ভারত কেন বল্লভভাইয়ের বৃহৎ মূর্তি বানাতে চায়?

বদরুদ্দীন উমর

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ৩১ অক্টোবর গুজরাটের কেওড়িয়াতে নর্মদা নদীর তীরে কংগ্রেসের নেতা সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের এক মূর্তির উদ্বোধন করেছেন।

এই মূর্তির উচ্চতা নিউইয়র্কের বিশ্ববিখ্যাত ‘স্টাচু অব লিবার্টির’ থেকেও অনেক বেশি। ৫৯৭ ফুট উঁচু এই মূর্তিটি ব্রোঞ্জের মোড়কে মোড়ানো। এটি নির্মাণ খাতে ব্যয় হয়েছে ২ হাজার ৯৯০ কোটি অর্থাৎ প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা!

ভারতের জনগণের বুকের ওপর পা দিয়ে এই মূর্তিটি তৈরি হয়েছে, এজন্য স্থানীয় ২২টি গ্রামের জনগণ প্রথম থেকে এই মূর্তি নির্মাণের বিরোধিতা করে আসছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত তারা এর বিরোধিতা করে মূর্তিটি উদ্বোধনের বিরুদ্ধে দাঁড়ান।

এর বিরুদ্ধে তারা বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। এই বিক্ষোভকারীদের অনেককে পুলিশ গ্রেফতার করে। এ ধরনের ঘটনা সামাল দেয়ার জন্য চারদিকে হাজার হাজার পুলিশ মোতায়েন করা হয়। মূর্তিটির পার্শ্ববর্তী এলাকা ছাড়াও গুজরাটের অন্যান্য জায়গায়ও এর বিরুদ্ধে জনগণ খণ্ড খণ্ড বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন।

জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানে ভাস্কর্যটি উদ্বোধন করার সময় মোদি মূর্তিটিকে ভারতের অখণ্ডতা ও দৃঢ় প্রতিজ্ঞার প্রতীক হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। মূর্তিটির নামকরণ করা হয়েছে ‘স্ট্যাচু অব ইউনিটি’ অর্থাৎ ঐক্যের মূর্তি! মূর্তিটিকে স্ট্যাচু অব ইউনিটি আখ্যা দিয়ে নরেন্দ্র মোদি, তাদের দল বিজেপি এবং আরএসএস সর্দার প্যাটেলকে ভারতের অখণ্ডতার সব থেকে প্রধান প্রবক্তা ও প্রতিনিধি হিসেবে খাড়া করতে চেয়েছেন।

স্থানীয় লোকরা এবং গুজরাটের জনগণের একটি অংশ এই মূর্তি নির্মাণকে একটা জাতীয় অপচয় হিসেবে এর বিরুদ্ধে নিজেদের ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। কারণ ভারতের মতো একটি দেশে, যেখানে মানুষের খাদ্য, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসার সুব্যবস্থা নেই, কৃষকরা ঋণ শোধ করতে না পেরে আত্মহত্যা করছেন, সেখানে তিন হাজার কোটি টাকার মতো বিপুল পরিমাণ অর্থ দিয়ে শত শত হাসপাতাল ও স্কুল তৈরি করা যেত।

সেই অবস্থায় স্বাস্থ্য সমস্যার দিকে না তাকিয়ে, শিক্ষার জন্য স্কুল নির্মাণ বাদ দিয়ে, কৃষকদের দুরবস্থার দিকে নজর না দিয়ে এভাবে হাজার হাজার কোটি টাকা সর্দার প্যাটেলের মতো একজন নেতার মূর্তি নির্মাণের কোনো যৌক্তিকতা তারা একেবারেই দেখেন না। এ কাজ যে হিন্দুত্ববাদ প্রচারের উদ্দেশ্যে ভারতের অখণ্ডতা ইত্যাদি অজুহাত তৈরি করে করা হয়েছে এতে কারও সন্দেহ নেই।

এখানে লক্ষ করার বিষয়, চরম প্রতিক্রিয়াশীল, সাম্প্রদায়িক ও হিন্দুত্ববাদী সংগঠন আরএসএসের আদর্শের অধীনে বিজেপি সরকার এই যুক্তি তৈরি করলেও সর্দার প্যাটেল আরএসএসের সদস্য ছিলেন না। তার জীবনকালে বিজেপির জন্ম পর্যন্ত হয়নি। অথচ তারা এখন সব ছেড়ে দিয়ে সর্দার প্যাটেলের এই মূর্তিটি তৈরি করে এর নাম দিয়েছেন ‘স্ট্যাচু অব ইউনিটি’!

কংগ্রেস তো এমন একটি সংগঠন ছিল, যারা নিজেদের হিন্দুত্ববাদী তো নয়ই, এমনকি সাম্প্রদায়িক পর্যন্ত বলত না। তাদের নিজেদের ঘোষণা অনুযায়ী, তারা ছিল একটি ধর্মবিযুক্ত (সেকুলার) রাজনৈতিক দল। সেই অবস্থায় কংগ্রেসের শীর্ষ নেতাদের একজন বল্লভভাই প্যাটেলের মূর্তি তৈরি করে চরম সাম্প্রদায়িক ও হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক দল বৈরী ঢাকঢোল পেটাচ্ছে।

সর্দার প্যাটেলকে নিয়ে তাদের এভাবে ঢাকঢোল পেটাতে দেখে মনে হয়, প্যাটেল কংগ্রেসের নয়, নিকৃষ্টতম হিন্দুত্ববাদী সংগঠন আরএসএসেরই নেতা ছিলেন। এর থেকে এ কথা তো স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, সর্দার প্যাটেল কংগ্রেসের মধ্যে এমন একজন ছিলেন, যাকে আরএসএস সদস্যরা মনে করেন নিজেদেরই লোক।

এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, গান্ধী আরএসএসের একজন সদস্যের গুলিতে নিহত হয়েছিলেন। এরপর ভারতে আরএসএসকে বেআইনি ঘোষণা করা হয়। কিন্তু অল্প কিছুদিন পরই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সর্দার প্যাটেল এই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেন এই অজুহাতে যে, আরএসএস কোনো রাজনৈতিক দল নয়, এটি হল একটি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান।

কংগ্রেস প্রকৃতপক্ষে ও কার্যত একটি সাম্প্রদায়িক দল হলেও তারা হিন্দুত্ববাদী ছিল না। তারা হিন্দুত্ববাদীদের মতো মুসলমানদের বিদেশি মনে করত না এবং এই হিসাব কষে তারা ভারতীয় ইতিহাসকে চরমভাবে বিকৃত করার চেষ্টায় নিয়োজিত থাকত না, যে কাজ বিজেপি প্রথম থেকেই, এমনকি সরকারি ক্ষমতার বাইরে থাকাবস্থায় থেকে করে আসছিল।

তাহলে বিজেপির মতো কংগ্রেসের শীর্ষপর্যায়ের নেতা সর্দার প্যাটেলকে এমনভাবে মাথায় তুলে নাচানাচি করছে কেন, যাতে মনে হয় তিনি কংগ্রেস নেতা নন, ব্রিটিশ শাসনামলে আরএসএসের নেতা ছিলেন? একে অকারণঘটিত ব্যাপার মনে করার মধ্যে কি কোনো যুক্তি আছে?

কংগ্রেসের মধ্যে গোখলে, চিত্তরঞ্জন দাস, সুভাষ বসু, শরৎ বসুর মতো অসাম্প্রদায়িক নেতারা থাকলেও অধিকাংশ উচ্চপর্যায়ের নেতা ছিলেন সাম্প্রদায়িক। এদের মধ্যে সব থেকে বিষাক্ত সাম্প্রদায়িক নেতা ছিলেন সর্দার প্যাটেল, রাজেন্দ্র প্রসাদ, জেবি কৃপালিনি, পুরষোত্তম দাস ট্যান্ডন প্রমুখ।

অবাক হতে হয় এই ভেবে যে, প্যাটেল ও রাজেন্দ্র প্রসাদের মতো চরম সাম্প্রদায়িক ব্যক্তিরা যে রাজনৈতিক দলের উচ্চতম পর্যায়ের নেতা ছিলেন, সেই দলকে কিভাবে অসাম্প্রদায়িক আখ্যা দেয়া হতো!

১৯৪৭ সালের আগস্ট মাসে স্বাধীনতার ঠিক পূর্বমুহূর্তে রাজেন্দ্রপ্রসাদ নেহেরুকে এক চিঠি দিয়ে জোর দাবি জানান ভারতে অবিলম্বে গো হত্যা বন্ধের!

কংগ্রেস ১৮৮৫ সালে তার প্রথমদিকে একটি অসাম্প্রদায়িক দল হলেও পরে তা পরিণত হয় একটি সাম্প্রদায়িক দলে এবং তিরিশের দশকের শেষে, বিশেষত চল্লিশের দশকে পরিণত হয় পুরোপুরি একটি সাম্প্রদায়িক দলে। এর দৃষ্টান্ত শত শত, হাজার হাজার। কংগ্রেসের এই সাম্প্রদায়িকতার প্রধান মুখপাত্র হিসেবে কাজ করেন উপরে উল্লেখিত কংগ্রেস নেতারা।

প্যাটেল আবার ছিলেন এদের মধ্যে প্রভাবের দিক দিয়ে এবং কর্মকাণ্ডে সব থেকে উল্লেখযোগ্য। কংগ্রেস ও সর্দার প্যাটেল যে কী ধরনের সাম্প্রদায়িক ছিলেন তার ফল স্বয়ং মৌলানা আবুল কালাম আজাদ তার স্মৃতিকথা India Wins Fredom-এ লিখে গেছেন। তার থেকে এখানে একটি উদ্ধৃতি অপ্রাসঙ্গিক হবে না।

১৯৪৬ সালের নির্বাচনের পরবর্তী এক ঘটনা সম্পর্কে মৌলানা আজাদ লেখেন, ‘The Congress had grown as a national organisation and given the opportunity of leadership to men of different communities. Thus in Bombay Mr. Nariman was the acknowledged leader of the local Congress. When the question of forming the provincial government arose, there was general expectation that Mr. Nariman would be … the chief minister while the majority of members in the Congress Assembly Party were Hindus. Sardar Patel and his colleges could not reconcile themselves to such a position and felt that it would be unfair to the Hindus supporters of the Congress to deprive them of this honour. Accordingly for B. G. Kher was brought into the picture and elected leader of the Congress Assembly Party in Bombay (India Wins Freedom, Abul Kalam Ayad, Orient Black Swan, P. 16).

এই হলেন ‘অসাম্প্রদায়িক’ কংগ্রেস নেতা সর্দার প্যাটেল ও তার সাঙ্গপাঙ্গরা! বস্তুতপক্ষে এরাই কংগ্রেসের নীতিনির্ধারণ করতেন যার সঙ্গে গান্ধী, নেহেরুর মতো নেতারা সম্পর্কিত ছিলেন।

কিন্তু শুধু বোম্বের এই ঘটনার মধ্যেই নয়, অন্যত্রও প্যাটেলের চরম সাম্প্রদায়িকতা এবং দেশভাগের ক্ষেত্রে তার ভূমিকা অর্থাৎ ভারতের অখণ্ডতা ভেঙে দেয়ার ক্ষেত্রে তার ভূমিকার কথা মৌলানা আজাদ উল্লেখ করেছেন, যদিও কংগ্রেস তাদের ঘোষণা অনুযায়ী ছিল অখণ্ড ভারতের পক্ষে।

ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক প্রণীত ভারত বিভাগের পরিকল্পনা কার্যকর করার জন্য তারা লর্ড মাউন্ট ব্যাটেনকে ভারতে পাঠায় ১৯৪৭ সালের ফেব্র“য়ারিতে। তারপর কংগ্রেসের মধ্যে যেসব ঘটনা ঘটেছিল তার অনেক উদাহরণ মৌলানা আজাদের উপরোক্ত বইটিতে আছে। তার থেকে আরও দু-একটি উদ্ধৃতি নিলেই বিষয়টি আরও পরিষ্কার হবে। এ ক্ষেত্রে প্যাটেল সম্পর্কে তিনি লিখেছেন,

In fact, Sardar Patel was fifty per cent in favour of partition even before Lord Mountbatten appeared on the scene. He was convinced that he could not work with the Muslim League. He openly said that he was prepared to have a part of India if only he could get rid of the Muslim League. It would not perhaps be unfair to say that Yallabhbhai Patel was the founder of Indian partition.’ (India Wins Freedom, Abul Kalam Ayad, Orient Black Swan, P.198).

ওই এই নয়, প্যাটেল সম্পর্কে তিনি আরও বলেছেন, ‘I found that patel was so much in favour of partition that he was hardly prepared to listen to aû other point of viwe … I was surprised and pained when Patel in imply said that whether we liked it or not there were two nations in India … I was surprised that Patel was nwo an even greater supporter of the two nation theory than Jinnah. Jinnah may have raised the flag of partition but nwo the real flag bearer was Patel’ (India Wins Freedom, Abul Kalam Ayad, Orient Black Swan, P. 200-201).

এই হল আসল সর্দার প্যাটেল। চরম সাম্প্রদায়িক ভারতকে দ্বিখণ্ডিত করার নায়ক। তবে শুধু প্যাটেলকে এ ক্ষেত্রে দোষারোপ করা ঠিক নয়। তিরিশ ও চল্লিশের দশকে কংগ্রেস উচ্চবর্ণ হিন্দুদের, যারা মাড়োয়ারি বড় পুঁজির রাজনৈতিক প্রতিনিধিতে পরিণত হয়ে দাঁড়িয়েছিল, একটি সাম্প্রদায়িক দলে। সর্দার প্যাটেল ছিলেন এই সাম্প্রদায়িক দলের সব থেকে উচ্চবর্ণ নেতা।

এহেন সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলকে ভারতের অখণ্ডতার প্রতিমূর্তি হিসেবে প্রচার করে তার মূর্তি বানিয়ে তার নামকরণ করা হয়েছে ‘স্টাচু অব ইউনিটি’ বা ঐক্যের মূর্তি! এর চেয়ে ঐতিহাসিক মিথ্যা আর কিছু হতে পারে না। এর থেকে প্রমাণিত হয় যে, প্রকৃতপক্ষে সর্দার প্যাটেল ছিলেন কংগ্রেসের মধ্যে আরএসএসেরই আদর্শের এক অঘোষিত অনুসারী। ঘাপটি মেরে থাকা রাজনৈতিক নেতা।
০৪.১১.২০১৮
(যুগান্তর)
বদরুদ্দীন উমর : সভাপতি, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
দয়া করে আপনার নাম লিখুন