সেলফি আসক্তিতে অপূরণীয় ক্ষতি

মুফতি মুহাম্মদ মর্তুজা 

সেলফি শব্দটি ইংরেজি সেলফিশ থেকে এসেছে। এর অর্থ আত্মপ্রতিকৃতি। অক্সফোর্ড অভিধানের মতে, সেলফি হলো একটি ছবি (আলোকচিত্র), যা নিজের তোলা নিজের প্রতিকৃতি। এটি সাধারণত স্মার্টফোন বা ওয়েবক্যামে ধারণকৃত এবং যেকোনো সামাজিক মাধ্যমে আপলোড (তুলে দেওয়া) করা হয়ে থাকে। বেশির ভাগ সেলফি হাত সামনে তুলে বা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে, কখনো কখনো সেলফ টাইমার ব্যবহার করেও নেওয়া হয়। ১৮৩৯ সালে রবার্ট কর্নিলিয়াস নামের একজন মার্কিন আলোকচিত্রী প্রথম তাঁর আত্মপ্রতিকৃতি ক্যামেরায় ধারণ করেন। দাবি করা হয়, এটিই বিশ্বের প্রথম সেলফি। (পাবলিক ডোমেইন রিভিউডটওআরজি) বর্তমানে বিশ্বের বড় একটি অংশের নারী-পুরুষের মধ্যে এর জনপ্রিয়তা আছে। কিন্তু অনেক সমাজবিজ্ঞানীর মতে, সেলফির উত্থান ঘটে মূলত পর্নো সংস্কৃতিতে ব্যবহারের মাধ্যমে। তাঁদের দাবি, নিজেদের শরীর সুন্দরভাবে প্রদর্শনের মাধ্যমে অন্যকে আকৃষ্ট করার জন্যই নারীরা সেলফি তুলত। নিজেকে আকর্ষণীয় করাই ছিল সেলফির মূল উদ্দেশ্য। যদিও ২০১০ সালের পরবর্তী সময় থেকে মুখ বাঁকিয়ে, চোখ রাঙিয়ে কিংবা উদ্ভট অঙ্গভঙ্গিতে প্রতিবন্ধীর মতো সেলফি তোলাই ট্রেন্ডে পরিণত হয়েছে। (সূত্র : উইকিপিডিয়া, স্টারলাইট ডটকম)

সেলফি একটি মানসিক ব্যাধি

মার্কিন গবেষকরা দাবি করেছেন, অতিরিক্ত সেলফি তোলার অভ্যাসের সঙ্গে মানসিক ব্যাধির সম্পর্ক থাকতে পারে। নিজের চেহারার প্রতি আকর্ষণ অনুভব করা মানসিক স্বাস্থ্যকে ঝুঁকির মুখে ফেলে দিতে পারে। ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস টাইমসের এক খবরে এ তথ্য জানানো হয়েছে। আমেরিকান সাইকিয়াট্রিস্ট অ্যাসোসিয়েশন (এপিএ) সম্প্র্রতি মানসিক ব্যাধির সঙ্গে সেলফি তোলার সম্পর্কের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। শিকাগোতে প্রতিষ্ঠানটির বার্ষিক পরিচালনা পর্ষদের সভায় সেলফির সঙ্গে মানসিক ব্যাধির বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়। গবেষকরা দাবি করেছেন, নিজের ছবি তোলার অতিরিক্ত প্রবণতা এবং সেই ছবি সামাজিক যোগাযোগের ওয়েবসাইটে দেওয়ার এই মানসিক সমস্যার নাম ‘সেলফিটিস’। (সূত্র : প্রথম আলো অনলাইন, ৩ এপ্রিল ২০১৪) এর প্রমাণ অবশ্য আমরা বাঙালিরাও পেয়েছি, যখন আমাদের দেশের কিছু সেলফিপ্রেমীকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মৃত মানুষের সঙ্গে পোজ দিয়ে সেলফি তুলতে দেখা গেছে।

সেলফি আসক্তি মানুষের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেয়, ক্ষেত্রবিশেষে ঈমানকেও। চলন্ত ট্রেনের সামনে, বহুতল ভবনের ছাদে, হিংস্র প্রাণীর সঙ্গে, পাহাড়ের চূড়ায় সেলফি তুলতে গিয়ে বিশ্বে এ পর্যন্ত অনেক মানুষ নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। ইউনাইটেড স্টেটস ডিপার্টমেন্ট অব ট্রান্সপারেশন ২০১৪ সালকে ‘ইয়ার অব দ্য সেলফি’ ঘোষণা করেছে। তাদের গবেষণা মতে, ২০১৪ সালে প্রায় ৩৩ হাজার মানুষ গাড়ি চালানো অবস্থায় সেলফি তুলতে গিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে। (সূত্র : https://crashstats. nhtsa.dot. gov/Api /Public/ViewPublication/812260)

এ ছাড়া উইকিপিডিয়ায় ২০১৩ থেকে ২০১৫ সালে সেলফি তুলতে গিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে নিহত ৬৫ জন ব্যক্তির তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। তারা জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে সেলফি তুলতে গিয়ে নিহত হয়েছে।

অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, ইবাদত-বন্দেগিতেও সেলফির অনুপ্রবেশ ঘটে যাচ্ছে। এটি আমাদের আমল ধ্বংস করার জন্য মারাত্মকভাবে ভূমিকা রাখছে। এর দৌরাত্ম্যে আমরা এতটাই নিচে নেমে যাচ্ছি যে পবিত্র হজ পালন করতে গিয়েও আমরা আল্লাহর ঘরের সামনে সেলফি তুলছি। যেখানে মানুষ শুধু আল্লাহকে পেতেই যায়, আমরা সেখানে মানুষের লাইক, কমেন্ট পেতে মরিয়া হয়ে পড়ি। নামাজের মতো অঙ্গভঙ্গি করে কিংবা জুমার নামাজ পড়তে গিয়ে মসজিদে বসে সেলফি তুলছি! অথচ পবিত্র কোরআনে কারিমে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘পূর্ব ও পশ্চিম দিকে তোমাদের মুখ ফেরানোতে কোনো পুণ্য নেই; পুণ্যবান তো সেই, যে আল্লাহর ওপর ঈমান এনেছে, ঈমান এনেছে শেষ দিবসের ওপর এবং সব ফেরেশতা, কিতাবসমূহ ও নবীগণের ওপর। ’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৭৭)

প্রত্যেক ঈমানদারের জন্য এ আয়াতে এই গভীর শিক্ষা রয়েছে, আমাদের ইবাদত-বন্দেগি যেন শুধু অঙ্গভঙ্গিতে রূপান্তরিত না হয়। আমাদের প্রতিটি আমলই হয় যেন শুধু আল্লাহর জন্য, মানুষকে দেখানোর জন্য নয়। কারণ আল্লাহ আমাদের অন্তর দেখেন।

অন্যত্র মুমিনদের উদ্দেশ করে মহান রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন, ‘আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না তার (কোরবানির প্রাণীর) গোশত ও রক্ত; বরং পৌঁছায় তোমাদের তাকওয়া…। ’ (সুরা : হজ, আয়াত : ৩৭)

অথচ কোরবানির মতো ইবাদতকেও আমরা তাকওয়াবিরোধী কাজ সেলফি তোলার মাধ্যমে নষ্ট করে দিচ্ছি। গত কোরবানিতে কোরবানির গরুর ওপর বসে একটা সেলফি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছিল। যা সত্যিই দুঃখজনক ছিল। কেননা রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘যে ব্যক্তি লোক দেখানো ইবাদত করে, আল্লাহ এর বিনিময়ে তার লোক দেখানো উদ্দেশ্য প্রকাশ করে দেবেন। ’ (সহিহ বুখারি : ৬৪৯৯)

তা ছাড়া সেলফি তোলার মূল উদ্দেশ্যই হলো আত্মপ্রদর্শন। এটাকে শরিয়তের ভাষায় ‘রিয়া’ বলে। এই প্রদর্শন যদি হয় ইবাদতের ক্ষেত্রে তা হতো আমাদের ঈমানকে ধ্বংস করার একটি শক্তিশালী হাতিয়ার।

হজরত ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) থেকে বর্ণিত একটি দীর্ঘ হাদিসে উল্লেখ আছে, মুআজ ইবনে জাবাল (রা.) বলেন, তিনি রাসুল (সা.)-কে বলতে শুনেছেন, ‘সামান্যতম রিয়াও (লোক দেখানো আমল) শিরক। ’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৩৯৮৯)

সংক্ষিপ্ত এই আলোচনা থেকে আমরা বুঝতে পারি, সেলফি হলো, আত্মতৃপ্তি ও আত্মপ্রদর্শনের একটি মাধ্যম। আর ইবাদত হলো সম্পূর্ণ আল্লাহর জন্য। তাই ইবাদতের মধ্যে সেলফির অনুপ্রবেশ ঘটানো মোটেই সমীচীন নয়। এতে আমল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শুধু ইবাদতের ক্ষেত্রেই নয়, ব্যক্তিজীবনেও সেলফি আসক্তি মানুষের জীবন কেড়ে নিতে পারে কিংবা ঘটিয়ে দিতে পারে অনেক বড় কোনো বিপদ। তাই আসুন, আমরা এ ধরনের অনর্থক কাজ থেকে তাওবা করে আল্লাহর পথে ফিরে আসি।

লেখক : প্রাবন্ধিক, গবেষক

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
দয়া করে আপনার নাম লিখুন