দেশে দেশে ইফতার সংস্কৃতি

মুফতি মুহাম্মদ মর্তুজা

 

রোজাদারের সবচেয়ে আনন্দের মুহূর্ত ইফতারের সময়। কারণ এ সময় আল্লাহ তাআলা তাঁর রোজাদার বান্দাদের দোয়া কবুল করেন এবং ইফতারের মাধ্যমেই একজন রোজাদার তাঁর রোজা সম্পন্নের পর মহান আল্লাহ তাআলার নৈকট্য অর্জন করেন।

ইফতার, হোক না সেটা একগ্লাস পানি ও একটি লালচে খেজুরে কিংবা শুধুই একমুঠো শুভ্র মুড়িতে, একজন রোজাদার এতেই পূর্ণ তৃপ্তি পায়। যা সেই রোজাদারই শুধু উপলদ্ধি করতে পারে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ইফতারের ধরন বিভিন্ন রকম। আবার অঞ্চলভেদে একই দেশে বিভিন্ন রকম ইফতার হয়ে থাকে। তবে ইফতারে কিছু কিছু জিনিস সব জায়গায়ই কমবেশি ব্যবহার হয়। যার মধ্যে খেজুর অন্যতম। কেননা প্রিয় নবী (সা.) এই পবিত্র ফল ও কয়েক ঢোঁক পানি দিয়েই ইফতার শুরু করতেন। সময়ের পরিবর্তনে তাতে যোগ হয়েছে হরেক রকম খাবার। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ইফতারের বৈচিত্র্য নিয়ে আমাদের আয়োজন—‘দেশে দেশে ইফতার সংস্কৃতি’।

নিম্নে বিশ্বের কয়েকটি দেশের ইফতার সংস্কৃতি তুলে ধরা হলো :

বাংলাদেশ : আমাদের প্রিয় দেশকে দিয়েই শুরু করা যাক। বাংলাদেশের ইফতারে কমন আইটেম থাকে খেজুর, পিঁয়াজু, বেগুনি, হালিম, আলুর চপ, জিলাপি, মুড়ি ও ছোলা। একটু ব্যতিক্রমী হলে থাকে সমুচা, ফিশ কাবাব, মাংসের কিমা ও মসলা দিয়ে তৈরি কাবাবের সঙ্গে পরোটা, মিষ্টি ও ফল। শরবতসহ এসব খাবার এ দেশের ইফতার টেবিলকে দেয় পরিপূর্ণ রূপ। কিছু অঞ্চলের ইফতারের আসরে খিচুড়ি, চিঁড়া ইত্যাদিও শোভা পায়।

সৌদি আরব : এটি প্রিয় নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর দেশ। এখানে মসজিদে হারাম ও মসজিদে নববীতে বিশ্বের সর্ববৃহৎ ইফতারের আয়োজন হয়। এখানে প্রতিদিন লাখো মানুষ একসঙ্গে ইফতার করে থাকে।   ইফতারিতে থাকে কোনাফা, ত্রোম্বা, বাছবুচান্ডর নামক নানা রকম হালুয়া। এ ছাড়া রয়েছে সাম্বুচা, যা দেখতে ঠিক সমুচার মতো, এর ভেতর থাকে মাংসের কিমা। তবে মরিচ থাকে না। এ ছাড়া থাকে সালাতা (সালাদ), সরবা (স্যুপ), জাবাদি (দই), লাবান, খবুজ (ভারী ছোট রুটি) বা তমিজ (বড় রুটি)। তা ছাড়া খেজুরের নানা রকম লোভনীয় আইটেম তো রয়েছেই। যার মধ্যে খেজুরের বিস্কুট, পিঠা ইত্যাদি।

ব্রুনাই : এখানকার স্থানীয় ভাষায় ইফতারকে সোংকাই বলা হয়। ঐতিহ্যগতভাবেই আঞ্চলিক বা গ্রামীণ মসজিদগুলোতে এর আয়োজন করা হয়। সাধারণত সরকার ও স্থানীয় বাসিন্দারা এই সোংকাইয়ের আয়োজন করে থাকে। এখানে ইফতারের আগে বেদুক নামে এক ধরনের ড্রাম বাজানো হয়, যার মানে হচ্ছে, ইফতারের সময় হয়ে গেছে। এ ছাড়া রাজধানী বন্দর সেরি বেগাওয়ানে সোংকাইয়ের সংকেত হিসেবে কামান থেকে গুলি ছোড়া হয়।

ইন্দোনেশিয়া : এখানে ইফতারকে বুকা পুয়াসা বলা হয়। এখানে বেদুক বাজানোর মাধ্যমে ইফতারের সময় নিশ্চিত করার রেওয়াজ রয়েছে। আসরের নামাজের পর বাজারগুলোতে বিভিন্ন ইফতার বিক্রি হয়।

ইরান : এখানকার ইফতার আয়োজনে খুব বেশি কিছু থাকে না। চায়ে (চা), লেভাস বা বারবারি নামের এক ধরনের রুটি, পনির, তাজা ভেষজ উদ্ভিদ, মিষ্টি, খেজুর ও হালুয়া দিয়েই চলে সেখানকার ইফতার।

মালয়েশিয়া : এখানকার স্থানীয় লোকেরা ইফতারে আখের রস ও সয়াবিন মিল্ক খান, যাকে তাদের ভাষায় বারবুকা পুয়াসা বলা হয়। এ ছাড়া স্থানীয় খাবারের মধ্যে থাকে লেমাক লাঞ্জা, আয়াম পেরিক, নাসি আয়াম, পপিয়া বানাস ও অন্যান্য খাবার। মালয়েশিয়ার বেশির ভাগ মসজিদে রোজায় আসরের নামাজের পর স্থানীয়দের ফ্রি রাইস পরিজ দেওয়া হয়।

মালদ্বীপ : এখানে ইফতার ‘রোয়াদা ভিলান’ নামে পরিচিত। তাদের ইফতারের মূল উপাদান শুকনো বা ফ্রেশ খেজুর। বিলাসবহুল রেস্তোরাঁ বা হোটেলে ইফতার ও ডিনারের বিশেষ আয়োজন থাকে। অন্যদিকে সেখানকার মসজিদগুলোতে ফ্রি খেজুর জুসের ব্যবস্থা করা হয়।

রাশিয়া : এখানে ইফতার আয়োজনে খেজুর ও অন্য ফল রাখা হয়। এরপর স্যুপ, রুটি ও বিভিন্ন স্থানীয় খাবারের আয়োজন তো রয়েছেই। রাশিয়ান ঐতিহ্যবাহী কাভাসকেও তৃষ্ণা মেটাতে সেরা পানীয় হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

আফগানিস্তান : গরু বা খাসির মাংসের কাবাব, হরেক রকম ফ্রেশ ও শুকনো ফল এবং জুস এ অঞ্চলের ইফতার টেবিলের মধ্যমণি।

দুবাই : এখানকার ইফতারিতেও থাকে নানা রকম মুখরোচক খাবার। রুটি, মাংসের চপ (যা ভেড়ার মাংস দিয়ে তৈরি—স্থানীয় ভাষায় ওউজি), মসুর ডালের স্যুপ, সালাদ ইত্যাদি থাকে। তাদের এই আয়োজনকে সম্মিলিতভাবে ‘মেজে’ বলা হয়।

মিসর : দেশটির পথে পথে ছোট ছোট সোনামণিদের লেটুসপাতা বিক্রি করতে দেখা যায়। সেখানকার ইফতারে এ পাতার দারুণ সমাদর। ইফতারিতে তাদের প্রধান মেন্যু কোনাফা ও কাতায়েফ। এগুলো মূলত কেকজাতীয় খাদ্য। যেগুলো আটা, চিনি, মধু ও বাদাম দিয়ে তৈরি হয়।

সিরিয়া : হালুয়ার জন্য বিখ্যাত শহর সিরিয়া। কথিত আছে, আরব দেশগুলোর মধ্যে ভালো হালুয়া তৈরি করে সিরিয়ার লোকেরা। তারা এ খাবারকে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গেছে। তাদের হালুয়া যে কত নকশার হতে পারে, তা না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। এ ছাড়া তারা ইফতারের পর দিজাজ সয়াইয়া, খবুজ, সরবা খায়।

ফিলিস্তিন : এখানকার ইফতারির সঙ্গে বাঙালিদের বেশ মিল রয়েছে। তবে পুরনো জেরুজালেমের বাসিন্দারা চিরায়ত ঐতিহ্য অনুযায়ী তাদের জনপ্রিয় পানীয় তামারিন জুস পান করে।

পাকিস্তান : খেজুর ও পানি দিয়ে তাদের ইফতার শুরু হয়। তবে তাদের আয়োজনে থাকে হরেক রকমের চোখ ধাঁধানো খাবার। চিকেন রোল, স্প্রিং রোল, শামি কাবাব এবং ফলের সালাদের পাশাপাশি মিষ্টি ও ঝালজাতীয় খাদ্য, জিলাপি, সমুচা, নিমকি ইত্যাদি।

ভারত : ভারতের ইফতারিতে রয়েছে নানা বৈচিত্র্য। সেখানকার একেক রাজ্যে ইফতারির একেক রকম পদ হয়। হায়দরাবাদের লোকজনের ইফতার হয় হালিম দিয়ে। তামিলনাড়ু ও কেরালায় ইফতার হয় ননবো কাঞ্জি দিয়ে। এটি  তৈরি হয় ভাত, খাসির মাংস, সবজি ও মসলা দিয়ে। পাশাপাশি থাকে বন্ডা, পাকুড়া—এসব খাবার।

তুরস্ক : ‘রমজান কিবাবি’ নামক খাদ্যটির ইফতার হিসেবে আলাদা কদর রয়েছে এখানে। এটা বিশেষ ধরনের কাবাব। এ ছাড়া রোজা ভাঙতে এখানে নানা রকম শরবতের ব্যবহার বেশ পুরনো।

ব্রিটেন : ইফতারিতে ব্রিটিশ রোজাদাররা খেজুর, ফল, স্যুপ, জুস, রুটি, ডিম, মাংস, চা-কফি ইত্যাদি গ্রহণ করে থাকে।

ইতালি : ১ শতাংশ মুসলমানের এই দেশে রোজাদাররা বার্গারজাতীয় খাদ্য, নানাবিধ ফল যেমন—মাল্টা, আপেল, আঙুর, বিভিন্ন ফলের রস ইত্যাদি দিয়ে ইফতার করেন।

আমেরিকা : আমেরিকায় ইফতারসামগ্রীর মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের খেজুর, খুরমা, সালাদ, পনির, রুটি, ডিম, মাংস, ইয়াগার্ট, হট বিনস, স্যুপ, চা ইত্যাদি। জানা যায়, সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের আমল থেকে রমজান মাসে হোয়াইট হাউসেও ইফতারের আয়োজন করা হয়। এটা বর্তমানে সেখানকার একটি প্রথা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেখানে বিভিন্ন দেশের মুসলিম প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন।

কানাডা : এখানকার মুসলমানদের ইফতারিতে খেজুর, খুরমা, পনির, সালাদ, ফল, স্যুপ, জুস, রুটি, ডিম, মাংস, চা-কফি ইত্যাদি থাকে।

অস্ট্রেলিয়া : ২ শতাংশ মুসলমানের এই দেশে ইফতারিতে স্যান্ডউইচ, পনির, মাখন, দুধজাতীয় খাবার, নানাবিধ ফল ও ফলের রস খাওয়া হয়।

দক্ষিণ কোরিয়া : এখানে জনসংখ্যার হারে মুসলমানের সংখ্যা মাত্র ৩ শতাংশ।   ইফতারিতে এখানকার মুসলমানরা নুডলস, স্যুপ, ফলের রস, বিভিন্ন প্রকারের ফলফলাদি খেয়ে থাকে। সাহরিতে মাংস ও রুটি।

স্পেন : এটি একসময় মুসলমানদের দেশ থাকলেও বর্তমানে এখানে মুসলমানের সংখ্যা মাত্র ৪.১ শতাংশ। এখানকার মুসলিমরা ইফতারিতে হালাল শরমা, ডোনার কাবাব, হামাস (যা তৈরি করা হয় ছোলা, তিল, জলপাই তেল, লেবু, রসুন ইত্যাদি দিয়ে। এটি মূলত মধ্যপ্রাচ্যের খাবার। ), লাম্ব কোফতা, আলা তুরকা, পাইন অ্যাপেল, টমেটো সালাদ ইত্যাদি খেয়ে থাকেন। এ ছাড়া রয়েছে খিচুড়ি, বিরিয়ানি, যা সেখানে অবস্থানরত ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের প্রবাসীরা খেয়ে থাকেন।

পর্তুগাল : এখানকার মুসলমানরা ইফতারি হিসেবে পাস্টার দি নাতা (এক প্রকার কেক) ও সারডিন মাছের কোপ্তা বেশ পছন্দ করে।   এ ছাড়া রয়েছে প্রেগোরোজ, ট্রিনচেডো, প্রাউজ (চিংড়ি), স্প্রিং গ্রিল ও স্যুপ।

জর্দান : ইফতারের জন্য তাদের পানীয় সাধারণত মিশ্রিত জ্যুস, স্যুপ ও লাচ্চি। এগুলো দিয়ে তারা রোজা ভঙ্গ করে। এরপর তাদের টেবিল আলোকিত করে ঐতিহ্যবাহী খাবার মানসাফ ও কাতাইফ দিয়ে।   মানসাফ, এটি সম্ভবত ভেড়ার মাংসকে হালকা মসলা দিয়ে পাকানো হয়। পরে তার ওপর দই ও কাজুবাদাম দিয়ে সাজানো হয় এবং তা রুটি দিয়ে পরিবেশন করা হয়। আর কাতাইফ; দারুচিনি, পুদিনাপাতা, আখরোট ও চিনির মিশ্রণে তৈরি একটি খাবার, যা মধু দিয়ে খাওয়া হয়।

জাপান : এখানে মুসলমানের সংখ্যা অনেক কম। তাদের ইফতারি আইটেমে রয়েছে জ্যুস, স্যুপ ও মাশি মালফুফ, যা আঙুর, বাঁধাকপির পাতা ও চাল মিশিয়ে বানানো হয়। এ ছাড়া রয়েছে মটরশুঁটি ও গরুর কলিজা মিশ্রিত কিবদা, রুটিতে মোড়ানো মাংসের কিমা ইত্যাদি।

 

বিশেষ নিবেদন : বিশ্বের কোন অঞ্চলের মানুষ কী দিয়ে ইফতার করে, সে খবর তো আমরা জানতে পারলাম। কিন্তু আমাদের আশপাশের গরিব মানুষগুলোর খোঁজ কি আমরা একটিবারও নিয়েছি? আমাদের সবার হয়তো শত শত মানুষকে ইফতার করানোর সামর্থ্য নাও থাকতে পারে, কিন্তু আমাদের নিজেদের ইফতারি তো আমরা কোনো একজন দুস্থ মানুষকে নিয়ে ভাগাভাগি করে করতে পারি! তবেই তো আমাদের ইফতারে পরিপূর্ণ ফজিলত ও সাওয়াব অর্জিত হবে।

লেখক : প্রাবন্ধিক, গবেষক

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
দয়া করে আপনার নাম লিখুন