বরগুনার ঐতিহাসিক বিবিচিনি শাহি মসজিদ

মো. শামীম সিকদার

দিগন্তজোড়া বর্ণিল সবুজের মাঝে উঁচু টিলার ওপর দাঁড়িয়ে আছে ঐতিহাসিক বিবিচিনি শাহি মসজিদ। এ এক হৃদয়ছোঁয়া পরিবেশ, যা ভোলার নয়। দেশের অনেক দর্শনীয় ও ঐতিহাসিক স্থানের মধ্যে বিবিচিনি মসজিদ অন্যতম। এটি বরগুনার বেতাগী উপজেলার বিবিচিনিতে অবস্থিত। তবে সম্প্রতি দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম ঐতিহাসিক প্রাচীন এই মসজিদ প্রয়োজনীয় সংস্কার, রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সৌন্দর্য ও ঐতিহ্য হারাচ্ছে। দক্ষিণাঞ্চলের ইসলাম প্রচারের কেন্দ্র হিসেবে অবহিত করা হয় এ মসজিদকে।

সপ্তদশ শতাব্দীতে ইসলাম প্রচারের লক্ষ্যে আধ্যাত্মিক সাধক শাহ নেয়ামতউল্লাহ এক গম্বুজবিশিষ্ট বিবিচিনি শাহি মসজিদটি নির্মাণ করেন। এ মসজিদের দৈর্ঘ্য ৩৩ ফুট, প্রস্থ ৩৩ ফুট। দেয়ালগুলো ছয় ফুট চওড়া। উচ্চতা প্রায় ২৫ ফুট। দক্ষিণ ও উত্তর দিকে তিন-তিনটি দরজা রয়েছে। তবে মসজিদটিতে মূল প্রবেশদ্বার একটি। মসজিদের সংস্কার কাঠামোয় প্রবেশদ্বারের মূল ফটক সংস্কার করা হলেও প্রবেশপথ এখনো অপরিসর। মসজিদের ব্যবহৃত ইটগুলো মোগল আমলের তৈরি। দৈর্ঘ্য ১২ ইঞ্চি, প্রস্থ ১০ ইঞ্চি এবং চওড়া দুই ইঞ্চি। সমতল ভূমি থেকে ৩০ ফুট সুউচ্চ টিলার ওপর দিগন্তের মাঝে দাঁড়িয়ে আছে এ মসজিদ।

দর্শনার্থী ও নামাজিদের ওঠা-নামার জন্য মসজিদের দক্ষিণ পাশের ২১ ধাপবিশিষ্ট ৪৮ ফুট দীর্ঘ একটি সিঁড়ি রয়েছে। সিঁড়ি নির্মাণের ফলে যাতায়াতের পথ সুুগম ও সহজ হলেও বর্তমানে টিলা বেয়ে মুসল্লিদের নামাজ পড়তে ও পর্যটকদের আসা-যাওয়ায় দুর্ভোগে পড়তে হয়। মসজিদের সঙ্গে যোগাযোগের একমাত্র সড়কটি ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে আছে বহুদিন। পূর্ব পাশের ২৫ ধাপবিশিষ্ট ৪৬ ফুট দীর্ঘ সিঁড়িটির অবস্থাও নাজুক। পর্যটকদের থাকার জন্য নাই কোনো ডাকবাংলো। বাউন্ডারি ওয়াল না থাকায় মসজিদের পবিত্রতা রক্ষা পাচ্ছে না। সম্ভাবনাময় এ পর্যটন স্পটটি পর্যটকদের পাশাপাশি সবার হৃদয় আকৃষ্ট করে তুললেও পরিবেশ রক্ষার্থেও নেই তেমন কোনো উদ্যোগ। স্থানীয় কিছু লোক মসজিদের টিলার নিচের মাটি কেটে তাদের জমি বাড়িয়ে আবাদ করে টিলার ব্যাপক ক্ষতি সাধন করে চলেছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় এ মসজিদকে কেন্দ্র করে মুক্তিযোদ্ধারা তাঁদের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেছেন বলে স্থানীয়রা জানিয়েছে।

দীর্ঘদিনের অরক্ষিত ও জরাজীর্ণ অবস্থায় থাকা মসজিদটি উদ্ধারের পর প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর সংস্কার করলেও প্রয়োজনের তুলনায় তা খুবই কম হয়েছে। এ সংস্কারে মসজিদের পুরনো কাঠামোগত বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে হুবুহু মিল রেখে কাজ করা হয়। মসজিদের ভেতরে অবাধে বাতাস চলাচলের পথগুলো উন্মুক্ত রাখা হয়। কোনোমতে স্থাপন করা হয় বাতি ও বৈদ্যুতিক পাখা। জানা যায়, পরবর্তীকালে ১৯৯৩ সালে মসজিদের আরো সৌন্দর্য বৃদ্ধি, অবকাঠামোগত সম্প্রসারণ ও সংস্কারের জন্য প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ এক কোটি টাকার একটি প্রকল্প হাতে নিলেও আজও তা আলোর মুখ দেখেনি।

দেশের বিভিন্ন স্থান থেকেও তাদের উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য প্রতিদিন এখানে অগণিত নারী-পুরুষ আসে। তাদের পদচারণে মুখরিত হয় মসজিদ এলাকা। সারা বছরই কমবেশি মানুষ ছুটে আসে এ মসজিদে।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
দয়া করে আপনার নাম লিখুন