হিজরি সনের ইতিহাস-ঐতিহ্য-তাৎপর্য

মাওলানা আনোয়ার হোসাইন

ঐতিহাসিকদের মতে ভূমণ্ডলের ওপর মানবজাতির আধিক্য সমাজকে তারিখ ও বর্ষপঞ্জির প্রয়োজনীয়তার দিকে ধাবিত করে। সর্বপ্রথম বর্ষপঞ্জি গণনা শুরু হয় হজরত আদম (আ.)-কে আল্লাহ তায়ালা জান্নাত থেকে পৃথিবীতে পাঠানোর সময়কে ভিত্তি করে।
পরবর্তী সময়ে গুরুত্বপূর্ণ অনেক ঘটনাকে কেন্দ্র করে বর্ষপঞ্জির ধারাবাহিকতার ইতিহাস পাওয়া যায়। যথা : হজরত নূহ (আ.)-এর মহাপ্রলয়, হজরত ইব্রাহিম (আ.)-কে অভিশপ্ত নমরুদ কর্তৃক অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করা, হজরত ইউসুফ (আ.) মিসরের শাসনকর্তা নিযুক্ত হওয়া, মূসা (আ.) তদানীন্তন জালিমশাহী ফেরাউনের নির্যাতনে অতিষ্ঠ হয়ে বনি ইসরাইলের বহুধা-বিভক্ত সম্প্রদায়কে সঙ্গে নিয়ে মহান আল্লাহর নির্দেশে মিসর ছেড়ে চলে যাওয়া, হজরত দাউদ (আ.)-এর নবুওয়াত ও শাসনকাল, এরপর হজরত সোলাইমান (আ.)-এর রাজত্বকাল, হজরত ঈসা (আ.)-এর জন্ম ইত্যাদিকে কেন্দ্র করেই মূলত সমসাময়িকভাবে বর্ষপঞ্জি তারিখ গণনার সূত্রপাত হয় বলে ঐতিহাসিকদের ধারণা।

পরবর্তী সময়ে প্রত্যেক গোত্র, সম্প্রদায়, জনগোষ্ঠী তাদের নিজেদের মধ্যে ঘটে যাওয়া বিশেষ কোনো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাকে কেন্দ্র করে বর্ষগণনা শুরু করত। বর্ষগণনার উল্লিখিত প্রথা যেমনটা ছিল অনারবদের মধ্যে, তদ্রূপ প্রচলন ছিল আরব জাতির মধ্যেও। বাসুস যুদ্ধ যা বকর বিন ওয়ায়েল ও বনি যুহাল গোত্রের মধ্যে একটা উষ্ট্রীকে কেন্দ্র করে ৪০ বছর ধরে চলমান ছিল। ওই যুদ্ধকে মূল ভিত্তি বানিয়ে বর্ষগণনার সূত্রপাত করেন আরবরা। এর পরে দাইস যুদ্ধ ও আসহাবে ফীল তথা হস্তীবাহিনীর ঘটনাকে কেন্দ্র করে বর্ষপঞ্জি প্রণয়ন করা হয়। (উমদাতুল কারী ১৭/৬৬)

বর্ষপঞ্জি প্রণয়নের উপায় : আল্লাহ তায়ালা মানবজাতিকে সন গণনার বিশেষ দুটি পদ্ধতি সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে মৌলিক ধারণা দিয়েছেন। ১. চন্দ্র কেন্দ্রিক সন ২. সূর্য কেন্দ্রিক সন।

চাঁদের গতি-প্রকৃতি হিসাবে যে সন গণনা করা হয়, সেটাকে বলা হয় চান্দ্রসন, আর সূর্যের গতি-প্রকৃতি হিসাবে যে সন গণনা করা হয়, তাকে বলা হয় সৌরসন। আর তা নির্ভর করে সূর্য ও চন্দ্র উভয়ের জন্য আল্লাহ তায়ালা যে কক্ষপথ নির্ধারণ করে দিয়েছেন তাতে উভয়ের পরিভ্রমণের ওপর। তবে চাঁদ যেহেতু প্রতি মাসে তার নিজস্ব পরিক্রমণ সমাপ্ত করে ফেলে, সেহেতু চন্দ্রকলার হ্রাস ও বৃৃদ্ধিসম্পাদনে সময় লাগে প্রায় ২৯ দিন ১২ ঘণ্টা। তাই এক চান্দ্রবছর হতে সময় লাগে ৩৫৪ দিন ৮ ঘণ্টা ৪৮ মিনিট।

আর সূর্য তার কক্ষপথে একবার পরিভ্রমণ করতে সময় লাগে প্রায় ৩৬৫ দিন ৫ ঘণ্টা ৪৮ মিনিট ৪৬ সেকেন্ড। এটাই সৌর বছরের দৈর্ঘ্য। বর্তমান দুনিয়ায় প্রচলিত ইংরেজি সন হচ্ছে সৌর সন এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হিজরতের স্মৃতিবিজড়িত হিজরি সন হচ্ছে চান্দ্রসন। আমাদের বাংলা সন মূলত হিজরি চান্দ্রসনেরই সৌরকরণের ফল। বাংলা সনের উৎপত্তির ইতিহাস পর্যালোচনা করলেই তা প্রমাণিত হয়। তাই আগের হিসাব মতে সৌরবর্ষ তথা ইংরেজি বর্ষ দাঁড়ায় ৩৬৫ দিনে এবং হিজরি বর্ষ বা চান্দ্রবর্ষ দাঁড়ায় ৩৫৪ দিনে আর বাংলা সন যেহেতু চান্দ্রসনের সৌরকরণের ফল, তাই বাংলা বর্ষগণনাও ৩৫৪ দিনের পরিবর্তে ৩৬৫ দিন হবে।

হিজরি সনের ইতিকথা : হিজরি সন এমন একটি সন, যার সঙ্গে মুসলিম উম্মাহর তাহজিব-তামাদ্দুনিক ঐতিহ্যের ভিত্তি সম্পৃক্ত। এটি এমন একটি স্মারক, যার সঙ্গে জড়িত আছে বিশ্বমানবতার মুক্তির দূত সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব প্রিয় নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রিয় ও পুণ্যময় জন্মভূমি মক্কানগরী ত্যাগ করে বিরহ বেদনা নিয়ে মদিনা শরিফ গমনের ঐতিহাসিক ঘটনা। ৬১০ খ্রিস্টাব্দে মহানবী (সা.) মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে নবুওয়াতপ্রাপ্তির পর আল্লাহ অস্বীকারকারীদের এক আল্লাহর দিকে আহ্বান করেছিলেন, তখন তার সবচেয়ে প্রিয় মানুষেরা তার বিরোধিতা শুরু করে দিয়েছিল। গোপনে গোপনে তিনি তিন বছর দাওয়াত দিয়েছিলেন। এরপর আল্লাহর নির্দেশে সাফা পাহাড়ে প্রকাশ্যে এক আল্লাহর ওপর ইমান আনয়নের ঘোষণা করেছিলেন, তখন থেকেই শুরু হয়েছিল নির্যাতনের ধারা। পথে প্রান্তরে তাকে আহত, অপমানিত, লাঞ্ছিত করা হতো। অত্যন্ত ধৈর্য ও পরম সাহসিকতার সঙ্গে মহানবী (সা.) তাঁর মিশন সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে থাকেন। মক্কার কাফেররা একদিন সর্ব শেষ নীতি নির্ধারণের উদ্দেশ্যে তাদের ‘নদওয়া’ মন্ত্রণা গৃহে সব গোত্রপতির একটি বৈঠক আহ্বান করল। সেখানে তারা সিদ্ধান্ত নিল, আমরা নানা কৌশল করে মুহাম্মদ (সা.)-কে ঠেকাতে চেয়েছি। কিন্তু কিছুই হলো না, বরং তার চেয়ে আমরা মুহাম্মদকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিই। সবাই এই সিদ্ধান্তের ওপর তাদের সমর্থন ব্যক্ত করল এবং এই মহাঘৃণ্যতম কাজ আঞ্জাম দেওয়ার জন্য সব গোত্র থেকে শক্তিশালী যুবকদের বাছাই করা হলো। ঘোষণা করা হলো, যে মুহাম্মদ (সা.)-কে জীবিত অথবা মৃত এই ‘নদওয়া’ গৃহে হাজির করতে পারবে, তাকে ১০০ উট পুরস্কার দেওয়া হবে। মক্কার সব গোত্র থেকে শক্তিশালী যুবকরা একত্রিত হয়ে শপথ নিল আজ রাতেই মুহাম্মদ (সা.)-এর বাড়ি ঘেরাও করে তার জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটানো হবে।

এদিকে আল্লাহ তায়ালা তাঁর প্রিয় হাবিবকে নির্দেশ করলেন, হে নবী! মক্কার মানুষ আপনাকে চায় না, মদিনার মানুষ আপনার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন, মদিনায় আপনি হিজরত করে চলে যান। মহানবী (সা.) আল্লাহ তায়ালার এই ঘোষণা পাওয়ার পর ৬২২ খ্রিস্টাব্দের ১২ সেপ্টেম্বর মোতাবেক ২৭ সফর মক্কা মুকাররামা থেকে মদিনার উদ্দেশে হিজরত করেন। ২৩ সেপ্টেম্বর ৬২২ খ্রিস্টাব্দে মোতাবেক ৮ রবিউল আওয়াল কোবায় পৌঁছেন। ২৭ সেপ্টেম্বর ৬২২ খ্রিস্টাব্দে মোতাবেক ১২ রবিউল আওয়াল মদিনা মুনাওয়ারায় পৌঁছেন মহানবী (সা.)। এ হিজরতেরই স্মৃতিবহন করে আসছে আমাদের হিজরি সন। হিজরি বর্ষ গণনা বিক্ষিপ্তভাবে শুরু হয় মূলত রাসুলে করিম (সা.)-এর জামানা থেকেই। ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা অর্ধ দুনিয়ার ন্যায়পরায়ণ শাসক হজরত ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর খেলাফতকালে এসে প্রকাশিত হয় এর সুনির্দিষ্ট রূপ।

মহররম মাস দ্বারা কেন হিজরি সন শুরু হয়? : আগেই আলোচনা করা হয়েছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন মদিনা মুনাওয়ারায় আসেন, তখন মাসটি ছিল রবিউল আওয়াল। আমীরুল মু’মিনীন হজরত উমর (রা.) হিজরি সনের প্রথম মাস ধরেন মহররমকে। এর পেছনেও রয়েছে বিরাট তাৎপর্য। মহানবী (সা.) যদিও মদিনা শরিফে হিজরত করে পৌঁছেন রবিউল আওয়াল মাসে। কিন্তু হিজরতের মূল পরিকল্পনা হয়েছিল নবুওয়াতের ১৩তম বর্ষের হজের মৌসুমে মদিনার আনসারী সাহাবায়ে কেরামের সঙ্গে আকাবার দ্বিতীয় শপথ থেকে। আর তা অনুষ্ঠিত হয় জিলহজ মাসে। মহররম মাস তার পরের মাস। মুসলমানদের হিজরতকারী প্রথম দলটি মদিনা মুনাওয়ারায় পৌঁছেন মহররম মাসে। আর মুসলমানদের এই হিজরত ছিল মহানবী (সা.)-এর মদিনায় হিজরতের সূচনা পর্ব।

তাছাড়া ইমাম শাওকানী (রহ.) লিখেন, চান্দ্রমাস তথা আরবি মাসের তারতীব ও ধারাবাহিকতা এবং মাসগুলোর নাম স্বয়ং আল্লাহ নির্ধারণ করে দিয়েছেন। এই নামগুলো কোনো মানুষের রাখা নয়।

বাংলাদেশে হিজরি সনের প্রচলন : ৬৩৮ খ্রিস্টাব্দে হজরত ওমর (রা.) কর্তৃক হিজরি সন প্রবর্তিত হওয়ার এক বছর পরই আরব বণিকদের আগমনের মাধ্যমে আমাদের দেশে প্রচলিত ইসলামের প্রচার ও প্রসার শুরু হয়। সঙ্গে সঙ্গে হিজরি সনও ক্রমান্বয়ে এ দেশে প্রসারিত হতে থাকে। ৫৯৮ হিজরি মোতাবেক ১২০৯ খ্রিস্টাব্দে ইখতিয়ার উদ্দীন মুহাম্মদ বখতিয়ার খিলজীর বঙ্গবিজয়ের মাধ্যমে বাংলার জমিনে মুসলিম শাসনের ইতিহাস সূচিত হয়। এই সময় থেকে এখানে হিজরি সন রাষ্ট্রীয় মর্যাদা লাভ করে জাতীয় সনে পরিণত হয়। যা ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দের ২৩ জুন পলাশীর যুদ্ধ পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। ইতিহাসবিদদের মতে, উপমহাদেশে প্রায় ৫৫০ বছর রাষ্ট্রীয়ভাবে এই হিজরি সন স্বীকৃত ছিল। ইংরেজ শাসনকালে আমাদের দেশে খ্রিস্টাব্দ সনের প্রচলন হয়। যা আজও আমরা ব্যবহার করছি।

হিজরি বর্ষ অনুসরণে ইসলামী শরিয়তের বিধান : হজরত মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) বলেন, সৌর হিসাব রাখা ও ব্যবহার করা একেবারেই নাজায়েজ নয়। বরং এই এখতিয়ার থাকবে, কোনো ব্যক্তি নামাজ, রোজা, জাকাত, ইদ্দতের ক্ষেত্রে চান্দ্রবর্ষের হিসাব ব্যবহার করবে। কিন্তু ব্যবসা-বাণিজ্যসহ অন্যান্য বিষয়ে সৌর হিসাব ব্যবহার করবে। কিন্তু শর্ত হলো, সামগ্রিকভাবে মুসলমানদের মধ্যে চান্দ্র হিসাবের প্রচলন থাকতে হবে। যাতে রমজান, হজ ইত্যাদি ইবাদতের হিসাব জানা থাকে। এমন যাতে না হয়, শুধু জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি ছাড়া অন্য কোনো মাসই তার জানা নেই। ইসলামী ফিকাহবিদগণ চান্দ্রবর্ষের হিসাব রাখাকে মুসলমানদের জন্য ফরজে কিফায়া বলেছেন। এতে সন্দেহের অবকাশ নেই, চান্দ্রমাসের হিসাবের অনুসরণ নবীজি (সা.) ও খোলাফায়ে রাশেদার সুন্নাত। যাদের অনুসরণ আমাদের জন্য পুণ্যময় ও কল্যাণকর আমল।

লেখক : সহকারী সম্পাদক, মাসিক আল আবরার

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
দয়া করে আপনার নাম লিখুন