মাদরাসা শিক্ষায় বৈষম্য

বিজ্ঞাপন দিতে যোগাযোগ করুন, ০১৭৭৬৭৮৫৪৭৮, ০১৯৬৭৯৭৯০৯৩

যুবায়ের আহমাদ

স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে স্বাধীনতার মহান স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশ মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড প্রতিষ্ঠার যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি তৎকালীন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ‘আরবি ও ইসলামী শিক্ষা’ বিভাগ থেকে ‘আরবি’ ও ‘ইসলামী শিক্ষা’ আলাদা আলাদা বিভাগ করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ইসলামী শিক্ষা সম্প্রসারিত করেছিলেন। বঙ্গবন্ধুকন্যা ও বর্তমান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আমলেও মাদরাসা শিক্ষার উন্নয়ন হয়েছে। সংসদে আইন পাস করে কওমি মাদরাসা সনদের স্বীকৃতির বিশাল কাজটি তাঁর দ্বারাই সম্পন্ন হয়েছে। তাঁর হাত ধরেই ২০১০ সালে দেশের ৩১টি মাদরাসায় পাঁচটি বিষয়ে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুষ্টিয়া) অধীনে অনার্স কোর্স চালু হয়েছে। পরবর্তী সময়ে আরো বেশ কিছু মাদরাসায় অনার্স চালু হয়েছে। ২০১৩ সালে সংসদে আইন পাস করে ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে এ দেশের ধর্মপ্রাণ মানুষের শত শত বছরের চাওয়াকে পাওয়াতে পরিণত করার সাহসী কাজটি তিনিই করেছেন। আলিম (উচ্চ মাধ্যমিক) মাদরাসার অধ্যক্ষের বেতন স্কেল ছিল উচ্চ মাধ্যমিক কলেজের অধ্যক্ষের এক গ্রেড নিচে। এ বৈষম্য নিরসন হয়েছে এ সরকারের আমলে। যুগের পর যুগ ধরে বঞ্চিত স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদরাসা শিক্ষকদের জাতীয় বেতন স্কেলে অন্তর্ভুক্তকরণ ও প্রাথমিক পর্যায়ের মাদরাসা (আলিয়া) শিক্ষার সমস্যা সমাধানে ‘স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদরাসা স্থাপন, স্বীকৃতি, পরিচালনা, জনবল কাঠামো এবং বেতন-ভাতাদি/অনুদানসংক্রান্ত নীতিমালা-২০১৮’ প্রণয়ন করে এ শিক্ষকদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সমমর্যাদা প্রদান করা হয়েছে। এক হাজার ৬৮১টি মাদরাসার অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে ছয় হাজার কোটি টাকা। অনেক বৈষম্য নিরসন করা হলেও বেশ কিছু বৈষম্য রয়ে গেছে এখনো।

মাদরাসা ও সাধারণ ধারার মধ্যে বৈষম্যের জায়গাটি হলো উপবৃত্তি। ২০১৮ সালের প্রাথমিক ও ইবতেদায়ি সমাপনী পরীক্ষার হিসাবে দেখা যায়, দেশের প্রাথমিক স্তরের মোট শিক্ষার্থীর ১০.৩৫ শতাংশ ইবতেদায়ি মাদরাসায় (আলিয়া) পড়ে (অবশ্য কওমি মাদরাসার শিক্ষার্থীদের যোগ করলে মাদরাসায় পড়ুয়া শিক্ষার্থীর হার দাঁড়াবে অন্তত মোট শিক্ষার্থীর ২০ শতাংশ)। অত্যন্ত দুঃখজনক হলো, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা উপবৃত্তি পেলেও ইবতেদায়ি মাদরাসার শিক্ষার্থীরা এখনো উপবৃত্তি থেকে বঞ্চিত। একাধিকবার ঘোষণা করে শিক্ষার্থীদের তথ্য চাওয়া হলেও এখনো তাদের উপবৃত্তিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। ফলে ইবতেদায়ি (প্রাথমিক) স্তরে মাদরাসায় শিক্ষার্থী কমছে। মাদরাসায় পড়ানোর ইচ্ছা থাকলেও দরিদ্র পরিবারের অনেক অভিভাবক তাঁদের সন্তানদের উপবৃত্তির জন্য স্কুলে দিচ্ছেন। এ ছাড়া দারিদ্র্যপীড়িত এলাকায় রয়েছে স্কুল ফিডিং প্রকল্প। মাদরাসা এতেও পিছিয়ে। এতে করে মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থায় নিচের স্তরে শিক্ষার্থী কম থাকার প্রভাব ওপরের স্তরগুলোতে (দাখিল-কামিল) গিয়ে মারাত্মকভাবে পড়ছে। ইবতেদায়ি মাদরাসায় পড়তে আসা এ শিক্ষার্থীরাও তো আমাদের দেশেরই সন্তান। তারা কেন উপবৃত্তি থেকে বঞ্চিত হবে?

টেকসই উন্নয়ন বা Sustainable Development-এর জন্য প্রয়োজন মানসম্মত শিক্ষা। আর মানসম্মত শিক্ষার জন্য প্রয়োজন শিক্ষক প্রশিক্ষণ। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের জন্য দেশে অন্তত ৫৬টি প্রাইমারি টিচার্স ট্রেনিং ইনস্টিটিউট থাকলেও সারা দেশে প্রাথমিক (ইবতেদায়ি) থেকে কামিল (মাস্টার্স) মাদরাসা শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের জন্য মাত্র একটি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট। গাজীপুরের বোর্ড বাজারে অবস্থিত বাংলাদেশ মাদরাসা শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট। সাধারণ শিক্ষা ধারায় শুধু প্রাথমিক স্তরের জন্য প্রতি জেলায় অন্তত একটি করে প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট আর এর বিপরীতে সারা দেশের মাদরাসাগুলোর প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক, স্নাতক ও স্নাতকোত্তরের শিক্ষকদের জন্য মাত্র একটি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট। ফলে যথাযথ প্রশিক্ষণের অভাবে মাদরাসা শিক্ষকদের মানোন্নয়ন কম হচ্ছে। মাদরাসার গণিত, বাংলা ও ইংরেজির মতো সাধারণ বিষয়গুলোর শিক্ষকদের জন্য মাধ্যমিক স্কুলের শিক্ষকদের সঙ্গে প্রশিক্ষণ গ্রহণে সুযোগ দেওয়ায় সাধারণ বিষয়গুলোর শিক্ষকরা মোটামুটিভাবে প্রশিক্ষণের সুযোগ পেলেও কোরআন-হাদিস ও আরবি সাবজেকটগুলোর শিক্ষকরা এ দিক থেকে একেবারেই পিছিয়ে থাকছেন। এ সংকট নিরসনে প্রতিটি বিভাগে অন্তত একটি করে মাদরাসা শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট স্থাপন ও সাধারণ শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটগুলোতে মাদরাসা বিভাগ চালু করে আরবি, কোরআন-হাদিস ও আকাইদ বিষয়ক প্রশিক্ষক নিয়োগ দিয়ে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ গ্রহণের সুযোগ করে দেওয়া একান্ত প্রয়োজন হয়ে পড়েছে।

দেশের প্রায় সব প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জন্য একই ডিজাইনের ভবন আছে। ইদানীং সব প্রাথমিক বিদ্যালয়ে একই ধরনে সীমানা দেয়াল এবং গেট নির্মাণ করতে দেখা যাচ্ছে। কিন্তু প্রাথমিক স্তরের (স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি) মাদরাসাগুলোর ভবন ও ফটক কিছুই নেই। ফলে অনেক ইবতেদায়ি মাদরাসায় এখনো ভাঙা টিনের ঘরে পাঠদান চলে। বৈষম্য দেখেই বড় হচ্ছে মাদরাসার শিশুরা। ইবতেদায়ি শিক্ষকদের প্রাথমিকের সমমর্যাদা দিয়ে জাতীয় বেতন স্কেলে অন্তর্ভুক্তকরণে সরকার যে উদ্যোগ নিয়েছে, এর পাশাপাশি স্বীকৃতিপ্রাপ্ত সব ইবতেদায়ি মাদরাসাকে এমপিওভুক্ত করে বেতন-ভাতা পাওয়ার সুযোগ দান এবং প্রাথমিক স্তরের এসব মাদরাসার অবকাঠামোগত নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় বরাদ্দ দিয়ে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মতো দৃষ্টিনন্দন ভবন নির্মাণ করে পর্যায়ক্রমে রেজিস্টার্ড প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো জাতীয়করণের মতো স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদরাসাগুলোকেও জাতীয়করণের আওতায় না আনলে প্রাথমিক শিক্ষায় বৈষম্য থেকেই যাবে।

শিক্ষকদের বেতন স্কেলেও কিছুটা বৈষম্য রয়েছে। একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক (ইসলাম শিক্ষা) পদের প্রারম্ভিক বেতন স্কেল হলো ১২ হাজার ৫০০ টাকা (১১তম গ্রেড)। এ পদের ন্যূনতম যোগ্যতা হলো ফাজিল পাস। কিন্তু এ শিক্ষক যদি কামিল পাস হন, তাহলে তিনি উচ্চতর স্কেল (অন্য বিষয়ে বিএড স্কেলের সমান ১০ম গ্রেডে) ১৬ হাজার টাকা পান। স্কুলের ক্ষেত্রে ফাজিলের স্থলে কামিল পাস হলে সে শিক্ষককে বিএড স্কেলে বেতন দেওয়া হলেও একই যোগ্যতাধারী মাদরাসার দাখিল স্তরের সহকারী মৌলভি সে স্কেল পান না। এ বৈষম্য রোধে আদালত একটি নির্দেশনা জারি করলেও তা এখনো কার্যকর করা হয়নি। ফলে হাজার হাজার শিক্ষক এ বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন।

জাতীয়করণের ক্ষেত্রে চরম বৈষম্যের শিকার মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থা। বর্তমান সরকারের আমলে শিক্ষাক্ষেত্রে ঈর্ষণীয় সাফল্যের একটি হলো জাতীয়করণ। কিন্তু দুঃখজনক হলো, তিন শতাধিক মাধ্যমিক বিদ্যালয় সরকারি করা হলেও একটি দাখিল মাদরাসাও সরকারি করা হয়নি। প্রায় ৩০০ কলেজ সরকারি করা হলেও একটি কামিল মাদরাসাও সরকারি করা হয়নি। অথচ মাদরাসা শিক্ষার্থীরা ভালো ফল করছে। ঢাবিসহ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় বারবার প্রথম হওয়ার গৌরব অর্জন করছে। বিসিএস করে বিভিন্ন বিভাগে সাফল্যের সঙ্গে কাজ করছে। তাদের মধ্যে মাদকাসক্তের পরিমাণ প্রায় শূন্যের কোঠায়। ধর্মীয় মূল্যবোধ নিয়ে গড়ে ওঠায় মাদরাসা শিক্ষিতদের মধ্যে দুর্নীতির প্রবণতা তুলনামূলক অনেক কম। এ আদর্শ মানুষ তৈরির সফল কারিগর মাদরাসা শিক্ষকরা যুগ যুগ ধরে জাতীয়করণের স্বপ্ন দেখে এখন তাঁরা রীতিমতো হতাশ। প্রথম শ্রেণিতে কামিল পাস একজন শিক্ষক দাখিল মাদরাসায় চাকরি করছেন, তাঁর চাকরি সরকারি হয়নি। অথচ তাঁরই এক বন্ধু দ্বিতীয় বিভাগে কামিল পাস করে হাই স্কুলে ধর্মীয় শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেছিলেন। তাঁর চাকরি এখন সরকারি হয়েছে। ঢাবি থেকে ভালো রেজাল্ট করে ইংরেজিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পাস করে একজন একটি কামিল মাদরাসায় ইংরেজি প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেছিলেন। তাঁর মাদরাসা জাতীয়করণ না হওয়ায় তাঁর চাকরি সরকরি হয়নি। অথচ তার চেয়ে রেজাল্টে পিছিয়ে থাকা তাঁরই এক বন্ধু ঢাবির ইংরেজি বিভাগ থেকে পাস করে একটি কলেজে প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেছিলেন। ওই বন্ধুর কলেজ সরকারি হওয়ায় তাঁর চাকরি সরকারি হয়েছে। প্রথম বন্ধুটি অবসর গ্রহণের পর হয়ে যাবেন বোঝা আর দ্বিতীয় বন্ধু অবসর গ্রহণের পরও সরকারি বেতন-ভাতা পাবেন। জাতীয়করণের আশা না থাকায় মাদরাসায় শিক্ষকতা করতে মেধাবীরা অনাগ্রহী হয়ে পড়বেন—এমনটিই স্বাভাবিক। আনুপাতিক হারে জাতীয়করণ না করা হলে এবং বৈষম্যের এ ধারা চলতে থাকলে ভালো মেধাবীরা মাদরাসায় চাকরি করতে আসবেন না। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত ধরেই মাদরাসা শিক্ষার এসব বৈষম্যের অবসান হবে; জাতীয়করণ হবে মাদরাসা শিক্ষাও—এমনটিই আশা এ দেশের কোটি ধর্মপ্রাণ মানুষের।

লেখক : কলামিস্ট, গবেষক; নির্বাহী সম্পাদক, ডেইলি ইসলাম বিডি

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
দয়া করে আপনার নাম লিখুন