ভোট কাকে দেবেন, কেন দেবেন?

মুফতি মাহবুবুর রহমান নোমানি

নির্বাচন এলে একটি কথা মানুষের মুখে মুখে শোনা যায়-‘আমার ভোট আমি দেব, যাকে খুশি তাকে দেব।’ আপনার ভোট আপনি দিবেন, তবে একজন বিবেকবান ও সচেতন নাগরিক হিসেবে আপনাকে প্রার্থী যাচাই-বাচাই করে ভোট দেওয়া উচিত। প্রার্থীর যোগ্যতা, দক্ষতা, সততা, বিশ্বস্থতা, আমনতদারিতা দেখে ভোট দেওয়া ভোটারের কর্তব্য। আপনার ভোট এতো মূল্যহীন নয় যে, আপনি যাকে তাকে দিয়ে দিবেন। বরং আপনার ভোটের মূল্য ও গুরুত্ব অনেক। তাইতো নির্বাচনের সময় ভোটারদের কদর বেড়ে যায়। প্রার্থীরা ভোটারদের দ্বারে দ্বারে গিয়ে ভোট প্রার্থনা করে। আপনি যদি মনে করেন, আমার একটি ভোটে কী আসে যায়? তাহলে এই চিন্তা ভুল হবে। কেননা এটা সবারই জানা যে, প্রচলিত গণতন্ত্রে একটি ভোটের গুরুত্বও অনেক বেশি। যখন ভালো-মন্দ, যোগ্য-অযোগ্য উভয় প্রতিদ্বন্ধি সমান ভোট পায় তখন আপনার একটি ভোট পুরো জাতির ভাগ্য নির্ধারণ করে দিতে পারে। সুতরাং একজন ভোটার বা একটি ভোট নির্বাচনে অনেক বড় ভূমিকা পালন করে। গণতান্ত্রিক দেশে যেহেতু ভোটের মাধ্যমেই রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব অর্পিত হয় তাই প্রত্যেক ভোটারকে ভেবে-চিন্তে ভোট প্রদান করতে হবে।

কোনো অযোগ্য, দুর্নীতিপরায়ণ, খারাপ চরিত্রের ব্যক্তির হাতে দেশের শাসনভার তুলে দেওয়া মস্তবড় অন্যায়। এমনিভাবে টাকার বিনিময়ে বা অন্য কোনো পার্থিব কারণে ভোট বিক্রি করাও জঘন্যতম গোনাহ। এ ক্ষেত্রে ইসলাম কী বলে তা প্রাধান্য দিতে হবে। মুফতি শফি (রহ.) লিখেছেন- ইসলামের দৃষ্টিতে ভোট হচ্ছে তিনটি জিনিসের সমষ্ঠি- ১. সাক্ষ্য প্রদান। ২. সুপারিশ। ৩. ওকালতি। এই তিনটি বিষয়ে পবিত্র কোরআন-সুন্নাহয় রয়েছে স্পষ্ট বক্তব্য ও মূলনীতি। এখানে সংক্ষেপে তা তুলি ধরছি:

এক. সাক্ষ্য প্রদান: কাউকে ভোট দেওয়ার অর্থ, তার ব্যাপারে এই সাক্ষ্য প্রদান করা যে, আমার পছন্দের লোকটি সৎ ও যোগ্য। বাস্তবে সে যদি সৎ ও যোগ্য না হয় তাহলে তাকে ভোট হবে মিথ্যা সাক্ষ্য। যার ভয়াবহতার ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেছেন- ‘সব চেয়ে মারাত্মক কবিরা গোনাহ হচ্ছে- আল্লাহর সাথে শিরক করা, পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়া এবং মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া।’ বর্ণিত আছে, এই হাদিসটি বর্ণনার করার সময় নবীজি হেলান দিয়ে বসা ছিলেন। কিন্তু তৃতীয় পাপটি বলার সময় তিনি হেলান ছেড়ে সোজা হয়ে বসে বললেন, ‘শুনে নাও, মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া অনেক বড় গোনাহ।’ (বোখারি শরিফ: ২৬৫৪)

মিথ্যা সাক্ষ্য প্রদান যেমন মারাত্মক অন্যায় তেমন সাক্ষ্য গোপন করা বা প্রয়োজনের সময় সাক্ষ্য না দেওয়াও গোনাহের কাজ। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ولاتكتموا الشهادة وَمَنْ يَكْتُمْهَا فَإِنَّهُ آثِمٌ قَلْبُهُ ‘তোমরা সাক্ষ্য গোপন করো না। আর যে সাক্য গোপন করে তার অন্তর গোনাহগার।’ (সুরা বাকারা:২৮৩)

ইনসাফ প্রতিষ্ঠার জন্য সত্য সাক্ষ্য প্রদান করা অপরিহার্য। এ মর্মে আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনে নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُونُوا قَوَّامِينَ بِالْقِسْطِ شُهَدَاءَ لِلَّهِ وَلَوْ عَلَى أَنْفُسِكُمْ أَو الْوَالِدَيْنِ وَالْأَقْرَبِينَ.
‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা ন্যায়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাক, আল্লাহর ওয়াস্তে ন্যায়সঙ্গত সাক্ষ্যপ্রদান কর, যদিও সে সাক্ষ্য তোমাদের বিরুদ্ধে যায়, কিংবা তোমাদের পিতা-মাতা, নিকটতম আত্মীয়-স্বজনের বিপরীতে চলে যায়।’ (সুরা নিসা:১৩৫)

অন্য আয়াতে বলেছেন‘ وَأَقِيمُوا الشَّهَادَةَ لِلَّهِ ‘অর্থাৎ তোমরা আল্লাহর জন্য সঠিক সাক্ষ্য প্রদান কর।’ (সুরা তালাক:২)

হাদিসে নবীজি (সা.) এরশাদ করেছেন-কাউকে সাক্ষ্য প্রদানের জন্য ডাকা হলে সে যদি তা গোপন করে তবে তা মিথ্যাসাক্ষ্যের ন্যায় হবে।’ (তাবরানি:২৭০)

দুই. সুপারিশ: নির্বাচনে প্রার্থীকে ভোট প্রদানের আরেকটি দিক হচ্ছে শাফায়াত বা সুপারিশ। ভোটদাতা যেন সুপারিশ করছে আমার পছন্দের প্রাথীকে নির্বাচিত করা হোক। সেই জনপ্রতিনিধি হওয়ার অধিক যোগ্যতা রাখে।

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা এ ব্যাপারেও মূলনীতি পেশ করেছেন। তিনি এরশাদ করেন,
مَنْ يَشْفَعْ شَفَاعَةً حَسَنَةً يَكُنْ لَهُ نَصِيبٌ مِنْهَا وَمَنْ يَشْفَعْ شَفَاعَةً سَيِّئَةً يَكُنْ لَهُ كِفْلٌ مِنْهَا
‘যে ব্যক্তি উত্তম ও সত্য সুপারিশ করবে সে এর অংশ পাবে। আর যে ব্যক্তি মন্দ ও মিথ্যা সুপারিশ করবে সে তার বোঝা বহন করবে।’ সুরা নিসা:৮৫)

আয়াত থেকে বুঝা গেল, সৎকর্ম ও সৎব্যক্তির পক্ষে সুপারিশ করলে নেকি আর মন্দকাজ ও মন্দব্যক্তি পক্ষে সুপারিশ করলে গোনাহর ভাগি হবে। আমাদের ভোটে নির্বাচিত প্রার্থী জনগণ সংশ্লিষ্ট ভালো-মন্দ যা কিছু করবে তা আমাদের আমলনামায় যুক্ত হবে এবং তাতে শরিক গণ্য হব।

তিন. ওকালতি। ভোটের আরেকটি দিক হচ্ছে ওকালতি তথা প্রতিনিধিত্বের ক্ষমতা প্রদান। অর্থাৎ আপনার ভোট পেয়ে প্রার্থী জনগণের প্রতিনিধি মনোনীত হয়। সুতরাং নির্বাচিত প্রতিনিধি কর্মজীবনে জনগণের হক নষ্ট করলে তার গোনাহর একটি অংশ ভোট দাতাও বহন করবে। আমরা আমাদের ব্যক্তিগত কাজের জন্য কাউকে প্রনিনিধি নিয়োগ করলে তার সবকিছু যাচাই-বাচাই করি। আর জাতীয় নির্বাচনে প্রতিনিধিত্বের বিষয়টি একজন ভোটারের সাথে সম্পৃক্ত নয়, বরং পুরো জাতীর সাথে সম্পৃক্ত। সুতরাং এখানে প্রতিনিধি যাচাই-বাচাইয়ে আরও বেশি সতর্কতা অবলম্বন করা দরকার। তা ছাড়া ভোট একটি পবিত্র আমানত। এই আমনতকে যথোপযুক্ত স্থানে না রাখলে খেয়ানতের গোনাহ হবে।

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন- ان الله يامركم ان تودوا الامانات الى اهلها ‘নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন আমানতকে তাঁর যোগ্য হকদার ব্যক্তির কাছে পৌঁছে দিতে।’ (সুরা নিসা:৫৮)

অতএব, যাকে ইচ্ছা তাকে নয়, বরং সৎ, নিষ্ঠবান, আমানতদার, যোগ্য প্রার্থীকে ভোট দিতে হবে।

ভোট দেওয়া থেকে বিরত থাকা কাম্য নয়
ভোট না দেওয়া সাক্ষ্য গোপন করার অন্তর্ভূক্ত। আর প্রয়োজনের সময়ে সাক্ষ্য গোপন করা হারাম। নির্বাচনে অংশ নিয়ে আপনার কাছে তলব করা হচ্ছে, আপনার অঞ্চলে যারা প্রার্থী হয়েছেন, তাদের মধ্যে আপনার দৃষ্টিতে দ্বীনদারিতা, আমানতাদারিতা, সততা, নিষ্ঠা, দেশ ও জাতির কল্যাণকামিতার দিক থেকে কে সর্বোত্তম? এই অবস্থায় সাক্ষ্য গোপন করা জায়েজ নেই।

অতএব সঠিক বিবেচনার মাধ্যমে যোগ্য প্রার্থীকে ভোট প্রদান করা আমাদের সকলের
অবশ্য কর্তব্য।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
দয়া করে আপনার নাম লিখুন