হিজরি সন থেকে বাংলা নববর্ষ

মাওলানা কাজী ফজলুল করিম: মানব সভ্যতার শুরু থেকেই সময়ের হিসাব ধরে রাখার মনমানসিকতা সঞ্চারিত হয়। আল্লাহ তায়ালা ঘোষণা করেন, ‘নিশ্চয়ই আকাশম-লী ও পৃথিবীর সৃষ্টির দিন থেকেই আল্লাহর বিধানে মাসের সংখ্যা বারটি।’ (সূরা তওবা : ৩৬)।

এ কারণে যেমন সূর্যের পরিক্রমের হিসাবের উদ্ভব ঘটে, তেমনি চন্দ্র পরিক্রমের হিসাবেরও উদ্ভব ঘটে। মহান আল্লাহ ঘোষণা করেন, ‘তিনিই সূর্যকে তেজস্কর ও চন্দ্রকে জ্যোতির্ময় করেছেন এবং এর মনজিল (তিথি) নির্দিষ্ট করেছেন, যাতে তোমরা বছর গণনা ও সময়ের হিসাব জানতে পার। আল্লাহ এটা নিরর্থক সৃষ্টি করেননি। জ্ঞানী সম্প্রদায়ের জন্য তিনি এসব নিদর্শন বিশদভাবে বিবৃত করেন।’ (সূরা ইউনুস : ৫)।

হিজরি সনের ইতিকথা : বাংলা সন যে হিজরি চান্দ্র সনেরই সৌররূপ, তা সর্বজনবিদিত। বাংলাদেশে বর্তমানে প্রচলন রয়েছে হিজরি, বাংলা ও ইংরেজি সাল। বাংলাদেশে ইংরেজি সালের ব্যবহার শুরু হয় ১৭৫৭ খ্রিষ্টাব্দে সংঘটিত পলাশী বিপর্যয়ের পরপরই। আর হিজরি সনের প্রচলন হয় ৬৪০ খ্রিষ্টাব্দের দিকে, যখন এখানে আনুষ্ঠানিকভাবে ইসলাম প্রচার শুরু হয়।
এখানে উল্লেখ্য, একটি ইসলামি পঞ্জিকার প্রয়োজন মেটানোর জন্য প্রিয়নবী (সা.) এর মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের বছর ৬২২ খ্রিষ্টাব্দকে প্রথম বছর ধরে ৬৩৯ খ্রিষ্টাব্দে হিজরতের ঘটনার ১৭ বর্ষে এ ঘটনাকে স্মরণীয় করে রাখতে আলী (রা.) এর পরামর্শে ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা ওমর (রা.) কর্তৃক হিজরি সনের প্রবর্তন হয়।

উপমহাদেশে হিজরি সনের ব্যবহার : হিজরি সন প্রবর্তনের পরের বছরই অর্থাৎ ৬৪০ খ্রিষ্টাব্দের দিকে উপমহাদেশে ব্যাপকভাবে ইসলাম প্রচারের সূচনা হয়। স্বভাবতই বাংলা অঞ্চলে যারা ইসলামে দাখিল হচ্ছিলেন, তাদের মধ্যে হিজরি সনের ব্যবহার চালু হয় বিভিন্ন ইবাদত পালনের সুবিধার্থে।
উল্লেখ্য, ইসলামি শরিয়তে চান্দ্রমাস তথা ইসলামি হিজরি সনের হিসাব রাখা ফরজে কেফায়া। প্রতিটি এলাকায় কোনো না কোনো ব্যক্তিকে অবশ্যই হিজরি সন-তারিখের খোঁজখবর রাখতে হবে। কেননা হিজরি সন-তারিখের সঙ্গেই সব ইবাদতের সম্পর্ক। যদি কোনো অঞ্চলে কেউ হিজরি সন-তারিখের খোঁজখবর না রাখে, তাহলে সবাইকে গোনাহগার হতে হবে।
৫৯৮ হিজরি মোতাবেক ১২০১ খ্রিষ্টাব্দে সিপাহসালার ইখতিয়ারুদ্দীন মুহাম্মাদ বিন বখতিয়ার খিলজী (রহ.) কর্তৃক বাংলা বিজয় হলে এখানে মুসলিম শাসনের গোড়াপত্তন হয়। ফলে হিজরি সন রাষ্ট্রীয় ও জাতীয় সন হিসেবে মর্যাদা লাভ করে এবং সালতানাতের কাজকর্মে এ হিজরি সনের ব্যবহার হতে থাকে, যা ব্রিটিশ রাজ কায়েম হওয়ার আগ পর্যন্ত চালু থাকে।
হিজরি সনের সঙ্গে ইবাদতের সম্পৃক্ততার কারণ : হিজরি সন পবিত্র চান্দ্রমাস। হিজরি সন চাঁদের পরিক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ায় এ সনের মাস কোনো নির্দিষ্ট ঋতুর সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে পারে না। আর সে কারণেই বিভিন্ন ঋতুতে ইবাদত পালনের ভিন্ন ভিন্ন স্বাদ ও আনন্দ উপলব্ধি করার সৌভাগ্য আমাদের হয়েছে। যদি নির্দিষ্ট ঋতুর সঙ্গে হিজরি মাসের সম্পৃক্ততা থাকত, তাহলে কখনও শীতকালে, আবার কখনও গরমের মৌসুমে, আবার কখনওবা বর্ষা মৌসুমে রোজা রাখার নতুন নতুন উপলব্ধি আমাদের হতো না।

চন্দ্র ও সৌরবর্ষের দৈর্ঘ্য : সূর্য নিজ কক্ষপথ ঘুরে আসতে সময় লাগে প্রায় ৩৬৫ দিন ৫ ঘণ্টা ৪৮ মিনিট ৪৬ সেকেন্ড। একে বলা হয় সৌর বছরের দৈর্ঘ্য। অন্যদিকে চন্দ্রকলার হ্রাস ও বৃদ্ধি সম্পাদনে সময় লাগে প্রায় ২৯ দিন ১২ ঘণ্টা। যে কারণে এক চান্দ্র বছর হতে সময় লাগে ৩৫৪ দিন ৮ ঘণ্টা ৪৮ মিনিট।

হিজরি সনের নবরূপ বাংলা সন : সম্রাট আকবর রাজস্ব আদায়ের সুবিধার্থে হিজরি সনের মর্যাদা অক্ষত রেখে একটি নতুন সৌর সন উদ্ভাবনের জন্য সেকালের এক প-িত জ্যোতির্বিজ্ঞানী আমির ফতেহ উল্লাহ সিরাজীকে ১৫৮৪ খ্রিষ্টাব্দে দায়িত্ব দেন। আমির ফতেহ উল্লাহ সিরাজী সেকালে প্রচলিত ও অপ্রচলিত বিভিন্ন পঞ্জিকা তুলনামূলক পর্যালোচনা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে একটি নতুন সৌর সন উদ্ভাবনের চেষ্টা করেন। শেষমেশ তিনি হিজরি চান্দ্র সনকেই সৌর গণনায় আনেন। তিনি হিজরি সনের বছর ৩৫৪ দিনের স্থলে ৩৬৫ দিনে এনে যে নতুন সন উদ্ভাবন করেন, সেটিই বাংলাদেশে বাংলা সন নামে প্রচলিত হয়।
১৫৮৫ খ্রিষ্টাব্দে সম্রাট আকবর এক শাহি ফরমান জারির মাধ্যমে এ রাজস্ব সন বা ফসলি সন প্রবর্তনের ঘোষণা প্রদান করেন। এ নতুন সন গণনার সূচনা বছর হিসেবে ধরা হয় বাদশাহ আকবরের মসনদে অধিষ্ঠিত হওয়ার বছর অর্থাৎ ১৫৫৬ খ্রিষ্টাব্দ মোতাবেক ৯৬৩ হিজরিকে। এ নতুন সৌর সন হিজরি সনকে ধারণ করে সৌর নিয়মে এগিয়ে যায়। হিজরি চান্দ্র সনের স্মৃতি ও পবিত্রতা স্বাভাবিকভাবেই বাংলা সনের মধ্যে বিরাজ করছে।

বাংলা বারো মাসের নামকরণ : ১৫৮৫ খ্রিষ্টাব্দ থেকে বাংলাদেশে বাংলা সন প্রচলিত হয়। এ সন সম্রাট আকবর কর্তৃক গঠিত সুবা বাঙলায় বিশেষ সন হিসেবে সর্বসাধারণ গ্রহণ করে। এ সনের প্রথম মাস হিসেবে গ্রহণ করা হয় শকাব্দের দ্বিতীয় মাস বৈশাখকে। আর শকাব্দের প্রথম মাস চৈত্র হয়ে যায় নতুন সনের দ্বাদশ মাস। শক রাজার নাম অনুযায়ী বহু আগে এ উপমহাদেশে শকাব্দের প্রচলন ছিল। এ নতুন বাংলা সনের সঙ্গে শকাব্দের মাসগুলো যুক্ত করা হয়। একমাত্র অগ্রহায়ণ মাস ছাড়া অন্য ১১টি মাস একেকটি নক্ষত্রের নাম ধারণ করে আছে।

বাংলা সনের ঐতিহ্য ও আমাদের স্বকীয়তা : বাংলা সন বাংলাদেশের মানুষের নিজস্ব সন। এর উৎপত্তি ও বিকাশের ইতিহাস ইসলামি উত্তরাধিকার থেকে প্রাপ্ত। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমাদের ঐতিহ্যগত অনুভূতি। আমাদের নিজস্বতা, আমাদের স্বকীয়তা। এক্ষেত্রে যাতে আমাদের ইসলামি মূল্যবোধ বজায় থাকে, সেদিকে অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে। নববর্ষ পালনের নামে উচ্ছৃঙ্খলতা, মঙ্গল প্রদীপ জ্বালিয়ে মঙ্গল কামনা করা, উলুধ্বনি দেওয়াÑ এগুলো আমাদের বাংলা সনের ঐতিহ্যগত বিষয় নয়। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি যে সম্প্রদায়ের সঙ্গে সাদৃশ্য অবলম্বন করে, সে ওই সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত।’
(আবু দাউদ : ৩৫১২)।

লেখক : মুহাদ্দিস, জামিয়া আরাবিয়া শামসুল উলুম নিশিন্দারা (কারবালা মাদ্রাসা), বগুড়া

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
দয়া করে আপনার নাম লিখুন