এই ‘সন্ত্রাস’-এর পটভূমি কারা তৈরি করেছে?

আলতাফ পারভেজ

এটা কি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা?

নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চে আজ শুক্রবারের হামলার বিস্তারিত আমরা এখনো জানি না। প্রাথমিকভাবে মৃতের সংখ্যা ৪০ বলে জানানো হয়েছে। ইতিমধ্যে ইতিহাসের ভয়াবহ এই বর্ণ ও জাতিবাদী খুন বিশ্বজুড়ে প্রধান খবরে পরিণত হয়েছে।

কিন্তু এই হামলাকে কি ফিলিস্তিন, কাশ্মীর, আরাকানের ঘটনাবলি থেকে আলাদা করে পাঠ করার সুযোগ আছে? বিগত সময়ে বিশ্বজুড়ে মুসলমানদের বিরুদ্ধে কাঠামোগত ঘৃণাচর্চা ও নির্যাতনের যে রেওয়াজ দেখা যাচ্ছে—তারই আন্তমহাদেশীয় সম্প্রসারিত রূপ হিসেবে এই হামলাকে কি আমরা শনাক্ত করতে পারি না?

এটা ভাবা প্রকৃতই জরুরি যে, বিশ্বজুড়ে মুসলমানবিরোধী ঘৃণা তৈরি, তাদের পশ্চাৎপদ হিসেবে প্রতিনিয়ত প্রচার করা, তাদের পোশাক ও খাবার অভ্যাস নিয়ে পুনঃপুন বিতর্ক সৃষ্টি, তাদের নিয়ন্ত্রণ করার ধারণা প্রচার, তাদের নির্যাতন ও খুনযোগ্য প্রমাণ করা ও তাতে ন্যায্যতা দেওয়া এবং তা থেকে চোখ ফিরিয়ে রাখার যে চর্চা হচ্ছে দশকের পর দশক; তারই ফল কিনা জাতিবাদী-বর্ণবাদী এই অপরাধ।

এটা কি শুধুই একটা ‘দক্ষিণপন্থী সন্ত্রাস’?

নিউজিল্যান্ডের এই ‘খুনের উৎসব’কে ইতিমধ্যে শুধুই একটা ‘সন্ত্রাসী’ ঘটনা হিসেবে দেখানোর চেষ্টা দেখছি আমরা। অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের ক্ষমতাধর রাজনীতিবিদেরা এইরূপ হামলার বৈশ্বিক চরিত্র আড়াল করতে একে স্রেফ একটা ‘দক্ষিণপন্থী’ ঘটনা হিসেবে ব্যাখ্যা দিচ্ছেন। কিন্তু নিউজিল্যান্ডের মসজিদে হামলাকারীদের মধ্যে অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক থাকা এইরূপ অপরাধীদের আন্তর্জাতিক যোগাযোগের সাক্ষ্য দিচ্ছে। এর আগেও ‘উন্নত’ নিরাপত্তাময় দেশগুলোতে মুসলমানদের বিরুদ্ধে এরূপ সমন্বিত হামলার দৃষ্টান্ত আছে। বস্তুত এইরূপ ঘৃণার চাষবাস দুনিয়াব্যাপীই চলছে। নিউজিল্যান্ডের ক্ষেত্রে নতুন যেটা দেখা গেল—সন্ত্রাসীদের নাম ও পরিচয় প্রকাশে মিডিয়ায় সচেতন বিলম্ব ঘটছে। এমনকি হতাহতের প্রকৃত সংখ্যার জন্যও দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে। এমনকি তাদের পরিচয়ও প্রকাশ করা হয়নি। অভিবাসী মানুষদের আন্তর্জাতিক নিকটজনদের জন্য যা জানা জরুরি ছিল। অর্থাৎ জানার অধিকারও এ ক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে সংকুচিত দেখা গেল। কোনো মুসলমান সংগঠন ও ব্যক্তি দ্বারা যখন এইরূপ ঘটনা ঘটে, তখন প্রায় তাৎক্ষণিকভাবেই তাদের নাম, বংশ ও ধর্মীয় ঠিকুজির বিষয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন হাজির হতে দেখা গেছে অতীতে। নিউজিল্যান্ডে তার ব্যতিক্রম দেখা গেল এবং এই ব্যতিক্রমের রাজনৈতিক দিকটি অস্পষ্ট নয়।

হামলা হলো ঘৃণাবাদী ভাবাদর্শের ওপর দাঁড়িয়ে

ইতিমধ্যে এই হামলার যে বিবরণ মিলেছে তাতে দেখা যাচ্ছে, অনেক সমন্বিত এবং ব্যাপকসংখ্যক ব্যক্তির যোগসাজশে তা হয়েছে। একই সঙ্গে অনেকগুলো মসজিদসহ বহু স্থান রক্তে ডুবে গেছে। হামলার ধরনে সামরিক প্রশিক্ষণের নজরকাড়া ছাপ রয়েছে। আক্রমণকারীরা এই হামলার পেছনে ভাবাদর্শিক মেনিফেস্টোও প্রচার করেছে এবং হামলার ভিডিও করেছে। মুসলমানবিরোধী ঘৃণার গভীরতা এবং তার ভাবাদর্শিক ব্যাপকতা এসব তথ্য থেকে স্পষ্ট। এই হামলা যে বিচ্ছিন্ন এবং ‘হঠাৎ সৃষ্ট কোনো ঘটনা’ নয়, তার আলামত হামলাকারীদের বুদ্ধিবৃত্তিক ও সামরিক প্রস্তুতি থেকেই স্পষ্ট। তারা বিশ্বের সামনে এটাকে একটা ‘নজির’ হিসেবে আনতে চেয়েছে এবং তা সফল।

নিউজিল্যান্ডের এই ঘটনা প্রমাণ করছে বিশ্বজুড়ে, বিশেষ করে ইউরোপ, আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়া অঞ্চলে জাতি ও বর্ণ ঘৃণার শিকার মানুষ হিসেবে মুসলমানদের অসহায়ত্ব কত বেড়েছে। তথাকথিত ‘ইসলামভীতি’র নামে তাদের জাতিগতভাবে ‘অমানবিকীকরণ’-এর বৈশ্বিক প্রকাশ হিসেবে চিহ্নিত করা যায় চলতি অবস্থাকে। উন্নত দেশগুলোতে তারা কতটা মাথা নিচু করে মনস্তাত্ত্বিক ভীতির মধ্যে বসবাস করছে এবং করতে থাকবে, ক্রাইস্টচার্চের রক্তস্নাত শুক্রবার সেটাই জানিয়ে দিল বিশ্ববাসীকে। যদিও বিশ্ব আদৌ তা শুনতে প্রস্তুত কি না—সে বিষয়ে গভীর সন্দেহ থেকেই যায়।

এই ‘সন্ত্রাস’-এর পটভূমি কারা তৈরি করেছে?

নিউজিল্যান্ডের হামলাকে একটা ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’ বলা হলেও আন্তর্জাতিক পরিসরে এই মুহূর্তে কয়েক ডজন বড় বড় রাজনৈতিক দলের নাম উল্লেখ করা সম্ভব যারা প্রকাশ্যে এবং পদ্ধতিগতভাবে ‘আগ্রাসী’ জনগোষ্ঠী হিসেবে উল্লেখ করে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ঘৃণাকে প্রাতিষ্ঠানিকতা দিয়ে চলেছে। তাদের জন্মহার বেশি ইত্যাদি বলে ওইরূপ ঘৃণাকে জরুরি প্রমাণ করা হচ্ছে। আবার এইরূপ প্রাতিষ্ঠানিক ঘৃণা থেকে রাজনৈতিক ও নির্বাচনী ফায়দা হাসিল করা হচ্ছে। তাতে মুসলমানবিরোধী আইন প্রণয়নেও উদ্দীপনা এসেছে। এইরূপ প্রচারণা ও উদ্দীপনাই যে নিউজিল্যান্ডের সর্বশেষ হামলার পটভূমি তৈরি করেনি, সেটা আমরা কোনোভাবেই বলতে পারি না। এরূপ আরও হামলা যে হবে না তারও নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারে না। সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো বিশ্বের কোনো তথাকথিত ‘নিরাপদ’ দেশই আর মুসলমানদের জন্য নিরাপদ নেই। নিউজিল্যান্ডের ঘটনা তা–ই প্রমাণ করছে।

‘ইসলামভীতি’র রাজনৈতিক-অর্থনীতির প্রতি কবে নজর দেব আমরা?

আলোচ্য হামলার পর থেকে একনাগাড়ে বলা হচ্ছে এর কারণ ‘ইসলামভীতি’। এ যেন পরোক্ষে এটাই বলা যে ইসলাম ভীতিকর, ইসলামকে নিয়ে ভীতির কারণ রয়েছে। আর এই ভীতি দূর করতে হবে কখনো খুন, কখনো যুদ্ধ, কখনো নিয়ন্ত্রণ করে।

প্রকৃতপক্ষে দেশে-দেশে করপোরেট লুণ্ঠন ও স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার স্বরূপটি আড়াল করতেই মুসলমানদের এভাবে ‘ভীতিকর’ প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করানো হয়েছে বহুকাল যাবৎ। কমিউনিস্ট ভীতির আবেদন ও প্রয়োজনীয়তা শেষে নতুন এই ‘ভীতিপ্রকল্প’-এর আবির্ভাব ঘটানো হয়। মুসলমানদের ‘প্রতিপক্ষ’ হিসেবে দাঁড় করিয়ে রাষ্ট্রে-রাষ্ট্রে নাগরিক স্বাধীনতার ওপর নজরদারি ও ব্যক্তি অধিকার হরণের কারবার বাড়ানো হয়েছে। মুসলমানবিরোধী ঘৃণা বিশ্বের অনেক স্থানেই সমরাস্ত্র খাতের জন্য দারুণ ভাবাদর্শিক এক বিনিয়োগ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। সিরিয়া, ইরাক, আফগানিস্তানের পাশাপাশি আরাকান, কাশ্মীর, ফিলিস্তিনকে বহুকাল যাবৎ জ্বলতে দেখা যাচ্ছে। এসব জ্বলন্ত জনপদ নিয়ে জাতিসংঘসহ মানবাধিকারগোষ্ঠী বিশ্ব আজও প্রতিরোধযোগ্য কিছু করতে পারেনি।

এ–ও সত্য যে, বিশ্বের অনেক স্থানে বিভিন্ন সময় মুসলমানদের কিয়দংশও আন্তর্জাতিক পুঁজিতন্ত্রের এইরূপ ঘৃণাবাদী প্রকল্পের ফাঁদে পা দিয়েছে এবং পাল্টাঘৃণার মনোভাব গড়ে উঠছে। এতে মূল শত্রুদের লাভ হয়েছে।

নিউজিল্যান্ডে চরম নৃশংসতার এই মুহূর্তটি আবারও জাতিবাদী ঘৃণার ফ্যাক্টরিগুলো এবং তার পেছনকার বৈশ্বিক রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রনৈতিক প্রকল্পগুলোকে সঠিকভাবে চিহ্নিত করার তাগিদ দিচ্ছে। (সূত্র : প্রথম আলো অনলাইন)

আলতাফ পারভেজ: গবেষক

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
দয়া করে আপনার নাম লিখুন