সুদিনের আশায় সুদান

মুফতি মুহাম্মদ মর্তুজা

সুদান আফ্রিকা মহাদেশের উত্তরাঞ্চলের একটি দেশ। এর রাজধানী খার্তুম। এলাকার দিক থেকে এটি আফ্রিকার বৃহত্তম দেশ। উত্তরে মিসর, উত্তর-পূর্বে লোহিত সাগর, পূর্বে ইরিত্রিয়া ও ইথিওপিয়া, দক্ষিণ-পূর্বে কেনিয়া ও উগান্ডা, দক্ষিণ-পশ্চিমে গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্র ও সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিক, পশ্চিমে চাদ এবং উত্তর-পশ্চিমে লিবিয়া অবস্থিত। এর আয়তন ২৫ লাখ পাঁচ হাজার ৮১০ বর্গকিলোমিটার। এখানকার বেশির ভাগ ভূমি সমতল। তবে দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে রয়েছে পর্বতমালা। ঐতিহাসিক নিল নদের একটি অংশ সুদানের রাজধানী খার্তুমের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হয়েছে। জনসংখ্যা ৪৩ মিলিয়নেরও বেশি। এর মধ্যে ৯৭ শতাংশই মুসলমান।

৩১ কিংবা ৩৯ হিজরিতে খুলাফায়ে রাশিদার সোনালি যুগে ইসলামের পরশে ধন্য হয় সুদান, ইসলামের তৃতীয় খলিফা উসমান (রা.)-এর আমলে। মিসরে নিযুক্ত মুসলিম শাসক প্রসিদ্ধ সাহাবি আমর ইবনুল আস (রা.)-ই সুদান শাসন করতেন। তখন থেকেই অনেক আরব মুসলিম পরিবার সুদানে বসতি স্থাপন শুরু করে। চলে দাওয়াত ও তাবলিগের তৎপরতা। ফলে একসময় পুরো অঞ্চলেই আরবি ভাষা ও ইসলামী সংস্কৃতি ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে বিশ্বের অন্যতম মুসলিমপ্রধান দেশের স্থান অধিকার করে সুদান। ১৮৮২ সালে ব্রিটিশরা মিসর দখল করলে স্বাভাবিকভাবে সুদানও তাদের দখলে চলে যায়। পরবর্তী সময়ে মুহাম্মদ আহমদ ইবনে আবদে আল্লাহর নেতৃত্বে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের মুখে ১৮৮৫ সালে সুদানে ব্রিটিশ গভর্নর জেনারেল গর্ডনের পতন হয়। সুদান থেকে প্রত্যাহার করা হয় মিসরীয় ও ব্রিটিশ সেনা। ক্ষমতা পাওয়ার মাত্র ছয় মাসের মধ্যে তিনি মারা যান। এরপর ক্ষমতায় আসেন আবদুল্লাহ ইবনে মুহাম্মদ। তিনি নিজেকে খলিফা ঘোষণা করেন।

১৮৯০ সালে ব্রিটিশরা আবারও সুদানে আধিপত্য পুনঃপ্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালায়। ১৮৯৯ সালে ব্রিটিশদের হাতেই ইঙ্গ-মিসরীয় সুদান প্রতিষ্ঠিত হয়। এর ফলে সুদান শাসনের ভার এক মিসরীয় গভর্নরের হাতে ন্যস্ত হয়। সুদানের নতুন পরিচয় হয় ব্রিটিশ কলোনি। ১৯২৪ থেকে ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত ব্রিটিশরা সুদানকে দুটি ভাগে ভাগ করে শাসন করত। দেশটির উত্তরাঞ্চলে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের এবং দক্ষিণাঞ্চলে খ্রিস্টানদের আধিপত্য টিকিয়ে রাখে।

স্বাধীন সুদান

১৯৫৪ সালে মিসরীয়রা ব্রিটিশদের সঙ্গে একটি চুক্তি করে। ওই চুক্তি অনুসারে ১৯৫৬ সালের ১ জানুয়ারি সুদান স্বাধীনতা লাভ করে। ইসমাইল আল আজহারি সুদানের প্রথম প্রধানমন্ত্রী ও আধুনিক সুদানের প্রথম সরকারের নেতৃত্ব দেন। কিন্তু স্বাধীনতার এক বছর আগে ১৯৫৫ সাল থেকেই দেশটিতে গৃহযুদ্ধ চলছিল। উত্তরাঞ্চলের মুসলমানদের সঙ্গে মিসরসহ আরববিশ্বের সুসম্পর্ক ছিল, তাই তারাই স্বাধীন সুদানের নেতৃত্ব দেবে—খ্রিস্টান অধ্যুষিত দক্ষিণাঞ্চলের এমন আশঙ্কাই এ গৃহযুদ্ধের মূল কারণ।

১৯৭২ সালে এক চুক্তিতে দেশটিতে গৃহযুদ্ধের অবসান হলেও ১৯৮৩ সালেই আবারও গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে ১৯৮৯ সালের ৩০ জুন কর্নেল ওমর আল বশির একদল সামরিক কর্মকর্তার সমর্থন নিয়ে রক্তপাতহীন এক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে দেশটির ক্ষমতায় আসেন।

১৯৯৬ সালের ১৬ অক্টোবর তিনি নিজেকে সুদানের প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করেন। সে বছর দেশটিতে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনও হয়। একমাত্র প্রার্থী ছিলেন তিনি নিজেই। তাঁর বিরুদ্ধে দমন-পীড়ন এবং যুদ্ধাপরাধ, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের আন্তর্জাতিক অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি ২০১০ ও ২০১৫ সালের দুটি নির্বাচনে বিজয়ী হন। তাঁর সর্বশেষ নির্বাচন বিরোধীরা বর্জন করে। কিন্তু তিনিও শেষ পর্যন্ত ক্ষমতা ধরে রাখতে পারলেন না। জনতার বিক্ষোভের মুখে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন প্রেসিডেন্ট বশির। প্রথম দিকে বিক্ষোভের প্রধান ইস্যু ছিল অর্থনৈতিক দুর্দশা—বাজারের দাম, জিনিসপত্র না পাওয়া। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই তা সরকার পতনের আন্দোলনে রূপ নেয়। পতন হয় প্রেসিডেন্ট ওমর আল বশিরের ৩০ বছরের শাসনের। এবার সুদিনের আশায় সুদান।

লেখক: উপসম্পাদক, ডেইলি ইসলাম

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
দয়া করে আপনার নাম লিখুন