সফল ব্যক্তিত্ব মাওলানা আতাউর রহমান খান (রহ.)

আতাউর রহমান খান

যুবায়ের আহমাদ

মাওলানা আতাউর রহমান খান (রহ.)। বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী সফল একজন তারকা আলেমের নাম। লেখালেখি থেকে হাদিসের মসনদ, মসজিদের মিম্বার থেকে জাতীয় সংসদ পর্যন্ত ছিল তার সরব পদচারণা।  গণমানুষের হৃদয়ের গভীরে ছিল যার স্থান।

তিনি ১৯৪৩ সালের ১ মার্চ কিশোরগঞ্জ জেলার ইটনা থানার হাতকবিলা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা মাওলানা আহমাদ আলী খান (রহ.) ছিলেন মাওলানা আতহার আলী (রহ.) –এর প্রধান খলিফা এবং জামিয়া ইমদাদিয়ার আজীবন প্রিন্সিপাল। মাওলানা আতাউর রহমান খান (রহ.)  জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রেই ছিলেন এক অনন্য সফল ব্যক্তিত্ব।

শিক্ষক মাওলানা আতাউর রহমান খান : তৎকালীন দেশের শীর্ষস্থানীয় দ্বীনি প্রতিষ্ঠান জামিয়া ইমদাদিয়া থেকেই মাওলানা আতাউর রহমান খান (রহ.) হাদিস, তাফসীর ফিকাহর সর্বোচ্চ শিক্ষা সমাপ্ত করেন। এর পরই জামিয়া ইমদাদিয়ায় অধ্যাপনার জন্য শায়খুল ইসলাম হযরত মাওলানা আতহার আলী (রহ.) তাঁকে নিযুক্ত করেন। দীর্ঘদিন পর্যন্ত তিনি জামিয়া ইমদাদিয়ার উপাধ্যক্ষ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে তিনি ঢাকার ফরিদাবাদ মাদরাসা এবং মিরপুর -৬ এর মাদরাসা দারুল উলূম এর অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালনসহ অনেক প্রতিষ্ঠনেই অধ্যাপনা করেছেন।

বক্তা মাওলানা আতাউর রহমান খান : জুমার খুতবা ও ওয়াজের ময়দানে শুদ্ধ ও প্রাঞ্জল ভাষায় গবেষণাধর্মী আলোচনা করার ক্ষেত্রে এক অনন্য ব্যক্তি ছিলেন মাওলানা আতাউর রহমান খান (রহ.)। বক্তব্যে ছিল অসাধারণ মুগ্ধতা। ভরাটি চরপাড়া হাফেজিয়া মাদরাসা মসজিদে তিনি তাফসির করতেন। কী চমতকার ভাষা! হাতে ছোট একটা রুমাল থাকত। সুন্দর চেহারা ও মনের এ মানুষটির যখন তাফসির করতেন তখন মনে হতো তার মুখ থেকে যেন মুক্তা ঝড়ছে। তাফসীর, হাদীস, ফিকহ, ইলমুল কালাম, দর্শন, আরবী ও উর্দূ ভাষায় তাঁর পান্ডিত্য ছিল ঈর্ষণীয়। তিনি ইংরেজী ও ফার্সী ভাষা জানতেন ভালো।

খান সাহেব হুজুরের তাফসির বা ওয়াজ মানেই ছিল মানুষের অন্যরকম আগ্রহ। হাজার হাজার মানুষের সমাগম হতো তার বয়ানে। তিনি আলোচনা করতেন বিষয়ভিত্তিক। নবীজির (সা.) সিরাত নিয়ে তিনি ধারাবাহিক আলোচনা করতেন একজন ইতিহাসবিদের মতো। সীরাতের সব তারিখ, হালত, ব্যক্তির নাম, রিজালসহ বলে দিতেন বক্তব্যে। সাহাবী হোক কিংবা অমুসলিম, কোনো ওয়াফদের সদস্য হোক, কোনো কবিলার লোক হোক সব তার মনে থাকত।

তর আলোচনায় মানুষ এতটাই মুগ্ধ ছিল যে, এমনও হয়েছে জনগণের অনুরোধে তিন দিনের মাহফিলে তিন দিনই তিনি বয়ান করতেন। জ্ঞান, দূরদর্শিতা, প্রজ্ঞাপূর্ণ বক্তব্যের কারণে দেশের সর্বত্র তাঁর পরিচিতি ছিল। জেলা শহরে থেকেই তিনি জাতীয় ব্যক্তিত্বে পরিণত হন।

এমপি মাওলানা আতাউর রহমান খান : বুদ্ধিদীপ্ত, গম্ভীর চেহারা ও হালকা গড়নের একজন দার্শনিক আলেম ছিলেন মাওলানা আতাউর রহমান খান। তাঁর মার্জিত ব্যবহার, পরিশীলিত আচরণের ফলে কিশোরগঞ্জের মাটি ও মানুষের অতি আপনজনে পরিণত হয়েছিলেন। কিশোরগঞ্জবাসী ‘খান সাহেব হুজুর’ বলে তাকেই চিনত। প্রিয় খান সাহেব হুজুরকে তারা ১৯৯১ সালে বিপুল ভোটে কিশোরগঞ্জ সদর আসন থেকে এমপি নির্বাচিত করেন।  এমপি হিসেবে উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডেও তিনি সাফল্যের পরিচয় দেন।

তখন তিনি ধর্ম মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সদস্য, ইসলামিক ফাউণ্ডেশনের বোর্ড অব গভর্নর্সের সদস্য ছিলেন। জাতীয় শরিয়াহ কাউন্সিলের সদস্যসহ বিভিন্ন জাতীয় সংগঠনের নেতৃত্ব দেন।

সম্পাদক মাওলানা আতাউর রহমান খান : সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর ইসলামিক ফাউণ্ডেশনের ডিজি সাহেবের পরামর্শে ইসলামী বিশ্বকোষের পরিচালক তার কাছে সম্পাদনার কাজে সহযোগিতা করার নিবেদন করলে অন্যান্য ব্যস্ততার মধ্যেও তিনি জাতির এ বৃহত্তর খেদমত আঞ্জাম দেন।  এছাড়াও বিভন্ন পত্রপত্রিকা সম্পাদনা করেছেন।

সংগঠক মাওলানা আতাউর রহমান খান : মাওলানা আতাউর রহমান খান (রহ.) খুব চিন্তাশীল এবং বিজ্ঞ সংগঠন ছিলেন। চেতনার দিক থেকে তিনি ছিলেন আল্লামা আতহার আলী (রহ.) এর উত্তরসূরী। ইসলাম ও মানবতার কল্যাণে বহু সংগঠনে তিনি নেতৃত্ব দিয়েছেন। বাংলাদেশ কওমি মাদরাসা শিক্ষাবোর্ড বেফাকের তিনি ১৯৮২-১৯৯১  দীর্ঘ ১০ বছর মহাসচিব ছিলেন।

সাদাসিধে জীবন : ব্যক্তগত জীবনে মাওলানা আতাউর রহমান খান ছিলেন সাদাসিধে জীবনের অধিকারী। এতবড় একজ ব্যক্তিত্ব হওয়া সত্বেও সামান্য অহঙ্কারও ছিল না। অমায়িক, বন্ধু বৎসল ও সাদা মনের মানুষ। ভদ্রতা, সৌজন্যবোধ ও বিনয়ের মহৎ গুণে অপরাপর ব্যক্তি থেকে তাঁকে আলাদাভাবে চেনা যেত। গায়ে সফেদ জামা, মাথায় কিশতি টুপি, মুখে মুচকি হাসি নিয়ে শহীদি মসজিদের সামনে দিয়ে হেটে যাচ্ছেন, এ দৃশ্য এখনো  আমার চোখে ভাসছে।

সফল পিতা : মাওলানা আতাউর রহমান খান (রহ.) রেখে গেছেন যোগ্য সন্তানদের । বাংলা সাহিত্য ও সাংবাদিকতায় পুরোধা ব্যক্তিত্ব, ইসলামী চিন্তাবিদ ও বুদ্ধিজীবি, দৈনিক ইনকিলাবের সহকারি সম্পাদক আল্লামা উবায়দুর রহমান খান নদভী তার প্রথম পুত্র। দ্বিতীয় পুত্র মাওলানা মুফতী ওয়ালিউর রহমান খান ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মুহাদ্দিস। বায়তুল মুকাররম জাতীয় মসজিদের বিকল্প ইমাম। তৃতীয় পুত্র ড. মাওলানা খলীলুর রহমান খান সুপরিচিত একজন আলোচক এবং কিশোরগঞ্জের ওয়ালীনেওয়াজ খান বিশ্বিবদ্যালয় কলেজের লেকচারার। চতুর্থ পুত্র মাওলানা রেজওয়ানুর রহমান খান আলআরাফাহ ইসলামি ব্যাংকের ফার্স্ট অ্যাসিস্ট্যাণ্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট। ৫ম পুত্র মুহিব খান জনপ্রিয় চিন্তাবিদ, গবেষক, রাষ্ট্রচিন্তক, কবি ও শিল্পী।

৩১ জুলাই, ২০০৮ বরেণ্য এ ইসলামী ব্যক্তিত্ব ইন্তিকাল করেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।  আল্লাহ মাওলানা আতাউর রহমান খানের (রহ.) সব খেদমত কবুল করুন! তাকে জান্নাতের উচ্চ মর্যাদা দান করুন!

লেখক : কলামিস্ট, গবেষক; যুগ্ম সম্পাদক, ডেইলি ইসলাম

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
দয়া করে আপনার নাম লিখুন