এক আলেমের স্মৃতিতে ৬ ফেব্রুয়ারির ছয় শহিদ ও ফতোয়া আন্দোলন

আজ ৬ ফেব্রুয়ারি। ২০০১ সালের এই দিনেই ইসলামের জন্য জীবন-উৎসর্গকারী ৬ শহিদের তপ্ত খুনে রঞ্জিত হয়েছিল ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মাটি। আন্দোলনে আন্দোলনে প্রকম্পিত ছিল পুরো দেশ। বাংলাদেশে সব ধরনের ফতোয়াকে অবৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্টের দেওয়া এক রায়ের প্রেক্ষিতে ইসলামী আইন বাস্তবায়ন কমিটির আহ্বানে সূচনা হয়েছিল এ আন্দোলনের। সেই সময়ের প্রেক্ষাপট, আন্দোলনের তেজস্বিতা এবং ছয় শহিদের শাহাদাতের স্মৃতি নিয়ে কথা বলেছেন ইসলামী আইন বাস্তবায়ন কমিটির যুগ্ম মহাসচিব মুফতী মাওলানা তৈয়ব

মুফতী মাওলানা তৈয়ব বলেন, ২০০১ সালের পহেলা জানুয়ারি হাইকোর্টের বিচারপতি গোলাম রব্বানী ও নাজমুন আরা সুলতানার ব্রাঞ্চ থেকে রায় দেওয়া হয়, বাংলাদেশে সবধরনের ফতোয়া অবৈধ। ইসলাম ও শরিয়াহর সঙ্গে পুরোপুরি সাংঘর্ষিক এ রায়ে চমকে ওঠেন এ দেশের ধর্মপ্রাণ জনগোষ্ঠী এবং উলামায়ে কেরাম। কিন্তু তাৎক্ষণিকভাবে কেউ কোনো কথা বলতে সাহস পাচ্ছিলেন না।

ঠিক সে সময় আল্লামা মুফতী ফজলুল হক আমিনী রহ. হাইকোর্টের রায়দাতা দুই বিচারপতি গোলাম রব্বানী ও নাজমুন আরা সুলতানাকে মুরতাদ ঘোষণা দিয়ে ফতোয়া প্রকাশ করেন। এবং হাইকোর্টের ফতোয়া-নিষিদ্ধের রায়ের বিরুদ্ধে ইসলামী আইন বাস্তবায়ন কমিটির ব্যানারে দুর্বার আন্দোলনের ডাক দেন। পুরো দেশ তখন আমিনী রহ.-এর এই সাহসী আহ্বানে সাড়া দিয়ে গর্জে ওঠে। দলমত নির্বিশেষে হকপন্থী সমস্ত উলামায়ে কেরাম তাঁকে সমর্থন জানান। শায়খুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হক রহ., বায়তুল মুকাররমের খতীব আল্লামা উবায়দুল হক রহ.-সহ সকলেই এ আন্দোলনে একাত্মতা ঘোষণা করেন। আন্দোলন চলতে থাকে দুর্বার গতিতে।

তৎকালীন ক্ষমতাসীন সরকারও এ আন্দোলন দমানোর জন্য দমন-পীড়নের চূড়ান্ত পন্থা বেছে নেয়। ২ ফেব্রুয়ারি দিনের বেলা মুফতি আমিনী রহ. পল্টনে আহুত ইসলামী আইন বাস্তবায়ন কমিটির বিশাল সমাবেশে যোগ দেবার প্রাক্কালে লালবাগ থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তারপর এই দিনই রাতের বেলা দিনাজপুরের একটি জনসভা থেকে ফেরার পথে গাজিপুর থেকে গ্রেপ্তার করা হয় শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক রহ.-কে।

সরকার ভেবেছিল আন্দোলনের এই দুই প্রাণপুরুষকে গ্রেপ্তার করলে আন্দোলন স্তিমিত হয়ে যাবে। কিন্তু ফল দাঁড়াল ঠিক এর বিপরীতটা। জ্বলন্ত আগুনে ঘি ঢেলে দিলে যেমন হয়, পুরো বাংলাদেশ সেভাবে গর্জ উঠল তাঁদের গ্রেপ্তারের সঙ্গে সঙ্গে। ৩-৪ ফেব্রুয়ারি সারা দেশে একযোগে হরতাল পালিত হয়। চলতে থাকে সরকারের দমন-পীড়নও।

এরই পরিপ্রেক্ষিতে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বড় হুজুর রহ. ঘোষণা দেন মুফতি আমিনী ও শায়খুল হাদীস রহ.-কে মুক্তি না দেওয়া পর্যন্ত ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ধর্মপ্রাণ মানুষ রাজপথে থাকবে। তাঁরা ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে আন্দোলনের মাধ্যমে সারাদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেন। আন্দোলন তুমুল বেগে চলতে থাকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়।

৬ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আওয়ামী লীগ নেতা মোহাম্মদ নাসিমের নির্দেশে পুলিশ ও বিডিআর সদস্যরা ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় আন্দোলনরত আপামর জনতার ওপর নির্বিচারে গুলি বর্ষণ করতে থাকে। এতে অসংখ্য মানুষ গুরুতর আহত হবার পাশাপাশি ৬ জন সাধারণ মুসল্লি ও মাদরাসা ছাত্র শাহাদত বরণ করেন।

আন্দোলন আরও বেগবান হয়৷ সরকার বাধ্য হয় মুফতী আমিনী ও শায়খুল হাদীস রহ.-কে মুক্ত করে দিতে। এবং তার কিছুদিনের মধ্যেই সরকারের মেয়াদ ফুরিয়ে যায়। নির্বাচন আসে। এ দেশের ধর্মপ্রাণ মানুষ নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে প্রত্যাখ্যান করে। চারদলীয় ঐক্যজোট আসে ক্ষমতায়।

চারদলীয় ঐক্যজোট তখন ক্ষমতায় এসেছিল আওয়ামী লীগের ইসলাম-বিরোধিতা ও ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর ওপর নিপীড়নের কারণে তৈরি ধর্মপ্রাণ মানুষের সিম্প্যাথিকে কাজে লাগিয়ে। নির্বাচনে তারা ওয়াদা দিয়েছিল ফতোয়া-বিরোধী রায় বাতিল করার পাশাপাশি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ছয় শহিদের বিচার ও তাদের প্রত্যেকের পরিবারকে একটি করে বাড়ি তৈরি করে দেবে।

কিন্তু পরবর্তী সময়ে তাদের পাঁচ বছরের শাসনামলে ফতোয়া-বিরোধী রায় বাতিল কিংবা ছয় শহিদের বিচার তো দূরের কথা, তাদের দিকে ফিরেও তাকায়নি বিএনপি-জামায়াত জোট।

মুফতী তৈয়ব বলেন, মুফতী আমিনী ও শায়খুল হাদীস রহ. বারবার অনুরোধ এবং নিজেদের সর্বাত্মক চেষ্টা দিয়ে সরকারকে বলেছেন এইসব বিষয়ে, কিন্তু বিএনপি তাঁদের কথা কানেই তুলতে রাজি হয়নি। মুফতি আমিনী রহ. তখন আক্ষেপ করে বলেছিলেন, আলেমদের সঙ্গে বিএনপির এই গাদ্দারি খুব শিগগির তাদের দীর্ঘ পতন ডেকে আনবে।

আজ হয়েছেও তাই। বিএনপির বর্তমান যে দুর্দশা, অদূর ভবিষ্যতে আর কখনও তারা ক্ষমতায় আসতে পারবে কি-না, সন্দেহ। তবে ছয় শহিদের রক্ত বৃথা যায়নি। তাঁদের শাহাদাতের হয়তো বিচার হয়নি, কিন্তু যে আওয়ামী লীগ ফতোয়া-নিষিদ্ধের রায় দিয়েছিল, সে আওয়ামী লীগই আবার ক্ষমতায় এসে তা বাতিল করেছে।

একদিন হয়তো এভাবেই ছয় শহিদের রক্তের বিচার হবে এই মাটিতে। বিচার হবে ইসলামি আন্দোলন-সংগ্রামে বিগত দিনে আরও যাঁরা রক্ত দিয়েছেন, পান করেছেন শাহাদতের অমীয় সুধা, তাঁদের তপ্ত খুনের। এমনটাই আশা ইসলামী আইন বাস্তবায়ন কমিটির যুগ্ম মহাসচিব মুফতী মাওলানা তৈয়বের।

সৌজন্যে : ফাতেহ টুয়েন্টিফোর ডটকম

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
দয়া করে আপনার নাম লিখুন