ঈদে নিরাপদ যাতায়াতে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের ৩৮ প্রস্তাবনা

ডেইলি ইসলাম:  আসন্ন রোজার ঈদে যাত্রীদের নিরাপদ যাতায়াতের লক্ষ্যে ৩৮টি প্রস্তাবনা তৈরি করেছে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়। এসব প্রস্তাবনায় পহেলা জুন থেকে ৮ জুন পর্যন্ত ৮ দিন দিনের বেলায় বালুবাহী নৌযান চলাচল বন্ধের কথা রয়েছে।

এছাড়া যাত্রীবাহী গাড়ি পারাপারের সুবিধার্থে ঈদের আগে ও পরে সাত দিন ফেরিতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যবাহী ছাড়া অন্যান্য ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান পারাপার বন্ধ রাখার কথাও বলা হয়েছে প্রস্তাবে। কালবৈশাখী মৌসুম থাকায় লঞ্চের নিরাপত্তায় বেশ কিছু পদক্ষেপের কথা রয়েছে প্রস্তাবে।

প্রতিটি লঞ্চের ছাদের সঙ্গে দুইশ’ থেকে তিনশ’ ফুট দৈর্ঘ্যরে রশিতে বড় প্লাস্টিক কনটেইনার বা বয়া বেঁধে রাখার কথা বলা হয়েছে- যাতে লঞ্চ ডুবে গেলে তাৎক্ষণিক শনাক্ত করা যায়। এদিকে যাত্রী তোলার ক্ষেত্রে কোনো বাধা না দেয়াসহ ২৪টি দাবিনামা তৈরি করেছে লঞ্চ মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-চলাচল (যাত্রী পরিবহন) সংস্থা। এসব দাবির মধ্যে ‘অহেতুক মামলা’ না দেয়াসহ মালিকদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয় রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে এসব তথ্য।

ঈদ উপলক্ষে যাত্রীদের নিরাপদ যাতায়াত নিয়ে করণীয় নির্ধারণে আজ আন্তঃসংস্থা বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) সভাকক্ষে অনুষ্ঠেয় এ বৈঠকে নৌমন্ত্রণালয়ের কার্যপত্রে ৩৮টি প্রস্তাবনা উঠবে। আর লঞ্চ মালিকেরাও তাদের দাবি নিয়ে এ বৈঠকে অংশ নেবেন।

ঈদের আগে প্রতিবছর এ ধরনের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। এরই ধারাবাহিকতায় এ বৈঠকের আয়োজন করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। বৈঠকে দেশের বিভিন্ন জেলার ডিসি, এসপিসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কর্মকর্তারা অংশ নেবেন।

নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আবদুস সামাদ বিদেশে অবস্থান করায় এ বিষয়ে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে বিআইডব্লিউটিএর চেয়ারম্যান কমোডর মো. মাহবুব-উল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, চলতি কালবৈশাখী মৌসুমে যাত্রীদের নিরাপদ গন্তব্যে পৌঁছতে যেসব পদক্ষেপ নেয়া দরকার তা বৈঠকে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। নৌঘাট ও ফেরি ম্যানেজমেন্ট কীভাবে ভালো রাখা যায় সেই বিষয়ে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, প্রতিকূল আবহাওয়ার সংকেত থাকলে আমরা লঞ্চ চলাচল করতে দেব না। এছাড়া লঞ্চে লাইফ জ্যাকেটসহ অন্যান্য নিরাপত্তা সরঞ্জাম নিশ্চিত করা হবে।

নৌমন্ত্রণালয়ের কার্যপত্রে দেখা গেছে, পাঁচ ক্যাটাগরিতে ৩৮টি প্রস্তাবনা উঠবে আজকের সভায়। এর মধ্যে যাত্রীসেবা নিশ্চিত করতে ১০টি, যাত্রীদের নিরাপত্তা সংক্রান্ত ১০টি, নৌ-রুট ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত ৫টি, নৌযান বৃদ্ধি বা সিডিউল পুনর্বিন্যাস সংক্রান্ত ৩টি, সমন্বয় সংক্রান্ত ৬টি ও বিবিধ ৪টি প্রস্তাব রয়েছে।

যাত্রীদের নিরাপত্তা সংক্রান্ত প্রস্তাবনায় রয়েছে- রাতে সব প্রকার পণ্যবাহী ও বালুবাহী জাহাজ চলাচল বন্ধ করতে হবে। আগামী পহেলা জুন থেকে ৮ জুন পর্যন্ত আট দিন দিনের বেলায়ও সব বালুবাহী বাল্কহেড চলাচল বন্ধ রাখতে হবে।

বিআইডব্লিউটিএ, নৌপরিবহন অধিদফতর, সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসন, জেলা পুলিশ ও নৌ পুলিশ এ নির্দেশনা বাস্তবায়ন করবে। রাতে স্পিডবোট চলাচল বন্ধ থাকবে। দিনে চলাচলের সময় যাত্রীদের লাইফ জ্যাকেট পরিধান নিশ্চিত করতে হবে।

নৌপথে ডাকাতি, চাঁদাবাজি ও যাত্রী হয়রানি বন্ধে রাতেও পুলিশের টহলের ব্যবস্থা করতে হবে। কোনো ক্রমেই লঞ্চে ওভারলোড ও অতিরিক্ত যাত্রী বহন করা যাবে না। লঞ্চের কেবিনের যাত্রীদের ছবি বা মোবাইল নম্বর অথবা জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর সংরক্ষণ করতে হবে।

যাত্রীসেবা প্রসঙ্গে প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, সদরঘাট টার্মিনাল হকারমুক্ত এবং সদরঘাট থেকে বাহাদুরশাহ পার্ক পর্যন্ত রাস্তা যানজটমুক্ত রাখতে হবে। নৌঘাটগুলোতে ইজারাদাররা যাতে যাত্রীদের হয়রানি না করেন সে বিষয়ে জেলা প্রশাসন, পুলিশ ও বিআইডব্লিউটিএ কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। লঞ্চ বা স্পিডবোটে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করলে জড়িতদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে হবে। ঈদের আগেই সদরঘাটে কাউন্টার থেকে টিকিট বিক্রি করতে হবে।

নৌরুট ব্যবস্থাপনা প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, লঞ্চের স্বাভাবিক চলাচল নিশ্চিত করতে নৌপথে বাতি ও মার্কিং ব্যবস্থা করতে হবে। ঈদের আগের তিন দিন ও পরের তিন দিন মোট সাত দিন ফেরিতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যবাহী ট্রাক ছাড়া সাধারণ ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান পারাপার বন্ধ থাকবে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিআইডব্লিউটিএর একজন পদস্থ কর্মকর্তা বলেন, প্রতি ঈদের আগে ও পরে মাওয়ার শিমুলিয়া ও কাঁঠালবাড়ীর ইলিয়াস আহম্মেদ চৌধুরী ঘাটে স্পিড পারাপারে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হয়। কিন্তু স্থানীয় প্রশাসন কোনো ব্যবস্থা নেয় না। এছাড়া নৌবন্দরগুলোতে প্রবেশ ফির নামেও বাড়তি টাকা আদায়ের বিস্তর অভিযোগ এলেও কোনো প্রতিকার হয় না।

ঈদে ‘পরিপূর্ণ’ যাত্রী নিতে চান মালিকেরা : সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ঈদে বাধাহীনভাবে পরিপূর্ণ যাত্রী বোঝাই করে লঞ্চ ছাড়ার সুযোগ চেয়ে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, বিআইডব্লিউটিএ ও নৌ-পরিবহন অধিদফতরকে চিঠি দিয়েছে লঞ্চ মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-চলাচল (যাত্রী পরিবহন) সংস্থা। আজকের সভায় এ দাবি নিয়ে মালিক প্রতিনিধিরা বক্তব্য রাখবেন বলেও কয়েকজন লঞ্চ মালিক যুগান্তরকে জানিয়েছেন। চিঠিতে ২৪টি প্রস্তাব রয়েছে।

এতে বলা হয়েছে, যাত্রী পরিপূর্ণ হওয়ার আগে কোনো লঞ্চকে যাতে ঘাট ত্যাগে বাধ্য করা না হয় সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। এর কারণ ব্যাখ্যা করে বলা হয়েছে, প্রথমদিকে লঞ্চ ঘাট ত্যাগে বাধ্য করা হলে পরবর্তীতে লঞ্চ না থাকায় যাত্রীরা বিপাকে পড়েন। আরেক দাবিতে বলা হয়েছে, হয়রানিমূলক মামলা দেয়া যাবে না।

মালিক সংগঠনের মতামত সাপেক্ষে স্পেশাল লঞ্চ সার্ভিস সময়সূচি অনুমোদন করতে হবে। কোনো অবস্থাতেই যাতে নির্ধারিত ট্রিপের লঞ্চের আগে স্পেশাল সার্ভিসের লঞ্চ ঘাটে বার্দিং (ভিড়তে) না পারে সেই পদক্ষেপ নিতে হবে। এ দাবি প্রসঙ্গে বিআইডব্লিউটিএ’র চেয়ারম্যান কমোডর মাহবুব-উল ইসলাম বলেন, লঞ্চ মালিকরা অনেক দাবিই করেন।

সাধারণত ঈদে লঞ্চে বেশি যাত্রী উঠে থাকেন। তবে আমরা সচেতন থাকব। তিনি বলেন, এবার ঈদে একাধিক দিনে গার্মেন্ট ছুটি দেয়ার বিষয়ে সরকারের আলাপ-আলোচনা চলছে। একাধিক দিনে ছুটি দেয়া হলে একসঙ্গে লঞ্চে চাপ পড়বে না।

লঞ্চ মালিক সংগঠনের অন্য দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে- জিপিও মোড় বা জিরো পয়েন্ট হতে সদরঘাট যাওয়ার রাস্তা অর্থাৎ নর্থ সাউথ ও নবাবপুর রোড যানজটমুক্ত রাখতে হবে। সদরঘাটে নৌকা দিয়ে যাতে কোনো যাত্রী লঞ্চে উঠতে না পারে তার ব্যবস্থা করতে হবে।

নৌকা দিয়ে যাত্রী পারাপারে কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে লঞ্চ মালিকদের দায়ী করা যাবে না। ঢাকা নদী বন্দর হতে লঞ্চ ছেড়ে যাওয়ার পর পথে কোনো আইন প্রয়োগকারী সংস্থা যাতে লঞ্চ পরিচালনায় ব্যাঘাত সৃষ্টি না করে সে ব্যবস্থা করতে হবে।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
দয়া করে আপনার নাম লিখুন