ইসলামের দৃষ্টিতে সড়ক দুর্ঘটনার দায়ভার কার?

আহমাদ রাইদ

বাংলাদেশ ক্রমেই যেন অস্বাভাবিক মৃত্যু উপত্যকায় পরিণত হচ্ছে। পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যায়, গত সাড়ে তিন বছরে সারা দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন ২৫ হাজার ১২০ জন। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে ২০ জন। এই সময়ে আহত হয়েছেন ৬২ হাজার ৪৮২ জন। এসব দুর্ঘটনার ৯০ শতাংশ ঘটেছে চালকের বেপরোয়া মনোভাব ও অতিরিক্ত গতির কারণে।

এসব সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহত ব্যক্তিদের বেশির ভাগই শিশু, তরুণ ও কর্মক্ষম ব্যক্তি। এই দুই শ্রেণিকে দেশের ভবিষ্যৎ ও অর্থনীতির মূল শক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সড়ক দুর্ঘটনা এবং এর প্রভাবে ক্ষয়ক্ষতির আর্থিক পরিমাণ বছরে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা।

এসব তথ্য বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের। (প্রথম আলো : ৪-৮-২০১৮)
সংক্ষিপ্ত পরিসরে আমরা ইসলামের আলোকে সড়ক দুর্ঘটনার কারণ ও প্রতিকার নিরূপণে প্রয়াস চালাব, ইনশাল্লাহ।

সড়ক দুর্ঘটনার মানবসৃষ্ট কারণ

প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব, চালকদের স্বেচ্ছাচারিতা, অদক্ষতা ও অপরিপক্বতা, ট্রাফিক আইন না মানাকে সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এ ছাড়াও অতিরিক্ত মুনাফার লালসায় অতিরিক্ত যাত্রী বহন করার কারণেও জলযান, স্থলযান দুর্ঘটনার শিকার হয়। ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, সড়ক-মহাসড়কের অবকাঠামোগত ত্রুটিসহ বহুবিধ কারণে অহরহ- আমাদের এমন মর্মন্তুদ পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে। দূরপাল্লার গাড়িগুলোর অভারটেকিং প্রবণতা ও মাদকাসক্ত হয়ে উন্মত্ত অবস্থায় গাড়ি চালানোকেও সড়ক দুর্ঘটনার বিশেষ কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে।

সড়ক দুর্ঘটনার ধর্মীয় কারণ

প্রথমত, মৃত্যু সৃষ্টজীবের অনিবার্য নিয়তি ও পরিণতি। ইসলাম মতে নির্দিষ্ট সময়েই মানুষের মৃত্যু হয়। কিন্তু পৃথিবী যেহেতু ‘দারুল আসবাব’ বা ‘কারণ-উপকরণের প্রকাশস্থল’। কাজেই কারো মৃত্যুর ব্যাপারে সড়ক দুর্ঘটনা বাহ্যিক উপলক্ষ ছাড়া কিছুই নয়।

দ্বিতীয়ত, পৃথিবীতে যখন ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা হয় না এবং অপরাধী মানুষগুলো আল্লাহর ভূখণ্ডে অবাধে বিচরণ করে, তখন তারা যেকোনো সময়েই ভয়াবহ আজাবে নিপতিত হতে পারে। আর আল্লাহর আজাব এসে গেলে অপরাধী-নিরপরাধী সবাই আজাবে পতিত হয়। আল্লাহ বলেন, ‘যারা পাপাচার ও অপকর্মের ষড়যন্ত্র করে, তারা কি এ বিষয়ে নির্ভয় হয়ে গেছে যে, আল্লাহ তাআলা তাদের ভূগর্ভে ধসিয়ে দেবেন না, কিংবা এমন দিক থেকে শাস্তি আসবে না, যা তাদের ধারণাতীত! কিংবা তাদের তিনি পাকড়াও করবেন, যখন তারা চলাফেরা করতে থাকবে। (সুরা : নাহল, আয়াত : ৪৫-৪৬)

তৃতীয়ত, রাসুল (সা.) ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন, ‘যখন সমাজে জিনা-ব্যভিচার বেড়ে যাবে, তখন তাদের মধ্যে মৃত্যু ব্যাপক হয়ে যাবে….যখন বিচারকার্যে অবিচার করা হবে, তখন তাদের মধ্যে খুনখারাবি ছড়িয়ে পড়বে।’ (মোয়াত্তা ইমাম মালেক)

সড়ক দুর্ঘটনার দায়ভার কার?

সড়ক দুর্ঘটনা বিষয়ে ওআইসির ফিকাহ একাডেমির অন্যতম মেম্বার আল্লামা মুফতি তকি উসমানী সাহেব লিখেন, গাড়ি একটি প্রাণহীন বস্তু, এর নিয়ন্ত্রণ চালকের হাতেই থাকে। কাজেই যদি সড়ক দুর্ঘটনায় চালকের প্রত্যক্ষ ভূমিকা থাকে, যেমন ট্রাফিক আইন না মানা, মাত্রাতিরিক্ত স্পিডে গাড়ি চালনা করে, অভারটেকিং বা বাই রোডে চলাচল করে কিংবা মদ্যপান করে গাড়ি চালনা করে, তবে এসব ক্ষেত্রে দুর্ঘটনার দায়ভার চালককেই বহন করতে হবে। কিন্তু যদি দুর্ঘটনায় ড্রাইভারের হস্তক্ষেপ ও প্রত্যক্ষ ভূমিকা না থাকে, যেমন সে ট্রাফিক আইন মেনেই চলছে, কিন্তু হঠাৎ কেউ গাড়ির সামনে ঝাঁপ দিল আর তৎক্ষণাৎ গাড়ির নিয়ন্ত্রণ সাধ্যাতীত হয়ে পড়ে অথবা পিছনের গাড়ি আগের গাড়িকে ধাক্কা দিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত করে, এমতাবস্থায় আগে থাকা গাড়ির চালককে কোনো ক্ষতিপূরণ বা শাস্তি দেওয়া হবে না। তবে পেছনের গাড়ি চালক অপরাধী হিসেবে সাব্যস্ত হবে। এ ছাড়াও চালক যদি নিয়ম মেনে গাড়ি চালনা করে, হঠাৎ গাড়ির ‘পার্টস’ বা কোনো অংশ নষ্ট হয়ে যায় আর নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে গাড়ি দুর্ঘটনার কবলে পড়ে, এ ক্ষেত্রেও ওই চালক অপরাধী হিসেবে সাব্যস্ত হবে না। অতিরিক্ত যাত্রীবহনে যদি মালিকপক্ষের চাপ থাকে কিংবা লাগামহীন দ্রুত গন্তব্যে গাড়ি পৌঁছানোর নির্দেশ থাকে, তবে মালিকপক্ষকেও এর দায়ভার বহন করতে হবে। অবকাঠামোগত ত্রুটির কারণে দুর্ঘটনা ঘটলে রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এর দায়ভার এড়াতে পারেন না।

সড়ক দুর্ঘটনা বনাম ‘অকাল মৃত্যু’

শত সংগ্রাম, ঝড়-ঝঞ্ঝা পেরিয়ে প্রতিকূল বন্ধুর পথ মাড়িয়ে এ পৃথিবীতে টিকে থাকতে হয়। আশ্চর্য, তবুও কেউ সুন্দর এ পৃথিবী ছেড়ে যেতে চায় না! অথচ নির্মম সত্য হলো, সবাইকেই চলে যেতে হয় সুন্দর এ পৃথিবী ছেড়ে। আরো নিদারুণ করুণ বাস্তবতা হলো, জন্মের ক্ষেত্রে ধারাবাহিকতা রয়েছে- দাদা থেকে বাবা, বাবা থেকে ছেলে। কিন্তু যাবার বেলায় নেই এমন কোনো বেঁধে দেওয়া বিধি। এ ক্ষেত্রে ইসলাম মনে করে, নির্ধারিত সময়েই মানুষের মৃত্যু হয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘প্রত্যেক জাতির জন্যই একটি সুনির্দিষ্ট সময় রয়েছে। যখন তাদের সময় আসবে, তখন তারা মৃত্যুকাল একমুহূর্তও বিলম্ব করতে পারবে না। তেমনি তারা একমুহূর্ত এগুতেও পারবে না।’ (সুরা : আরাফ, আয়াত : ৩৪)
তাই, ইসলাম ধর্মে অকাল মৃত্যু বলে কিছু নেই।

সড়ক দুর্ঘটনা রোধে মুসলমানদের করণীয়

ইসলামী শরিয়ত মতে সফরের যে ‘আদাব’ বা করণীয় শিষ্টাচার রয়েছে, সেসব মতে চলাফেরা করলে দুর্ঘটনা থেকে বাঁচা যাবে বলে রাসুল (সা.) ঘোষণা করেছেন। হাদিস শরিফে এসেছে, ‘যখন তুমি ঘর থেকে বের হবে, তখন দুই রাকাত নামাজ পড়বে। সে দুই রাকাত নামাজ তোমাকে ঘরের বাইরের বিপদাপদ থেকে হেফাজত করবে।’ (মুসনাদে বাজজার)

এ ছাড়াও সফরে বের হয়ে নির্দিষ্ট দোয়া পড়া : ‘বিসমিল্লাহি তাওক্কালতু আলাল্লাহি, ওয়া লা হাওলা ওয়া লা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহি।’ আরো দোয়া রয়েছে : ‘আল্লাহুম্মা হাওয়্যিন আলাইনা হাজাস সফরি’…ইত্যাদি পাঠ করা। এ ছাড়া পাক-পবিত্রতার সঙ্গে জীবনযাপন করলে এবং ফজর ও মাগরিবের পর নির্দিষ্ট দোয়া পাঠ করলে সারা দিন, সারা রাত বিপদাপদমুক্ত থাকার প্রতিশ্রুতি রয়েছে।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
দয়া করে আপনার নাম লিখুন