কে জিতেছে, এরদোয়ান না আসাদ?

সিরিয়ার সর্বশেষ বিদ্রোহী অধ্যুষিত প্রদেশ ইদলিবে তুরস্ক-রাশিয়ার ‘নিরাপদ অঞ্চল’ গড়ার সমঝোতা কোন পক্ষকে সুবিধা করে দিচ্ছে তা এখনও স্পষ্ট নয়। সব পক্ষই নিজেদের বিজয় বা সুবিধা মনে করছে।

পরস্পরের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়া সিরিয়া প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদ এবং তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যিপ এরদোয়ান নিজেদের জন্য বিজয় মনে করছে।

তুরস্ক দীর্ঘদিন ধরে চেষ্টা করে এসেছে বিবাদমান দুই পক্ষ সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদ এবং বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করার জন্য।

গত বছর কাজাখস্তানের রাজধানী আস্তানায় উভয় পক্ষ যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হলেও পরে কেউই তা আর রক্ষা করতে পারেনি।

উল্লেখ্য, ২০১১ সালে আরব বসন্তের সময় প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদকে হটাতে দেশব্যাপী ব্যাপক বিক্ষোভ হয়। বিক্ষোভ ঠেকাতে সেনাবাহিনী অভিযান শুরু করলে সিরিয়াতে গৃহযুদ্ধ বেধে যায়। সেই থেকে গত ৮ বছর ধরে দেশটিতে বিভিন্ন পক্ষ যুদ্ধে লিপ্ত রয়েছে।

২০১৪ সালে আইএস ইরাক ও সিরিয়ার বেশকিছু এলাকা দখল করে খেলাফত ঘোষণা করে। সিরিয়ার উত্তরাঞ্চলের রাকা শহরকে রাজধানী ঘোষণা করেছিল আইএস।

তখন আইএস নিধনের জন্য সিরিয়ায় হামলা শুরু করে আমেরিকার সৈন্যরা। এখনো আমেরিকার সেনাবাহিনী দেশটির উত্তরাঞ্চলে অবস্থান করছে। আসাদবিরোধী কুর্দি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে অর্থ ও সামরিক সহযোগিতা দিয়ে আসছে আমেরিকা।

২০১৫ সাল থেকে আসাদকে সহযোগিতা করতে সিরিয়ার বন্ধু রাষ্ট্র রাশিয়া বিদ্রোহীদের লক্ষ্য করে বিমান হামলা শুরু করে।

তুরস্ক শুরু থেকেই বাশার আল আসাদকে সরে যেতে বলে এসেছে। উল্লেখ্য, ঐতিহাসিকভাবে তুরস্কের সাথে সিরিয়ার শত্রুতামূলক সম্পর্ক রয়েছে।

তুরস্কের সৈন্যও সিরিয়ার বিভিন্ন স্থানে মোতায়েন রয়েছে। এছাড়া বিদ্রোহী কতগুলো গ্রুপকেও তারা সহযোগিতা করছে।

এদিকে সিরিয়ার চিরশত্রু ইসরাইলও বিদ্রোহীদের শুরু থেকে সহযোগিতা করে আসছে। গত দুই বছরে সিরিয়ায় দুই শতাধিকবার বিমান হামলাও করেছে ইসরাইল।

সম্প্রতি কয়েকদফা দ্বিপাক্ষিক আলোচনার পর সংঘাতময় ইদলিব প্রদেশে তুরস্ক-রাশিয়া ‘নিরাপদ অঞ্চল’ গড়তে সম্মত হয়।

রাশিয়া ও তুরস্কের এমন পদক্ষেপে আমেরিকা, সিরিয়া ও ইরান স্বাগত জানিয়েছে।

আমেরিকা আশা প্রকাশ করে জানিয়েছে যে, এর মাধ্যমে ইদলিবে বিভিন্ন পক্ষ স্থায়ী যুদ্ধবিরতির লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবে।

তবে রাশিয়ার সোচিতে পুতিনের সাথে এরদোগানের বৈঠকের এক সপ্তাহ পূর্বে ইদলিবে ১২টি অবস্থানে সৈন্য সংখ্যা বাড়িয়েছিল তুরস্ক।

এছাড়া আসাদ বিরোধী গোষ্ঠীগুলোকে দেশটি ভারী অস্ত্র প্রদান করে।

উল্লেখ্য, গত ১০ সেপ্টেম্বর তেহরানে ইরান ও রাশিয়ার সাথে ইদলিব প্রসঙ্গে বৈঠকে মিলিত হয়েছিল তুরস্ক। সে সময় ইদলিবে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব মেনে নেয়নি রাশিয়া ও ইরান।

অবশেষে তুরস্ক ও রাশিয়ার এই সমঝোতায় ইদলিবে ‘সামরিক অভিযানমুক্ত এলাকা’ চিহ্নিত করার ব্যাপারে উভয় পক্ষ সম্মত হয়েছে।

‘বাফার জোন’ বা ‘নিরাপদ এলাকা’ চিহ্নিত হলে বেসামরিক নাগরিকরা সেখানে আশ্রয় নিতে পারবে।

এতে আশা করা হচ্ছে, হতাহতের পরিমাণ আশঙ্কার চেয়ে কমে আসবে।

এরদোয়ান ও পুতিনের সমঝোতার ফলে সিরিয়ায় প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের স্বপ্ন শেষ হতে বসেছে বলে মন্তব্য করেছেন আসাদ সরকারের বিদ্রোহী গোষ্ঠী ফ্রি সিরিয়ান আর্মি কমান্ডার মুস্তফা সিরাজি।

কমান্ডার মুস্তফা সিরাজি বলেন, রাশিয়া-তুরস্কের ‘নিরাপদ অঞ্চল’ চুক্তিটি বাশার আল আসাদের সিরিয়া নিয়ন্ত্রণের স্বপ্ন নস্যাত করে দেবে।

তিনি আরো বলেন, ‘এই চুক্তির মাধ্যমে ইদলিবের সাধারণ মানুষ সিরিয়ার সেনাদের বোমা নিক্ষেপ থেকে রক্ষা পেলো।’

তবে ‘সিরিয়ান নেগোসিয়েশন কমিটি’র মুখপাত্র ইয়াহিয়া আল আরিদি রাশিয়া-তুরস্কের এই চুক্তি সম্পর্কে বলেন, ‘এর ফলে সম্ভাব্য হামলা ও ধ্বংসযজ্ঞ এড়ানো গেল এবং যে সময় পাওয়া গিয়েছে তাও কম নয়।’

‘আমরা আশা করছি এটা স্থায়ী হবে। এর মাধ্যমে শান্তির জন্য পথ খুঁজে পাওয়া সম্ভব হবে।’

‘নিরাপদ অঞ্চল’ পরিকল্পনা অনুযায়ী ১৫ আগস্ট থেকে ইদলিবের বেসামরিক নাগরিকদের জন্য বাফার জোন বা নিরাপদ অঞ্চল কার্যকর হবে।

উল্লেখ্য, ফ্রি সিরিয়ান আর্মিসহ অন্যান্য বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো সিরিয়ার সব প্রদেশ থেকে পরাজিত হয়ে সর্বশেষ ইদলিবে আশ্রয় নিয়েছে।

সিরিয়ার সেনাবাহিনী এবং রাশিয়ার বিমানবাহিনী ইদলিবে ইতিমধ্যে কয়েকদফা হামলা চালিয়েছে।

সোচিতে অনুষ্ঠিত তুরস্ক ও রাশিয়ার মধ্যকার এই চুক্তির পর প্রেসিডেন্ট পুতিন বলেন, ‘ইদলিব সীমান্ত থেকে ৯-১২ কিলোমিটার ভেতরে ১৫-২০ কিলোমিটার চওড়া বেসামরিক অঞ্চল তৈরি করা হবে। সেখানে কোন পক্ষ যুদ্ধে লিপ্ত হবে না।’

‘১০ অক্টোবরের মধ্যে বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোকে প্রস্তাবিত বেসামরিক অঞ্চল থেকে ভারি অস্ত্রপাতি সরিয়ে ফেলতে হবে। আর আসাদ সরকারকে রাশিয়া ইদলিবে প্রবেশ ও হামলা করতে বাধা দিবে।’

জেএস/

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
দয়া করে আপনার নাম লিখুন