ধর্ম প্রতিমন্ত্রীর কাছে আলেমসমাজের প্রত্যাশা

মোহাম্মদ মাকছুদ উল্লাহ

গত ৭ জানুয়ারি বঙ্গ ভবনে আয়োজিত এক জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানে শপথ গ্রহণ করলেন নবনিযুক্ত মন্ত্রিপরিষদের সদস্যরা। এবারকার নির্বাচন যেমন ছিল বহুল আলোচিত, তেমনি গঠিত মন্ত্রিপরিষদও চমকে ভরা। তরুণ-প্রবীণের সমাহারে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর মন্ত্রিপরিষদ ভারসাম্যপূর্ণ ও সময়োপযোগী হয়েছে বলেই বিজ্ঞজনরা মত প্রকাশ করেছেন। বিশেষ করে নবনিযুক্ত ধর্ম প্রতিমন্ত্রীর নামটি ধর্মীয় অঙ্গনে বিশেষ আশার সঞ্চার করেছে। দেশের আলেমসমাজ যেন এই-ই প্রথমবার বাংলাদেশ সরকারে তাদের একজন সত্যিকার অভিভাবককে খুঁজে পেয়েছে। দ্বিনি শিক্ষার একজন পৃষ্ঠপোষক হিসেবে নবনিযুক্ত ধর্ম প্রতিমন্ত্রী কওমি পরিবারকে জাতীয় উন্নয়নের অংশীদার হিসেবে যুক্ত হওয়ার সুযোগ করে দেবেন—এমনটি আশা করছেন ওই পরিবারের ১৫ লাখ সদস্য।

বাংলাদেশের ১১তম মন্ত্রিপরিষদের ধর্ম প্রতিমন্ত্রীর নাম শেখ মো. আব্দুল্লাহ। তাঁর বাবা মরহুম আলহাজ শেখ মো. মতিউর রহমান ও মা মোসাম্মাৎ রাবেয়া খাতুন ছিলেন অত্যন্ত ধর্মপরায়ণ। তিনি গোপালগঞ্জ জেলা ও সদর উপজেলার অন্তর্গত মধুমতী নদীর তীরবর্তী কেকানিয়া গ্রামে ১৯৪৫ সালের ৮ সেপ্টেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। চার ভাই তিন বোনের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়। তাঁর পড়ালেখার হাতেখড়ি দ্বিনি শিক্ষার মাধ্যমে হয়েছিল বলে জানা যায় এবং তিনি মাদরাসায় কয়েক শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করেছেন। অতঃপর নিজ এলাকায় প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা শেষে খুলনার আযম খান কমার্স কলেজ থেকে স্নাতক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। পেশাগত জীবনে তিনি একজন সফল ব্যবসায়ী। ১৯৯৬ সালে তিনি অগ্রণী ব্যাংক লিমিটেডের পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেছেন। ছাত্রজীবন থেকে তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। তিনি আযম খান কমার্স কলেজের ভিপি, গোপালগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কমিটির ধর্মবিষয়ক সম্পাদকসহ রাজনৈতিক ক্ষেত্রে অনেক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা, স্বাধীনতাসংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অবদান ছিল অসামান্য। তিনি ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের গভর্নর হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেছেন। জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা গোপালগঞ্জ-৩ আসনে যতবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন, শেখ মো. আব্দুল্লাহ অল্প কিছুদিন ছাড়া তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেছেন। সে সুবাদে তিনি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও এলাকার জনগণের কাছে অত্যন্ত প্রিয় একজন মানুষ। বিশেষ করে কওমি মাদরাসা অঙ্গনে তিনি অভিভাবক হিসেবে সামাদৃত। তিনি কওমি আলেমদের সঙ্গে সরকারের সুসম্পর্ক স্থাপন, কওমি শিক্ষা ও সনদের সরকারি স্বীকৃতি, জঙ্গিবিরোধী জনমত সৃষ্টি, বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির পরিচয় প্রতিষ্ঠা ইত্যাদি ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন।

মাননীয় ধর্ম প্রতিমন্ত্রীর মেজো ভাই আলহাজ হাফেজ মো. আবু মুসা মুজাহিদে আযম আল্লামা শামসুল হক ফরিদপুরী (রহ.)-এর মাদরাসা ‘দারুল উলুম খাদিমুল ইসলাম গওহরডাঙ্গা’ মাদরাসা থেকে হিফজ সম্পন্নকারী তাঁর সময়ের সেরা হাফেজ। তাঁর মেজো বোনও পবিত্র কোরআনের হাফেজ। তাঁর এক ভাগিনা মাওলানা মহিউদ্দীন বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের পেশ ইমাম, অন্য ভাগিনা মাওলানা আব্দুর রাজ্জাক কাসেমী কাকরাইল মারকাজ মাদরাসার মুহাদ্দিস। তাঁর পরিবার ও নিকটাত্মীয়দের মধ্যে অর্ধশতাধিক কওমি হাফেজ ও আলেম রয়েছেন। তাই কওমি পরিবারের অভিভাবক হিসেবে মাননীয় ধর্ম প্রতিমন্ত্রীকে ঘিরে দেশের আলেমসমাজের আশা ও প্রত্যাশা এবার একটু বেশি। আলেমসমাজ মনে করে, ধর্ম প্রতিমন্ত্রীর মাধ্যমে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সূচিত জাতীয় উন্নয়নের মহাসড়কে আলেমরা উপযুক্ত আসনে সমাসীন হবেন।

দেশের মোট জনসংখ্যার তুলনায় কওমি শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত জনসমষ্টি নেহাত কম নয়। বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (ব্যানবেইস) কর্তৃক পরিচালিত এক জরিপের তথ্য মতে, বাংলাদেশে মোট কওমি মাদরাসার সংখ্যা পুরুষ ১২ হাজার ৬৯৩টি এবং মহিলা এক হাজার ২০৯টি। আর এসব মাদরাসায় অধ্যয়নরত ছাত্রসংখ্যা ১০ লাখ ৫৮ হাজার ৬৩৬ জন, শিক্ষক ৬৬ হাজার ৯০২ জন, ছাত্রী তিন লাখ ৩৯ হাজার ৬১৬ জন এবং শিক্ষিকা ছয় হাজার ৮২৯ জন। অর্থাৎ ১৫ লাখের বেশি মানুষ তথা পরিবার কওমি মাদরা শিক্ষার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। সুতরাং সমকালীন প্রেক্ষাপটে নৈতিকতার মানদণ্ডে উত্তীর্ণ এত বড় জনসমষ্টিকে অবহেলা করা উচিত নয়, বিষয়টির যথাযথ উপলব্ধি থেকেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ২০১৭ সালের ১১ এপ্রিল গণভবনে আল্লামা শাহ আহমদ শফীর (দা.বা.) নেতৃত্বে উপস্থিত তিনশতাধিক আলেমের সামনে কওমি মাদরাসার সনদের স্বীকৃতির আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছিলেন। অতঃপর ১৩ এপ্রিল দাওরায়ে হাদিসের সনদকে ইসলামিক স্টাডিজ ও আরবির মাস্টার্স সমমান ঘোষণা করে গেজেট প্রকাশ করা হয় এবং ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮ জাতীয় সংসদে ‘আল-হাইয়াতুল উলইয়া লিল জামিয়াতিল কওমিয়া বাংলাদেশ’-এর ‘কওমি মাদরাসাগুলোর দাওরায়ে হাদিসের (তাকমিল) সনদকে মাস্টার্স ডিগ্রি (ইসলামিক স্টাডিজ ও আরবি) সমমান প্রদান বিল ২০১৮’ জাতীয় সংসদে পাসের মাধ্যমে আইনগতভাকে চূড়ান্ত করা হয়।

কওমি মাদরাসা হলো উপমহাদেশের প্রথম আনুষ্ঠানিক শিক্ষাব্যবস্থা, যা ১৮৬৬ খ্রিস্টাব্দে শুরু হয়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন ও স্বাধীনতা আন্দোলনসহ বিভিন্ন জাতীয় সংকটকালে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে আসছে নিষ্ঠার সঙ্গে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শত প্রতিকূলতা ও বিরোধিতা উপেক্ষা করে প্রাচীনতম এই শিক্ষা ও সনদের স্বীকৃতি দিয়ে প্রায় দেড় শ বছরের প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে কওমি মাদরাসায় শিক্ষিতদের জাতির মূলস্রোতে মিলনের সুযোগ করে দিয়েছেন। এবার সততা আর কর্মদক্ষতা দিয়ে কওমি ঘরানার আলেমদের জাতির সেবায় অবদান রেখে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা প্রমাণ করার পালা।

দাওরায়ে হাদিসকে মাস্টার্স সমমান দেওয়া হলেও কর্মক্ষেত্র তেমন সৃষ্টি হয়নি বলা চলে। শুধু ইসলামিক ফাউন্ডেশন পরিচালিত মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা এবং দারুল আরকাম ইবতেদায়ি মাদরাসার শিক্ষকের পদ ছাড়া অন্য কোথাও আপাতত কোনো সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে বলে আমাদের জানা নেই। সামনে হয়তো মডেল মসজিদগুলোতে কিছু সুযোগ তৈরি হবে। তার অর্থ হলো, মাদরাসায় শিক্ষিতদের ধর্মীয় আঙিনায় আবদ্ধ হয়ে থাকতে হবে। অথচ সমাজের অবক্ষয়কবলিত স্থানগুলোতে আলেমসমাজকে স্থান না দিলে জাতির শুদ্ধাচার আদৌ সম্ভব নয়। সুতরাং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত এসডিজি (সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোল) বা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত সময়ের (২০৩০ সাল) মধ্যে অর্জন করতে হলে সরকারি ক্যাডারগুলোয় বিশেষ করে দুর্নীতি দমন কমিশন, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ, ইনকাম ট্যাক্স, জনস্বাস্থ্য, বিএসটিআই, গণপূর্ত, সমাজসেবাসহ দুর্নীতিগ্রস্ত হিসেবে খ্যাত বিভাগগুলোয় এবং পুলিশ, র‌্যাব, সেনাবাহিনী ও ব্যাংকিং সেক্টরে কওমি মাদরাসায় শিক্ষিতদের নিয়োগের সুযোগ করে দেওয়া সময়ের দাবি। পাশাপাশি স্কুল-কলেজ ও সরকারি মাদরাসায় কওমি আলেম-উলামার উপযুক্ত কর্মস্থল হতে পারে।

মাননীয় ধর্ম প্রতিমন্ত্রী আলহাজ শেখ মো. আব্দুল্লাহ নিশ্চয়ই তাঁর নামের সার্থকতা অতীতের মতোই বর্তমান কওমি পরিবারের জন্য অভিভাবকের দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে প্রমাণ করবেন। দেশের আলেমসমাজ এরই মধ্যে মন্ত্রী হিসেবে তাঁর নিয়োগকে সানন্দে স্বাগত জানিয়েছে। আমরা তাঁর সর্বাঙ্গীণ মঙ্গল ও সাফল্য কামনা করি।

লেখক : সাংবাদিক, গ্রন্থকার ও পেশ ইমাম

রাজশাহী কলেজ কেন্দ্রীয় মসজিদ

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
দয়া করে আপনার নাম লিখুন