বাংলা ভাষায় সাংবাদিকতার পথিকৃৎ মওলানা আকরম খাঁ

আতাউর রহমান খসরু

ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসনে নিষ্পেষিত বাঙালি মুসলিম সমাজের জাগরণে যাঁরা নানাভাবে অবদান রেখে গেছেন মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ (১৮৬৮-১৯৬৮) তাঁদের অন্যতম। তিনি বাংলা ভাষায় সাংবাদিকতার অন্যতম পথিকৃৎ এবং বাঙালি মুসলিম সমাজে সাংবাদিকতার জনক। আধুনালুপ্ত দৈনিক আজাদের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবেই তিনি বেশি পরিচিত। তবে সাংবাদিকতার পাশাপাশি তিনি একজন সুলেখক, ধর্মবেত্তা, সমাজসেবক ও সময়ের প্রভাবশালী রাজনীতিকও ছিলেন। সব পরিচয়ের ঊর্ধ্বে তিনি ছিলেন ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম বাঙালি মুসলিম নেতা। মওলানা আকরম খাঁ তাঁর ধর্মাচার, লেখালেখি, সাহিত্যচর্চা, সাংবাদিকতা—সব কিছুর বিনিময়ে ভারতবর্ষের স্বাধীনতা ও মুসলিম স্বাধিকারের পক্ষে অবিরাম লড়াই করেন। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের জন্য তিনি জেল খাটেন এবং নিষিদ্ধ হয় তাঁর সম্পাদিত মাসিক মোহাম্মদী।

মওলানা আকরম খাঁ তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার চব্বিশ পরগনা জেলার বশিরহাট মহকুমায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মওলানা হাজি আবদুল বারী খাঁ গাজি মাত্র ১২ বছর বয়সে সৈয়দ আহমদ শহীদ (রহ.)-এর নেতৃত্বাধীন স্বাধীনতা আন্দোলনে যোগ দেন, যিনি ব্রিটিশ অপশাসনের অবসান ও খেলাফত ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ইংরেজ ও শিখদের সঙ্গে যুদ্ধে অবতীর্ণ হন এবং ঐতিহাসিক বালাকোটের ময়দানে দেশ ও জাতির জন্য জীবন উৎসর্গ করেন। সীমান্ত প্রদেশে সংঘটিত সেই যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার কারণে মওলানা হাজি আবদুল বারী খাঁকে ‘গাজি’ (যুদ্ধফেরত) বলা হতো। পিতার জীবনাদর্শ ও সংগ্রামী মনোভাব মওলানা আকরম খাঁকেও দারুণভাবে প্রভাবিত করে।

তিনি শৈশবে পিতা-মাতাকে হারিয়ে ভাগ্য-বিড়ম্বনার শিকার হন। তবু তাঁর মনোবল ও আকাঙ্ক্ষা ছিল অত্যন্ত উচ্চ। দুঃখকষ্ট ও দারিদ্র্যের মাঝেও তিনি নিষ্ঠার সঙ্গে লেখাপড়া করেন। ১৯০০ সালে তিনি কলকাতা আলিয়া মাদরাসা থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে এফএম পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। তবে মওলানা আকরম খাঁর জ্ঞানসাধনা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় আটকে ছিল না। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন জ্ঞানের অনুরাগী ও সাধক। বিশিষ্ট লেখক ও কলামিস্ট আবুল কাসেম ফজলুল হকের ভাষায়, ‘তিনি বাংলা, সংস্কৃত, ইংরেজি, আরবি, ফারসি, উর্দু—এই ছয়টি ভাষা জানতেন এবং নানা বিষয়ে অসাধারণ পণ্ডিত ছিলেন। তাঁর অসাধারণ পাণ্ডিত্য ছিল ইসলাম ধর্ম, হিন্দু ধর্ম, বৌদ্ধ ধর্ম, খ্রিস্ট ধর্ম, ইহুদি ধর্ম, ধর্মতত্ত্ব, বাংলার ইতিহাস, ভারতের ইতিহাস, ইংরেজ জাতির ইতিহাস, ইতিহাসতত্ত্ব, রাজনীতি ও রাষ্ট্রতত্ত্ব ইত্যাদি বিষয়ে। তাঁর রচনাবলিতে তাঁর পাণ্ডিত্য ও বিদ্যাবত্তার পরিচয় আছে। রাজনীতিবিদ হিসেবেও তিনি প্রভাবশালী ও গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন।’ (প্রবন্ধ : মওলানা আকরম খাঁ : তাঁর চিন্তা ও কর্ম, ভোরের কাগজ, ঈদ সাময়িকী ২০১৮)

শিক্ষাদীক্ষা, রাজনীতি, অর্থনীতি ও সামাজিক মর্যাদা—সর্বত্র পিছিয়ে থাকা ও অবহেলিত বাঙালি মুসলিম সমাজের জাগরণ ও সংস্কারে কর্মজীবনের শুরুতেই হাতে কলম তুলে নেন মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ। বাঙালি মুসলমানের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের লক্ষ্যে ১৯১০ সালে প্রতিষ্ঠা করেন সাপ্তাহিক মোহাম্মদী। ব্রিটিশ শাসনের বিরোধিতা করার অভিযোগে সরকার সাপ্তাহিক মোহাম্মদী বন্ধ করে দেয়। পরে ১৯১৭ সালে বের করেন আল এছলাম এবং ১৯২২ সালে অসহযোগ আন্দোলনের সময় মোহাম্মদী প্রকাশ করেন। এবারও ব্রিটিশ সরকার তা বন্ধ করে দেয়। ১৯৩৬ সালের ৩১ অক্টোবর তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় বাঙালি মুসলমানের প্রথম দৈনিক পত্রিকা দৈনিক আজাদ। পরবর্তীকালে বিশিষ্ট সাংবাদিক ও সাহিত্যিক আবুল কালাম শামসুদ্দীন দৈনিক আজাদের সম্পাদক হন। মওলানা আকরম খাঁ দৈনিক আজাদের মাধ্যমে বাঙালি মুসলমানের রাজনৈতিক আন্দোলন, সামাজিক জাগরণ, সাহিত্য-সংস্কৃতি ও বুদ্ধিবৃত্তিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক দৈনিক আজাদ সম্পর্কে বলেন, ‘আজাদ প্রকাশিত হয়েছে বাংলার মুসলমান সমাজের সার্বিক উন্নতির লক্ষ্য নিয়ে।…ইতিহাসের গতি নির্ধারণে আজাদ পালন করেছে অলধারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। আজাদ না থাকলে ইতিহাস অন্য রকম হতো। মওলানা আকরম খাঁ ও আজাদ তখন ইতিহাস সৃষ্টিতে কার্যকর ভূমিকা পালন করেছে।’ (প্রবন্ধ : মওলানা আকরম খাঁ : তাঁর চিন্তা ও কর্ম, ভোরের কাগজ, ঈদ সাময়িকী ২০১৮)

এ ছাড়া মওলানা আকরম খাঁ সম্পাদিত পত্রিকাগুলোতে কাজ করার সুযোগ পেয়ে অসংখ্য মুসলিম তরুণ সাংবাদিকতার প্রায়োগিক শিক্ষা লাভ করেন। পরবর্তীকালে নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে যথেষ্ট খ্যাতি অর্জন করেন। এখনো বাংলাদেশের অনেক প্রবীণ সাংবাদিক প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে তাঁর কাছে ঋণী। বাঙালি মুসলিম সমাজে সাংবাদিকতার অগ্রপথিক হিসেবে মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁর কৃতিত্ব ঐতিহাসিক তাৎপর্যমণ্ডিত।

মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ একজন সমাজ ও রাজনৈতিক সচেতন ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তিনি উপমহাদেশের প্রথম রাজনৈতিক দল কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠাকালীন (১৮৮৫ খ্রি.) কর্মী ছিলেন। এ সময় তিনি খেলাফত আন্দোলন ও অসহযোগ আন্দোলনেও সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। পরবর্তীকালে ভারতীয় কংগ্রেস মুসলিম স্বার্থ সংরক্ষণে ব্যর্থ হচ্ছে অভিযোগে ১৯৩৬ সালে মুসলিম লীগে যোগ দেন এবং পাকিস্তান আন্দোলনে জোরালো ভূমিকা রাখেন। তিনি মুসলিম লীগের প্রাদেশিক সভাপতিও ছিলেন। বাংলা একাডেমির চরিতাভিধানে মওলানা আকরম খাঁর রাজনৈতিক জীবন সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘আকরম খাঁ একজন বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ, মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনে নেতৃস্থানীয় সক্রিয় কর্মী, খেলাফত ও অসহযোগ আন্দোলনের নেতৃস্থানীয় কর্মী, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের স্বরাজ আন্দোলনের নেতৃস্থানীয় কর্মী হিসেবে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেন। মওলানা আকরম খাঁ কংগ্রেসে সক্রিয় ছিলেন এবং নেতৃস্থানীয় কর্মী ছিলেন। অসহযোগ আন্দোলনের সমর্থনে জোরালো সম্পাদকীয় লেখার জন্য তিনি এক বছর কারাদণ্ড ভোগ করেন। কারাগার থেকে মুক্ত হওয়ার পর তিনি অদম্য স্পৃহা নিয়ে ব্রিটিশ সরকারের প্রতিকূলে লেখালেখি ও সাংগঠনিক কার্যক্রম চালাতে থাকেন। ১৯২৯ সালে নেহরু রিপোর্টের প্রতিবাদে কংগ্রেস ত্যাগ করেন। নিখিল বঙ্গ প্রজা সমিতিরও অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন তিনি। এর প্রথম সাধারণ সম্পাদকও ছিলেন তিনি। ১৯৩৫ সালে তিনি বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভার সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৩৬ সাল থেকে তিনি মুসলিম লীগে সর্বশক্তি নিয়োগ করে কাজ করেন। ১৯৪৭ সালে তিনি বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন।’

১৯৫৪ সালে মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ সক্রিয় রাজনীতি থেকে অবসর গ্রহণ করেন। তার পরও তাঁর দৈনিক আজাদ পত্রিকা ও মাসিক মোহাম্মদীর মাধ্যমে তিনি বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও ইসলামী দাবিদাওয়ার সপক্ষে কাজ চালিয়ে যান। তিনি পাকিস্তান গণপরিষদ ও তালিমাতে ইসলামিয়া বোর্ডের সদস্য ছিলেন। বুদ্ধিজীবীমহলে তিনি পাকিস্তান অনুরাগী হিসেবে পরিচিত হলেও পাকিস্তানি শাসকদের অন্যায়ের প্রতিবাদে কখনো পিছপা হননি। আইয়ুব গণমাধ্যমের ওপর বিধি-নিষেধ আরোপ করলে ৮০ বছর বয়সে রাজপথে নেমে আসেন এবং সরকারবিরোধী আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলন শুরু হলে তিনি পাকিস্তান সরকারকে শান্তিপূর্ণ সমাধানের আহ্বান জানান।

মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁর রচনাভাণ্ডারও বেশ সমৃদ্ধ। তাঁর রচিত ‘মোস্তফা চরিত’ (১৯২৫) অমূল্য গ্রন্থ। তাঁর অনূদিত ‘বাংলা তফসিরুল কোরআন’ও (১৯৫৯) সমকালে জনপ্রিয়তা লাভ করে। ‘সমস্যা ও সমাধান’ (১৯৩১) গ্রন্থে বাংলায় মুসলিম সমাজের ও মুসলিম জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাবলির সমাধান দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। ‘গুণমান বাংলার সামাজিক ইতিহাস’ও  অত্যন্ত মূল্যবান গ্রন্থ। ‘মুক্তি ও ইসলাম’ (১৯৩৯) গ্রন্থে তিনি ইসলামে ধর্মীয় চিন্তার পুনর্গঠনের আহ্বান জানিয়েছেন। ‘মোছলেম বঙ্গের সামাজিক ইতিহাস’ (১৯৬৫) গ্রন্থে বাংলাদেশের ইতিহাস, বাঙালি মুসলমানের সামাজিক অবস্থার পর্যালোচনা, তাদের অধঃপতন ও উন্নয়নের বিভিন্ন দিক নিয়ে গভীর ও জ্ঞানগর্ভ আলোচনা করেছেন তিনি। তাঁর গুরুত্বপূর্ণ আরো কয়েকটি বই হলো—‘ইসলামের আদর্শ’ (১৯৩৯), ‘উম্মুল কেতাব’ (১৯৩৯), ‘বাইবেলের নির্দেশ ও প্রচলিত খৃস্টধর্ম’ (১৯৩৯), ‘বারোয়ারি’ (১৯৩৩)। এ ছাড়া তাঁর অনেক লেখা অগ্রন্থিত রয়ে গেছে।

১৯৬৮ সালের ১৮ আগস্ট ঢাকার বংশালের আহলে হাদিস মসজিদে নামাজরত অবস্থায় তাঁর ইন্তেকাল হয়। তাঁর মৃত্যুর পর প্রখ্যাত সাংবাদিক আবুল মনসুর আহমদ লেখেন, ‘শতাব্দীকালের একটি মহীরুহ, বিস্তীর্ণ ছায়াদার একটি বটবৃক্ষ ভূমিসাৎ হইল। দেশ হারাইল এক আলোকস্তম্ভ, দেশবাসী হারাইল বাড়ির মুরুব্বি, সাংবাদিক, সাহিত্যিকরা হারাইলেন উপদেষ্টা, রাজনীতিবিদরা হারাইলেন একজন অনুপ্রেরণাদাতা। সারা পাকিস্তানের ধসিয়া পড়িল একটি  সু-উচ্চ মিনার। শোকাচ্ছন্ন হইল সারা দেশ। দুই মাস আগে যারা আনন্দ কলরবে সরব হইয়াছিলেন, দুই মাস পরে তারাই আবার জানাযার শোক মিছিলে নীরব হইলেন।’ (মওলানা আকরম খাঁ, পৃষ্ঠা-৫৬, আবু জাফর সংকলিত ও সম্পাদিত, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ)

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
দয়া করে আপনার নাম লিখুন