বিশ্বজুড়ে ‘মিয়ানমার বর্জন’ কর্মসূচি শুরুর ঘোষণা

রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে ইসরায়েলবিরোধী বিশ্ব-প্রতিরোধ আন্দোলনের অনুপ্রেরণা কাজে লাগানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। রোহিঙ্গা অ্যাক্টিভিস্ট ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের নিয়ে গঠিত আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক এফআরসি (ফ্রি রোহিঙ্গা কোয়ালিশন) জানিয়েছে, ফিলিস্তিনি জাতির মুক্তির পক্ষে বিশ্বব্যাপী যেমন করে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে বিডিএস আন্দোলন পরিচালিত হচ্ছে, তেমন করে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগঠিত করার চেষ্টা করছেন তারা। এফআরসি’র এক বিবৃতিকে উদ্ধৃত করে তুর্কি বার্তা সংস্থা আনাদোলু এজেন্সি জানিয়েছে, নিউ ইয়র্কে আয়োজিত তাদের এক সম্মেলন থেকে ‘মিয়ানমার বর্জন’ কর্মসূচি শুরু করা হবে।

কয়েক প্রজন্ম ধরে রাখাইনে বসবাস করে আসলেও রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব স্বীকার করে না মিয়ানমার। ২০১৭ সালের আগস্টে রাখাইনে নিরাপত্তা বাহিনীর তল্লাশি চৌকিতে হামলার পর রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে পূর্বপরিকল্পিত ও কাঠামোবদ্ধ সহিংসতা জোরালো করে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। খুন, ধর্ষণ ও অগ্নিসংযোগের মুখে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে প্রায় সাত লাখ রোহিঙ্গা। জাতিসংঘ মিয়ানমারে সংঘটিত রোহিঙ্গাবিরোধী নৃশংসতাকে গণহত্যা আখ্যা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আর বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা স্যাটেলাইট ইমেজ আর অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের মধ্য দিয়ে হত্যা-ধর্ষণ-ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়ার মতো মানবতাবিরোধী অপরাধের আলামত তুলে আনলেও মিয়ানমার ওই অভিযোগকে ‘অতিকথন’ কিংবা ‘গুজব’ আখ্যায়িত করে তা নাকচ করে আসছে।

রোহিঙ্গাদের বিপন্নতার অবসান ঘটানোর প্রত্যাশা নিয়ে ৮ ও ৯ ফেব্রুয়ারি নিউ ইয়র্ক সিটিতে এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজন করেছে ফ্রি রোহিঙ্গা কোয়ালিশন (এফআরসি)। যুক্তরাষ্ট্রের কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্নার্ড কলেজে এরআরসির দুই দিনের সম্মেলনে এক হচ্ছেন বিশ্বের অনেক শিক্ষাবিদ, মানবাধিকারকর্মীসহ জাতিসংঘের আইনজীবীরা। আয়োজকরা জানিয়েছেন, ওই সম্মেলনে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে গণহত্যা ও যুদ্ধাপরাধ সংঘটনকারী মিয়ানমারের কর্মকর্তাদের বিচারের আওতায় নেওয়ার ব্যাপারে আলোচনা হবে। অন্যান্য সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠীর সুরক্ষার প্রশ্নও তোলা হবে সেখানে।

আয়োজকরা জানিয়েছেন, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর নিপীড়নের অবসান ঘটানো আর তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় ইসরায়েলবিরোধী বিশ্ব-আন্দোলন বিডিএস-এর সাংগঠনিক প্রক্রিয়া অবলম্বন করা হবে। বিডিএস-এর পূর্ণরূপ বয়কট, ডিভাস্টমেন্ট অ্যান্ড স্যাঙ্কশন্স অর্থাৎ বয়কট, বিনিয়োগ প্রত্যাহার এবং নিষেধাজ্ঞা । ২০০৫ সালে এই আন্দোলনের সূচনা। দুনিয়াজুড়ে ইসরায়েলি পণ্য বর্জন, দেশটি থেকে পুঁজি প্রত্যাহার এবং ইসরায়েলি পণ্যের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ সংক্রান্ত এ আন্দোলন বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয়তা পেয়েছে। বহু খ্যাতিমান শিল্পী-বুদ্ধিজীবীসহ বিভিন্ন অঙ্গনের তারকা ব্যক্তিত্ব এই আন্দোলনে জড়িত। মার্কিন বুদ্ধিজীবী নোম চমস্কি, ভারতীয় লেখক অরুন্ধতী রায় আর পিংক ফ্লয়েড ব্যান্ডের রজার ওয়াটারের মতো বিশ্বখ্যাত ব্যক্তিরা রয়েছেন এই আন্দোলনের সঙ্গে। এফআরসির সমন্বয়ক মং জার্নি বলেছেন, ‘রাষ্ট্রীয় উপদেষ্টা অং সান সু চির নেতৃত্বাধীন বেসামরিক সরকার, খুনি সেনাবাহিনী ও সরকারের বিদ্বেষ-বিভ্রান্তি ও বর্ণবাদী রাজনীতির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত সামাজিক সংগঠনগুলোকে আমরা বয়কট করবো। ঠিক যেমনটা করা হয়েছে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে বিডিএস আন্দোলনের মাধ্যমে।’

অন্তারিও ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট এজেন্সি (ওআইডিএ) এর প্রতিবেদনকে উদ্ধৃত করে আনাদোলু এজেন্সি জানিয়েছে, ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর থেকে মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে প্রায় ২৪ হাজার রোহিঙ্গা নিহত হয়েছে। মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও পুলিশের হাতে ধর্ষণের শিকার হয়েছে ১৮ হাজার রোহিঙ্গা নারী ও কিশোরী। জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে ১ লাখ ১৫ হাজারেরও বেশি রোহিঙ্গা ঘর-বাড়ি। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে যুক্তরাজ্যের উদ্যোগে মিয়ানমারবিরোধী কঠোর প্রস্তাব আনার প্রচেষ্টা নেওয়া হলেও রাশিয়া ও চীনের কারণে তা বাস্তবায়ন করা যায়নি।

জার্নির অভিযোগ, জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর এই সমস্যা সমাধানে কোনও আগ্রহই নেই কারণ এখানে তাদের স্বার্থ জড়িত নয়। তিনি জানিয়েছেন, আয়োজিত রোহিঙ্গা সম্মেলনে মিয়ানমারকে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে বিচারের আওতায় নেওয়ার চাপ জোরালো করার চেষ্টা করা হবে। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীসহ মিয়ানমারের অপরাপর সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠীর সুরক্ষার দাবিও তোলা হবে ওই সম্মেলনে। তিনি জানান, বিভিন্ন দেশের যেসব সরকার আর আন্তর্জাতিক সংস্থা নীরব ভূমিকা পালনের মধ্য দিয়ে মিয়ানমারকে নিরুদ্বেগে তাদের অপকর্ম চালিয়ে যেতে সহায়তা করছে তাদের বিরুদ্ধে জনমত গঠনের প্রচেষ্টা রয়েছে তাদের। তিনি আশা প্রকাশ করেন, তাদের সম্মেলন থেকে বিশ্বব্যাপী বিবেকসম্পন্ন মানুষকে রোহিঙ্গাদের দুর্দশা সম্পর্কে সোচ্চার হতে উদ্বুদ্ধ করা যাবে। জার্নির বিশ্বাস, এর মধ্য দিয়ে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মানুষকে তাদের পূর্বপ্রজন্মের ভূমিতে নিজস্ব অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং তাদের সমানাধিকার-সম্পন্ন নাগরিকত্ব নিশ্চিতে সহায়তা করা যাবে।

জাতিগত সংঘাত ও দারিদ্র্য-জর্জরিত রাখাইনের রোহিঙ্গারাই মিয়ানমারের একমাত্র নিপীড়িত জাতিগোষ্ঠী নয়। রাখাইন বৌদ্ধরা (আরাকান জাতিভূক্ত) সহ সেখানকার বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী আধিপত্যবাদী বামার জাতিগোষ্ঠীর প্রাধান্যশীল সেনাবাহিনী ও কেন্দ্রীয় সরকারের নিপীড়নের শিকার হয়। গত বছর (২০১৮ সালের জানুয়ারি মাসে) নিউ ইয়র্ক টাইমস প্রকাশিত এক বিশ্লেষণ থেকে ২০১১ সালে বেসামরিক সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সঙ্গে এক মাসেই ১০টি বিদ্রোহী গোষ্ঠীর লড়াইয়ের কথা জানা যায়। গতমাসে প্রকাশিত প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক থিংক ট্যাংক ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ তাদের এক প্রতিবেদনে দাবি করেছে, আরাকান জাতিগোষ্ঠীর মানুষের সঙ্গে কেন্দ্রীয় সরকারের সংঘাতের বাস্তবতা আড়াল করতে রোহিঙ্গাদের ব্যবহার করা হয়। বিদ্বেষী সেনা-প্রচারণার মধ্য দিয়ে বিভক্তির বিষ ছড়িয়ে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ওপর নিপীড়ন জারি রাখে মিয়ানমার। মানবাধিকার কর্মী জার্নি বলেন, মিয়ানমারের কর্তৃপক্ষ স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে যানবাহনের মাধ্যমেও বর্ণবাদ ও রোহিঙ্গা বিদ্বেষ ছড়াচ্ছে। খ্রিস্টান ক্যারেন গোষ্ঠী ও কাচিনদের বিরুদ্ধেও একই আচরণ তাদের। তিনি বলেন, এই সম্মেলনে আমরা তুলে ধরবো যে মিয়ানমারের এসব প্রতিষ্ঠানগুলো সংখ্যালঘু নিপীড়ন খুবই সাধারণ ঘটনা। সেটা রোহিঙ্গা হোক, কাচিন কিংবা রাখাইন বৌদ্ধ ।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
দয়া করে আপনার নাম লিখুন