ওমরা যাত্রীদের টিকিট সঙ্কট নিরসনে হাবের চেষ্টা অব্যাহত

এক দিকে বাংলাদেশী ওমরাহযাত্রী বৃদ্ধি, অন্য দিকে বিভিন্ন এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট কমিয়ে আনার কারণে তীব্র টিকিট সঙ্কটে রমজানে প্রায় ২০ হাজার লোকের ওমরাহ পালন চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। অনেক যাত্রীকে দ্বিগুণেরও বেশি মূল্যে টিকিট কিনে ওমরাহ পালনে যেতে হচ্ছে। সময়মতো যেতে না পারায় অনেকের ভিসা বাতিল হয়ে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকারকে জরুরি ব্যবস্থা নেয়ার আহ্বান জানিয়েছে হজ এজেন্সিস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (হাব)।

সমস্যা সমাধানে ঢাকা-জেদ্দা, ঢাকা-মদিনা ও ঢাকা-রিয়াদ রুটে বিমান বাংলাদেশ এয়ার লাইন্সের ফ্লাইট বাড়ানো এবং অন্যান্য বিমান সংস্থাকে বিভিন্ন চার্জ কমিয়ে বাংলাদেশ থেকে মধ্যপ্রাচ্যে ফ্লাইট পরিচালনায় উৎসাহী করার প্রস্তাব দিয়েছে হাব।
গতকাল রাজধানীর নয়াপল্টনে একটি হোটেলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে হাবের সভাপতি এম শাহাদাত হোসাইন তসলিম এই আহ্বান জানান।
তিনি স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপ হিসেবে বিমানের কম দূরত্বের রুটের ফ্রিকুয়েন্সি কমিয়ে সৌদি আরবের রুটে ফ্রিকুয়েন্সি বৃদ্ধি করা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হিসেবে বিদেশী এয়ারের বিভিন্ন ধরনের চার্জ কমানো বা মওকুফ করে দেয়া এবং ওপেনস্কাই করার বিষয়টি বিবেচনা করা যায় কি না দেখার অনুরোধ জানান।

তিনি বলেন, ওমরাহযাত্রীদের টিকিট সঙ্কট শুধু রমজানে নয়, সারা বছরই বিরাজ করবে। কারণ বাংলাদেশে ওমরাহযাত্রীর সংখ্যা অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে এবং পাচ্ছে। সৌদি সরকারও এখন হজের কয়েক দিন বাদ দিয়ে সারা বছর ওমরাহর ভিসা দিচ্ছে।
সংবাদ সম্মেলনে হাব সভাপতি বলেন, চলতি বছর ওমরাহযাত্রীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় এয়ারলাইন্সগুলোতে আসন সঙ্কট তীব্র আকার ধারণ করেছে। এ সুযোগে এয়ারলাইন্সগুলো বিমানভাড়া অসহনীয় মাত্রায় বৃদ্ধি করেছে। আগে যেখানে ঢাকা-জেদ্দা-ঢাকা সরাসরি বিমানভাড়া ছিল ৫০ হাজার টাকা, বর্তমানে ঢাকা-জেদ্দা-ঢাকা ওমরাহযাত্রীদের বিমানভাড়া ৮০-৮৫ হাজার টাকা। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ৯০-৯৫ হাজার টাকাও নেয়া হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে বেশি ভাড়া দিয়েও ফ্লাইটের টিকিট পাওয়া যাচ্ছে না।
তিনি বলেন, বিগত বছরগুলোতে সৌদি কর্তৃপক্ষ বছরের নির্দিষ্ট ছয়-সাত মাস (জানুয়ারি থেকে জুন) পর্যন্ত ওমরাহ ভিসা প্রদান করলেও চলতি বছর থেকে সারা বছর (হজের কয়েক দিন বাদ দিয়ে) ভিসা প্রদান করছে। গত ৮ মে পর্যন্ত বাংলাদেশের ১ লাখ ৬২ হাজার ৫০৮ জনকে ওমরাহ ভিসার জন্য মুফাহ দিয়েছে সৌদি আরব। বিমানে আসন সঙ্কটে বহু ওমরাহযাত্রীর ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যাচ্ছে। শুধু রোজার মাসে সময়মতো টিকিট না পেলে ২০ হাজার যাত্রী ওরমাহ পালন করতে পারবেন না। আর্থিক বিবেচনায় ৯০ থেকে ১০০ কোটি টাকার আর্থিক লোকসান হবে।

তিনি বলেন, এ ছাড়াও সরকারের অভিবাসন ব্যয় কমানো নীতিমালা থাকলেও বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যগামী অভিবাসীদের বিমানভাড়া দ্বিগুণ বাড়ার কারণে অভিবাসন ব্যয় অনেক বেড়েছে। অসহায় গরিব অভিবাসন প্রার্থীরা বর্ধিত টাকার ব্যয় বহন করতে না পারায় অনেকের ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যাচ্ছে বা ভিসা বাতিল হচ্ছে। তা ছাড়াও ছুটিতে আসা অনেক অভিবাসী বিমানের আসন সঙ্কট ও ভাড়া বাড়ার কারণে গন্তব্যে ফিরতে পারছেন না।

তিনি আরো জানান, বর্তমানে ঢাকা-জেদ্দা-ঢাকা অভিবাসীদের বিমানভাড়া ৬০-৬৫ হাজার টাকা যেখানে আগে ২২-২৪ হাজার টাকা ছিল। অতিরিক্ত বিমানভাড়ার টাকা বৈদেশিক মুদ্রা আকারে নিয়ে যাচ্ছে বিদেশী এয়ারলাইন্সগুলো।

সমস্যা সঙ্কট সমাধানে তিনি স্বল্প ও দীর্ঘ মেয়াদি প্রস্তাবনা পেশ করেন।

স্বল্পমেয়াদি সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের যেসব রুটে যাত্রী সংখ্যা কম ও অলাভজনক সেসব রুটের ফ্লাইটের সংখ্যা কমিয়ে ঢাকা-জেদ্দা-ঢাকা, ঢাকা-রিয়াদ-ঢাকাসহ মধ্যপ্রাচ্যগামী অন্যান্য গন্তব্যে ফ্লাইটের সংখ্যা বৃদ্ধি করা। এতে বিমান লাভবান হবে এবং ওমরাহযাত্রীসহ সব মধ্যপ্রাচ্যগামী অভিবাসী উপকৃত হবে।

দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা সমাধানে বিদেশী এয়ারলাইন্সগুলোকে বাংলাদেশে ফ্লাইট পরিচালনার সুযোগ করে দেয়ার জন্য ওপেন স্কাই করা বা তাদের উৎসাহ প্রদানের জন্য হ্যান্ডেলিং, ল্যান্ডিং ও পার্কিংসহ অন্যান্য চার্জ কমানো ও মওকুফ করা যেতে পারে।

এক প্রশ্নের জবাবে হাব সভাপতি বলেন, চাহিদার কারণে সৌদি এরাবিয়ান এয়ারলাইন্স তাদের ফ্লাইট সংখ্যা বৃদ্ধি করেছে। বাংলাদেশ বিমানকেও বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত। প্রধানত ওমরাহ যাত্রীদের সমস্যা সমাধানের দিকটি প্রাধান্য দেয়া উচিত। এ ছাড়া বিমান এই রুটে ফ্লাইট বাড়ালে ব্যবসায়িকভাবেও লাভবান হবে।

আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ঢাকা-জেদ্দা-ঢাকা রুটে কোনো এয়ারলাইন্সের টিকিট পাওয়া যাচ্ছে না। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স আগামী ২০ মে একটি অতিরিক্ত ফ্লাইট পরিচালনা করবে। যেদিন টিকিট বুকিং শুরু হয়েছে সেদিন ১০ মিনিটের মধ্যে সব টিকিট বিক্রি হয়ে গেছে। এ থেকে বুঝা যায় পরিস্থিতি কেমন।
শাহাদাত হোসাইন তসলিম বলেন, এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণে দ্রুত সরকারকে হস্তক্ষেপ করতে হবে। ফ্লাইটের টিকিট বিক্রির জন্য নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে এক সাথে বেশি টিকিট যেন না দেয়া হয় সে দিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখা দরকার। যাতে কোনো রকমের সিন্ডিকেট হতে না পারে। অপর এক প্রশ্নের জবাবে হাব সভাপতি বলেন, পৃথিবীর কোন দেশের দুই কোটি মানুষকে বিমানে চড়ে বিদেশ যেতে হয়? একমাত্র বাংলাদেশের এই সংখ্যক মানুষ প্রবাসী। অভিবাসীদের অবদানের বিষয়টি সামনে রেখে সরকারকে অবশ্যই ওমরাহসহ মধ্যপ্রাচ্যগামী ফ্লাইটের টিকিট সঙ্কট দ্রুত অবসানে পদক্ষেপ নিতে হবে।
বেসামরিক বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়কে বিষয়টি লিখিতভাবে অবহিত করা এবং প্রতিমন্ত্রীর সাথে আলোচনা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, আমরা সমস্যা তুলে ধরে আমাদের প্রস্তাবও দিয়েছি। আশাকরি সরকার সমস্যার সমাধানে পদক্ষেপ নেবে।
সংবাদ সম্মেলনে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন হাবের মহাসচিব ফারুক আহমেদ সরদার, সিনিয়র সহসভাপতি মাওলানা ইয়াকুব শরাফতী, সহসভাপতি এএসএম ইব্রাহীম, অর্থ সম্পাদক মুফতি আব্দুল কাদের মোল্লা, সাংস্কৃতিক সম্পাদক মাওলানা কফিল উদ্দিন সালেহী, জনসংযোগ সচিব মাজাহারুল ইসলাম, ইসি সদস্য মো: আবু তাহের, আবুল হাসান, মাহবুবুর রহমান, মুস্তাফিজুর রহমান প্রমুখ।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
দয়া করে আপনার নাম লিখুন