ইসলামে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের স্থান নেই

মাওলানা কাসেম শরীফ

ইসলাম ধর্ম মতে, এক ও অভিন্ন উৎসমূল থেকে মানুষের সৃষ্টি। সব মানুষ হজরত আদম (আ.)-এর সন্তান।

হজরত হাওয়া (আ.)-এর ঔরস থেকে মানব বংশের বিস্তার শুরু হয়। পর্যায়ক্রমে আদম সন্তান বিভিন্ন গোত্র, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে বিভক্ত হয়ে পড়ে। কেন এই বিভক্তির রেখা টেনে দেওয়া হলো? হ্যাঁ, যাতে মানুষ সামাজিক হতে পারে, বৈচিত্র্যের মধ্যেও ঐক্যের সূতিকায় আবদ্ধ হতে পারে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মানুষ! আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি এক পুরুষ ও এক নারী থেকে। অতঃপর তোমাদের বিভক্ত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে, যাতে তোমরা একে অন্যের সঙ্গে পরিচিত হতে পারো। ’ (সুরা : হুজুরাত, আয়াত : ১৩)

মানুষকে বলা হয় সামাজিক জীব। সৃষ্টিগতভাবে সামাজিকতার উপাদান মানুষের মধ্যে রয়েছে। সব বিষয়ে কাউকে নিরঙ্কুশ ও সার্বভৌম ক্ষমতা দেওয়া হয়নি। পদে পদে মানুষকে পরনির্ভর ও পরমুখাপেক্ষী হতে হয়।

তথাপি মানুষ সামাজিকতার উপাদানগুলো উপেক্ষা করে অসামাজিক হয়ে ওঠে। ক্ষমতার দ্বন্দ্বে, আদর্শিক লড়াইয়ে, পার্থিব দুনিয়ার মোহগ্রস্ত হয়ে মানুষ সংঘাতে লিপ্ত হয়। সহিংসতা ও সন্ত্রাস করে রক্তের হোলিখেলায় মেতে ওঠে। মানুষ এখন আর আগের মতো ঘোষণা দিয়ে যুদ্ধ করে না। শান্তির নামে, মানবতার নামে, ধর্মের নামে ও মানুষের অধিকার আদায়ের কথা বলে এসব হত্যাযজ্ঞ চালাতে থাকে। অথচ শান্তি, মানবতা, ধর্ম ও মানুষের অধিকারের সঙ্গে এসবের সম্পর্ক নেই।

মানুষ হত্যা, সন্ত্রাস ও ত্রাস সৃষ্টি যেকোনো ধর্ম, মতাদর্শ ও সভ্যতাবিরোধী। খুনাখুনি ও রক্তপাত কেউ পছন্দ করে না। এর পরও হীনস্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য ও ক্ষমতার লড়াইয়ে টিকে থাকার জন্য আদর্শের উগ্র উন্মাদনায় মেতে ওঠে। পার্থিব-অপার্থিব কল্যাণের অলীক আশায় সন্ত্রাসীগোষ্ঠী হত্যাযজ্ঞে মেতে ওঠে। প্রকৃতপক্ষে সন্ত্রাসীদের কোনো ধর্ম নেই। তাদের ধর্ম সন্ত্রাস। সারা বিশ্বেই খুন-খারাবি হচ্ছে। ইসলাম গ্রহণের কারণে নয়, পূর্ণ ইসলাম না থাকার কারণেই মানুষ সন্ত্রাসী হয়। মুসলমান সন্ত্রাসী হওয়ার পথে কোরআনই সবচেয়ে বড় বাধা। আল্লাহ বলেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো মুমিনকে ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যা করবে, তার শাস্তি জাহান্নাম। সেখানে সে চিরকাল থাকবে। ’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ৯৩)

ইসলাম ধর্ম মতে, কোনো মুসলমান হাজারো অপরাধ করলেও তার সমুদয় পাপের সাজা ভোগ করে সে জান্নাতে যাবে। কোনো মুসলিম অনন্তকাল জাহান্নামে থাকবে না। অথচ এ আয়াতে হত্যাজনিত অপরাধের কারণে অনন্তকাল জাহান্নামে থাকার হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, একটি অন্যায় হত্যাকে ইসলাম বিশ্বমানবতাকে হত্যার সমতুল্য বলে ঘোষণা করেছে। কোরআন বলছে, ‘নরহত্যা কিংবা পৃথিবীতে ধ্বংসাত্মক কাজ করা ছাড়া কেউ কাউকে হত্যা করলে সে যেন দুনিয়ার সব মানুষকেই হত্যা করল। ’ (সুরা : মায়েদা, আয়াত : ৩২)

কোথাও কোনো হত্যাকাণ্ড ঘটতে দেখলে অন্যদের উচিত নির্যাতিত ব্যক্তির সাহায্যে এগিয়ে আসা। আল্লাহ বলেন, ‘আর যে কারো প্রাণ রক্ষা করল, সে যেন (বিশ্বের) সব মানুষের প্রাণ রক্ষা করল। ’ (সুরা : মায়েদা, আয়াত : ৩২)

এ ছাড়া বহু আয়াতে হত্যার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনগণ, তোমরা একে অন্যের সম্পত্তি অন্যায়ভাবে গ্রাস কোরো না… এবং একে অন্যকে হত্যা কোরো না। ’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ২৯)

ইসলাম অন্যায়ভাবে কোনো অমুসলিমকেও হত্যায় উৎসাহিত করে না। আল্লাহ বলেন, ‘(রহমানের বান্দা তারাই) যারা আল্লাহ ছাড়া অন্য উপাস্যর ইবাদত করে না, অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করে না। ’ (সুরা : ফুরকান, আয়াত : ৬৮)

হজরত ইবনে আব্বাস (রা.)-এর মতে, এ আয়াতটি অমুসলিমদের হত্যার ব্যাপারে নাজিল হয়েছে। এ ছাড়া সুরা বনি ইসরাইলের ৯ নম্বর আয়াতে, সুরা বাকারার ৮৪-৮৫তম আয়াতে ও সুরা আনআমের ১৫১ নম্বর আয়াতে নরহত্যা নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। তা সত্ত্বেও কেউ কাউকে অন্যায়ভাবে হত্যা করলে পরকালের শাস্তির পাশাপাশি পার্থিব জীবনেও তার জন্য মৃত্যুদণ্ড (কিসাস) কার্যকর করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এভাবেই ইসলাম হত্যা, সন্ত্রাস ও সন্ত্রাসবাদীদের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে।

ইসলাম কখনোই হত্যা, নৈরাজ্য সৃষ্টি, সহিংসতা ও সন্ত্রাসকে প্রশ্রয় দেয় না। পৃথিবীতে নৈরাজ্য ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকে নিষেধ করে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করতে প্রয়াসী হইও না। নিশ্চয়ই আল্লাহ বিপর্যয় সৃষ্টিকারীকে পছন্দ করে না। ’ (সুরা : কাসাস, আয়াত : ৭৭)

অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘ফিতনা (দাঙ্গা, বিশৃঙ্খলা ও গৃহযুদ্ধ) হত্যা অপেক্ষা গুরুতর। ’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৯১)

অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করাকে ইসলাম বিশ্বমানবতার মৃত্যুতুল্য গণ্য করেছে। আর মুসলমানদের পারস্পরিক রক্তপাতের বিরুদ্ধে হাদিস শরিফে কঠিন হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা হয়েছে। রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘কোনো মুসলমানকে গালি দেওয়া গোনাহর কাজ আর তাকে হত্যা করা কুফরি। ’ (বুখারি, হাদিস : ৬০৪৪)

বর্তমান পরিস্থিতিতে দেখা যাচ্ছে, একদল মুসলিম অন্য দলের ওপর অস্ত্রাঘাত করছে। অথচ রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আমাদের (মুসলমানদের) ওপর অস্ত্র উঠাবে, সে আমাদের (ধর্মের) দলভুক্ত না। ’ (বুখারি, হাদিস : ৬৮৪৪)

অন্য হাদিসে তিনি বলেন, ‘আল্লাহর কাছে গোটা পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাওয়া কোনো মুসলমানের হত্যার চেয়েও অধিক সহনীয়। ’ (নাসায়ি শরিফ, হাদিস : ৩৯৯২)

কেউ অন্যায়ভাবে  হত্যাকাণ্ডে লিপ্ত হলে ইসলাম তার জন্য মৃত্যুদণ্ড বা কিসাস আইন প্রবর্তন করেছে। আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনগণ, নিহতদের ব্যাপারে তোমাদের জন্য কিসাসের বিধান দেওয়া হলো। ’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৭৮)

সন্ত্রাস দমনে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছে ইসলাম। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এবং দুনিয়ায় ধ্বংসাত্মক কাজ করে বেড়ায়, তাদের শাস্তি হলো, তাদের হত্যা করা হবে অথবা ক্রুশবিদ্ধ করা হবে কিংবা বিপরীত দিক থেকে তাদের হাত-পা কেটে ফেলা হবে কিংবা তাদের দেশান্তরিত করা (বন্দি) করা হবে। ’ (সুরা : মায়েদা, আয়াত : ৩৩)

দমন-পীড়ন বনাম ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা

ইসলাম শান্তিপ্রতিষ্ঠায় শক্তিপ্রয়োগের অনুমতি দিলেও অন্যায়ভাবে, উদ্দেশ্যমূলকভাবে সন্দেহবশত কাউকে হয়রানি ও হত্যাকে সমর্থন করে না। এ ক্ষেত্রে ইসলাম ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার প্রতি সবিশেষ গুরুত্বারোপ করেছে। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা যখন মানুষের মধ্যে বিচারকার্য পরিচালনা করবে, তখন ন্যায়পরায়ণতার সঙ্গে বিচার করবে। ’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ৫৮ )

ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় অর্থের জোর, ক্ষমতার দাপট ও রক্তের বন্ধন উপেক্ষা করার কথা বলা হয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনগণ, তোমরা ন্যায়বিচারে দৃঢ়প্রতিষ্ঠিত থাকবে আল্লাহর সাক্ষীস্বরূপ, যদিও তা তোমাদের নিজেদের কিংবা পিতা-মাতা ও আত্মীয়স্বজনের বিরুদ্ধে হয়; সে বিত্তবান হোক অথবা বিত্তহীন। আল্লাহ উভয়েরই ঘনিষ্ঠতর। ’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ১৩৫)

তবে বল প্রয়োগ যেন অন্যায়ভাবে বিদ্বেষপ্রসূত না হয়; সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। আল্লাহ বলেন, ‘কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ তোমাদের যেন কখনো সুবিচার বর্জনে প্ররোচিত না করে। ’ (সুরা : মায়েদা, আয়াত : ৮)

রাষ্ট্রীয় সংকট : খোলাফায়ে রাশেদিনের কর্মপন্থা

রাষ্ট্রপ্রধানগণ গণমানুষের প্রতিনিধি। তাই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সর্বসাধারণের সুবিধা-অসুবিধার খোঁজ-খবর নেওয়া, তাদের সঙ্গে সলাপরামর্শ করা রাষ্ট্রপ্রধানের অন্যতম কর্তব্য। পরস্পর সমঝোতা করার মানসিকতা থাকলে পরামর্শ ও সন্ধি স্থাপনের মাধ্যমে যেকোনো বিষয়েই যৌক্তিক ও সন্তোষজনক উপসংহারে উপনীত হওয়া যায়। রাসুল (সা.) চিরশত্রু কাফির কুরাইশের সঙ্গে ঐতিহাসিক হোদায়বিয়ার সন্ধিতে আবদ্ধ হন। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, এ সন্ধিই পরবর্তী সময়ে মক্কা বিজয়ের পথ সুগম করে। সংলাপ, পরস্পর বোঝাপড়া ও পরামর্শের প্রতি গুরুত্বারোপ করে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তাদের যাবতীয় কাজকর্ম নিজেদের মধ্যে পারস্পরিক পরামর্শ নিয়ে সাধিত হয়। ’ (সুরা : শুরা, আয়াত : ৩৩)

অন্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় কাজকর্মে তাদের সঙ্গে পরামর্শ করো। ’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১৫৯)

কোরআনের এসব বাণী বুকে ধারণ করেই সাহাবায়ে কেরাম রাষ্ট্রীয় সংকট নিরসন করেছেন। হজরত ওমর (রা.) মজলিসে শুরায়ে আম ও খাস নামে পৃথক দুটি পরামর্শ পরিষদ গঠন করে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ কাজের সমাধান করতেন। হজরত ওসমান (রা.) বারবার বিরোধীপক্ষের সঙ্গে সংলাপে বসেন। তবুও তিনি দমন-পীড়ননীতি অনুসরণ করে ক্ষমতায় টিকে থাকার চেষ্টা করেননি। একপর্যায়ে তাকেই জীবন দিতে হলো। তবুও তিনি সাধারণ মানুষের জীবন নিয়ে খেলা করেননি। হজরত আলী (রা.) ও হজরত মুয়াবিয়া (রা.)-এর মধ্যকার ঐতিহাসিক দ্বন্দ্বের পরিসমাপ্তিও ঘটে পরস্পর সন্ধি স্থাপনের মাধ্যমে। দুই পক্ষের সামান্য উদারতা বহু মানুষের জান-মাল ও জীবন-জীবিকা রক্ষা করতে পারে।

 

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
দয়া করে আপনার নাম লিখুন