পাশ্চাত্যে ইসলামের আলোকদীপ্তি

মুহাম্মাদ মিনহাজ উদ্দিন

হালের বৈশ্বিক ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে ন্যূনতম ধারণা রাখেন, এমন যেকেউ খুব ভালোভাবেই জ্ঞাত আছেন যে বর্তমানে পশ্চিমা বেশির ভাগ মানুষ নিজেদের ধর্মকর্ম ও সভ্যতা-সংস্কৃতির প্রতি আস্থা-বিশ্বাস হারাতে বসেছে। তাদের মন-মানসিকতায় হানা দিয়েছে মানবিক মূল্যবোধ পতনের ঝোড়ো হাওয়া।

মনোজগতে সৃষ্টি হয়েছে নৈতিকতা ও সুস্থতার তীব্র হাহাকার। ভাঙনের সুর লেগেছে তাদের ধর্মীয় অনুভূতির নির্মাণসৌধে। এর নেপথ্য কারণরূপে যা কাজ করছে, তা হলো ইসলাম ও মুসলমান। কারণ ইসলাম পবিত্র, শাশ্বত ও আল্লাহর মনোনীত একমাত্র ধর্ম। ইসলামের সুমহান ন্যায়-নীতি, সাম্য-সম্প্রীতি, উদারতা, যুগোপযোগিতা, সামগ্রিক কার্যকারিতা ও স্বয়ংসম্পূর্ণতার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে সচেতন পশ্চিমারা ক্রমেই ধাবিত হচ্ছে সত্যের নাগাল পেতে এবং ইসলামের সৌম্য-মোহন ছোঁয়ায় ঋদ্ধ হতে।
তাঁদের এ মহান ব্রতের মাধ্যমে আরো স্পষ্ট হচ্ছে যে জীবনচলার পথে মানুষ পদে পদে যত বাধা-বিপত্তি ও সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে, তার যথোপযুক্ত সমাধান ইসলামে রয়েছে।

পশ্চিমারা যতই ইসলামবিরোধী হোক, তারা যতই ইসলামফোবিয়া সৃষ্টি করুক, ইসলাম নিজ মহিমায় ছড়িয়ে পড়েছে দেশ-দেশান্তরে। তৃষ্ণা নিবারণ করছে লাখো-কোটি তৃষিত হৃদয়ের। ষড়যন্ত্রের রূপ যত বিচিত্র ও অভিনব হোক, কিছুতেই থামানো যাবে না ইসলামের অভিযাত্রা, ইনশাআল্লাহ।

বহু অমুসলিম যখনই ইসলাম নিয়ে গবেষণার সুযোগ পেয়েছেন, ইসলাম সম্পর্কে মোটামুটি ধারণা লাভের চেষ্টা করেছেন, তখনই তাঁদের বেশির ভাগ ইসলামের সুমহান আদর্শে মোহিত হয়ে শান্তির সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় নিয়েছেন। এর বাস্তব প্রমাণ অসংখ্য ও অগণিত। আনন্দের ব্যাপার হলো, কুণ্ঠচিত্তে হলেও খোদ কিছু পশ্চিমা মিডিয়া ইদানীং এর সাক্ষ্য দিচ্ছে। ক্রমেই এখন দিবালোকের মতো স্পষ্ট হচ্ছে, ইসলামে অলৌকিক আকর্ষণশক্তি রয়েছে। ইসলামের বিরোধিতা করে কেউ এর প্রচার-প্রসারে প্রতিবন্ধকতা ও বিঘ্ন সৃষ্টি করতে পারে না। উল্টো হিতে বিপরীত হয়। ইসলামবিদ্বেষীরা ইসলামকে কলুষিত করার যেরূপ হীনচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, ইসলামের পরিধিও তদরূপ পরিব্যাপ্তি লাভ করছে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘তারা তাদের মুখের ফুৎকারে আল্লাহর আলো নিভিয়ে দিতে চায়। কিন্তু আল্লাহ অবশ্যই তাঁর আলোর পূর্ণতা দান করবেন। যদিও তা কাফিরদের কাছে অপ্রীতিকর লাগে। ’ (সুরা : তাওবা, আয়াত : ৩২)

পশ্চিমা মিডিয়ার কিছু রিপোর্টে চোখ বুলিয়ে নেওয়া যাক—

আমেরিকার নিউজ চ্যানেল ‘সিএনএন’ (CNN)-এর রিপোর্ট অনুযায়ী পুরো বিশ্বে অতি দ্রুত ও ব্যাপকতার সঙ্গে প্রসার হওয়া ধর্মের স্বীকৃতি পেয়েছে ইসলাম। ‘এনবিসি’ (NBC) রিপোর্ট দিয়েছে, ২০ হাজার আমেরিকান নারী-পুরুষ প্রতিবছর ইসলাম গ্রহণ করছে। ‘সিএনএস নিউজ’ (CNS News) তাদের নিজস্ব ওয়েবসাইটে একটি নিবন্ধ প্রকাশ করেছে, তাতে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘ইসলাম ইউরোপে অতিসত্বর সংখ্যাগরিষ্ঠ ধর্মে পরিণত হতে চলছে। আরো বলা হয়েছে, জুমার নামাজে অংশগ্রহণকারী মুসলমানদের সংখ্যা আগামী ৩৫ বছর পরে রবিবার চার্চে উপাসনা করতে আসা খ্রিস্টানদের চেয়ে দ্বিগুণে দাঁড়াবে। ২০৪৬ সালে জার্মানিতে ইসলাম বৃহত্তর মানবগাষ্ঠীর ধর্মে পরিণত হবে। কোনো কোনো বিশ্লেষক বলছেন, ‘বর্তমানে বিভিন্ন মুসলিম দেশের অভিবাসন প্রত্যাশী হাজার হাজার নারী-পুরুষ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পাড়ি জমানোর কারণে মনে হয় আগামী ১০০ বছর পর ইউরোপ মুসলিম মহাদেশে পরিণত হতে চলেছে। ’ এটি অবশ্য তাদের ব্যক্তিগত মতামত। তবু ফেলে দেওয়ার মতো কথা নয়।

সিএনএস নিউজের নিবন্ধে আরো উল্লেখ করা হয়েছে, ফ্রান্সে গত শতাব্দীতে চার্চের তুলনায় মসজিদই নির্মিত হয়েছে বেশি। ব্রিটেনের সংবাদমাধ্যম ‘দ্য হেরাল্ড’ (The Herald) লিখেছে, ‘ইউরোপে হাজার হাজার অমুসলিম নাগরিক ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হচ্ছে। ’ তারা আরো লিখেছে, ‘ব্রিটেনের বিখ্যাত শহর গ্লাসগোয় মুসলমানদের সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বেড়েই চলছে। প্রতিবছর ২০০ থেকে ৫০০ লোক ইসলাম গ্রহণ করছে। বিভিন্ন জরিপের মাধ্যমে জানা যায়, গত বছর চার হাজার জার্মান নারী-পুরুষ ইসলাম গ্রহণ করেছে। ’

আশ্চর্যের কথা হলো, পাশ্চাত্যের দেশগুলোতে ইসলাম গ্রহণকারীদের বেশির ভাগই নারী। যুক্তরাজ্যের ম্যাগাজিন ‘টাইমস’ (Times) জানিয়েছে, ‘আমেরিকান পুরুষদের তুলনায় নারীরা চার গুণ বেশি হারে ইসলাম গ্রহণ করছে। সুইজারল্যান্ডে গত কয়েক বছরে ৩০ হাজার নারী ইসলাম গ্রহণ করেছে। ’

অন্য একটি জরিপের মাধ্যমে জানা গেছে, বিগত কয়েক বছরে যে সংখ্যক ব্রিটিশ নাগরিক ইসলাম গ্রহণ করেছে, গত বছর তার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেছে। একটি স্থানীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, গত ১০ বছরে এক লাখ ব্রিটিশ নাগরিক ইসলাম গ্রহণ করেছে এবং প্রতিবছর তাদের পাঁচ হাজারের ঊর্ধ্বে লোক ইসলাম গ্রহণ করছে।

গত ১২ মাসে যুক্তরাজ্যে পাঁচ হাজার ২০০ ব্রিটিশ নাগরিক ইসলাম গ্রহণ করেছে। যেখানে লন্ডনে ইসলাম গ্রহণকারীর সংখ্যা এক হাজার ৪০০ জন। যুক্তরাজ্যের স্থানীয় জনগণ, পুলিশ স্টেশন ও মসজিদগুলোর ওপর একটি জরিপ চালিয়ে দেখা গেছে, ইংল্যান্ডে গত ১০ বছরে ইসলাম ব্যাপক হারে প্রসার লাভ করেছে।

গত ছয় বছরে ব্রিটেনে মুসলমানের সংখ্যা ৩৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। মসজিদের সংখ্যা এক হাজার ৫০০ পেরিয়ে গেছে।

ইংল্যান্ডের রাষ্ট্রীয় প্রচারমাধ্যম জানিয়েছে, ‘যুক্তরাজ্যের কারাগারগুলোয় বিপুলসংখ্যক কয়েদি ইসলাম গ্রহণ করছে। অনুরূপ স্কুলগুলোতে ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যেও ইসলামপ্রীতি বাড়ছে খুব জোরেশোরে। এমনকি ছোট ছোট বাচ্চারাও বিভিন্ন মসজিদ ও ইসলামিক সেন্টারগুলোয় গিয়ে ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে জানতে আগ্রহী হয়ে উঠছে।

ব্রিটেনের একজন প্রতাপশালী সচিব জানিয়েছেন, ‘ব্রিটেনে খ্রিস্টানদের চার্চগুলো বন্ধ হওয়া আর মানুষের নৈতিকতাশূন্যতার পরিপূরক হতে পারে শুধু ইসলামই। ’ একটি রিপোর্টের শিরোনামই দেওয়া হয়েছে—‘গ্রেট ব্রিটেনে ইসলামের ব্যাপক প্রসারতা’। প্যারিস, রোম ও লন্ডনে মসজিদের সংখ্যা চার্চের সংখ্যাকে ছাড়িয়ে গেছে। ইউরোপ ও আমেরিকার বাজারগুলোতে কোরআনের অনূদিত কপি সর্বাধিক বিক্রীত গ্রন্থের তালিকায় গণ্য হচ্ছে। সেখানকার কারাগারগুলোয়ও খুব জোরেশোরে ইসলামের প্রচার হচ্ছে। বিভিন্ন কারাগারে কয়েদিদের বড় অংশ ইসলাম গ্রহণ করছে। রিপোর্টে বলা হয়েছে, ওয়েলস, আয়ারল্যান্ড এবং অন্য অঞ্চলগুলোয় খুব দ্রুত বিস্তারকারী ধর্মের স্বীকৃতি লাভ করেছে ইসলাম।

রিপোর্টে আরো বলা হয়েছে, এভাবে চলতে থাকলে ও মুসলমানদের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়তে থাকলে ভবিষ্যতে ইসলাম ইংল্যান্ডের দ্বিতীয় বৃহৎ ধর্মে পরিণত হবে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী জানা যায়, ২০০১ সালে ইংল্যান্ডে খ্রিস্টানদের সংখ্যা ছিল ৭২ শতাংশ, কিন্তু ২০১১ সালে এসে তাদের সংখ্যা দাঁড়ায় ৫৯ শতাংশে।

২০১০ সালে সিএনএনের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত একটি নিবন্ধে বলা হয়, পাশ্চাত্যে ইসলাম গ্রহণকারীদের সংখ্যা বহুগুণ বেশি এবং এর ধারা ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়েই চলছে। গত ১২ বছরে আমেরিকায় এক হাজার ২০০-এরও বেশি মসজিদ নির্মিত হয়েছে। অর্থাৎ প্রতিবছর গড়ে ১০০টি করে মসজিদ নির্মিত হচ্ছে।

(কুয়েত থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক ‘আল-মুজতামা’ ও ভারতের দারুল উলুম নদওয়াতুল উলামা থেকে প্রকাশিত ম্যাগাজিন পাক্ষিক ‘তামিরে হায়াত’ অবলম্বনে রচিত। )

লেখক : প্রাবন্ধিক, গবেষক

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
দয়া করে আপনার নাম লিখুন