ঈমানদারের কাঙ্খিত মৃত্যু

মাওলানা কাসেম শরীফ

প্রত্যেকেই শুভ পরিণাম প্রত্যাশা করে। একজন মুমিনের পরম প্রত্যাশিত বস্তু হলো ইমানের সঙ্গে মৃত্যুর সৌভাগ্য লাভ করা।

কোনো মুমিনের শেষ পরিণাম ভালো হওয়ার আলামত হলো, মৃত্যুর আগেই সে যাবতীয় পাপ থেকে তাওবা করে নিজেকে শুধরে নেওয়া। ভালো কাজ ও আল্লাহর আনুগত্যের প্রতি ক্রমেই ধাবিত হওয়া। আমলি জিন্দেগিতে তার মৃত্যু হওয়া। খাঁটি মুমিন মৃত্যুর আগে জান্নাতের সুসংবাদ পেতে থাকে। ফলে তাঁর চেহারায় আনন্দের দীপ্তি প্রকাশিত হয়। আল্লাহ বলেন, “যারা বলে, ‘আমাদের প্রতিপালক আল্লাহ’, অতঃপর (ইমানের ওপর) অবিচলিত থাকে (মৃত্যুর সময়), তাদের কাছে ফেরেশতা অবতীর্ণ হয়ে বলতে থাকে, ‘তোমরা ভীত হয়ো না, চিন্তিত হয়ো না। এবং তোমাদের যে জান্নাতের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে তার জন্য আনন্দিত হও। ’ ’’ (সুরা হা-মিম আসসিজদা, আয়াত, ৩০) শায়খ আলবানি (রহ.) তাঁর ‘আহকামুল জানায়েজ’ নামক গ্রন্থে কোরআন ও হাদিসের আলোকে মানুষের শুভ পরিণাম ও পুণ্যময় মৃত্যুর ১৯ আলামত উল্লেখ করেছেন। প্রতিটির সঙ্গেই তিনি কোরআন বা হাদিসের উদ্ধৃতি উপস্থাপন করেছেন। উদ্ধৃতি ছাড়া সংক্ষেপে এখানে তা তুলে ধরা হলো—এক. কালিমায়ে শাহাদাত পাঠ করে মৃত্যুবরণ করা। দুই. মৃত্যুর পর কপাল থেকে ঘাম বের হওয়া। তিন. পবিত্র জুমার রাত বা দিনে মৃত্যুবরণ করা। চার. যুদ্ধের ময়দানে শাহাদাত বরণ করা। পাঁচ. আল্লাহর পথে গাজি হয়ে মৃত্যুবরণ করা। ছয়. কোনো মহামারিতে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করা। সাত. পেটের পীড়ায় মৃত্যুবরণ করা। আট. পানিতে ডুবে মৃত্যুবরণ করা। নয়. কোনো কিছু পতিত হওয়ায় মৃত্যুবরণ করা। দশ. সন্তান প্রসব করার সময় কোনো নারী মৃত্যুবরণ করা।
এগারো. আগুনে পুড়ে মৃত্যুবরণ করা। বারো. ফুসফুস (প্লুরিসি) রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করা।
তেরো. যক্ষ্মা ও ক্ষয়কাশে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করা। চৌদ্দ. ছিনতাইকারী ও লুণ্ঠনকারীর হাত থেকে বাঁচতে গিয়ে নিহত হওয়া। পনেরো. ধর্মের ব্যাপারে যেকোনো প্রতিরোধের মুখে পতিত হয়ে মৃত্যুবরণ করা। ষোলো. আত্মরক্ষার জন্য প্রতিরোধ করতে গিয়ে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করা। সতেরো. আল্লাহর পথে যুদ্ধের জন্য সারিবদ্ধ হওয়া অবস্থায় মৃত্যুবরণ করা। আঠারো. কোনো নেক কাজ করা অবস্থায় মৃত্যুবরণ করা।

উনিশ. অত্যাচারী শাসক অন্যায়ভাবে যাকে হত্যা করেছে। এ ছাড়া হজের ইহরাম বাঁধা অবস্থায় মৃত্যুবরণ করা। শেষ কাজ ইবাদত-বন্দেগিতে অতিবাহিত হওয়া ইত্যাদি সুন্দর মৃত্যুর নিদর্শন।

মহানবী (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলবে এবং এটাই হবে তার শেষ আমল, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। যে আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় একদিন রোজা রাখবে এবং এটাই হবে তার শেষ আমল, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। যে আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় সদকা করবে এবং এটাই হবে তার শেষ আমল, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। (মুসনাদে আহমদ, ৫/৩৯১) এ জন্য চেষ্টা করা চাই, যাতে দিন ও রাতের শেষ কাজ ইবাদতে অতিবাহিত হয়।

সুন্দর মৃত্যুর জন্য করণীয়

সুন্দর মৃত্যুর জন্য বিশেষ কিছু করণীয় রয়েছে—এক. ইবাদতের ধারাবাহিকতা ধরে রাখা। দুই. কোনো পাপকাজ সংঘটিত হলে দ্রুত তাওবা করা। তিন. আল্লাহর কাছে সর্বোত্তম পন্থায় মৃত্যুর জন্য দোয়া করা।

চার. জাহের ও বাতেন তথা প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে আমলের সঙ্গে লেগে থাকা। পাঁচ. দ্বীনের ওপর অবিচল থাকা। ছয়. আল্লাহর সম্পর্কে ভালো ধারণা পোষণ করা। সাত. তাকওয়া ও খোদাভীতি অর্জন করা। আট. বেশি বেশি তাওবা, ইস্তেগফার করা। নয়. বেশি বেশি মৃত্যুর চিন্তা করা এবং দীর্ঘ জীবনের আশা পরিত্যাগ করা। দশ. অপমৃত্যু থেকে আল্লাহর কাছে পরিত্রাণ চাওয়া।

জীবনের সময়টুকুই একজন মানুষের ইহকালীন মূলধন। যদি তা আখিরাতের কল্যাণের ক্ষেত্রে কাজে লাগানো হয়, তবেই তো সফলতা। আর যদি তা বিনষ্ট করা হয় গুনাহ ও পাপাচারে আর এ অবস্থায় মৃত্যু হয়, তাহলে সে হবে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন, ‘ইমানদার ব্যক্তি গুনাহকে এমন মনে করে, যেন সে কোনো পাহাড়ের নিচে বসে আছে। আর যেকোনো মুহূর্তে পাহাড়টি তার ওপর ধসে পড়তে পারে। ’ (বুখারি, ১১/৮৯)

অনেক মানুষ বেপরোয়াভাবে পাপাচারে লিপ্ত থাকে। একপর্যায়ে তার শেষ সময় এসে যায় এবং তার অপমৃত্যু ঘটে।

যখন মৃত্যু নিকটবর্তী হয়, তখন অধিক পরিমাণে আল্লাহর রহমতের আশা করা উচিত। আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাতের আগ্রহ প্রবল হওয়া উচিত। কারণ যে ব্যক্তি আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাতে আগ্রহী হয়, আল্লাহও তার সাক্ষাতে আগ্রহী হন। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘তোমাদের প্রত্যেকে যেন কেবল এ অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে যে সে আল্লাহর প্রতি সুধারণা পোষণ করে। ’ (মুসলিম, হা. ২৮৭৭)

বেশি বেশি মৃত্যুকে স্মরণ করলে দুনিয়ার মোহ কেটে যায় এবং আখিরাতের চিন্তা সৃষ্টি হয়। ফলে তা বান্দার মধ্যে বেশি বেশি নেক আমলের প্রেরণা সৃষ্টি করে এবং ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ায় অবৈধ ভোগবিলাস থেকে বিরত রাখে। মহানবী (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘সব ভোগ-উপভোগ বিনাশকারী মৃত্যুকে তোমরা বেশি বেশি স্মরণ করো। (তিরমিজি, হা. ২৪০৯)

কবর মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয় তার পরিণামের কথা। মৃত্যুর পর আপনজনই তো কবর খনন করে। মৃতকে অন্ধকার ঘরে শায়িত করে। মাটির নিচে রেখে ফিরে আসে। আল্লাহর রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘তোমরা কবর জিয়ারত করো। কারণ তা মৃত্যুকে স্মরণ করিয়ে দেয়। ’ (মুসলিম, হা. ৯৭৬)

নেককারদের সংস্পর্শ হূদয়ে ইমানি চেতনা জাগ্রত করে এবং হিম্মত ও প্রেরণা বৃদ্ধি করে। কারণ নেককার ব্যক্তিদের ইবাদত-মগ্নতা, পুণ্যের কাজে উদ্যম ও প্রতিযোগিতা যখন অন্য মানুষ প্রত্যক্ষ করে, তখন তাদের মধ্যেও পুণ্যের পথে চলার সাহস ও প্রেরণা জাগে। একইভাবে মানুষ যখন তাদের আল্লাহমুখিতা ও দুনিয়াবিমুখতা প্রত্যক্ষ করে, তখন তাদের মনেও এই বৈশিষ্ট্য অর্জনের আগ্রহ জাগে।

 

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
দয়া করে আপনার নাম লিখুন