আফগানিস্তানে কি আবারো আসতে পারে তালেবান শাসন?

আফগানিস্তানের সমসাময়িক ভূরাজনৈতিক ইতিহাসকে পাঁচটি অধ্যায়ে ভাগ করা যেতে পারে। এখন আরও একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হচ্ছে। তবে নতুন এ অধ্যায়ের এখন সবে অঙ্কুরোদ্গম হয়েছে। এর চরিত্র ও গতি–প্রকৃতির সংজ্ঞা নির্ধারণে আরও কিছুদিন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে হবে।

প্রথম অধ্যায় হিসেবে ১৯৭৪ থেকে ১৯৭৯ সালকে ধরা যেতে পারে। এই সময়টাতে আফগানিস্তানের মোহাম্মাদ দাউদ খানের সরকারকে যারা উৎখাত করতে চেয়েছে, তাদের আশ্রয় ও প্রশিক্ষণ দেওয়াসহ সব ধরনের মদদ দিচ্ছিল পাকিস্তান। এর পরের অধ্যায় বা ধাপ হলো ১৯৭৯ থেকে ১৯৮৯ সাল। এই সময়কালে যুক্তরাষ্ট্র এবং সৌদি আরব সোভিয়েত সেনাদের বিরুদ্ধে লড়াইরত আফগান মুজাহিদদের অর্থ, প্রশিক্ষণ ও সমরাস্ত্র দিয়ে সর্বাত্মক সহযোগিতা করেছিল। ১৯৮৯ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত সময়কালকে তৃতীয় ধাপ ধরা যায়। এই সময়টাতে আফগানিস্তানে ক্ষমতার পালাবদল হয়। আঞ্চলিক যুদ্ধবাজ নেতারা ক্ষমতা দখল করেন এবং প্রেসিডেন্ট মোহাম্মাদ নাজিবুল্লাহ ক্ষমতাচ্যুত হন। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত সময়কে চতুর্থ ধাপ ধরা যায়। এই ভাগে তালেবান সরকার আফগানিস্তানে ভয়াবহ এক ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে এবং পাকিস্তান, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত ছাড়া বিশ্বের অন্য সব দেশ কাবুলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে।

পঞ্চম ধাপটি শুরু হয় ২০১১ সালে নাইন–ইলেভেন হামলার পর। তখন থেকেই যুক্তরাষ্ট্র আফগান সরকারের পক্ষ হয়ে পাকিস্তানের মদদপুষ্ট তালেবানের বিরুদ্ধে প্রচণ্ড যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে।

এখন ষষ্ঠ ধাপের শুরু। এই ধাপে এসে আমাদের সামনে দুটো প্রশ্ন হাজির হয়েছে। এক. আফগানিস্তানে যুদ্ধে কি আমেরিকার পরাজয় হয়েছে? যদি হয়ে থাকে, তাহলে কেন হয়েছে?

প্রথম প্রশ্নের জবাব ‘হ্যাঁ’ এবং ‘না’—দুটোই। যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানের মাটি থেকে তালেবানকে উৎখাত করতে ব্যর্থ হয়েছে এবং দেশটিকে সন্ত্রাসীদের স্বর্গরাজ্য হওয়ার আশঙ্কাকে সম্পূর্ণ নির্মূলও করতে পারেনি। তালেবানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের চলমান শান্তি আলোচনা এবং আফগানিস্তান থেকে ক্রমান্বয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সেনা সরিয়ে নেওয়ার মধ্য দিয়ে তা প্রমাণিত হয়েছে। আমেরিকার জনগণ এখন যুদ্ধ নিয়ে বীতশ্রদ্ধ এবং ২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগেই ডোনাল্ড ট্রাম্প আফগানিস্তানে মার্কিন বাহিনীর লড়াইয়ের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তির ঘোষণা দেবেন। এই দিক থেকে দেখলে বলা যেতে পারে, যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানে পরাজিত হয়েছে।

আবার একই সঙ্গে এই সময়কালে যুক্তরাষ্ট্রের বহু অর্জনও রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের ফলেই কাবুল থেকে তালেবান পালাতে বাধ্য হয়েছে। বর্তমানে তালেবানের সঙ্গে শান্তি আলোচনা চললেও তারা যে একেবারে বিনা বাধায় আবার কাবুলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিতে পারবে, সে পরিস্থিতি এখন আর নেই।

যুক্তরাষ্ট্রের আরও অর্জন আছে। ওসামা বিন লাদেন পাকিস্তানে মার্কিন অভিযানে নিহত হয়েছেন। তালেবান নেতা মোল্লা ওমর পলাতক অবস্থায় মারা গেছেন এবং তাঁর উত্তরসূরি মোল্লা আখতার মনসুর ২০১৬ সালে পাকিস্তানে মার্কিন ড্রোন হামলায় নিহত হয়েছেন। সন্ত্রাসীদের মদদ না দেওয়ার বিষয়ে পাকিস্তান আন্তর্জাতিক চাপে রয়েছে। তবে সবকিছু যে যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনামতো এগিয়েছে তা নয়। এর পেছনে কয়েকটি কারণ আছে।

প্রথম এবং প্রধান কারণ হলো, রাজনৈতিক ভুল ও অদূরদর্শিতা। ২০০১ সালের পর যুক্তরাষ্ট্র কোনো কিছু বিবেচনায় না নিয়েই আফগানিস্তানে প্রেসিডেন্ট শাসিত সরকারব্যবস্থা চাপিয়ে দেয়। ২০০৩ সালের পর ইরাক যুদ্ধ শুরু হলে যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তান থেকে মনোযোগ সরিয়ে ইরাকের দিকে বেশি ঝুঁকে পড়ে এবং আফগানিস্তান থেকে সেনা ও সম্পদ প্রত্যাহার শুরু করে দেয়। এ ছাড়া আফগান ন্যাশনাল সিকিউরিটি ফোর্স গঠনে যুক্তরাষ্ট্র শুরুতে যতটা গুরুত্ব দিয়েছিল, পরে সেখানেও তারা শিথিল হয়ে আসে। আফগান সরকারব্যবস্থায় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার দিকে মন না দেওয়ায় সেখানকার লড়াইরত গোষ্ঠীগুলো আরও ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে।

যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় ভুল ছিল সামরিক অভিযানের ধরনের দিক থেকে। ২০০৮ সালের পর যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ পরিকল্পকেরা বিশ্বাস করতে শুরু করলেন, ইরাকে যেভাবে শত্রুপক্ষকে ঘায়েল করতে তৃতীয় আরেক পক্ষকে কাজে লাগানো হয়েছে, একইভাবে আফগানিস্তানেও তা–ই করা ফলদায়ক হবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নানা কারণে আফগানিস্তানে তা সম্ভব হয়নি।

ইরাকের আনবার প্রদেশে স্থানীয় বিভিন্ন গোষ্ঠীকে এক ছাতার তলে এনে তাদের সহযোগিতা দিয়ে সন্ত্রাসী মোকাবিলায় সাফল্য পেয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। ওই সব গোষ্ঠী একত্র হয়ে সরকারবিরোধীদের দমন করেছিল। কিন্তু আফগানিস্তানের বাস্তবতা ভিন্ন। এখানে যুদ্ধবাজ গোষ্ঠীগুলোকে এক জায়গায় আনা সম্ভব হয়নি। তালেবান তাড়া খেয়ে পাকিস্তানে ঢুকে পড়ে সেখান থেকে আবার সংঘবদ্ধ হয়ে ফিরে এসেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ ভুল হলো তারা অতীত ভুল থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতেও ব্যর্থ হয়েছে। হুমকি দিয়ে, আর্থিক সহায়তার লোভ দেখিয়ে এবং সামরিক সহযোগিতা দিয়ে পাকিস্তানকে তালেবানবিরোধী লড়াইয়ে সহযোগী হিসেবে আনা হলেও মার্কিন প্রশাসকেরা, সামরিক অধিনায়কেরা এবং কূটনীতিকেরা বিশ্বাস করে এসেছেন পাকিস্তানের এই সহযোগিতামূলক মনোভাব টেকসই হবে। মার্কিন আর্থিক সহযোগিতায় ভাটা পড়ার সঙ্গে সঙ্গে পাকিস্তানও তার তালেবানবিরোধী তৎপরতা শিথিল করে দিয়েছে।

এশিয়ার ক্রসরোডে অবস্থান হওয়ায় আফগানিস্তান প্রতিবেশী দেশগুলোর জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ দেশ। বিশেষ করে ইরান, রাশিয়া, চীন, পাকিস্তান এবং ভারতের স্বার্থ সংরক্ষণের বিষয়ে দেশটির অর্থবহ ভূমিকা আছে। যত দিন পর্যন্ত পাকিস্তান ও আফগানিস্তান আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসীদের প্রশিক্ষণ শিবির হিসেবে ব্যবহৃত হবে, তত দিন পর্যন্ত এই দুই দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মাথাব্যথা থাকবে। সেই ভবিষ্যৎকে বিবেচনায় নিয়ে পশ্চিমা দেশগুলোকে আফগানিস্তানের নিকট অতীত ভালোভাবে বিশ্লেষণ করতে হবে। তার ভিত্তিতেই ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা ঠিক করতে হবে। এটি না করা হলে নিশ্চিতভাবেই তালেবান আবার কাবুলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেবে।

ইংরেজি থেকে অনূদিত। স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট
ধ্রুব জয়শংকর: দিল্লিতে ব্রুকিং ইন্ডিয়া এবং ওয়াশিংটন ডিসিতে ব্রুকিং ইনস্টিটিউশনের ফরেন পলিসি স্টাডিজের একজন ফেলো

সুত্র : প্রথম আলো

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
দয়া করে আপনার নাম লিখুন