বিশ্বনবীর দৃষ্টিতে ভারতবর্ষ

মুফতি মাহমুদ হাসান

ইসলামে গোত্র, বর্ণ ও স্থানভিত্তিক বৈষম্যের কোনো স্থান নেই। সব মানুষ মহান আল্লাহ তাআলার সৃষ্টি।
তাই মহান সৃষ্টিকর্তা ও পালনকর্তার সব সৃষ্টিই শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার পাত্র। এ জন্যই ইসলামে সম্মান ও মর্যাদার ভিত্তি রাখা হয়েছে আল্লাহ তাআলার বাধ্য ও অবাধ্য হওয়ার ওপর। যে ব্যক্তি আল্লাহর যত বেশি অনুগত, সে তত বেশি মর্যাদার অধিকারী। এতে কোনো গোত্র, বর্ণ ও দেশের বিভেদ নেই। তা সত্ত্বেও কিছু কিছু দেশ ও স্থান বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের কারণে বিশেষ গুরুত্ব ও মর্যাদা রাখে। যেমন—পৃথিবীর কেন্দ্রভূমি পবিত্র মক্কা শরিফ পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ স্থান। তারপর রাসুল (সা.)-এর হিজরতের ভূমি মদিনা শরিফ সর্বশ্রেষ্ঠ। এরপর নবী-রাসুলদের স্মৃতিধন্য শাম অঞ্চল (সিরিয়া, জর্দান ও ফিলিস্তিন) বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ। তেমনি এই উপমহাদেশও কিছু বৈশিষ্ট্যের কারণে ইসলামে বিশেষ গুরুত্ব ও মর্যাদার দাবিদার।

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দৃষ্টিতে ভারতবর্ষ

ভারতবর্ষ বা হিন্দুস্তান ইসলামের ইতিহাসে এক অতীব গুরুত্বপূর্ণ স্থানাধিকারী দেশ। সর্বপ্রথম আল্লাহ তাআলা দুনিয়ায় প্রথম মানব ও প্রথম নবী আদি পিতা হজরত আদমকে (আ.)-কে হিন্দুস্তানের মাটিতে (সরণদ্বীপ বা লঙ্কা; বর্তমানে শ্রীলঙ্কা, যা ছিল একসময় হিন্দুস্তানেরই অংশ) পাঠিয়েছিলেন। সেখান থেকেই তিনি পৃথিবীর কেন্দ্র ও সর্বশ্রেষ্ঠ ভূমি পবিত্র মক্কায় রওনা হয়েছিলেন। যেহেতু প্রথম নবী হজরত আদম (আ.) হিন্দুস্তানের মাটিতে সর্বপ্রথম এসেছিলেন, এর দ্বারা প্রতীয়মান হয়, নবীদের প্রতি মহান আল্লাহ তাআলার বার্তাবাহক ফেরেশতাকুল সর্দার হজরত জিবরাঈল (বিশুদ্ধ হলো ‘জিবরিল’) (আ.)ও পৃথিবীতে সর্বপ্রথম হিন্দুস্তানের মাটিতে এসেছিলেন।

হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন, সর্বপ্রথম আল্লাহ তাআলা দুনিয়ায় প্রথম মানব হজরত আদম (আ.)-কে হিন্দুস্তানের মাটিতে পাঠিয়েছিলেন। (মুস্তাদরাকে হাকেম, হাদিস : ৩৯৯৪) হাদিস বিশারদদের পরিভাষায় হাদিসটি সহিহ।

হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) সূত্রে বর্ণিত, নবী করিম (সা.) বলেন, আদম (আ.) হিন্দুস্তান থেকে হেঁটে এক হাজারবার কাবা শরিফ জিয়ারতে এসেছিলেন। (সহিহ ইবনে খুজাইমা, হাদিস : ২৭৯২) হাদিসটির সনদ জইফ (সূত্রগতভাবে দুর্বল)।

হজরত সুদ্দি (রহ.) বলেন, হজরত আদম (আ.) সর্বপ্রথম হিন্দুস্তানের মাটিতে অবতরণ করেছিলেন। তাঁর সঙ্গে হাজরে আসওয়াদ পাথরটিও ছিল। সঙ্গে জান্নাতের কিছু পাতাও ছিল। তিনি তা হিন্দুস্তানের মাটিতে ছিটিয়ে দিলেন। এতে অনেক সুগন্ধিগাছ উত্পন্ন হয়। (আখবারু মাক্কাহ, হাদিস : ২৩) হাদিসটির সনদ হাসান (সূত্রগতভাবে গ্রহণযোগ্য)।

ভারতবর্ষ সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ভবিষ্যদ্বাণী

ভারতবর্ষ সম্পর্কে হজরত রাসুলে কারিম (সা.)-এর অনেক বাণীই বিদ্যমান। এগুলোর আলোকে প্রমাণিত হয়, ভারতবর্ষের সঙ্গে ইসলামের সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। রাসুলুল্লাহ (সা.) ও সাহাবায়ে কেরামের যুগ থেকেই ভারতবর্ষের সঙ্গে মুসলিম বিশ্বের এক নিগূঢ় আত্মিক সুসম্পর্ক ছিল। ফলে প্রথম হিজরি থেকেই মুসলমানদের বারবার ভারত উপমহাদেশে আগমন করতে হয়।

হজরত সাওবান (রা.) সূত্রে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, আমার উম্মতের দুই দলকে আল্লাহ তাআলা জাহান্নামের কঠিন আগুন থেকে মুক্তি দেবেন, এক হলো যারা ন্যায়ের পক্ষে হিন্দুস্তানে যুদ্ধ করবে, দ্বিতীয় দল হলো, যারা কেয়ামতের আগে মরিয়মপুত্র ঈসা (আ.)-এর সঙ্গী হবে। (সুনানে নাসাঈ, হাদিস : ৩১৭৫, মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ২২৩৯৬) হাদিসটি সহিহ (বিশুদ্ধ)।

হজরত আবু হুরাইরা (রা.) সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) হিন্দুস্তানে যুদ্ধের ব্যাপারে আমাদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, যদি আমি সে সময় পাই তাতে আমার জান-মাল খরচ করব। যদি আমি এতে শহীদ হই, তাহলে আমি সর্বোত্তম শহীদ হব। আর যদি বিজয়ীর বেশে ফিরে আসি, তাহলে আমি আবু হুরাইরা জাহান্নাম থেকে মুক্ত। (সুনানে নাসাঈ, হাদিস : ৩১৭৪, মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ৭১২৮) হাদিসটি হাসান।

হজরত আবু হুরাইরা (রা.) সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) হিন্দুস্তানের আলোচনা করে বললেন, তোমাদের একদল লোক অবশ্যই হিন্দুস্তানে যুদ্ধ করে এমনভাবে বিজয় লাভ করবে যে সেখানকার (জালিম) শাসকবর্গকে শিকলে বন্দি করে নিয়ে আসবে। আল্লাহ তাআলা তাদের ক্ষমা করে দেবেন। অতঃপর তারা চলতে চলতে শাম দেশে (বর্তমান সিরিয়া, জর্দান, ফিলিস্তিন) ঈসা ইবনে মারইয়াম (আ.)-এর সঙ্গে যুক্ত হবে। আবু হুরাইরা (রা.) বলেন, ‘যদি আমি সে সময় পাই তাহলে আমার অর্জিত সব সম্পদ বিক্রি করে হলেও সে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করব। যখন আল্লাহ তাআলা আমাদের বিজয় দান করবেন, তখন আমি জাহান্নাম থেকে মুক্ত। যখন সে দল শাম দেশে ঈসা (আ.)-কে পাবে, তখন আমি ঈসা (আ.)-এর কাছে গিয়ে বলব, আল্লাহর প্রেরিত রাসুল! আমি আপনার সঙ্গে থাকব। ’ এতে রাসুলুল্লাহ (সা.) মুচকি হাসলেন এবং বললেন, ‘আবু হুরাইরা! তা হতে এখনো অনেক দেরি আছে। ’ (মুসনাদে ইসহাক ইবনে রাহাওয়াইহ, হাদিস : ৫৩৭; আলফিতান, নুআইম ইবনে হাম্মাদ, হাদিস : ১২৩৬)

লেখক : ফতোয়া গবেষক, ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
দয়া করে আপনার নাম লিখুন