বাঙালি মুসলমানদের ওপর বঙ্গবন্ধুর ঋণ

কাসেম শরীফ

এটা দিবালোকের মতো পরিষ্কার যে ১৯৭১ সালের যুদ্ধ ইসলামের বিরুদ্ধে ছিল না, ছিল জালিম পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে। মুক্তিযুদ্ধের সময় ‘মোনাফিকদের ক্ষমা নেই’ শীর্ষক একটি সরকারি প্রচারপত্রের শেষে লেখা ছিল, “আল্লাহ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, ‘সত্যের জয় ও মিথ্যার বিনাশ অবশ্যম্ভাবী।’ বাঙালি এতে সম্পূর্ণ বিশ্বাসী।” (হাসান হাফিজুর রহমান, বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ : দলিলপত্র, তৃতীয় খণ্ড, পৃ. ৩৩৩-৩৩৬)

এই প্রচারপত্রে ফুটে উঠেছে যে ঈমানি প্রেরণা নিয়েই মুসলমানরা ১৯৭১ সালে যুদ্ধ করেছে। যারা এ নিয়ে তর্ক করতে চায়, তারা আসলে বিভ্রান্তির শিকার। এ বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছিল স্বাধীনতার পরই, মুষ্টিমেয় লোকের মাধ্যমে। বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে এই বিভ্রান্তির ক্ষেত্র তৈরি হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু স্বদেশে ফিরে এসে এই বিভ্রান্তি দূর করেন। আবুল মনসুর আহমদের ভাষায়, “এখানে শুধু এইটুকু বলিলেই যথেষ্ট হইবে যে একটা বিভ্রান্তি সত্যই সৃষ্টি হইয়াছিল। সে বিভ্রান্তি পাকিস্তানের পরিণাম, বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় জাতীয় স্বকীয়তা, ধর্মনিরপেক্ষতা ইত্যাদি সকল ব্যাপারে পরিব্যাপ্ত ছিল। ফলে তাহাদের মধ্যে এমন ধারণাও সৃষ্টি হইয়াছিল যে নিজেদের ‘মুসলমান’ ও নিজেদের রাষ্ট্রকে ‘মুসলিম রাষ্ট্র’ বলিলে সাধারণভাবে হিন্দুরা বিশেষভাবে ভারত সরকার অসন্তুষ্ট হইবেন।…

শেখ মুজিবের প্রত্যাবর্তন এক মুহূর্তে এই কুয়াশা দূর করিয়া দিয়াছিল। ১০ই জানুয়ারির ওই একটি মাত্র বক্তৃতার তুফানে বাংলাদেশের আসমান হইতে ওই বিভ্রান্তিকর কালমেঘ মিলাইয়া গিয়াছিল।

শেখ মুজিব তাঁর বক্তৃতায় তিনটি গুরুত্বপূর্ণ এবং আশু প্রয়োজনীয় ঘোষণা করিয়াছিলেন : ১. আমি মুসলমান, আমার বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম রাষ্ট্র; (২) আমাকে মুক্তি দেওয়ার জন্য আমি মি. ভুট্টোর কাছে কৃতজ্ঞ। কিন্তু সে কৃতজ্ঞতার দরুন আমি দুই অঞ্চল মিলিয়া এক পাকিস্তান রাখিবার তাঁর অনুরোধ রাখিতে পারিলাম না। বাংলাদেশ স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রই থাকিবে; (৩) তাঁদের সৈন্যবাহিনী বাংলাদেশের জনগণের ওপর যে অকথ্য জুলুম করিয়াছে, দুনিয়ার ইতিহাসে তার তুলনা নাই।…শেখ মুজিবের এই তিনটি ঘোষণাই জনগণের অন্তরের কথা ছিল। বিপুল হর্ষধ্বনি করিয়া সেই বিশাল জনতা শেখ মুজিবের উক্তি সমর্থন করিয়াছিল।” (আবুল মনসুর আহমদ, আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর, খোশরোজ কিতাব মহল, বাংলাবাজার, ঢাকা, পৃ. ৬০৪-৬০৫)

ওই সমাবেশে বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করেছেন, ‘বাংলাদেশ পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম অধ্যুষিত দেশ। ইন্দোনেশিয়ার পরেই এর স্থান। মুসলিম জনসংখ্যার দিক দিয়ে ভারতের স্থান তৃতীয় এবং পাকিস্তানের স্থান চতুর্থ। কিন্তু অদৃষ্টের পরিহাস। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ইসলামের নামে এ দেশের মুসলমানদের হত্যা করেছে, আমাদের নারীদের বেইজ্জত করেছে। ইসলামের অবমাননা আমি চাই না।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমি মুসলমান, মুসলমান একবারই মরে, বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম রাষ্ট্র।’ তাঁর এই ভাষণটি বহু বিভ্রান্তির অবসান করেছিল। বিখ্যাত রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক ও সাহিত্যিক আবুল মনসুর আহমদ লিখেছেন, ‘চিন্তার বিভ্রান্তি এভাবে দূর হওয়ার অল্পদিনের মধ্যে কাজের বিভ্রান্তির অবসান করলেন মুজিব নেতৃত্ব। রেডিও-টেলিভিশনে কোরআন তেলাওয়াত, আসসালামু আলাইকুম, খোদা হাফেজ বহাল হলো। ‘ধর্ম ও জীবন’ সম্পর্কে কোরআন-হাদিসভিত্তিক সাপ্তাহিক আলোচনা আবার শুরু হলো। সরকারি ফাংশনেও মিলাদ মাহফিল হতে লাগল। জনগণ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।’ (আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর, পৃষ্ঠা-৭৭২)।

এ প্রসঙ্গে ভারতের সাবেক পররাষ্ট্র সচিব জে এন দীক্ষিতের পুস্তকের কিছু পর্যবেক্ষণ পেশ করা যেতে পারে। তিনি তার Liberation and Beyond, Dhaka (UPL, 1999) পুস্তকের Person of Sheikh Mujibur Rahman অধ্যায়ের এক স্থানে লিখেছেন, ‘শেখ মুজিব অনুধাবন করেন যে এভাবেই বাংলার মুসলমানরা এক সম্মানজনক অবস্থানের অধিকারী হতে পারবেন। ধর্মীয়ভাবে তিনি গোঁড়া ছিলেন না বটে, কিন্তু তাঁর স্থির বিশ্বাস জন্মেছিল, বাংলার মুসলমানদের ইসলামী স্বাতন্ত্র্যই শুধুমাত্র হিন্দুপ্রধান ভারতের কাছ থেকে তাদের যথার্থ দাবি আদায়ে সক্ষম হবে।’ [He felt that it was the only way in which muslims of Bengal could ensure for themselves a place under the sun. He was not a religious extremist but was deeply convreced of the sanctity and relevance of the islamic identity of Bengali Muslims who he felt world not get a fair deal from Hindu dominated India. P.220]

আবুল মনসুর আহমদ আরো লিখেছেন : “এই সব বিভ্রান্তির মধ্যে প্রধান এই : ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতায় পাকিস্তান ভাঙিয়া গিয়াছে; ‘দ্বিজাতিতত্ত্ব’ মিথ্যা প্রমাণিত হইয়াছে।’ এটা সাংঘাতিক মারাত্মক বিভ্রান্তি।…অথচ প্রকৃত অবস্থাটা এই যে বাংলাদেশের স্বাধীনতায় পাকিস্তানও ভাঙে নাই; ‘দ্বিজাতিতত্ত্ব’ও মিথ্যা হয় নাই। এক পাকিস্তানের জায়গায় লাহোর প্রস্তাবের মতো দুই পাকিস্তান হইয়াছে।…পশ্চিমা জনগণ তাদের রাষ্ট্র—নাম রাখিয়াছে ‘পাকিস্তান’। আমরা পূরবীরা রাখিয়াছি বাংলাদেশ। এতে বিভ্রান্তির কোনো কারণ নাই।” (আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর, পৃ. ৬৩২, ৬৩৪)
বর্তমান বাংলাদেশে ইসলামের খেদমতে বঙ্গবন্ধুর বহু অবদানের কথা তুলে ধরা হয়। কিন্তু উল্লিখিত দিক তুলে ধরা হয় না। অথচ ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু ইসলাম ও মুসলিম পরিচয় তুলে দিয়ে বাংলাদেশের চেহারা ভিন্ন ধরনের হতো, এটা বলাই বাহুল্য।
লেখক : সাংবাদিক
kasemsharifcu@gmail.com

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
দয়া করে আপনার নাম লিখুন