হজ আদায়ে অবহেলা করা উচিত নয়

হজ ইসলামের অন্যতম মৌলিক বিধান। প্রতিবছর নির্দিষ্ট সময়ে আল্লাহর ঘর পবিত্র কাবা শরিফকে কেন্দ্র করে বিশ্বের মুসলমানরা হজ পালন করে থাকেন। ভাষা-বর্ণ, জাতি-গোষ্ঠীসহ অন্যান্য বাহ্যিক বৈচিত্র্য ও পার্থক্য থাকলেও আকিদা-বিশ্বাস ও ধর্মের ক্ষেত্রে সব মুসলমান এক ও অভিন্ন। সবার কণ্ঠে দৃপ্তস্বরে ধ্বনিত হয় তাওহিদের অমিয় বাণী। মানবেতিহাসের সূচনালগ্ন থেকে পবিত্র কাবাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে আল্লাহবিশ্বাসী জনগোষ্ঠীর বৃহত্তর ঐক্য ও সংহতি। এখান থেকেই বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে হিদায়াতের আলো ও দাওয়াতের পয়গাম।

হজরত নুহ (আ.)-এর যুগে মহাপ্লাবনের পর আল্লাহ তাআলার নির্দেশক্রমে হজরত ইবরাহিম (আ.) যখন আবার কাবাঘর নির্মাণ করলেন, তখন আল্লাহ তাআলা তাঁকে হুকুম করেন, ‘মানুষের মধ্যে হজের ঘোষণা দিন। তারা আপনার কাছে হেঁটে এবং সব ধরনের কৃশকায় উটের পিঠে আরোহণ করে দূরদূরান্ত থেকে আসবে।’ (সুরা : হজ, আয়াত : ২৭)

হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর সেই ঐতিহাসিক ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে তখন বিশ্বের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আল্লাহপ্রেমী মানুষেরা কাবা পানে ছুটে আসতে লাগল। ধীরে ধীরে তা পরিণত হলো আল্লাহপ্রেমী মানুষদের মিলনকেন্দ্রে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘আমি বাইতুল্লাহকে মানুষের মিলনস্থল ও নিরাপদ স্থান বানিয়েছি।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১২৫)

সামর্থ্যবান প্রত্যেক মুসলমানের জন্য আল্লাহ তাআলা তাওহিদের এই কেন্দ্রভূমিতে এসে ধরনা দেওয়া বাধ্যতামূলক করে দিয়েছেন। হজ-ওমরাহর উদ্দেশ্যে এই পবিত্র ভূমিতে আসা প্রত্যেককেই দ্ব্যর্থহীন স্বরে ঘোষণা করতে হয়—‘হাজির! প্রভু, আমি হাজির! তোমার কোনো অংশীদার নেই। সমস্ত প্রশংসা, নিয়ামত আর কর্তৃত্বের একচ্ছত্র অধিকারী একমাত্র তুমিই। তোমার কোনো শরিক নেই।’ রাজা-প্রজা, শাসক-শাসিত সবাইকেই অকুণ্ঠ চিত্তে এই স্বীকৃতি দিতে হয়; বিশ্বপ্রভুর দরবারে এই অঙ্গীকার পাঠ করতে হয়। এর মাধ্যমে বিশ্বনিয়ন্তা মহান আল্লাহর সামনে মানুষের যাবতীয় অহংকার ও আমিত্বের অবসান ঘটে। প্রতিষ্ঠিত হয় একমাত্র আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব।

যারা অলসতা করে কিংবা অহংকারবশত কাবা শরিফে গমন করে না এবং আল্লাহর এই শ্রেষ্ঠত্বের স্বীকৃতি দেয় না, তাদের ব্যাপারে হাদিস শরিফে হুঁশিয়ারি বর্ণিত হয়েছে। রাসুল (সা.) বলেন, ‘বায়তুল্লাহর হজ করার জন্য যে ব্যক্তির পথসম্বল আছে এবং বাহন ইত্যাদির ব্যয় বহনের সামর্থ্য আছে অথচ সে হজ সম্পাদন করে না, সে ইহুদি কিংবা খ্রিস্টান হয়ে মৃত্যুবরণ করুক, তাতে কিছু যায়-আসে না।’ (তিরমিজি, হাদিস : ৮১২; বায়হাকি, হাদিস : ৩৬৯২)

হজরত উমামা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি বাহ্যিক স্পষ্ট কোনো প্রয়োজন কিংবা অত্যাচারী বাদশাহ অথবা প্রতিবন্ধক সৃষ্টিকারী কোনো রোগের কারণে হজে গমনে বাধাগ্রস্ত হওয়া বিনে হজ না করে মৃত্যুবরণ করল, সে চাইলে ইহুদি হয়ে মরতে পারে। চাইলে খ্রিস্টান হয়ে মরতে পারে।’ (দারেমি, হাদিস : ১৮২৬; বায়হাকি, হাদিস : ৩৬৯৩)

হাদিসের মর্মকথা অনুয়ায়ী নিজের মুসলমানিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য অবশ্যই হজ পালন করতে হবে। তবে তিনটি কারণে হজে যেতে অপারগ হলে তা আল্লাহর কাছে মার্জনীয় হবে—এক. পাথেয় অথবা পরিবহন সমস্যা; দুই. অত্যাচারী রাজা-বাদশাহ বা সরকারের ক্ষতির আশঙ্কা; তিন. ব্যাধির কারণে হজযাত্রায় অপারগতা। উল্লিখিত কারণগুলো ছাড়া কেউ হজ পালনে বিরত থাকলে তার মৃত্যুকে ইহুদি-খ্রিস্টানের মৃত্যুর সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে।

রাসুল (সা.)-এর এই শিক্ষা সাহাবারা অত্যন্ত সার্থকভাবে গ্রহণ করেছিলেন। হজরত ওমর (রা.) খিলাফতের দায়িত্ব পালনকালে বলতেন, ‘আমি সংকল্প করেছি যে আমি প্রতিটি শহরে লোক পাঠাব, তারা খবর নেবে সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কারা হজ করে না। আমার প্রেরিত লোকগুলো সেই লোকদের ওপর জিজিয়া (কর) আরোপ করবে। কেননা তারা মুসলমান নয়।’ (ইবনে কাসির)

আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, ‘সামর্থ্যবান মুমিন ব্যক্তি যদি হজ না করে এবং জাকাত না দেয়, সে যদি মৃত্যুকালে অবকাশ কামনা করে তাকে বলা হবে, অবকাশ তো কাফিররা চেয়ে থাকে।’

আবদুল্লাহ ইবনে আববাস (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি হজ করার ইচ্ছা করে, সে যেন তাড়াতাড়ি আদায় করে নেয়। কারণ যেকোনো সময় সে অসুস্থ হয়ে যেতে পারে বা বাহনের ব্যবস্থাও না থাকতে পারে; অথবা অন্য কোনো সমস্যার সম্মুখীন হতে পারে।’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ১৮৩৩; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস : ২৮৮৩; সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ১৭৩২)

ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত অন্য বর্ণনায় রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘ফরজ হজ আদায়ে তোমরা বিলম্ব কোরো না। কারণ তোমাদের কারো জানা নেই তোমাদের পরবর্তী জীবনে কী ঘটবে।’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ২৮৬৭; সুনানে কুবরা বায়হাকি : ৪/৩৪০)

উপরন্তু যে সচ্ছল সামর্থ্যবান ব্যক্তি দ্রুত হজ আদায় করে না, একটি হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ তাআলা তাকে হতভাগা ও বঞ্চিত আখ্যায়িত করেছেন।

আবু সাঈদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুল (সা.) বলেন, ‘আল্লাহ তাআলা বলেন, আমি আমার বান্দার শরীরকে সুস্থ রাখলাম, তার রিজিক ও আয়-উপার্জনে প্রশস্ততা দান করলাম। পাঁচ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পরও যদি সে আমার ঘরের হজের উদ্দেশ্যে আগমন না করে তাহলে সে হতভাগ্য, বঞ্চিত।’ (ইবনে হিব্বান, হাদিস : ৩৬৯৫; মুসনাদে আবু ইয়ালা, হাদিস : ১০৩১; তবারানি, হাদিস : ৪৯০)

শুধু তা-ই নয়, একসময় বায়তুল্লাহ উঠিয়ে নেওয়া হলে মানুষ হজ করতে পারবে না—এই আশঙ্কার কারণেও আল্লাহর রাসুল উম্মতকে তাড়াতাড়ি হজ করার হুকুম করেছেন। ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা হজ ও ওমরাহর মাধ্যমে এই ঘরের (বায়তুল্লাহ) উপকার গ্রহণ করো। কেননা তা এর আগে দুইবার ধ্বংস হয়েছে। তৃতীয়বারের পর উঠিয়ে নেওয়া হবে।’ (ইবনে খুজাইমা, হাদিস : ২৫০৬; ইবনে হিব্বান, হাদিস : ৬৭১৮; মুসনাদে বাজ্জার, হাদিস : ১০৭২; মুসতাদরাকে হাকিম, হাদিস : ১৬৫২)

হজ করার শক্তি-সামর্থ্য ও অর্থবিত্ত থাকার পরও যে ব্যক্তি হজ করে না, তার সম্পর্কে হাদিস শরিফে কঠোর হুমকি প্রদান করা হয়েছে। ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি হজ করার সামর্থ্য রাখে তবু হজ করে না, সে ইহুদি হয়ে মৃত্যুবরণ করুক বা খ্রিস্টান হয়ে—তাতে আল্লাহর কিছু যায়-আসে না।’ (তাফসিরে ইবনে কাসির : ১/৫৭৮)

তিনি আরো বলেন, ‘আমার ইচ্ছা হয় কিছু লোককে বিভিন্ন শহরাঞ্চল ও লোকালয়ে পাঠিয়ে দিই, তারা সেখানে দেখবে কারা সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও হজ করছে না। তারা তাদের ওপর কর আরোপ করবে। তারা মুসলমান নয়।’ (তাফসিরে ইবনে কাসির : ১/৫৭৮)

হজ-ওমরাহ না করে সন্ন্যাসী হওয়ার চেষ্টা করাও ইসলাম কখনো অনুমোদন করে না। ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, ইসলামে বৈরাগ্য নেই। অন্য বর্ণনায় রয়েছে, হজের ক্ষেত্রে কোনো বৈরাগ্য নেই। (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ৩১১৩; আবু দাউদ, হাদিস : ১৭২৯)

ওপরে উল্লিখিত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)-এর এই বক্তব্যের মাধ্যমে প্রতীয়মান হয় যে সামর্থ্য থাকার পরও যেসব মুসলমান হজ করে না, কিয়ামতের দিন তারা কী কঠিন অবস্থার সম্মুখীন হবে। সেদিন শত অবকাশ চাইলেও তাদের আর হজ আদায়ের সুযোগ দেওয়া হবে না। ফলে তারা নিদারুণ শাস্তি ভোগ করবে।

মোদ্দাকথা, হজ পালনে বিলম্বের কোনো অবকাশ নেই। এ ব্যাপারে সামান্য উদাসীনতা সীমাহীন শাস্তি ও আজাবের কারণ হতে পারে। হজ ত্যাগকারীর বিরুদ্ধে রাসুল (সা.) ‘বিধর্মী হয়ে মৃত্যুবরণ’ করার মতো চূড়ান্ত মাত্রার হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। তাই কোনো প্রকৃত ঈমানদার হজ ফরজ হওয়ার পর কালবিলম্ব করতে পারে না। কারণ হজ পালনের সামর্থ্য লাভের পর যদি হজ না করে এবং হজ করার সক্ষমতা পরবর্তী সময়ে হারিয়ে ফেলে তাহলে জীবনে সেই অপরাধ মোচনের কোনো সুযোগ থাকে না। তখন আক্ষেপ আর হতাশা ছাড়া ভাগ্যে কিছুই জোটে না। পক্ষান্তরে হজ-ওমরাহর দ্বারা মানুষের ভাগ্যোন্নয়নের কথা হাদিস শরিফে সুস্পষ্টভাবে বিধৃত হয়েছে। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে উপযুক্ত সময়ে হজ করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
দয়া করে আপনার নাম লিখুন