গরিবের চাল নিয়ে চালবাজি

কিশোরগঞ্জের ভৈরব উপজেলায় নিম্ন আয়ের মানুষের মধ্যে ১০ টাকা কেজি দরে বিক্রির জন্য সরকারিভাবে বরাদ্দ করা চাল নিয়ে অনিয়মের অভিযোগে এক ডিলার ও তাঁর সহযোগীকে আটক করেছে র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব)।

আটকরা হলেন- উপজেলার শিবপুর ইউনিয়নের ডিলার মিজানুর রহমান ও তাঁর সহযোগী কামরুল ইসলাম।

আজ বৃহস্পতিবার রাত ৩টার দিকে র‌্যাব ভৈরব ক্যাম্পের অধিনায়ক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রফিউদ্দিন মোহাম্মদ যোবায়েরের নেতৃত্বে তাকে আটক করা হয়েছে।

আজ সকালে র‌্যাব-১৪ ভৈরব ক্যাম্পের অধিনায়ক রফিউদ্দিন মোহাম্মদ যোবায়ের বলেন, ‌‌‌‌‘উপজেলার শম্ভুপুর রেলগেট এলাকায় অভিযান চালিয়ে কামরুল ইসলামের একটি গুদাম থেকে অবৈধভাবে মজুদ করা ১৬০ বস্তা চাল উদ্ধার করা হয়েছে। এ ছাড়া ডিলার মিজানুর রহমানের ছনছাড়া এলাকার গুদামে ১২০ বস্তা চাল মজুদ থাকার কথা থাকলেও সেখানে ২৪ বস্তা চাল পাওয়া যায়। বাকি ৯৬ বস্তা চালের সঠিক হিসাব পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ সেখান থেকে ৯৬ বস্তা চাল গায়েব হয়ে গেছে।’

র‌্যাব অধিনায়ক আরো দাবি করেন, ১০ টাকা কেজি দরের চাল বিক্রির জন্য উপজেলার শিবপুর ইউনিয়নে দুজন ডিলার নিয়োগ দেয়ার কথা। কিন্তু সেখানে মিজানুর রহমানকেই একমাত্র ডিলার হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। ফলে ওই ইউনিয়নের জন্য বরাদ্দ করা ৩৭৬ বস্তা চাল তাঁকেই সরবরাহের জন্য ভৈরব উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা মো. শরীফ মোল্লা অনুমতিপত্র দেন।

বরাদ্দ করা এই চাল চলতি মাসের ৯ তারিখ ভৈরব বাজারে খাদ্যগুদাম (এলএসডি গোডাউন) থেকে সরবরাহ নিয়ে বিতরণের কথা ছিল। কিন্তু ডিলার মিজানুর রহমান এ সময় নিজের নামে ১২০ বস্তা এবং তাঁর সহযোগী কামরুল ইসলামের নামে ১৬০ বস্তা চাল উত্তোলন করেন বলে র‍্যাবের দাবি।

র‍্যাব জানায়, মিজানুর তাঁর নিজ এলাকা ছনছাড়া গ্রামের একটি গুদামে ১২০ বস্তা চাল রেখেছেন দাবি করলেও সেখানে পাওয়া গেছে মাত্র ২৪ বস্তা। বাকি চালের কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।

এদিকে মানিকগঞ্জের শিবালয়ে সরকারের ১০ টাকা কেজি দরে চাল বিক্রি প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। ডিলাররা এসব চাল হতদরিদ্র সুবিধাভোগীদের নামে ওঠালেও তাদের মাঝে বিক্রি না করে বেশি দামে কালোবাজারে বিক্রি করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, তালিকায় নাম থাকলেও চাল দিচ্ছেন না অনেক ডিলার। অনেকের হাতে পৌঁছেনি চাল সংগ্রহের কার্ডই। অভিযোগ উঠেছে খাদ্য বিভাগের যোগসাজসে এসব চাল কালোবাজারে বিক্রি করে দিচ্ছে ডিলাররা। তবে এসব স্বীকার করেননি সংশ্লিষ্টরা।

খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতায় সরকার ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বর মাস থেকে হতদরিদ্রদের মাঝে ১০ টাকা কেজি দরে চাল বিক্রি কার্যক্রম শুরু করে। নির্ধারিত ডিলারের কাছে থেকে বছরে ৫ মাস ৩০ কেজি করে চাল কিনতে পারবেন উপকারভোগীরা।

এজন্য স্থানীয় মেম্বার ও চেয়ারম্যানদের মাধ্যমে হতদরিদ্রদের একটি তালিকা করে খাদ্য বিভাগ। তালিকাভুক্তদের উপকারভোগী হিসেবে কার্ড দেয়া হয়।
কিন্তু তালিকায় নাম থাকার পরও অনেক এলাকায় চাল পাচ্ছেন না উপকারভোগীরা।

শিবালয় উপজেলার কানাইদিয়া চরের বাসিন্দা আব্দুল কুদ্দুস মৃধা, খৈমুদ্দিন ও মোহন মন্ডলসহ বেশ কয়েকজন অভিযোগ করেন, ১০ টাকা কেজি দরে চাল সংগ্রহের জন্য তাদের তালিকায় নাম রয়েছে। একবার চাল উত্তোলনও করেছেন। কিন্তু পরবর্তীতে তাদের আর চাল দেয়া হচ্ছে না।

তারা অভিযোগ করে বলেন, চাল আনতে গেলে ডিলাররা নাম নেই বলে খারাপ আচরণ করে তাড়িয়ে দেয়। বিষয়টি স্থানীয় মেম্বার ও চেয়ারম্যানকে জানিয়েও কোনো প্রতিকার মিলছে না বলে অভিযোগ তাদের।

এই চরের আরো বেশ কয়েকজন অভিযোগ করেন, খাদ্য বিভাগ থেকে উপকারভোগী হিসেবে যে কার্ড তাদের দেয়া হয়েছে তাও ডিলার রেখে দিয়েছেন। তাদের ধারণা চাল তাদের না দিয়ে বেশি দামে কালোবাজারে বিক্রি করে দিচ্ছেন ডিলাররা।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে শিবালয় সদর ইউনিয়নের দুই ডিলার একেএম তারেক ও মনোরঞ্জন শীল নকুল জানান, তালিকায় যাদের নাম আছে এবং যারা কার্ডধারী সবাইকেই চাল দেয়া হচ্ছে। চাল না পাওয়ার অভিযোগটি সঠিক নয়। তবে কেউ যদি চাল না নিতে আসেন তাহলে ধরে নিতে হবে তারা কার্ড পাননি।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, প্রতিটি ডিলার প্রতিবার সুবিধাভোগীদের নামে চাল তুলছেন। আবার তাদের নামেই সেই চাল বিক্রি দেখিয়ে খাদ্য অফিসে স্বাক্ষর ও টিপসইযুক্ত তালিকা জমা দিচ্ছেন।

অভিযোগ রয়েছে, খাদ্য বিভাগের কতিপয় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যোগসাজসে ডিলাররা কাগজে কলমে তালিকা ঠিক রেখে স্বল্পমূল্যের এই চাল বেশি দামে কালোবাজারে বিক্রি করে দিচ্ছেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে শিবালয় উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক এবং উপজেলা খাদ্যবান্ধব কমিটির সদস্য সচিব শাহ মো. হেদায়েতুল্লাহ জানান, তালিকায় নাম থাকার পরও চাল পাচ্ছেন না এমন অভিযোগ তার জানা নেই। আর চাল বিতরণ না করে কালোবাজারে বিক্রির সঙ্গে তার অফিসের কেউ জড়িত থাকার সুযোগ নেই।

তবে অভিযোগ পেলে সংশ্লিষ্ট ডিলারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। হতদরিদ্রদের চাল কেউ মেরে খাবে তা বরদাস্ত করা হবে না বলেও জানান এ কর্মকর্তা।

জেএস/

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
দয়া করে আপনার নাম লিখুন