনায় খুব আধুনিক থাকলেও তাঁর পুত্র দেবেন্দ্রনাথের বিয়ে দিয়েছিলেন সতেরো বছর বয়সে, পাত্রীর বয়স ছিলো এগারো।’
বাঙালি জাতির সবচেয়ে প্রাগ্রসর শিক্ষাবিদ হিসেবে যাদের নাম উল্লেখ করা হয়, তারা কত বছর বয়সী নারীদের বিয়ে করেছিলেন, ড. মুরশিদ লিখেছেন : বঙ্কিমচন্দ্র যাঁকে বিয়ে করেছিলেন, তাঁর বয়স ছিলো মাত্র পাঁচ বছর। দেবেন্দ্রনাথ ও বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামীর স্ত্রীে বয়স ছিলো ছ বছর। সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্ত্রীর বয়স ছিলো সাত বছর, ইশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের স্ত্রীর বয়স আট বছর, কেশব সেন এবং জ্যোতরিন্দ্রনাথের ৯, শিবনাথ শাস্ত্রীর দশ আর রাজনারায়ণ বসুর স্ত্রীর বয়স ছিলো এগারো বছর।’
(দেখুন : হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি, পৃষ্ঠা-২২০)
যারা আয়েশা (রা.)-এর বিয়ের বয়স নিয়ে আপত্তি করেন, তাদের অনেকের কাছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর দেবতা তুল্য। রবীন্দ্রনাথ তাদের কাছে সবক্ষেত্রে আদর্শ পুরুষ। তিনি কিন্তু ২৩ বছর বয়ছে মাত্র ১১ বছরের মেয়েকে বিয়ে করেছিলেন। ড. গোলাম মুরশিদই সে তথ্য উল্লেখ করেছেন।
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১২ বা ১৩ বছর বয়সে তিন বছর বয়সী রেণুকে (বঙ্গমাতা) বিয়ে করেছেন । অবশ্য এটা ছিল পারিবারিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী। (অসমাপ্ত আত্মজীবনী, পৃষ্ঠা-৭)
বাংলাদেশে নারী জাগরণের পথিকৃৎ বেগম রোকেয়া বিয়ে কত বছর বয়সে হয়েছিল? ১৮৯৬ সালে ১৬ বছর বয়সে রোকেয়ার বিয়ে হয় ভাগলপুরের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দ সাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে। বিয়ের পর তিনি ‘বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন’ নামে পরিচিত হন। তাঁর স্বামীও মুক্তমনা মানুষ ছিলেন। (http://www.manobkantha.com/2013/12/09/150194.html)
বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বিয়ে হয়েছে ১৫ থেকে ১৬ বছর বয়সে। প্রসিদ্ধ অভিমত অনুযায়ী তাঁর জš§ ১০৪৫ সালে, তাঁর বিয়ে হয়েছে ১৯৬০ সালে। (দেখুন : বাংলাপিডিয়া ইংরেজি সংস্করণ- http://en.banglapedia.org/index.php?title=Zia%2C_Begum_Khaleda)
সম্প্রতি আমাদের দেশে একটি আইন হয়েছে, মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে নতুনভাবে অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে মুক্তিযোদ্ধার বয়স ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চে ন্যূনতম ১৩ বছর হতে হবে। (কালের কণ্ঠ : ৯ নভেম্বর, ২০১৬)
১৩ বছর বয়সেই যদি কেউ যোদ্ধা হতে পারে, সেক্স করার জন্য কি তার বয়স ১৮ বা ২১ হতে হবে? বিয়ে বা সেক্স কি যুদ্ধের চেয়েও কঠিন কাজ? না, কঠিন কাজ না। তাই তো জাতিসংঘ ও তার দোষররা ১৮ বছরের আগে মেয়েদের বিয়ে নিয়ে আপত্তি করলেও এ বয়সের মেয়েদের ‘লাভ’, ‘সেক্স’ ও ‘ফ্রেন্ডশিপ’-এর প্রতি কোনো নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে না।
উপমহাদেশে ১৮৬০ সালে এজ অফ কন্সেন্ট আইনে মেয়েদের বিয়ের ন্যূনতম বয়স স্থির করা হয় ১০। ১৮৯২ সনে এই বয়স বেড়ে দাঁড়ায় ১২। ১৯২৯ সনে এটা আবার বেড়ে দাঁড়ায় ১৪। ১৯৫৫ সালে এটা বেড়ে দাঁড়ায় ১৮ বছর। সে আইন এখনো বলবৎ আছে। তার মানে যুগে যুগে নারীদের গড় আয়ু ও পরিবেশ-পরিস্থিতিতে বিয়ের ন্যূনতম বয়স নির্ধারণের ক্ষেত্রে তারতম্য দেখা যায়। সে ক্ষেত্রে পরের আইনের আলোকে আগের আইনসিদ্ধ বিষয়কে বিচার করা অজ্ঞতা, মূর্খতা ও জ্ঞানপাপীতা ছাড়া আর কিছুই নয়। ধরুন, আজ আপনি ২১ বছর বয়সে একটি ১৮ বছরের মেয়েকে বিয়ে করলেন। ঠিক ১০০০ বছর পর আইন হলো যে ছেলেদের বিয়ের বয়স ২৮ আর মেয়েদের ২৫। তখন কি ৩০১৬ সালের মানুষ আপনাকে-বাল্যবিবাহ আইন ভঙ্গ করেছেন-এমন অভিযোগে অভিযুক্ত করতে পারবে? কেন পারবে না? যদি না পারে, তাহলে আপনি কেন ১৪০০ বছর আগের আইনের আলোকে সংগঠিত হওয়া আয়েশা (রা.)-এর বিয়ে নিয়ে চিল্লাচিল্লি করছেন? নতুন আইনের আলোকে কেন পুরনো আইনের বিষয়কে বিচার করছেন? উদ্দেশ্য কী?

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
দয়া করে আপনার নাম লিখুন