বাংলাদেশের অর্থনীতিতে হজ

যুবায়ের আহমাদ

প্রেমময় এক আধ্যাত্মিক সফর হজ। ইসলামপূর্ব যুগ থেকে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক মহাসমাবেশ হিসেবে হজের অবস্থান শীর্ষস্থানেই। যুক্তরাষ্ট্রের প্রগ্রেসিভ পলিসি ইনস্টিটিউটের ‘ট্রেড ফ্যাক্ট অব দ্য উইক’ প্রকাশনায় ২০০৯ সালেই বিশ্বের সবচেয়ে বড় একক অনুষ্ঠানের স্বীকৃতি দেওয়া হয় হজকে। পৃথিবীর ৩০ লক্ষাধিক হাজীর আধ্যাত্মিক এ সফরে বাংলাদেশিদের অংশগ্রহণও বিশাল। সরকারি ও বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় এ বছর হজ করছেন ১ লাখ ২৭ হাজার ১৯৮ জন হাজী। হজকেন্দ্রিক হাজী সাহেবরা বাণিজ্যিক চিন্তা করেন না। তবু প্রাচীনকাল থেকেই আন্তর্জাতিক অর্থনীতির অন্যতম প্রধান যোগসূত্র হিসেবে হজ গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা পালন করে আসছে। ৩০ লাখ হজযাত্রীর আসা-যাওয়া, সৌদি আরবে অবস্থান এবং কেনাকাটায় যেমন সৌদি আরবের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়ে, তেমনি ১ লাখ ২৭ হাজার বাংলাদেশি হাজীর হজযাত্রা বাংলাদেশের জাতীয় অর্থনীতিকেও ইতিবাচকভাবে প্রভাবিত করে।
লক্ষাধিক হাজীর প্রতিজনে গড়ে ৪ লাখ টাকা ব্যয় হলে এ খাতে মোট অর্থ ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়াবে ৫ হাজার ৮৭ কোটি ৯২ লাখ টাকা। হাজীদের এই অর্থ ব্যয় প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে প্রভাবিত করে আমাদের অর্থনীতির অনেক খাতকে। হাজীদের অর্থের একটি বিরাট অংশ খরচ হয় বিমানের টিকিটে, যা বাংলাদেশ বিমানের জন্য একটি বিশাল প্রাপ্তি। কখনও কখনও শুধু হজ ফ্লাইটের কারণেই বিমানে যোগ হয় ‘লাভ’ শব্দটি, আর কখনও হজ ফ্লাইট লাভের পাল্লাকে ভারী করে। ২০১২ সালে প্রথম ‘বাংলাদেশ বিমান’ লাভের মুখ দেখে হজ ফ্লাইটে। ২০১২ সালে হজযাত্রী পরিবহন করে মোট রাজস্ব আয় করে ৬৫০ কোটি টাকা। তা থেকে খরচ বাদ দিয়ে বিমানের আয় হয় ৮০ কোটি টাকা। (প্রথম আলো : ০৯-১২-২০১২)। শুধু হজ ফ্লাইট পরিচালনা করেই ২০১৪ সালে বিমানের নেট লাভ হয় ১৮৫ কোটি টাকা। (যুগান্তর : ২৩-১১-২০১৪)। ২০১৫ সালেও বিপুল অর্থ লাভ হয় হজ ফ্লাইট থেকে। এ প্রসঙ্গে একটি জাতীয় দৈনিকের প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘বিমান সদ্য বিদায়ী বছরে লাভ করেছে ২৭১ কোটি টাকা। এর মধ্যে শুধু হজ খাতেই লাভ হয়েছে ২০০ কোটিরও বেশি। (জনকণ্ঠ : ০৪-০১-২০১৬)। বিগত বছরগুলোয় হজ ফ্লাইট পরিচালনা করে বিমান প্রায় ৩০০ কোটি টাকা মুনাফা করে। (সমকাল : ৭-০৪-২০১৮)। বছরের পর বছর বিমানকে এ বিশাল লাভের মুখ দেখাচ্ছে হজ ফ্লাইট। বাংলাদেশ বিমান কর্তৃপক্ষের সচেতনতা, স্বচ্ছতা ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করে অপচয় রোধ করলে শুধু হজ থেকেই বছরে ২০০ থেকে ৩০০ কোটি টাকা লাভ হতে পারে বিমানের। হাজযাত্রীদের বিমানের টিকিট করার সময় ভ্যাট বাবদ যে টাকা নেওয়া হয় তাতেও সরকারের আয় কোটি কোটি টাকা।
হজের পাসপোর্ট করতে প্রত্যেক হাজীকে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের মাধ্যমে সরকারের কাছে জমা দিতে হয় ন্যূনতম ৩ হাজার ৪৫০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৬ হাজার ৯০০ টাকা। প্রায় ২৫ শতাংশ হাজী আর্জেন্ট পাসপোর্ট করেন। তাদের প্রত্যেককে দিতে হয় ৬ হাজার ৯০০ টাকা করে। এখানে সরকারের আয় ২১ কোটি ৯৪ লাখ ১৬ হাজার ৫৫০ টাকা। বাকি ৭৫ শতাংশ হাজীকে কমপক্ষে (প্রতিজনে ৩ হাজার ৪৫০ টাকা করে) ৩২ কোটি ৯১ লাখ ২৪ হাজার ৮২৫ টাকা দিতে হয়। ১ লাখ ২৭ হাজার হাজীর কাছ থেকে পাসপোর্ট বাবদ সরকারের আয় ৫৪ কোটি ৮৫ লাখ ৪১ হাজার ৩৭৫ টাকা। এ হাজার হাজার কোটি টাকা জমা দিতে হয় ব্যাংকের মাধ্যমে। এর ইতিবাচক প্রভাবে সগরম হয় ব্যাংকপাড়া।
মুয়াল্লিম ফি বাবদ হজ অধিদপ্তরকে প্রত্যেক হাজীর জমা দিতে হয় ৩০ হাজার ৭৫২ টাকা। এখান থেকে সৌদি আরবে প্রদানের পর প্রতি হাজী বাবদ সরকারের থেকে যায় ৪ হাজার ৫০০ টাকা। মুয়াল্লিম ফির সৌদি আরবের অংশ জমা দেওয়ার পরও সরকারের লাভ হয় ৫৭ কোটি ২৩ লাখ ৯১ হাজার টাকা। এই হাজার হাজার কোটি টাকা লেনদেন হয় ব্যাংকের মাধ্যমে। ফলে সরগরম হয় ব্যাংকপাড়া। হাজীদের বাড়ি ভাড়াসহ অন্যান্য খরচের টাকা পাঠাতে হয় আইবিএনের মাধ্যমে। আর এ টাকা যায় বাংলাদেশের ব্যাংক হয়ে। এখান থেকেও সরকারের লাভ হয় কয়েক কোটি টাকা।
বাংলাদেশে হজ এজেন্সির সংখ্যা প্রায় ১ হাজার ৪০০। প্রত্যেকটি এজেন্সিরই জামানত বাবদ সরকারের কাছে রাখতে হয় ২০ লাখ টাকা করে। এজেন্সিগুলোর জামানত বাবদও সরকারের কাছে থাকে কয়েক হাজার কোটি টাকা। এজেন্সিগুলোর অফিসিয়াল কাজে সারা বছরই প্রয়োজন হয় জনবলের। গড়ে প্রতিটি এজেন্সির অফিসে ন্যূনতম ছয়জন লোকের প্রয়োজন হয়। এ খাতেই প্রায় ৮ হাজার ৪০০ লোকের কর্মসংস্থান হচ্ছে। ধর্ম মন্ত্রণালয়ের ঢাকার হজ অফিস, হাজী ক্যাম্প এবং সৌদি আরবের জেদ্দার হজ মিশনে কর্মসংস্থান হচ্ছে সহস্রাধিক লোকের। এ বছর ৫২৮টি হজ এজেন্সি হজ সেবায় নিয়োজিত। সেবা প্রদানের পর প্রতি এজেন্সি যদি গড়ে ১৫ লাখ টাকাও মুনাফা অর্জন করে, তাহলে ৫২৮টি এজেন্সিতে ৭৯ কোটি ৯২ লাখ টাকা মুনাফা অর্জন করবে।
হজে অনেক জিনিসপত্রের প্রয়োজন হয়। বিশেষ করে ইহরামের কাপড়। প্রতি সেট ইহরামের কাপড় ৫০০ থেকে ৩ হাজার ৫০০ টাকা। ইহরামের কাপড় ছাড়াও কাঁধের ব্যাগ, ইহরাম বাঁধার বেল্ট, পাসপোর্ট ব্যাগ, টুপি, প্লাস্টিক জায়নামাজ, পাথর রাখার ব্যাগ, গাইড বই, মিসওয়াক, হিজাব, ছাতা ইত্যাদি কিনতে হয়। জিনিসগুলো বাবদ গড়ে প্রতিজন হাজীর খরচ আড়াই হাজার টাকা হলেও এ বাবদ খরচ হয় ৩১ কোটি ৭৯ লাখ ৯৫ হাজার টাকা। এই জিনিসগুলো কেনা হয় বাংলাদেশ থেকেই। তাই এই পুরো অর্থটাই থেকে যাচ্ছে বাংলাদেশে। হজে গিয়ে তারা কেনাকাটা করেন তা-ও তো চলে আসে নিজ দেশে। এভাবে দেখা যায়, হজে খরচ হওয়া অর্থের অনেকটাই ঘুরেফিরে যোগ হয় বাংলাদেশের অর্থনীতিতে।

লেখক : কলামিস্ট, গবেষক; যুগ্ম সম্পাদক, ডেইলি ইসলাম

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
দয়া করে আপনার নাম লিখুন