শায়খুল হাদিস (রহ.) : জীবন-কর্ম ও অবদান

মাওলানা মুহাম্মাদ মামুনুল হক

জন্ম ও শৈশব
শায়খুল হাদিস আজিজুল হক (রহ.) আনুমানিক ১৯১৯ ঈসায়ী সালে বিক্রমপুর (মুন্সিগঞ্জ) জেলার ভিরিচ খা অঞ্চলে জন্মগ্রহণ করেন। পিতার নাম হাজী এরশাদ আলী। জীবনের শুরুতেই মাত্র ৪/৫ বছর বয়সে তিনি মাকে হারান। এরপর নানীর কাছে লালিত পালিত হন। তাঁর মাতুলালয় ছিল একই জেলার কলমা অঞ্চলে। এই সুবাদে শৈশবের কিছুটা সময় তাঁর এখানেই কেটেছে। এরপর ৭/৮ বছর বয়সে নিজ জেলা ছেড়ে বি.বাড়িয়া শহরে চলে আসেন। কারণ তাঁর শ্রদ্ধেয় পিতা হাজী এরশাদ আলী (রহ.) তখন ব্যবসার কাজে সেখানেই অবস্থান করতেন। বাংলাদেশের তিনজন শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তি সে সময় বি.বাড়িয়ায় ছিলেন। তাঁরা হলেন-হযরত মাওলানা শামসুল হক ফরিদপুরী (রহ.), হযরত মাওলানা মুহাম্মাদুল্লাহ হাফেজ্জী হুজুর (রহ.) ও হযরত মাওলানা আবদুল ওয়াহহাব পীরজী হুজুর (রহ.)। তিনজনের সাথেই হাজী এরশাদ আলী সাহেবের গভীর ভক্তির সম্পর্ক ছিল। তাই তিনি তাঁর সৌভাগ্যপুত্রকে হযরত আল্লামা শামসুল হক ফরিদপুরী (রহ.)-এর বিশেষ তত্ত্বাবধানে অর্পণ করেন।

শিক্ষার সূচনা ও জ্ঞান অর্জন
নানাবাড়ি কলমা এলাকার স্থানীয় মসজিদেই হযরত শায়খুল হাদিস (রহ.)-এর লেখাপড়ার সূচনা হয়। সেখানে তিনি কোরআন মাজিদের নাজেরা সমাপ্ত করেন। এরপর আল্লামা শামসুল হক ফরিদপুরী রহ.-এর বিশেষ নেগরানিতে জামিআ ইউনুসিয়ায় আরবি শিক্ষা শুরু হয়। শায়খুল হাদিস রহ.-এর বড় সৌভাগ্য ও তাঁর প্রতি আল্লাহ তাআলার বড় অনুগ্রহ এই যে, শিক্ষাজীবনের সূচনা থেকেই তিনি হযরত শামসুল হক ফরিদপুরী (রহ.)-এর মতো শায়খ ও মুরবিবর সাহচর্য ও তত্ত্বাবধান লাভ করেছেন। যিনি ছিলেন ছাত্রদের তালিম ও তরবিয়তের বিষয়ে এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এমনকি হযরত ফরিদপুরী (রহ.)-এর জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত শায়খুল হাদিস (রহ.) তাঁর স্নেহের ছায়ায় থাকার সৌভাগ্য লাভ করেছেন। প্রাতিষ্ঠানিক ছাত্রজীবন সমাপ্ত হওয়ার পরও দীর্ঘ সময় তিনি তাঁরই তত্ত্বাবধানে তারাক্কির মঞ্জিলসমূহ অতিক্রম করতে থাকেন।

জামিআ ইউনুসিয়ায় ছাত্র থাকাকালে
বিভিন্ন কারণে হযরত ফরিদপুরী (রহ.) জামিআ ইউনুসিয়া থেকে পৃথক হয়ে যান এবং তাঁর দুই সহকর্মী হযরত হাফেজ্জী হুজুর ও হযরত আবদুল ওয়াহহাব পীরজী হুজুর (রহ.) কে নিয়ে ঢাকায় চলে আসেন। এখানে তিনি বড় কাটারায় আশরাফুল উলূম নামে একটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন।

শায়খুল হাদিস রাহ. যেহেতু মূলত হযরত আল্লামা ফরিদপুরী (রহ.)-এর শাগরিদ ছিলেন এজন্য তিনিও আশরাফুল উলূম মাদরাসায় চলে আসেন এবং এখানেই দাওরায়ে হাদীস সমাপ্ত করেন। হযরত ফরিদপুরী (রহ.) ছাড়াও তিনি এখানে আল্লামা রফীক আহমদ কাশ্মিরী রাহ.-এর বিশেষ সান্নিধ্য লাভ করেন।

শায়খুল ইসলাম যফর আহমদ উসমানি (রহ.) তখন ঢাকায় থাকতেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা আলিয়া মাদরাসা ছাড়াও তিনি আশরাফুল উলুম মাদরাসার শায়খুল হাদিস ও সদরুল মুদাররিসীন ছিলেন। এর সুবাদে ১৯৪০-৪১ ঈসায়ী সালে শায়খুল হাদিস (রহ.) তাঁর নিকট তাফসীরে বায়যাবী, জামে তিরমিযী ও সহিহ বুখারি পড়ার সৌভাগ্য অর্জন করেন।

জামিআ ইসলামিয়া তালীমুদ্দীন ডাভেল
আশরাফুল উলূম মাদরাসা বড় কাটারায় দাওরায়ে হাদিসের বছর শায়খুল হাদিস (রহ.) যেসব কিতাব ও শরাহ মুতালাআ করেছেন তার মধ্যে ‘ফাতহুল মুলহিম’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এ কিতাব অধ্যয়নের সময়ই তিনি শায়খুল ইসলাম আল্লামা শাব্বির আহমদ উসমানি (রহ.)-এর ভক্ত হয়ে যান। তাঁর নিকট দ্বিতীয়বারের মতো সহিহ বুখারী পড়ার ইচ্ছা তীব্র হয়ে ওঠে। আল্লামা উসমানী (রহ.) তখন জামিআ ইসলামিয়া ডাভেলে ছিলেন এবং সেখানেই তাঁর বিখ্যাত দরসে বুখারি হত। তাই শায়খুল হাদিস (রহ.) দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে ডাভেল গেলেন এবং ১৩৬২-৬৩ হিজরীতে আল্লামা উসমানি (রহ.)-এর নিকট বুখারি পড়ার গৌরব অর্জন করেন।

ডাভেল যাওয়ার পথে মাযাহিরুল উলুম সাহারানপুরে কয়েকদিন অবস্থান করেন। এ সময় হযরত থানভি (রহ.)-এর খলীফা হযরত মাওলানা আসআদুল্লাহ রামপুরী (রহ.)-এর সাথে তাঁর বিশেষ সম্পর্ক গড়ে ওঠে এবং হযরত তাকে মুসালসালাতের ইজাযতও প্রদান করেন।

দারুল উলুম দেওবন্দে দাওরায়ে তাফসিরে অংশগ্রহণ
আল্লামা শাব্বির আহমদ উসমানি (রহ.)-এর নিকট বুখারি শরিফ পড়ার সময় শায়খুল হাদিস (রহ.) তাঁর বুখারির তাকরিরগুলো অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে লিপিবদ্ধ করতেন। বছর শেষ হওয়ার পর লিখিত তাকরিরগুলো পরিষ্কার করে লেখা, উদ্ধৃতিসমূহের নিরীক্ষা ও সম্পাদনার জন্য উসমানী (রহ.) আরো এক বছরের জন্য তাঁকে দেওবন্দে নিজের কাছে রেখে দেন।

অবস্থানের সুবিধার্থে শায়খুল হাদিস (রহ.) দারুল উলুম দেওবন্দের দাওরায়ে তাফসিরে ভর্তি হন। সেখানে তিনি শায়খুত তাফসির আল্লামা ইদরিস কান্ধলভি (রহ.)-এর নিকট পড়ার সৌভাগ্যও লাভ করেন।

একনজরে শায়খুল হাদিস (রহ.)-এর উল্লেখযোগ্য ও বিশেষ উস্তাদ ও শায়খবৃন্দ
১. শায়খুল ইসলাম আল্লামা শাববীর আহমদ উসমানী (রহ.)। ১৩৬২-৬৩ হিজরীতে শায়খুল হাদিস (রহ.) তাঁর নিকট সহীহ বুখারি পড়েন।

২. হযরত আল্লামা যফর আহমদ উসমানি (রহ.)। ১৯৪০-১৯৪১ ঈসায়ী সালে ঢাকার আশরাফুল উলুম বড় কাটারা মাদরাসায় হযরতের নিকট সহীহ বুখারি, জামে তিরমিযি ও তাফসিরে বায়যাবি পড়েছেন।

৩. হযরত মাওলানা শামসুল হক ফরিদপুরী (রহ.) (ছদর ছাহেব হুজুর)। শিক্ষার সূচনা থেকে তাঁর জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তাঁর নিকট বিভিন্ন কিতাব পড়েছেন। এবং তাঁর সার্বক্ষণিক নেগরানি ও তরবিয়তে ছিলেন।

৪. শায়খুত তাফসীর মাওলানা ইদরিস কান্ধলভি (রহ.)। দারুল উলূম দেওবন্দে হযরতের নিকট দাওরায়ে তাফসির করেছেন। শিক্ষাবর্ষ : ১৩৬৩-১৩৬৪ হিজরী।

৫. হযরত মাওলানা মুহাম্মাদুল্লাহ হাফেজ্জী হুজুর (রহ.)। প্রাথমিক স্তর থেকে দাওরায়ে হাদীস পর্যন্ত তাঁর নিকট বিভিন্ন কিতাব পড়েছেন।

৬. হযরত মাওলানা রফীক আহমদ কাশ্মীরী (রহ.)। নাহবেমির জামাত থেকে শরহে জামি জামাত পর্যন্ত বিভিন্ন কিতাব পড়েছেন।

৭. হযরত মাওলানা আসআদুল্লাহ রামপুরী (রহ.)। প্রায় এক মাস হযরতের সোহবতে থাকেন এবং আহাদিসে মুসালসালার ইজাযত লাভ করেন। ১৩৬৩ হিজরী।

৮. মুহাদ্দিসে কাবির হযরত আল্লামা হেদায়াতুল্লাহ (রহ.)। তাঁর নিকট সহীহ মুসলিম ও অন্যান্য কিতাব পড়েছেন।

ছাত্রজীবনের কয়েকটি বিশেষ গুণ ও বৈশিষ্ট্য
গোটা ছাত্রজীবনে শায়খুল হাদিস রাহ.-এর মধ্যে তিনটি বিশেষ গুণ উজ্জলভাবে ছিল। যথা :

ক) অসাধারণ মেধা ও বুদ্ধি।

খ) অক্লান্ত পরিশ্রম ও একাগ্রতা

গ) উস্তাদদের সাথে গভীর সম্পর্ক ও তাদের খেদমত।

এ সকল গুণ ও বৈশিষ্ট্যের কারণে শায়খুল হাদিস (রহ.) তার সকল উস্তাদের নিকট ছিলেন অতি প্রিয়। তিনি তাদের আন্তরিক দোআ লাভ করেছেন

দরসে বুখারির পাশাপাশি অত্যন্ত সুন্দরভাবে হযরত আল্লামা উসমানি (রহ.)-এর বুখারির তাকরিরগুলো লিপিবদ্ধ করা। এরপর প্রায় এক বছর শায়খের সান্নিধ্যে থেকে তার তাবয়িয করা এ সব কিছুই তাঁর মেধা ও প্রত্যুতপন্নমতিত্বের স্পষ্ট সাক্ষর।

এমনিভাবে হযরত যফর আহমদ উসমানি (রহ.)-এর নিকট অধ্যয়নকালে তাঁর জামে তিরমিযির তাকরির (আলোচনা) লিপিবদ্ধ করেন। এছাড়াও ছাত্রজীবনের বিভিন্ন সময়ে বেশ কয়েকটি শরাহ রচনা করেন। যেমন-শরহে মাকামাতে হারিরি, শরহে মিযান ইত্যাদি।

তবে শায়খুল হাদিস (রহ.)-এর আসল বৈশিষ্ট্য হল, এত ইলমি ইসতিদাদ ও মেহনত করার পরও সকল উস্তাদের সাথে তিনি আন্তরিক সম্পর্ক বজায় রেখেছেন এবং মনেপ্রাণে তাদের এমন খেদমত করেছেন, যা এই যুগের তালিবে ইলমের মাঝে বিরল। এ কারণেই তাঁর প্রতি সর্বদা উস্তাদগণের বিশেষ দৃষ্টি ছিল এবং তাদের স্নেহ-মমতা ও আন্তরিক দুআ তিনি লাভ করেছেন। নিম্নে এ ধরনের কয়েকটি ঘটনা উল্লেখ করা প্রাসঙ্গিক মনে হল।

১. হযরত মাওলানা রফিক আহমদ কাশ্মিরি (রহ.) সম্পর্কে শায়খুল হাদিস (রহ.) বলতেন, তিনি মায়ের গর্ভ থেকেই অলি হয়ে এসেছিলেন।

একবার এই উস্তাদ তাকে বললেন, আমি জীবনে মাত্র দুটি দোয়া করেছি এবং আল্লাহ তাআলার নিকট আশাবাদী যে, দোয়া দুটি কবুল হয়েছে। প্রথম দোয়াটি করেছি তোমার ভাইয়ের জন্য। আল্লাহ যেন তাকে আরোগ্য দান করেন। কেননা, তার রোগ দীর্ঘ হলে তোমার পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটবে। আর দ্বিতীয়টি তোমার জন্য। আল্লাহ তাআলা যেন তোমাকে আলিম বানান এবং তোমার দ্বারা দ্বীনের কাজ নেন।

২. দারুল উলূম দেওবন্দের ফয়েয লাভের উদ্দেশ্যে শায়খুল হাদিস (রহ.) জালালাইন জামাত শেষ করে দেওবন্দ যাওয়ার জন্য প্রস্ত্তত হলেন। তার শফিক উস্তাদ যফর আহমদ উসমানি (রহ.)-এর কাছে বিদায় নিতে গেলে তিনি পরিষ্কার বলে দেন, কে বলেছে তুমি দেওবন্দ যাচ্ছ? তোমাকে আমি নিজেই পড়াব। একথা বলে হযরত দাওরায়ে হাদিসের সবকগুলোর পাশাপাশি বায়যাভি শরিফের সবকও নিজের দায়িত্বে নিয়ে নেন।

৩. হযরত মাওলানা আসআদুল্লাহ রামপুরী (রহ.)-এর সান্নিধ্যে শায়খুল হাদিস রাহ. অল্প কয়েকদিন ছিলেন। কিন্তু এত অল্প সময়েই হযরতের সাথে শায়খের এমন আন্তরিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল যে, বিদায়ের সময় হযরত খুব কাঁদলেন এবং বললেন, আরো কোনো আজিজুল হক পাওয়া গেলে আমার কাছে পাঠিয়ে দিও।

৪. জামিআ ইসলামিয়া ডাভেলে অবস্থানকালে একবার হযরত শায়খুল ইসলাম শাব্বির আহমদ উসমানি (রহ.) তাঁকে বললেন, আমি আশাবাদী যে, তোমার দ্বারা বাংলদেশে আমার কিছু কথা প্রচার হবে।

আল্লামা উসমানি (রহ.)-এর সাথে একবার শায়খুল হাদিস (রহ.)-এর শফীক উস্তাদ ও মুরব্বি হযরত আল্লামা শামসুল হক ফরিদপুরী (রহ.)-এর সাক্ষাত হল। তখন তিনি বললেন, ঢাকায় আজিজুল হক নামে আমার এক ছেলে আছে। আপনি কি তাকে চিনেন? জবাবে হযরত ফরিদপুরী (রহ.) অত্যন্ত সাদাসিধেভাবে বললেন, হ্যাঁ, আমরা দুজন একই মাদরাসার মুদাররিস।

৫. এ প্রসঙ্গে হযরত মাওলানা শামসুল হক ফরিদপুরী (রহ.)-এর একটি কথা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি বলতেন, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা যদি জিজ্ঞাসা করেন, কী নিয়ে এসেছ, তাহলে মৌলবি আজিজুল হক ও মৌলবি হেদায়েতুল্লাহকে পেশ করে বলব-এদেরকে নিয়ে এসেছি।

দ্বীনী খেদমতের কয়েকটি দিক
আল্লাহ তাআলা শায়খুল হাদিস (রহ.) কে দেশ, জাতি ও দ্বীনের বিভিন্ন খেদমতের তাওফীক দান করেছেন। এর ফলে তিনি ছিলেন বাংলাদেশের শীর্ষ পর্যায়ের আলেমদের একজন, যাঁদের সবিশেষ অবদান বাংলার কোটি মুসলমানের প্রতি রয়েছে। তবে কয়েকটি বিশেষ অঙ্গন ছিল তাঁর খেদমতের প্রধান ক্ষেত্র। যথা-

ক) দরস ও তাদরিস তথা পঠন-পাঠন।

খ) রচনা ও সংকলন।

গ) দাওয়াত ও ইরশাদ।

ঘ) ইসলামি আন্দোলন ও শরিয়ত প্রতিষ্ঠা এবং আল্লাহর কালিমাকে সমুন্নত রাখার চেষ্টায় পূর্ণ অংশগ্রহণ ও নেতৃত্ব।

শায়খুল হাদিস (রহ.)-এর এসব খেদমতের বিস্তারিত বিবরণের জন্য একটি আলাদা দীর্ঘ গ্রন্থ রচনার প্রয়োজন। এখানে অতি সংক্ষেপে উপরোক্ত বিষয় সম্পর্কে কিঞ্চিত আলোচনা করা হল।

১। দরস-তাদরিস ও মাদরাসা প্রতিষ্ঠা

প্রাতিষ্ঠানিক ছাত্রজীবন শেষে ১৩৬৪ হিজরি, মোতাবেক ১৯৪৪ ঈসায়ি সালে ঢাকা আশরাফুল উলূম বড় কাটারা মাদরাসায় শায়খুল হাদিস (রহ.) কে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এর ২ দুই বছর আগে শায়খুল হাদিস (রহ.) এই মাদরাসা থেকেই শিক্ষা সমাপন করেছিলেন। আকাবির ওলামা ও আসাতিযা থাকা সত্ত্বেও তাঁকে উঁচু স্তরের কিতাব দেওয়া হয়। তিনি এখানে ৮ বছর তাদরিসের দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৫২ সালে হযরত আল্লামা শামসুল হক ফরিদপুরী (রহ.) ঢাকার প্রসিদ্ধ লালবাগ এলাকায় ‘জামিআ কুরআনিয়া আরাবিয়া লালবাগ’ নামে একটি বিরাট মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন। অল্প সময়ে মাদরাসাটি খুব প্রসিদ্ধি ও মাকবুলিয়ত লাভ করে। হযরত শায়খুল হাদীস (রহ.) তখন এই জামিআয় চলে আসেন। এখানে ১৯৫৫ সালে তার উপর বুখারির দরসদানের দায়িত্ব অর্পণ করা হয়। ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত তিনি শায়খুল হাদিস হিসেবে বুখারি শরিফ ও অন্যান্য কিতাবের দরস দিতে থাকেন। একই সময়ে ঢাকার অপর প্রসিদ্ধ দ্বীনী প্রতিষ্ঠান জামিআ ইসলামিয়া তাতিবাজার ইসলামপুরেও শায়খুল হাদিস (রহ.) তাদরিসের খেদমত আঞ্জাম দেন। ১৯৬৫ সালে হযরত মাওলানা হাফেজ্জী হুজুর (রহ.)-এর প্রতিষ্ঠিত মাদরাসা নূরিয়া ঢাকায় দাওরায়ে হাদিসের জামাত শুরু হলে দরসে বুখারির জন্য হযরতকেই আমন্ত্রণ জানানো হয় এবং তিনি তা সাদরে গ্রহণ করেন। এছাড়াও তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কয়েক বছর বুখারি শরিফের দরস দিয়েছেন।

১৯৬৫ সালে হযরত ফরিদপুরী (রহ.) ইন্তেকাল করেন। শায়খুল হাদিস (রহ.) তখনও জামিআ কুরআনিয়া আরাবিয়া লালবাগেই তাদরিসের দায়িত্ব পালন করছিলেন। কিন্তু কিছুদিন পর বিভিন্ন কারণে সেখান থেকে পৃথক হয়ে যান। এরপর ১৯৮৬ সালে ঢাকার পশ্চিমে মুহাম্মদপুরে ‘জামিআ মুহাম্মদিয়া আরাবিয়া’ নামে একটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করে সেখানে বুখারী শরীফের দরস প্রদান করেন। এর দুই বছর পর জামিআটি একই এলাকার ঐতিহাসিক সাত মসজিদের পাশে নিজস্ব জমিতে স্থানান্তরিত হয়। এ সময় এর নামে কিছুটা পরিবর্তন এনে ‘জামিআ রাহমানিয়া আরাবিয়া মুহাম্মদপুর’ নাম রাখা হয়। ১৯৮৮ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত এই জামিআই ছিল শায়খুল হাদীস (রহ.)-এর দরসে বুখারি ও অন্যান্য তাদরিসি খেদমতের প্রধান কেন্দ্র। তবে তলাবাদের আগ্রহ ও অনুরোধে তিনি ঢাকার কয়েকটি বড় মাদরাসায়ও শায়খুল হাদিসের দায়িত্ব পালন করেন এবং বুখারীর উল্লেখযোগ্য পরিমাণ দরস প্রদান করেন। এর পাশাপাশি ঢাকার বাইরেও বিভিন্ন মাদরাসার ছাত্ররাও বুখারি শরীফের প্রথম কয়েকটি পারা তাঁর নিকট পড়ার সৌভাগ্য লাভ করেন।

জামিআ রাহমানিয়া আরাবিয়া ছাড়াও শায়খুল হাদিস (রহ.) যেসব মাদরাসায় বুখারি শরীফের সবক পড়িয়েছেন সেগুলো হল, জামিআ শরইয়্যাহ মালিবাগ ঢাকা, মাদরাসা দারুস সালাম মিরপুর ঢাকা, জামিআ ইসলামিয়া লালমাটিয়া ঢাকা, জামেউল উলূম মিরপুর-১৪ ঢাকা।

শায়খুল হাদিস (রহ.) ও দরসে বুখারি

শায়খুল হাদিস (রহ.) তাঁর দীর্ঘ শিক্ষকজীবনে বিভিন্ন শাস্ত্রের অনেক কিতাবের দরস দিয়েছেন। যার মধ্যে কুরআন মজিদের তরজমা ও তাফসির এবং হাদিসের কিতাবসমূহ, মানতিক, নাহু, সরফ, আরবি সাহিত্য, ফিকহ, উসূলে ফিকহ অন্তর্ভুক্ত। তবে আল্লাহ তাআলা তাঁকে বিশেষভাবে বুখারি শরিফের দরস ও এর খেদমতের জন্য মনোনীত করেছিলেন। এ কারণে ১৯৫৫ সাল থেকে ২০১০ পর্যন্ত অর্ধ শতাব্দীরও বেশি সময় তিনি এই কিতাবের সফল দরস দিয়েছেন। আর তাঁর এই দরস এতই সমাদৃত ছিল যে, বাংলাদেশে এর কোনো নজির খুঁজে পাওয়া যায় না। এ কারণেই তাঁর শিক্ষকজীবনের প্রায় শেষ বিশ বছর বিভিন্ন মাদরাসা থেকে বুখারি শরিফ পড়ানোর জোর আবেদন আসতে থাকে। এজন্য প্রতিদিন ৪/৫ মাদরাসায় তাঁকে বুখারি পড়াতে হত। ফলে তাঁর নিকট শুধু বুখারি শরিফ পড়েছে-এমন তালিবে ইলমের সংখ্যাও প্রায় ৫ হাজার পৌঁছে গেছে।

এখানে এ কথাটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, শায়খুল হাদীস (রহ.) ছাত্রজীবনেই আল্লামা উসমানি (রহ.)-এর বুখারি শরিফের তাকরির লিপিবদ্ধ করে কিতাবটির এক মূল্যবান উর্দু শরাহ প্রস্ত্তত করে ফেলেন। আর কর্মজীবনে প্রবেশের পর তিনি বাংলা ভাষায় বুখারি শরিফের এমন শরাহ লেখেন, যা এ ভাষায় পূর্ণ বুখারির সর্বপ্রথম শরাহ। যা সবচেয়ে বিশদ ও গ্রহণযোগ্য শরাহ। বৃহৎ দশ খন্ডে তা প্রকাশিত হয়েছে।

সহিহ বুখারির এমন নানামুখী খেদমতের কারণে ‘শায়খুল হাদিস’ উপাধিটি তাঁর নামের এক অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। দেশের মানুষ তাঁকে ‘শায়খুল হাদীস’ উপাধিতেই স্মরণ করে। আর সাধারণভাবে ‘শায়খুল হাদীস’ বললে সকলের মনে তাঁর কথাই ভেসে উঠে।

জামিআতুল আজিজ প্রতিষ্ঠা
আজ থেকে ১০/১২ বছর আগে শায়খুল হাদিস (রহ.) ঢাকার মুহাম্মদপুরে একটি ব্যতিক্রমধর্মী মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর বন্ধু-বান্ধব ও ছাত্রদের ইচ্ছায় এর নাম জামিআতুল আজিজ রাখা হয়। অনেকের দাবি ছিল, তিনি যেন এমন একটি দ্বীনি প্রতিষ্ঠানের ভিত্তি স্থাপন করেন, যাতে মৌলিক দ্বীনি ইলমের পাশাপাশি জাগতিক শিক্ষারও পূর্ণ ব্যবস্থা থাকবে।

যারা নিজের সন্তানকে দ্বীনের মৌলিক শিক্ষার সাথে সাথে দ্বীনী পরিবেশে জাগতিক শিক্ষা দিতে চায় তারা যেন এখানে তাদের সন্তানকে ভর্তি করাতে পারেন। ধীরে ধীরে দাবিটি এত জোরালো হয়ে ওঠে যে, বিষয়টির প্রয়োজনীয়তা শায়খের নিকট স্পষ্ট হয়ে গেল এবং তিনি এতে আগ্রহী হলেন। অবশেষে আল্লাহ তাআলার মেহেরবানিতে জামিআতুল আজিজ প্রতিষ্ঠা লাভ করে। আলহামদুলিল্লাহ, প্রতিষ্ঠানটি তার লক্ষ্য-উদ্দেশ্যের দিকে অগ্রসর হয়ে চলেছে। আল্লাহ তাআলা হযরতের প্রতিষ্ঠিত সকল প্রতিষ্ঠানকে দ্বীনের খেদমতের জন্য কবুল করুন। এগুলোকে সব ধরনের বিপদ ও বিশৃঙ্খলা থেকে নিরাপদ রাখুন এবং তাতে উত্তরোত্তর উন্নতি ও সফলতা দান করুন। আমীন।

২। ছাত্রজীবন ও তরুণ বয়স থেকেই শায়খুল হাদিস (রহ.) রচনা ও গবেষণার প্রতি বেশ আগ্রহী ছিলেন। ছাত্রজীবনেই তিনি কয়েকটি কিতাবের শরাহ লিখে ফেলেন। বুখারী শরীফ ও তিরমিযী শরীফের মতো হাদীসের মৌলিক কিতাবগুলোর উপর তার কাজ সে যুগেরই সাক্ষর।

আশরাফুল উলুম বড় কাটারা মাদরাসায় হযরত মাওলানা যফর আহমদ উসমানি (রহ.)-এর নিকট তিরমিযি শরিফ পড়া অবস্থায় এর শরাহ লেখা শুরু করেন। এই শরাহটি শুধু দরসের তাকরিরের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; হাদিস ও ফিকহের বিভিন্ন কিতাব ও মাসাদিরের মুরাজাআত এবং তা থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ ও সংকলনের প্রতিও গুরুত্ব দিয়েছেন। তবে আফসোসের বিষয় এই কিতাবটি পরিপূর্ণতা পায়নি।

এরপর দ্বিতীয়বারের মতো শায়খুল ইসলাম শাব্বির আহমদ উসমানি (রহ.)-এর নিকট বুখারি শরিফ পড়ার সময় তাঁর তাকরিরগুলো অত্যন্ত পূর্ণতা ও সুন্দরভাবে লিপিবদ্ধ করেন। যার ফলে বুখারির এই শরাহটি পাঠকবৃন্দের সামনে এসেছে।

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা সমাপ্ত করে কর্মজীবনে প্রবেশের পরও রচনা ও সংকলন ছিল হযরতের একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যস্ততা। তবে পরবর্তীতে হযরতের পূর্ণ মনোযোগ বাংলা ভাষায় কাজের প্রতি নিবদ্ধ হয়। যেন বাংলাভাষী কোটি মানুষের জন্য দ্বীনী পঠনসামগ্রী প্রস্তুত হয়। যা থেকে তারা তখনো ছিল প্রায় বঞ্চিত। বাংলার যে সকল আলেম প্রথম এই দ্বীনী প্রয়োজন অত্যন্ত গভীরভাবে অনুধাবন করতে পেরেছিলেন তাদের মধ্যে শায়খের উস্তাদ ও মুরশিদ আল্লামা ফরিদপুরী (রহ.) ছিলেন সবার শীর্ষে। তিনি এই অঙ্গনকে নিজের কর্ম ও মনোযোগের অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র হিসেবে গ্রহণ করেন এবং অনেক বড় খেদমত আঞ্জাম দেন। শায়খুল হাদিস (রহ.) মূলত নিজ শায়খ ও মুরশিদের প্রবর্তিত ধারাকে আরো অগ্রসর করেছেন এবং নিজের খেদমত দ্বারা একে উন্নতির পথে ধাবমান রেখেছেন।

বাংলাভাষীদের জন্য শায়খুল হাদিস রহ.-এর এক মহা উপহার : বুখারি শরিফের বাংলা অনুবাদ ও ভাষ্য

শায়খুল হাদিস (রহ.) একেবারে তরুণ বয়সেই এই কিতাব রচনা শুরু করেন। তখন বাংলাভাষায় শুধু মিশকাতের কয়েকটি খন্ড ছাড়া হাদীসের কোনো মৌলিক কিতাবের অনুবাদ প্রকাশিত হয়নি। আর বাংলাভাষায় কুরআন মজীদের তাফসীর বিষয়েও কোনো বিস্তারিত কিতাবও ছিল না। শায়খুল হাদিস রহ. অত্যন্ত পরিশ্রম ও পূর্ণ একাগ্রতার সাথে দীর্ঘ ১৬ বছর এই কাজে নিমগ্ন থাকেন। প্রথমে এটি সাত খন্ডে প্রকাশিত হয়। কিন্তু পরবর্তী সময়গুলোতে এর পুনঃসম্পাদনা ও পরিবর্তন-পরিবর্ধনের ধারা অব্যাহত থাকায় কিতাবটির কলেবর এত বেড়ে যায় যে, এখন তা বৃহৎ দশ খন্ডে প্রকাশিত হয়েছে। আল্লাহ তাআলা কিতাবটিকে এত গ্রহণযোগ্যতা দান করেছেন যে, বাংলা ভাষায় খুব কম দ্বীনী কিতাবেরই এমন গ্রহণযোগ্যতা আছে।

কিতাবটির কিছু বৈশিষ্ট্য
কিতাবটির একটি বৈশিষ্ট্য হল, সুন্দর উপস্থাপনা। এতে দ্বীনি ও ইলমী জটিল আলোচনা এবং কঠিন মাসআলাগুলো এত সাবলীলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে যে, সাধারণ মানুষও তা থেকে সমান উপকৃত হতে পারে। এর ফলে সাধারণ মানুষ ও জাগতিক শিক্ষায় শিক্ষিত মানুষের দ্বীনী শিক্ষা এবং আহলে সুন্নত ওয়াল জামাতের আকীদা-বিশ্বাস, আকাবিরে দেওবন্দের চিন্তাধারা ও দ্বীনের মৌলিক শিক্ষার প্রচার-প্রসারে বিরাট ভূমিকা পালন করেছে ও করছে।

এর আরো একটি বৈশিষ্ট্য হল, এতে আকীদা-বিশ্বাস, সিরাতে নববিয়্যাহ, ইসলামের ইতিহাস, আত্মার তাযকিয়া ও পরিশুদ্ধি এবং তারগিব ও তারহিব (উৎসাহ ও ভীতি বিষয়ক) হাদিসসমূহের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের প্রতিও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অথচ আরবি ও উর্দু অধিকাংশ ভাষ্যগ্রন্থে ফিকহি অধ্যায়ের হাদিসগুলোর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের প্রতি বেশি জোর দেওয়া হয়।

এছাড়া বুখারিতে যেসব হাদিস তাকরার হয়েছে (একাধিকবার এসেছে) এবং বিভিন্ন স্থানে বিক্ষিপ্তভাবে রয়েছে সেগুলোকে একত্র করে পূর্ণ হাদীসটি একসাথে উল্লেখ করা হয়েছে। এরপর এমনভাবে তার অনুবাদ করা হয়েছে যেন সকল হাদিস নিজ নিজ প্রেক্ষাপট ও লক্ষ্য-উদ্দেশ্যসহ একত্রে উপস্থাপিত হয়ে যায়। এর ফলে এই কিতাবটি ‘ফাহমে হাদিস’ তথা হাদীস অনুধাবনের ক্ষেত্রে বেশ সহযোগী প্রমাণিত হয়েছে।

অন্যান্য রচনা
বুখারি শরিফের অনুবাদ ও ব্যাখ্যার কাজ (একটা পর্যায় পর্যন্ত) পূর্ণ হওয়ার পর শায়খুল হাদিস (রহ.) বাংলায় আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ ও দীর্ঘ গ্রন্থ রচনার কাজ শুরু করেন। যার উদ্দেশ্য ছিল, যাওয়াইদ আলা সহীহিল বুখারি ও যাওয়াইদ আলা কুতুবিস সিত্তাহর অনুবাদ ও ব্যাখ্যা। অর্থাৎ ঐসব হাদীস, যা সহীহ বুখারি ছাড়া কুতুবে সিত্তার অবশিষ্ট পাঁচ কিতাবে আছে। এমনিভাবে মিশকাতে কুতুবে সিত্তাহর বাইরের যেসব হাদিস অতিরিক্ত আছে সেগুলোর অনুবাদ ও ব্যাখ্যা করা। পরিশ্রম ও ধৈর্য্যের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে কিতাবের দুটি খন্ড প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু এর পরে সহীহ বুখারীর ব্যাখ্যাগ্রন্থে আরো ব্যাপক পরিবর্তন ও সংযোজনের কাজে এবং অন্যান্য ব্যস্ততায় তিনি এতই নিমগ্ন হয়ে পড়েন যে, এ কাজ পুনরায় শুরু করাই সম্ভব হয়নি। ফলে কিতাবটি এখনো পূর্ণতার অপেক্ষায় আছে।

এ ছাড়া বিভিন্ন সময় দ্বীনি জরুরতের প্রেক্ষিতে আরো কয়েকটি কিতাব রচনা করেছেন। যার মধ্যে মাওলানা রুমীর মাসনবীর অনুবাদ ও ব্যাখ্যা, কাদিয়ানি মতবাদের খন্ডন, খেলাফত ও মুলুকিয়তের পর্যালোচনা ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

৩। ওয়ায ও ইরশাদ এবং দাওয়াত ও তাবলিগ

দরস-তাদরিস, তালিবে ইলমদের তরবিয়ত এবং রচনা-গবেষণাই ছিল শায়খুল হাদিস (রহ.)-এর প্রধান কাজ ও মূল ব্যস্ততা। কিন্তু চিন্তা ও স্বভাবের প্রশস্ততার কারণে শুধু এতেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখতে পারেননি; বরং দ্বীনি শিক্ষা থেকে বঞ্চিত প্রায় কোটি কোটি সাধারণ মানুষের দ্বীনি জরুরতের প্রতি তাঁর সজাগ দৃষ্টি ছিল। তাদের সেই দ্বীনী প্রয়োজন পূরণের লক্ষ্যে শায়খুল হাদীস (রহ.) তাঁর ইলমী শত ব্যস্ততা সত্ত্বেও জীবনের এক বিরাট অংশ ব্যয় করেছেন। যতদিন তিনি সুস্থ ছিলেন, শরীরে শক্তি ছিল ওয়ায-নসীহত, দাওয়াত-ইরশাদের মাধ্যমে তাদের মাঝে দ্বীনী বোধ সৃষ্টি করেছেন এবং দ্বীনী শিক্ষার প্রসারে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন।

এ লক্ষ্যে শায়খুল হাদিস (রহ.) গোটা দেশেই দ্বীনী ও দাওয়াতী সফর করেছেন এবং সাধারণ মানুষকে দ্বীনি সেবা দান করেছেন। এর দ্বারা হাজার হাজার মানুষের মাঝে পরিবর্তন এসেছে। তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনীত দ্বীন সম্পর্কে পরিচিতি লাভ করেছে এবং সে আলোকে নিজেদের জীবন পরিচালনায় উৎসাহী হয়েছে।

আফসোসের বিষয় এই যে, শায়খুল হাদীস (রহ.)-এর দ্বীনি ও দাওয়াতি এসব মূল্যবান বক্তৃতা-ভাষণ ও ওয়ায-নসিহত নিয়মতান্ত্রিকভাবে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়নি। এর অতি সামান্য অংশেরই রেকর্ড বিদ্যমান আছে, যার এ পর্যন্ত দুটি খন্ড প্রকাশিত হয়েছে। আল্লাহ তাআলার তাওফীকে যদি এই ধারা অব্যাহত থাকে তবে আরো কয়েকটি খন্ড পাঠকবৃন্দের সামনে আসবে ইনশাআল্লাহ।

৪। ইসলামি রাজনীতি এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে শরীয়ত প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা

এই অঙ্গনেও শায়খুল হাদিস (রহ.)-এর খেদমত ও অবদান অনস্বীকার্য। আগেই বলা হয়েছে, ইলম ও তালিবে ইলমের খেদমতই ছিল তাঁর মেহনতের প্রধান অঙ্গন। ‘দ্বীন ধ্বংস হবে আর আমি বসে থাকব’-এর সিদ্দিকি জযবাও তাঁর মাঝে ছিল সদা জাগরুক। এ কারণে ইলমি খেদমতের পাশাপাশি ইসলামি আন্দোলনগুলোতেও স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ করেছেন। বিশেষত রাষ্ট্র বা ধর্মবিদ্বেষী মহল থেকে ছড়ানো ফেতনাগুলোর বলিষ্ঠ মোকাবেলা করেছেন এবং দ্বীন ও ইসলামকে সমুন্নত রাখতে সচেষ্ট থেকেছেন।

পাকিস্তান গঠন-আন্দোলনে তিনি নিজ শায়খ ও মুরশিদ হযরত ফরিদপুরী (রহ.)-এর নেতৃত্বে অংশগ্রহণ করেন। আর পাকিস্তান গঠনের পর হযরত মাওলানা আতহার আলী রাহ. ও শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন আলেম ইসলামী বিধান বাস্তবায়নের জন্য ‘নেজামে ইসলাম পার্টি’ গঠন করলে শায়খুল হাদীস (রহ.) তার নির্বাহী কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন এবং দলের পক্ষে গণমত আদায়ের লক্ষ্যে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সফর করেন।

পাকিস্তানের স্বৈরশাসক জেনারেল আইয়ুব খান কুরআন-সুন্নাহবিরোধী পারিবারিক আইন প্রণয়ন ও কার্যকর করলে গোটা পাকিস্তানে তার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ-বিতর্কের সৃষ্টি হয়। পূর্বপাকিস্তানে হযরত শামসুল হক ফরিদপুরী (রহ.) সাহসিকতার সাথে পূর্ণ শক্তি নিয়ে এর বিরুদ্ধে ময়দানে অবতীর্ণ হন । শায়খুল হাদীস (রহ.)তাঁর শায়খ ও মুরশিদের মূল শক্তি হয়ে এই আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। শুধু এই আন্দোলনই নয়; বরং হযরত ফরিদপুরী (রহ.)-এর মুজাহিদসুলভ নেতৃত্বে যত আন্দোলন হয়েছে তিনি তাতে নিজ শায়খের মুখপাত্র হিসেবে বিরাট ভূমিকা পালন করেছেন।

১৯৭১ সালে পাকিস্তান বিভক্ত হয়ে বাংলাদেশের জন্ম হয়। তখন এদেশে ইসলামকে সমুন্নত রাখতে এবং ইসলাম বিরোধী সকল আক্রমণ প্রতিহত করতে বিভিন্ন কার্যক্রম ও আন্দোলনগুলোতে শায়খুল হাদিস (রহ.) বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেন। এ কারণে তিনি দেশ ও জাতির মহান নেতা ও সিপাহসালারের মর্যাদা লাভ করেন। বাংলাদেশে ওলামায়ে কেরামের প্রথম রাজনৈতিক দল ‘জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ’ গঠিত হলে তিনি এর সভাপতি নির্বাচিত হন। এরপর ১৯৮১ সালে তাঁর শায়খ হযরত মাওলানা হাফেজ্জী হুজুর (রহ.) যখন দেশজুড়ে খেলাফত আলা মিনহাজিন নবুওয়াহর আন্দোলন পরিচালনা করলেন এবং ‘তাহরিকে খেলাফত বাংলাদেশ’ নামে দল গঠন করলেন তখনও শায়খুল হাদিস রাহ. ছিলেন হযরত হাফেজ্জী হুজুর (রহ.)-এর ডানহাত ও মুখপাত্র। সে সময় তিনি স্বপদে থেকে বিরাট অবদান রাখেন। মোটকথা বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর থেকে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত যতদিন সমর্থ ছিলেন ইসলাম ও মুসলমানের সকল জাতীয় ও সম্মিলিত কার্যক্রমে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।

১৯৮২ সালে ইরাক-ইরান যুদ্ধ বন্ধে এবং দুই দেশের মাঝে সমঝোতা করার উদ্দেশ্যে হযরত হাফেজ্জী হুজুর (রহ.) এক ঐতিহাসিক সফরে ইরাক ও ইরান যান। এ সফরে তিনি সাদ্দাম হোসেন ও আয়াতুল্লাহ খোমেনীর সঙ্গে সাক্ষাত করে যুদ্ধের ভয়াবহ ক্ষতি সম্পর্কে সতর্ক করেন এবং সমঝোতার চেষ্টা করেন। এই সফরেও হযরত হাফেজ্জী হুজুর রাহ.-এর মুখপাত্র হিসেবে শায়খুল হাদীস (রহ.) গুরুত্বপূর্ণ খেদমত আঞ্জাম দেন।

১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর হিন্দুস্তানে মুসলমানরা এক চরম বিপদের শিকার হন। সেখানকার উগ্র হিন্দুরা অত্যন্ত নির্মমভাবে ৪শ বছরের পুরানো ‘বাবরী মসজিদ’ শহীদ করে দেয়। এর সাথে মুসলমানদের উপরও শুরু হয় গণহত্যা।

এই ঘটনায় মুসলমানদের অবস্থা কী হয়েছিল-তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। সারা বিশ্বের মুসলমান এর তীব্র প্রতিবাদ করেন এবং এই জুলুম ও বর্বরতার বিরুদ্ধে অত্যন্ত ঘৃণা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন। কিন্তু শায়খুল হাদীস (রহ.)-এর নেতৃত্বে বাংলাদেশের মুসলমান এ সময় যে ভূমিকা রেখেছেন তা ছিল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ঐ ঘটনার বিরুদ্ধে অব্যাহত প্রতিবাদের একপর্যায়ে শায়খুল হাদিস (রহ.) ‘অযোধ্যা’ অভিমুখে লংমার্চের ঘোষণা দেন। ফলে সারা দেশের মুসলমানের মাঝে দ্বীনী গায়রত ও বুগয ফিল্লাহর এক উত্তাল তরঙ্গ সৃষ্টি হয়। ২ জানুয়ারি ১৯৯৩ ঢাকা থেকে শায়খুল হাদীস রাহ.-এর নেতৃত্বে এই ঐতিহাসিক লংমার্চ শুরু হয়। এতে প্রায় এক লক্ষ মুসলমান অংশগ্রহণ করেন। ওলামা-তলাবা, সাধারণ মুসলমান, বৃদ্ধ-যুবক-সব ধরনের মানুষই এতে ছিল। লাখ মুসলিমের এই মিছিল খুলনা পৌঁছার পর সীমান্ত অভিমুখে অগ্রসর হতে থাকে। কিন্তু সীমান্তের কাছাকাছি পৌঁছামাত্র তাদেরকে লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়। এতে দুজন শহীদ হন।

বিশ্বমিডিয়ায় এই ঐতিহাসিক লংমার্চের খবর প্রচার করা হয়। ইসলামি বিশ্বে তাঁর এই কীর্তি অভিনন্দিত হয়। বিশেষ করে এ উপমহাদেশ ও আরব দেশের আলেমগণ শায়খুল হাদিস (রহ.) কে এজন্য মোবারকবাদ জানান। আরবের বিখ্যাত গবেষক ও মুহাদ্দিস শায়খ আবদুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহ (রহ.) তাঁকে ‘আলমুজাহিদুল কাবির’ আখ্যা দেন। শায়খুল হাদিস রাহ.-এর নিকট হাদিয়া পাঠানো তাঁর এক কিতাবে

তিনি লেখেন-

هدية مقدمة إلى الأخ العلامة الجليل والمحدث النبيل والمجاهد الكبير …

উপরে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক অঙ্গনে শায়খুল হাদিস (রহ.)-এর শুধু দুটি অবদানের কথা উল্লেখ করা হল। এছাড়াও দেশের অভ্যন্তরে রাষ্ট্র বা ইসলামবিদ্বেষী মহল থেকে দ্বীনের বিরুদ্ধে কোনো ষড়যন্ত্র হলে, ইসলামের উপর কোনো আঘাত এলে শায়খুল হাদীস (রহ.) বীরত্ব ও সাহসিকতার সাথে তা প্রতিহত করেছেন। এ অপরাধে তাঁকে কয়েকবার কারারুদ্ধ হতে হয়েছে এবং নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছে। কিন্তু শায়খুল হাদীস (রহ.) অত্যন্ত ধৈর্য্যের সাথে কষ্ট সহ্য করে ইউসুফ আ.-এর সুন্নতকে পুনরুজ্জীবিত করেছেন এবং নিজের দৃঢ়তায় কোনো ধরনের চির ধরতে দেননি। আর এসবের পিছনে তাঁর মাঝে যে প্রেরণা সর্বদা জাগরুক ছিল তা হল-‘দ্বীন ধ্বংস হবে আর আমি বসে থাকব?!’

পদবি ও দায়িত্ব
১। শায়খুল হাদিস : জামিআ কুরআনিয়া আরাবিয়া লালবাগ ঢাকা, জামিআ রাহমানিয়া আরাবিয়া মুহাম্মদপুর ঢাকা, জামিআ শরইয়্যাহ মালিবাগ ঢাকা, জামেউল উলুম মিরপুর-১৪ ঢাকা। এছাড়াও আরো কয়েকটি মাদরাসা।

২। মুহতামিম ও সভাপতি : জামিআ রাহমানিয়া আরাবিয়া ঢাকা, জামিআ শরইয়্যাহ মালিবাগ ঢাকা, জামিআতুল আজিজ মুহাম্মদপুর ঢাকা।

৩। খতীব : জাতীয় ঈদগাহ ঢাকা, লালবাগ কেল্লা জামে মসজিদ ঢাকা, আজিমপুর জামে মসজিদ ঢাকা।

৪। কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য : নেজামে ইসলাম পার্টি পাকিস্তান।

৫। সহ-সভাপতি : তাহরিকে খেলাফত বাংলাদেশ।

৬। সভাপতি ও চেয়ারম্যান : জমিয়তে ওলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ, খেলাফত মজলিস বাংলাদেশ ও বেফাকুল জামাআ-তিল ইসলামিয়াহ বাংলাদেশ।

জীবনের শেষ সময়

শায়খুল হাদিস (রহ.) তাঁর জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত ইলম ও দ্বীনের খেদমতের জন্য ওয়াকফ করে রেখেছিলেন। এককথায় বললে তাঁর গোটা জীবন ছিল দ্বীনের জন্য এক অব্যাহত প্রচেষ্টা। আর তাই ফজরের নামাযের পর সকাল সকাল দরস-তাদরীসের জন্য মাদরাসায় উপস্থিত হওয়া এবং প্রায় দুপুর পর্যন্ত বিভিন্ন সবক পড়ানো। এরপর দুপুরে সামান্য সময় কায়লুলার পর রচনা-গবেষণার কাজে ডুবে যাওয়া, আসরের পর রাজনৈতিক ও জাতীয় বিভিন্ন কার্যক্রম ও মুসলমানদের সম্মিলিত কাজে অংশগ্রহণের জন্য ঘর থেকে বের হওয়া। এরপর সাধারণ মুসলমান পর্যন্ত দ্বীনের দাওয়াত পৌঁছানের জন্য দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে সফর করে ওয়ায-নসিহত করা এবং অর্ধ রাতের পর বাসায় ফেরা এবং সামান্য সময় আরাম করা। এরপর ফজরের পর পূর্ণ উদ্যমে বুখারি শরীফের সবক পড়ানো-এ ছিল তাঁর জীবনের এমন রুটিন, যা তিনি বছরের পর বছর মেনে চলেছেন। ইলম ও দ্বীন এবং দেশ ও জাতির কাজে জীবনভর এমন ডুবে ছিলেন যে, স্বস্তির সাথে আরাম করার ফুরসতও তাঁর হয়নি।

এরপর ধীরে ধীরে তিনি বৃদ্ধ হয়ে পড়েন। অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়েন। গায়ে আর বল নেই। অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলোও যেন আর সাড়া দেয় না। স্মরণশক্তিও কমে গেছে। আল্লাহর নাম ছাড়া সবকিছুই তিনি ভুলে গেছেন। মোটকথা, কুদরতই তাকে জীবনভর মেহনত-মুজাহাদার পর এখন বিছানায় শুয়ে থাকতে বাধ্য করেছে। কথাবার্তাও প্রায় বন্ধ। শুধু আল্লাহ নামটাই তাঁর মনে আছে।

অবশেষে ১৯ রমযান ১৪৩৩ হিজরি, মোতাবেক ৮ আগস্ট ২০১২ বুধবার প্রায় ৯৫ বছর বয়সে শায়খুল হাদিস (রহ.) আল্লাহর সান্নিধ্যে চলে যান। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।

জানাযা ও দাফন
২০ রমযান ১৪৩৩ হিজরী, মোতাবেক ৯ আগস্ট বৃহস্পতিবার সকাল ১১ টায় জাতীয় ঈদগাহ ময়দানে শায়খুল হাদিস রাহ.-এর নামাযে জানাযা অনুষ্ঠিত হয়। শায়খের ছাহেবযাদা মাওলানা মাহফুযুল হক নামাযের ইমামতি করেন।

জানাযা শেষে কেরানীগঞ্জের আটিবাজার সংলগ্ন ঘাটারচর পারিবারিক কবরস্থানে শায়খুল হাদীস (রহ.) সমাহিত হন।

[শায়খুল হাদিস (রহ.) সংকলিত ফযলুল বারি শরহে সহীহিল বুখারির ভূমিকা থেকে গৃহীত ও অনূদিত। অনুবাদ : আবদুল্লাহ ফাহাদ]

জেএস/

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
দয়া করে আপনার নাম লিখুন