পবিত্র কোরআন সংকলন ও সংরক্ষণের ইতিহাস

মুফতি শাহেদ রহমানি

আল কোরআন বিশ্বের বিস্ময়কর গ্রন্থ। এটি সর্বাধিক প্রশংসিত মহা প্রজ্ঞাময় রাব্বুল আলামিনের পক্ষ থেকে শ্রেষ্ঠ নবী বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ওপর অবতারিত হয়েছে।
বিশ্বজনীন এ গ্রন্থের আবেদন ও উপযোগিতা সব যুগে এবং সব স্থানেই কার্যকর রয়েছে। কোরআনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, এ গ্রন্থ দুইবার নাজিল হয়েছে। প্রথমে একবার পুরো কোরআনের আয়াত প্রথম আসমানে ‘বাইতুল ইজ্জতে’ নাজিল হয়েছে এবং দ্বিতীয় পর্যায়ে ২৩ বছর ধরে ধীরে ধীরে বিভিন্ন ঘটনা উপলক্ষে, যুগ-জিজ্ঞাসার জবাবে নাজিল হয়েছে। কুদরতি নিয়মে হাজারো বছর ধরে অত্যন্ত বিস্ময়কর প্রক্রিয়ায় এ গ্রন্থকে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। লিখে রাখার পাশাপাশি হাজারো বছর ধরে হৃদয় থেকে হৃদয়ে একে ধারণ করা হয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কোরআনের লাখো হাফেজ বা মুখস্থকারী রয়েছেন। মানব ইতিহাসে আর কোনো গ্রন্থের এত হাফেজ নেই।

রাসুল (সা.)-এর যুগে কোরআন সংরক্ষণ :

যেহেতু পূর্ণ কোরআন একসঙ্গে নাজিল হয়নি; বরং কোরআনের বিভিন্ন আয়াত বিশেষ প্রয়োজনীয়তা ও অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে অবতীর্ণ হয়েছে; তাই রাসুল (সা.)-এর যুগে শুরু থেকেই বই আকারে একে সংরক্ষণ করা সম্ভব ছিল না। আসমানি গ্রন্থগুলোর মধ্যে আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনকে এ বিশেষত্ব দান করেছেন যে কলম-কাগজের চেয়েও একে অগণিতসংখ্যক হাফেজের স্মৃতিপটে সংরক্ষণ করেছেন।
মুসলিম শরিফে এসেছে, আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় হাবিব (সা.)-কে বলেছেন, ‘আমি আপনার ওপর এমন কিতাব অবতীর্ণ করব, যাকে পানি ধুয়ে নিতে পারবে না। ‘ অর্থাৎ দুনিয়ার সাধারণ গ্রন্থগুলোর অবস্থা এই যে পার্থিব বিপর্যয়ের কারণে সেগুলো ধ্বংস হয়ে যায়; কিন্তু কোরআনকে মানুষের অন্তরে অন্তরে এভাবে সংরক্ষণ করা হবে যে তা ধ্বংস হয়ে যাওয়ার কোনো আশঙ্কাই থাকবে না। তাই প্রথম দিকে লেখার চেয়েও কোরআন মুখস্থ করার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ফলে রাসুল (সা.)-এর জীবদ্দশায়ই সাহাবায়ে কেরামের একটি বড় অংশ হাফেজে কোরআন হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন-হজরত আবু বকর, ওমর, ওসমান, আলী, তালহা, সাআদ, আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ, হুজায়ফা বিন ইয়ামান, হজরত সালেম, আবু হুরায়রা, ইবনে ওমর, ইবনে আব্বাস, আমর ইবনুল আস, আবদুল্লাহ বিন আমর, মুয়াবিয়া, ইবনে জুবাইর, আবদুল্লাহ বিন আস্ সায়েব, আয়েশা, হাফসা, উম্মে সালমা, উম্মে ওয়ারাকা, উবাই ইবনে কাআব, মাআজ ইবনে জাবাল, আবু হুলাইমা মাআজ, জায়েদ ইবনে সাবেত, আবুদ্ দারদা, মুজাম্মা বিন জারিয়া, মাসলামা বিন মুখাল্লিদ, আনাস ইবনে মালেক, উকবা বিন আমের, তামিম দারেমি, আবু মুসা আশআরি এবং হজরত আবু জায়েদ রাদিয়াল্লাহু আনহুম প্রমুখ অন্যতম হাফেজ সাহাবি ছিলেন। (আল-ইত্বকান, খ. ১, পৃ. ৭৩-৭৪) মূলত উল্লিখিত নামগুলো সেসব সাহাবির, যাঁদের নাম হাফেজে কোরআন হিসেবে ইতিহাসের পাতায় স্থান পেয়েছে। অন্যথায় আরো অগণিত সাহাবির গোটা কোরআন মুখস্থ ছিল। কেননা বর্ণিত আছে, রাসুল (সা.) কখনো কখনো একেক গোত্রে সত্তরজন করে কোরআনের শিক্ষক পাঠাতেন। বিরে মউনার যুদ্ধে সত্তরজন কারি সাহাবি শহীদ হওয়ার কথা বিভিন্ন বর্ণনায় এসেছে। হাফেজ সাহাবির সংখ্যা এতই বেশি যে ইমামার যুদ্ধে প্রায় সমসংখ্যক হাফেজ, আরেক বর্ণনা মতে, পাঁচ শ (ইবনে কাছির, খ. ১, পৃ. ২৬), অন্য বর্ণনা মতে, সাত শ কারি/হাফেজ সাহাবি শহীদ হয়েছেন। (উলুমুল কোরআন, পৃ. ১৭৬)

রাসুল (সা.)-এর যুগে কোরআন সংকলন :

আরবদের দুনিয়াজুড়ে খ্যাত বিস্ময়কর স্মৃতির ওপর ভর করে কোরআন সংরক্ষণের পাশাপাশি রাসুল (সা.) লিখিতভাবে কোরআন সংকলন, সংরক্ষণ ও একত্রীকরণের ব্যবস্থা করে গেছেন। ওহির ইলম লিপিবদ্ধ করার জন্য তিনি চল্লিশজন ‘কাতেবে ওহি’ বা ওহি লেখক নিযুক্ত করেছেন। সে সময় কাগজ ছাড়াও পাথর, চামড়া, খেজুরের ডাল, বাঁশের টুকরা, গাছের পাতা এবং চতুষ্পদ জন্তুর হাড্ডির ওপর কোরআন লিখে রাখা হতো। এভাবেই রাসুল (সা.)-এর তত্ত্বাবধানে কোরআনের একটি কপি প্রস্তুত হয়ে গিয়েছিল, যদিও তা পুস্তিকারূপে ও গ্রন্থিত আকারে ছিল না। এ ছাড়া সাহাবায়ে কেরামের কারো কারো কাছে ব্যক্তিগতভাবে কোরআনের সম্পূর্ণ অথবা অসম্পূর্ণ কপি বিদ্যমান ছিল। যেমনটা বুখারি শরিফের এক বর্ণনায় এসেছে, হজরত ইবনে ওমর (রা.) বলেন, ‘রাসুল (সা.) কোরআন নিয়ে (অর্থাৎ কোরআনের কপি নিয়ে) শত্রুদের ভূখণ্ডে সফর করতে নিষেধ করেছেন। ‘ (বুখারি শরিফ, খ. ১, পৃ. ৪১৯)

আবু বকর (রা.)-এর যুগে কোরআন সংকলন :

যেহেতু রাসুল (সা.)-এর যুগে বিক্ষিপ্তভাবে বিভিন্ন বস্তুর ওপর কোরআন সংরক্ষিত ছিল, তাই হজরত আবু বকর (রা.) নিজ খেলাফতের সময় বিক্ষিপ্ত অংশগুলো একত্র করে সংরক্ষণের প্রতি মনোযোগী হয়েছেন। এ বিষয়ে বিস্তারিত বর্ণনা এসেছে সহিহ বুখারি শরিফে। হজরত জায়েদ ইবনে সাবেত (রা) বলেন, ”ইমামার যুদ্ধের পরপরই হজরত আবু বকর (রা.) আমাকে ডেকে পাঠালেন। আমি সেখানে গিয়ে দেখি ওমর (রা.)ও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। আবু বকর (রা.) আমাকে বললেন-ওমর (রা.) এসে আমাকে বলেছেন, ‘ইমামার যুদ্ধে কোরআনে হাফেজদের একটি বড় অংশ শহীদ হয়ে গেছে। আর এভাবেই যদি বিভিন্ন স্থানে কোরআনের হাফেজরা শহীদ হতে থাকেন, তাহলে আমার আশঙ্কা হয়, কোরআনের একটি বড় অংশ হারিয়ে যাবে। তাই আমার অভিমত হলো, আপনি চাইলে কোরআন সংকলনের নির্দেশ দিতে পারেন। ‘ আমি তাঁকে বললাম, ‘যে কাজ রাসুল (সা.) করেননি, সেই কাজ আমি কিভাবে করব?’ জবাবে ওমর (রা.) বললেন, ‘আল্লাহর কসম, এ কাজ উত্তমই উত্তম। এরপর ওমর (রা.) বারবার আমাকে একই কথা বলতে লাগলেন। একপর্যায়ে এ বিষয়ে আল্লাহ তাআলা আমার অন্তর খুলে দিলেন। এখন ওমরের অভিমত যা, আমার অভিমতও তা-ই। ‘ এরপর আবু বকর (রা.) আমাকে বললেন, ‘তুমি বিচক্ষণ যুবক, তোমার ব্যাপারে আমাদের কোনো খারাপ ধারণা নেই। রাসুল (সা.)-এর জীবদ্দশায় তুমি ওহি লেখার কাজ করতে। তাই তুমিই কোরআনের আয়াতগুলো অনুসন্ধান করে সেগুলো একত্র করো। ‘ জায়েদ (রা.) বলেন, ‘আল্লাহর কসম, তাঁরা যদি আমাকে সস্থান থেকে কোনো পাহাড় সরানোর আদেশ দিতেন, তাহলে তা আমার কাছে এত কঠিন মনে হতো না, যতটা কঠিন মনে হয়েছে কোরআন সংকলনের দায়িত্ব পালনের নির্দেশটি। ‘ আমি বললাম, ‘আপনারা এমন কাজ কিভাবে করবেন, যা রাসুল (সা.) করেননি?’ আবু বকর (রা.) বললেন, ‘আল্লাহর কসম, এ কাজে মঙ্গলই মঙ্গল রয়েছে। এরপর তিনি আমাকে বারবার তা বলতে লাগলেন। একপর্যায়ে এ বিষয়ে আল্লাহ তাআলা আমার বক্ষ উন্মুক্ত করে দিলেন, যে বিষয়ে বক্ষ উন্মুক্ত করে দিয়েছেন হজরত আবু বকর ও ওমর (রা.)-কে। অতঃপর আমি কোরআনের আয়াত অনুসন্ধান করতে লাগলাম। সুতরাং কোরআনের আয়াতগুলো খেজুরের ডাল, পাথরের তখতি এবং মানুষের হৃদয় থেকে খুঁজে খুঁজে আমি তা একত্র করলাম। সুরা তওবার শেষ আয়াত আবু খুজাইমা আনসারি (রা.)-এর কাছে পেলাম, অন্যদের কাছে (লিখিতভাবে) তা আমি পাইনি’। ” (বুখারি শরিফ, হা. ৪৯৮৬; ইবনে কাছির : ভূমিকা) তবে নিঃসন্দেহে সে আয়াতটি হাফেজ সাহাবিদের মুখস্থ ছিল এবং সেটি ‘মুতাওয়াতির’ বর্ণনা দ্বারাও কোরআনের আয়াত হওয়া প্রমাণিত। (উলুমুল কোরআন, তকি্ব উসমানি, পৃ. ১৮৫)

জায়েদ (রা.)-এর গবেষণা পদ্ধতি :

হজরত জায়েদ (রা.) নিজে কোরআনে হাফেজ হওয়া সত্ত্বেও এককভাবে কোরআন সংকলনের গুরুদায়িত্বটি আঞ্জাম দেননি, বরং তিনি চারটি পদ্ধতিতে কোরআন সংকলন করতেন। এক. কোনো আয়াত পাওয়া গেলে সর্বপ্রথম তা নিজের হিফজ ও মুখস্থের সঙ্গে মিলিয়ে নিতেন। দুই. হজরত উমর (রা.)ও হাফেজ ছিলেন। বর্ণিত আছে যে তিনিও আবু বকর (রা.)-এর নির্দেশে জায়েদ (রা.)-কে সহযোগিতা করতেন। তিন. কোনো আয়াত ততক্ষণ পর্যন্ত গ্রহণ করা হতো না যতক্ষণ না দুজন গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি এ কথার সাক্ষ্য দিতেন যে এ আয়াত রাসুল (সা.)-এর সামনে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে অথবা সেগুলো রাসুল (সা.)-এর মৃত্যুর আগে তাঁর কাছে উপস্থাপন করা হয়েছে। সুরা তাওবার শেষ আয়াতটি যখন কেবল হজরত আবু খুজাইমা (রা)-এর কাছে পাওয়া গেছে তখন এ সূত্রে সেটিকে গ্রহণ করা হয়েছে যে জীবদ্দশায় রাসুল (সা.) সে সাহাবির একজনের সাক্ষ্যকে দুজনের সাক্ষ্যের সমতুল্য ঘোষণা করে গেছেন। চার. অবশেষে চূড়ান্ত পর্যায়ে সে আয়াতগুলোর সমষ্টিকে বিভিন্ন সাহাবির ব্যক্তিগত উদ্যোগে সংগৃহীত কোরআনের পাণ্ডুলিপির সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়া হতো।

আবু বকর (রা.) সংকলিত কোরআনের বৈশিষ্ট্য :

আবু বকর (রা.) সংকলিত কোরআনকে পরিভাষায় ‘উম্ম’ বা আদি কোরআন বলা হয়। কেননা এটিই প্রথম লিখিত সুবিন্যস্ত কোরআন। এর বৈশিষ্ট্য হলো-এটি রাসুল (সা.) বর্ণিত ধারাক্রম অনুসারে প্রস্তুত করা হয়েছে। সুরাগুলো আলাদা রেখে দেওয়া হয়েছে; সুরার ক্রমধারা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়নি। এটি সাত হরফ বা সাত কেরাতে লেখা হয়েছে। এ কপিটি হীরার হস্তাক্ষরে লেখা হয়েছে। এখানে কেবল সেসব আয়াত লেখা হয়েছে, যেগুলোর তিলাওয়াত রহিত হয়নি। এই সংকলনের উদ্দেশ্য ছিল একটি সুবিন্যস্ত, গ্রন্থিত কোরআনের কপি সংগ্রহ করা, যাতে প্রয়োজনের সময় এর দ্বারস্থ হওয়া যায়। এটি ১৩ হিজরিতে শুরু হয়ে পূর্ণ এক বছর মতান্তরে প্রায় দুই বছরে সমাপ্ত হয়। (তারিখুল কোরআনিল কারিম, তাহের আল কুরদি; খ. ১, পৃ. ২৮)

হজরত আবু বকর (রা.) সংকলিত কোরআনটি মৃত্যু পর্যন্ত তাঁর কাছেই ছিল। এরপর উমর (রা.)-এর কাছে। তাঁর শাহাদাতের পর নিজ অসিয়ত মোতাবেক রাসুল (সা.)-এর স্ত্রী, নিজ কন্যা হাফসা (রা.)-এর কাছে বিদ্যমান ছিল। অতঃপর মারওয়ান বিন হাকাম তাঁর রাজত্বকালে এ কপিটি চাইলে তিনি তা দিতে অস্বীকৃতি জানান। হাফসা (রা.)-এর ইন্তেকালের পর মারওয়ান এ কপি হজরত ইবনে উমর (রা.)-এর কাছ থেকে নিয়ে যান। অতঃপর তিনি এ চিন্তা করে সেটি জ্বালিয়ে দিয়েছেন যে উসমান (রা.)-এর খেলাফত আমলে সর্বসম্মতিক্রমে প্রস্তুতকৃত কপির সঙ্গে এর কেরাতের পার্থক্যের কারণে অদূর ভবিষ্যতে ফেতনা মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে। কেননা উসমান (রা.) সাত কেরাতের পরিবর্তে এক কেরাত, আঞ্চলিক একাধিক ভাষার পরিবর্তে প্রমিত এক ভাষায় সে কোরআনটি সংকলন করেছেন। (উলুমুল কোরআন, তকি্ব উসমানি, পৃ. ১৮৬-১৮৭)

হজরত আবু বকর (রা.) সংকলিত কোরআনের বৈশিষ্ট্য হলো- সে সংকলনের উদ্দেশ্য ছিল লিখিতভাবে কোরআন সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা। আর সে সংকলনের প্রেক্ষাপট ছিল তৎকালীন হাফেজে কোরআনদের একের পর এক মৃত্যুবরণ করার কারণে কোরআনের কিছু অংশ হারিয়ে যাওয়ার শঙ্কা।
রাসুল (সা.)-এর যুগ থেকে বিভিন্ন সাহাবির কাছে কোরআনের সম্পূর্ণ অথবা অসম্পূর্ণ যেসব কপি বা পাণ্ডুলিপি নিজ নিজ সংগ্রহে ছিল, সেসব কপির মধ্যে সমন্বয় সাধন কিংবা চূড়ান্ত বিচার-মীমাংসা করে অভিন্ন পঠন পদ্ধতি প্রণয়ন সে সংকলনের উদ্দেশ্য ছিল না; এমনকি সেখানে সর্বসাধারণের সুবিধার্থে সাত কেরাত বা সাতভাবে কোরআন পাঠের অবকাশ রাখা হয়েছে। ফলে ‘মাসহাফে আবি বকর’-এর পাশাপাশি আরো বহু ‘মাসহাফ’ তৈরি হতে থাকল এবং একেক শহরে একেক ‘কারি’কে অনুসরণ করে ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতিতে মানুষ কোরআন পড়তে লাগল। সিরিয়ার অধিবাসীরা হজরত উবাই ইবনে কাব (রা.)-এর কেরাত অনুসারে, ইরাকের অধিবাসীরা হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর কেরাত অনুসারে, অন্যরা হজরত আবু মুসা আশআরি (রা.)-এর কেরাত অনুসারে তেলাওয়াত করতে লাগল। এতে পবিত্র কোরআনের শাব্দিক উচ্চারণ ও পঠনরীতি নিয়ে কিছুটা বিরোধ দেখা দিল। (সূত্র : জম্উল কোরআনি হিফজান ওয়া কিতাবাতান, ড. আলী বিন সুলায়মান, পৃ. ৫৩-৫৪)

এদিকে হজরত ওসমান (আ.)-এর যুগে ইসলাম বিজয়ী বেশে দূর-দূরান্তে ছড়িয়ে পড়ে। তাঁর যুগে আরবের সীমানা পেরিয়ে ইসলাম খুব দ্রুত বিস্তৃতি লাভ করে। আরব-অনারব নির্বিশেষে অগণিত লোক ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় গ্রহণ করতে থাকে। ফলে সেসব এলাকার নব মুসলিমরা খেলাফতের পক্ষ থেকে প্রেরিত বিভিন্ন ‘মুয়াল্লিম’ থেকে এবং কোথাও কোথাও মুজাহিদিনে ইসলাম থেকে কিংবা আরবের মুসলিম ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে কোরআন শিখতে শুরু করে। এতে বিপত্তিও বাড়তে থাকে।
হজরত হুজাইফা বিন ইয়ামান (রা.) আরমেনিয়া, আজারবাইজান সীমান্তে জিহাদে মশগুল থাকা অবস্থায় দেখলেন, সেখানে মানুষের মধ্যে কোরআনের পঠনরীতি নিয়ে মতবিরোধ চলছে। এমনকি এক দল আরেক দলকে কাফের পর্যন্ত বলছে। তিনি জিহাদ থেকে ফিরে ওসমান (রা.)-কে এক রীতিতে কোরআন পড়ার প্রথা চালু করতে পরামর্শ দেন। ওসমান (রা.) অবিলম্বে এ নিয়ে নেতৃস্থানীয় সাহাবিদের সঙ্গে পরামর্শ করেন। সাহাবায়ে কেরামের ইজমার ভিত্তিতে সে পরামর্শে তিনটি সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এক. ‘মাসহাফে আবি বকর’-এর পরিবর্তে অভিন্ন পঠনরীতিতে কোরআন সংকলন করা হবে। দুই. প্রতিটি শহরে এর একেকটি কপি পাঠিয়ে দেওয়া হবে। তিন. বিভ্রান্তি নিরসনকল্পে অবশিষ্ট কোরআনের কপি বাজেয়াপ্ত করা হবে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী হজরত ওসমান (রা.) ২৫ হিজরির শুরুর দিকে চারজন বিশিষ্ট সাহাবির সমন্বয়ে একটি কোরআন সংকলন বোর্ড গঠন করেন। এ চারজন সাহাবি হলেন- হজরত জায়েদ ইবনে সাবেত, আবদুল্লাহ ইবনে জুবায়ের, সাইদ ইবনুল আস এবং আবদুর রহমান ইবনে হারিস ইবনে হিশাম (রা.)। তাঁদের মধ্যে হজরত জায়েদ (রা.) ছিলেন আনসারি সাহাবি আর বাকি তিনজনই ছিলেন কুরাইশি। প্রধান দায়িত্বপ্রাপ্ত এ চারজনের বাইরে হজরত উবাই ইবনে কাব, কাসির ইবনে আফলাহ, মালেক ইবনে আবি আমের, আনাস ইবনে মালেক ও আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) প্রমুখসহ মোট ১২ জন এ কাজে নিয়োজিত ছিলেন। (ফতহুল বারি, খ. ৯, পৃ. ১৩-১৫; কিতাবুল মাসাহিফ, ইবনে আবি দাউদ, পৃ. ২৫)

উল্লেখ্য, কেউ কেউ হজরত ওসমান (রা.)-এর আমলে কোরআন সংকলনের প্রধান তিনটি কারণ উল্লেখ করেছেন। এক. কোরআনের পঠনরীতি নিয়ে সদ্য বিজিত দেশগুলোতে মতবিরোধ। দুই. বিভিন্ন কেরাত নিয়ে কোরআনের মুয়াল্লিমদের বিরোধ। তিন. এ বিষয়ে সাহাবায়ে কেরামের বিরোধ। (সূত্র : রসমুল মাসহাফি ওয়া জবতুহু.., ড. শা’বান মুহাম্মদ ইসমাইল, খ. ১, পৃ. ১৬-১৭)

সংকলন কমিটির কর্মপন্থা

হজরত ওসমান (রা.)-এর আমলে কোরআন সংকলন কমিটি সংকলনের ক্ষেত্রে প্রথমে কর্মপন্থা ও নীতিমালা নির্ধারণ করে। সেসব কর্মপন্থার অন্যতম নীতি ছিল এই যে : এক. হজরত আবু বকর (রা.) সংকলিত কোরআনকে মূল ভিত্তি হিসেবে ধরে নতুন সংকলনে অগ্রসর হওয়া। তাই হজরত ওসমান (রা.) হজরত হাফসা (রা.)-এর কাছে এ মর্মে বার্তা পাঠালেন যে ‘হজরত আবু বকর (রা.) সংকলিত কোরআনের কপি আমাদের কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হোক, আমরা তার থেকে আরো কপি করে আপনাকে তা ফেরত দিয়ে দেব। ‘ দুই. হজরত ওসমান (রা.)-এর সার্বক্ষণিক পৃষ্ঠপোষকতা ও তত্ত্বাবধানে সে সংকলনটি প্রস্তুত করা হয়। (কিতাবুল মাসাহিফ, ইবনে আবি দাউদ, পৃ. ২৫)

তিন. কোরআনের প্রমিত উচ্চারণসহ সার্বিক বিষয়ে তাঁরা নেতৃস্থানীয় সাহাবায়ে কেরামের পরামর্শ নিতেন। চার. বৈধ থাকা সত্ত্বেও একই শব্দের একাধিক লিখন পদ্ধতির পরিবর্তে প্রমিত ও অভিন্ন রীতি প্রচলন। পাঁচ. শব্দের লিখনরীতি নিয়ে মতবিরোধ হলে কোরাইশ ভাষার প্রাধান্য। হজরত ওসমান (রা.) বলেছেন যে ‘তোমরা ও জায়েদ কোনো বিষয়ে একমত না হলে কোরাইশ ভাষায় তা লিখে দেবে। কেননা কোরআন কোরাইশ ভাষায় নাজিল হয়েছে। ‘ (বুখারি ৬/৯৯) (সূত্র : জম্উল কোরআনি হিফজান ওয়া কিতাবাতান, ড. আলী বিন সুলায়মান, পৃ. ৫৯-৬১)

ছয়. উল্লিখিত কাজগুলো করার পাশাপাশি তাঁরা এবারও সে পন্থা অবলম্বন করেছেন, যে পন্থা হজরত আবু বকর (রা.)-এর সময় অবলম্বন করা হয়েছিল। তাই অতিরিক্ত সতর্কতার জন্য রাসুল (সা.)-এর যুগে প্রস্তুতকৃত সাহাবায়ে কেরামের কাছে সংরক্ষিত কোরআনের বিভিন্ন কপি ও পাণ্ডুলিপি আবার তলব করা হয়। এরই সঙ্গে নতুনভাবে নিরীক্ষণের মাধ্যমে নতুন কপি প্রস্তুত করা হয়। এবার সুরা আহজাবের ২৩ নম্বর আয়াত কেবল হজরত খুজাইমা (রা.)-এর কাছেই পাওয়া গেছে। এর অর্থ এই নয় যে সে আয়াত আর অন্য কারো স্মরণে ছিল না। কেননা হজরত জায়েদ (রা) নিজেই বলেছেন, ‘মাসহাফ লেখার সময় সুরা আহজাবের একটি আয়াত (লিখিতরূপে) পাওয়া যাচ্ছিল না, অথচ আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে সেটি পাঠ করতে শুনেছি। আমরা অনুসন্ধান করেছি, অতঃপর তা পেয়েছি খুজাইমা বিন সাবেত আনসারি (রা.)-এর কাছে। ‘ (ফতহুল বারি, খ. ৯, পৃ. ১৭)

হজরত ওসমান (রা.) সংকলিত কোরআনের বৈশিষ্ট্য

এক. হজরত আবু বকর (রা.)-এর আমলে কোরআন সংকলনের উদ্দেশ্য ছিল লিখিতভাবে কোরআন সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা। আর সে সংকলনের প্রেক্ষাপট ছিল তৎকালীন হাফেজে কোরআনদের একের পর এক মৃত্যুবরণ করার কারণে কোরআনের কিছু অংশ হারিয়ে যাওয়ার শঙ্কা। হজরত ওসমান (রা)-এর আমলে কোরআন সংকলনের উদ্দেশ্য ছিল রাসুল (সা.)-এর যুগ থেকে বিভিন্ন সাহাবির কাছে কোরআনের সম্পূর্ণ অথবা অসম্পূর্ণ যেসব কপি বা পাণ্ডুলিপি নিজ নিজ সংগ্রহে ছিল, সেসব কপির মধ্যে সমন্বয় সাধন কিংবা চূড়ান্ত বিচার-মীমাংসা করে প্রমিত ও অভিন্ন পঠন পদ্ধতি প্রণয়ন করা।

দুই. হজরত আবু বকর (রা.) কোরআনের যে কপি প্রস্তুত করেছেন, সেখানে সুরাগুলো বিন্যস্ত ছিল না। বরং প্রতিটি সুরা আলাদা আলাদা লেখা হয়েছিল। এ সংকলনে সব সুরাকে বিন্যস্ত করে একই মাসহাফে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে।

তিন. এ সংকলনে কোরআনের আয়াতগুলো ‘নুকতা’ ও ‘হরকত’ ব্যতীত এভাবে লেখা হয়েছে যে একই আয়াতের সব কয়টি ‘মুতাওয়াতির’ কেরাতের অবকাশ রাখা হয়েছে।

চার. হজরত আবু বকর (রা.)-এর আমলে কোরআনের কেবল একটি কপি প্রস্তুত করা হয়েছিল। আর এ সংকলনে কোরআনের একাধিক কপি প্রস্তুত করা হয়েছে। আল্লামা সুয়ুতির গবেষণা ও প্রসিদ্ধ অভিমত অনুসারে হজরত ওসমান (রা.) কোরআনের পাঁচটি কপি প্রস্তুত করেছেন। (আল ইতকান, খ. ১, পৃ. ২১১)

ইবনে আবি দাউদ (রহ.) বলেন, আমি আবু হাতেম আস সিজস্থানি (রহ.)-কে বলতে শুনেছি যে সে সময় মোট সাতটি নুসখা তৈরি করা হয়েছে। সেগুলো একটি করে মক্কা, শাম, কুফা, বসরা, ইয়ামান ও বাহরাইনে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং একটি মদিনায় সংরক্ষণ করা হয়েছে। (কিতাবুল মাসাহেফ : (১/২৪২)

পাঁচ. সাত কেরাতের পরিবর্তে অভিন্ন রীতিতে কোরআন প্রচলন।

ছয়. বিভিন্ন সাহাবির ব্যক্তিগত সংগ্রহে কোরআনের যেসব পাণ্ডুলিপি ছিল, তাদের কারো কারো কপিতে কোরআনের শাব্দিক ব্যাখ্যাও লেখা ছিল, এ সংকলনে সেগুলো পৃথক করা হয়েছে। (সূত্র : জম্উল কোরআনিল কারিম ফি আহদিল খুলাফাইর্ রাশিদিন, আবদুল কাইউম আস্ সানাদি, খ. ১, পৃ. ৪২)

সংকলনের কাজ সমাপ্তির পর…..

হজরত ওসমান (রা.)-এর তত্ত্বাবধানে কোরআন সংকলনের কাজ সমাপ্তির পর তিনি আগের ঘোষণা অনুযায়ী ‘মাসহাফে আবি বকর’ হজরত হাফসা (রা.)-এর কাছে পাঠিয়ে দেন। হুকুমতের বিভিন্ন প্রদেশে এর একেকটি কপি পাঠিয়ে দেন। এরই সঙ্গে সাহাবায়ে কেরামের ঐক্যবদ্ধ সম্মতিক্রমে কোরআন নিয়ে মতবিরোধ ও বিভ্রান্তি চিরতরে নির্মূলের লক্ষ্যে রাষ্ট্রীয় ফরমান জারি করে কোরআনের অবশিষ্ট পাণ্ডুলিপি ও কপি তিনি বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দেন। এ বিষয়ে হজরত ইবনে মাসউদ (রা.) ব্যতীত আর কোনো সাহাবির দ্বিমত ছিল না। আর প্রথমে দ্বিমত পোষণ করলেও পরবর্তী সময় তিনিও সম্মত হন।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
দয়া করে আপনার নাম লিখুন