ইয়েমেনে গাছের পাতা খেয়ে বেঁচে থাকার চেষ্টা!

গাছের পাতা খেয়ে যুদ্ধবিদ্ধস্ত ইয়েমেনে বহু পরিবার বেঁচে থাকার চেষ্টা করছে। গাছের লতাপাতা পানিতে সিদ্ধ করে টক স্বাদের সেই পেস্ট খাচ্ছেন তারা।

আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা এসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) এর পক্ষ থেকে সম্প্রতি উত্তর ইয়েমেনের আসলাম জেলায় সরেজমিনে গেলে এমন দৃশ্যের দেখা মেলে।

জেলার প্রধান স্বাস্থ্য কেন্দ্রে দেখা যায় অনেক ক্ষীণকায় শিশু চিকিৎসার জন্য এসেছে।

মারাত্নক রোগা কিন্তু বড় বড় চোখের ক্ষীণকায় শিশুদের প্লাস্টিকের গামলায় বসিয়ে নার্স ওজন মাপছেন।

শিশুদের শরীরে কাগজের মতো চামড়া মাংসহীন দেহে যেন কঙ্কালের উপর বসানো। নার্স তাদের হাতের বাহু মাপছিল। মাত্র কয়েক সেন্টিমিটার মাপ পাওয়া যাচ্ছিল।

চেহারা, শরীর আর নার্সের লিখিত তথ্য বলছে মারাত্নক পুষ্ঠিহীনতায় আক্রান্ত ইয়েমেনের শিশুরা।

এবছর স্বাস্থ্য কেন্দ্রটিতে প্রায় ২০টি শিশু ক্ষুধায় মারা গিয়েছে। তবে সরকারী হিসেবের বাইরেও দুর্ভিক্ষে মৃত্যুর ঘটনা যে রয়েছে তা সহজেই অনুমেয়। বাড়িতে বাড়িতে মৃত্যুর ঘটনা অহরহ ঘটছে।

স্বাস্থ্য কেন্দ্রে ক্ষীণকায় এক শিশুর ওজন করা হচ্ছে।আসলাম জেলা, ইয়েমেন।

সেখান থেকে নিকটের একটি গ্রামে গিয়ে দেখা গেল ৭ মাসের মেয়ে জাহরা কেঁদেই চলেছে। হাত পা ছুড়াছুড়ি করছে মায়ের দুধ খাওয়ার জন্য।

কিন্তু জাহরার মা মারাত্নক অপু্ষ্টির শিকার। ঠিকমতো মেয়েকে বুকের দুধ খেতে দিতে পারছেন না।

সেই মা কষ্ট নিয়ে বলেন, ‘মেয়েটা জন্মের পর থেকে ওর জন্য দুধ বা ওষুধ কিনতে পারিনি।’

স্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রধান মাকিয়ে মাহদি বলছিলেন, ‘জাহরাকে সম্প্রতি স্বাস্থ্য কেন্দ্রে চিকিৎসা দেয়া হয়েছে। কিন্তু বাড়ি ফেরার পর সে আবার শুকিয়ে যাচ্ছে।’

‘অর্থকড়ি না থাকার কারণে জাহরার বাবা-মায়ের পক্ষে জাহরাকে গাড়িতে করে পুনরায় ক্লিনিকে আনা সম্ভব হচ্ছে না। তারা যদি মেয়েকে ক্লিনিকে না আনতে পারেন তবে চোখের সামনে জাহরা মৃত্যুর কোলে ঢোলে পড়বে।’

‘আমরা একুশ শতকে বাস করছি। অথচ যুদ্ধ আমাদের এই পরিণতি দিয়েছে। আমি যখন গ্রামের বাড়ি বাড়ি ঘুরি দৃশ্যগুলো দেখলে আমার খুব কষ্ট হয়।’

‘মানুষেরা গাছের লতা পাতা সিদ্ধ করে খাচ্ছে। বাড়ি ফিরে খেতে বসে আমি মুখে খাবার নিতে পারি না।’

আসলাম শহরের এমন চিত্র প্রমাণ করছে স্থানীয় প্রশাসনের চাপের মুখে আন্তর্জাতিক ত্রাণ সহযোগিতা সবখানে ঠিক মতো বিতরণ হচ্ছে না।

এছাড়া কর্তৃপক্ষ দুর্ভিক্ষের কারণে যে মানবিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছিলেন তা সত্য বলে প্রমাণিত হচ্ছে।

প্রদেশের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রধান ওয়ালিদ আল শামসান বলেন, ‘হাজ্জাজ প্রদেশের এই আসলাম শহরে প্রথম ৬ মাসে ১৭ হাজার অপুষ্টির শিকার মানুষের তালিকা নথিভুক্ত হয়েছিল। অন্যান্য বছরের তুলনায় প্রথম ৬ মাসের এই সংখ্যা অনেক বেশি।’

‘প্রত্যন্ত গ্রাম যেখানে স্বাস্থ্যসেবা ও খাদ্য ঠিক মতো পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না সেখানে ক্ষুধা ও অপুষ্টিতে মৃত্যুহার বেশি।’

ইয়েমেনের উত্তরাঞ্চল দখল করে রেখেছে হুতি বিদ্রোহীরা। তারা ইয়েমেন সরকার ও সৌদিআরব পরিচালিত জোটের বিরুদ্ধে সশস্ত্র লড়াই করছে।

বিগত তিন বছরের এই গৃহযুদ্ধে দেশের অভ্যন্তরে খাদ্য উৎপাদন মারাত্নক কমে গিয়েছে।

এছাড়া দেশের বাইরে থেকে যে খাদ্য সাহায্য আসছে সেটা অপ্রতুল এবং যুদ্ধের কারণে সঠিকভাবে বিতরণ করা সম্ভব হচ্ছে না।

ধারণা করা হচ্ছে ইয়েমেনে এখন প্রায় ২৯ লাখ নারী ও শিশু অপুষ্টির শিকার। ক্ষুধার্তের সংখ্যা দিনদিন বেড়ে যাচ্ছে।

সাম্প্রতিক অচলাবস্থার কারণে আরো প্রায় ৪ লাখ শিশু নতুন করে অপুষ্টিতে আক্রান্ত হওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

উল্লেখ্য, আরব দেশ ইয়েমেনে প্রায় ৩ কোটি মানুষ বাস করে। ২০১৫ সাল থেকে সেখানে গৃহযুদ্ধে লিপ্ত হুতি বিদ্রোহী ও সরকার।

জেএস/

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
দয়া করে আপনার নাম লিখুন