পারিবারিক সূত্রে প্রাপ্ত মহানবী (সা.)-এর সম্পদ

মাওলানা কাসেম শরীফ

সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, উত্থান-পতন ও দরিদ্রতা-সচ্ছলতা নিয়েই জীবন। এগুলো জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। সৃষ্টিগতভাবেই মানুষের জীবনচক্র এ নিয়মের অধীন করে দেওয়া হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে, ‘আমি (আল্লাহ) তোমাদের কিছু ভয়, ক্ষুধা এবং ধন-সম্পদ, জীবন ও ফল-ফসলের ক্ষয়ক্ষতি দিয়ে অবশ্যই পরীক্ষা করব। তুমি সুসংবাদ দাও ধৈর্যশীলদের।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৫৫)

এই অমোঘ নিয়ম অনুসারে সব সময় মানুষ সচ্ছল থাকে না। মানুষ যতই বিত্ত-বৈভবের অধিকারী হয়, কখনো না কখনো অর্থকষ্টে পড়তে হয়। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)ও মানুষ ছিলেন। তিনিও আল্লাহর সৃষ্টিগত এ নিয়মের অধীন ছিলেন। ফলে তাঁর জীবনে যেমন সচ্ছলতা দেখা যায়, দরিদ্রতাও দেখা যায়। কিন্তু এক শ্রেণির সিরাতবেত্তা ও ভাসা ভাসা জ্ঞানের অধিকারী বক্তার বর্ণনায় শুধু মহানবী (সা.)-এর দরিদ্রতার বিষয়টি ফুটে ওঠে। তাঁদের বর্ণনা ও আলোচনা থেকে বোঝা যায়, রাসুলুল্লাহ (সা.) খুবই অভাবে জীবন যাপন করতেন। কিন্তু বিষয়টি এর ব্যতিক্রম। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর গোটা জীবন-ইতিহাসের দিকে তাকালে এটা অনুমান করা খুবই সহজ যে তিনি মোটেও দরিদ্র ছিলেন না। তবে মানবজীবনের অনিবার্য নিয়মের অধীনে তাঁকেও কখনো কখনো অর্থকষ্টে পড়তে হয়েছে।

পারিবারিক উত্তরাধিকার সম্পত্তি

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অর্থনৈতিক জীবন নিয়ে আলোচনা করতে গেলে প্রথমেই এ প্রশ্ন এসে যায় যে তাঁর পারিবারিক মিরাস কী ছিল? প্রাচীন ইতিহাসবিদদের মধ্যে ইবনে সাদ তাঁর শিক্ষক ইমাম ওয়াকিদি (রহ.) থেকে বর্ণনা করেছেন, ‘আবদুল্লাহ বিন আবদুল মুত্তালিব উম্মে আইমান নামে এক দাসী, পাঁচটি উট ও এক পাল বকরি রেখে গেছেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) উত্তরাধিকার সূত্রে এগুলো পেয়েছেন।’ (ইবনে সাদ, আত-তাবকাতুল কুবরা, বৈরুত, ১৯৫৭, প্রথম সংস্করণ, পৃষ্ঠা ১০০)

এই সম্পত্তি ছাড়া তিনি পৈতৃক ভিটা উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছেন। মহানবী (সা.)-এর প্রথম জীবনীকার ইবনে ইসহাক লিখেছেন, ‘জনাব আবদুল্লাহ সাইয়েদা আমিনার জন্য একটি জায়গা ক্রয় করেছেন। সেখানেই তাঁরা দাম্পত্য জীবন অতিবাহিত করেছেন।’ (সিরাতে ইবনে ইসহাক, পৃষ্ঠা ৩৩)

তাই এটা খুব স্বাভাবিকভাবেই বলা যায় যে মহানবী (সা.) তাঁর মাতা-পিতার বিভিন্ন অস্থাবর সম্পত্তিও উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছেন। উসামা বিন জায়েদ বিন হারেসা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! মক্কায় আপনি কি আপনার ঘরে অবস্থান করবেন?’ এর জবাবে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আকিল কি আমাদের জন্য কোনো জায়গা অবশিষ্ট রেখেছে?’ (মুসলিম, কিতাবুল হজ, হাদিস : ১৩৫১)

এ হাদিস সহিহ বুখারি ও আবু দাউদেও বর্ণিত হয়েছে। কোনো কোনো বর্ণনায় এসেছে, ‘আকিল কি আমার জন্য কোনো ঘর অবশিষ্ট রেখেছে?’

এসব বর্ণনা থেকে জানা যায়, আকিল [রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর চাচাতো ভাই] নিজের আপন ভাই-বোনের জায়গার পাশাপাশি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জায়গাও বিক্রি করে দিয়েছেন। ওই জায়গায় হিজরতের আগে রাসুলুল্লাহ (সা.) বসবাস করতেন।

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পিতা আবদুল্লাহর মৃত্যুসংক্রান্ত আলোচনায় সিরাতবেত্তারা এ বিষয়টিও উল্লেখ করেছেন যে তিনি ব্যবসার উদ্দেশ্যে মদিনায় গিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন কোরাইশি ব্যবসায়ী কাফেলার দলভুক্ত। মদিনা থেকে ফেরার পথে মদিনার সন্নিকটে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে তাঁর পরামর্শে তাঁকে মদিনায় তাঁর নানার বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। কাফেলা যথারীতি চলে যায়। তারা বিষয়টি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দাদা আবদুল মুত্তালিবকে অবহিত করেন। খবর শুনে আবদুল মুত্তালিব তাঁর বড় ছেলেকে মদিনায় পাঠিয়েছেন। ততক্ষণে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পিতা আবদুল্লাহ ওফাত লাভ করেছেন। এটা কিছুতেই বলা যায় না যে এটাই ছিল মহানবী (সা.)-এর পিতা আবদুল্লাহর একমাত্র ব্যবসায়িক সফর। বরং এটা খুব সহজেই অনুমিত হয় যে তিনি এর আগেও ব্যবসায়িক সফরে বের হয়েছেন। আর তাঁর মৃত্যুর পর এসব অর্থবিত্ত যে রাসুলুল্লাহ (সা.) উত্তরাধিকার সম্পত্তি হিসেবে পেয়েছেন, তা বলাই বাহুল্য।
লেখক : সাংবাদিক ও তাফসিরকারক
kasemsharifcu@gmail.com

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
দয়া করে আপনার নাম লিখুন