মানব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ক্রয়-বিক্রয় ও দানের বিধান

মাওলানা কাসেম শরীফ

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির নববিকাশে মানব জীবনের অন্যান্য দিকগুলোর ন্যায় চিকিৎসাবিজ্ঞানেও উত্তরোত্তর উন্নতি ও পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। স্বাস্থ্যবিজ্ঞানের উৎকর্ষতার এ যুগে চিকিৎসাব্যবস্থার নিত্যনতুন ধরন, গঠন, প্রক্রিয়া ও পদ্ধতির উদ্ভাবনে একদিকে যেমন উন্নততর স্বাস্থ্যসেবা ও চিকিৎসাগত সাফল্য অর্জিত হচ্ছে; অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে শাশ্বত জীবনব্যবস্থা ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপারে ধর্মপ্রাণ মুসলমানের মাঝে যুগজিজ্ঞাসা, কৌতূহল ও অনুসন্ধিৎসু প্রেরণা তৈরি হচ্ছে।

পাশ্চাত্য সভ্যতা ও সংস্কৃতির অনুকরণে আমাদের পরিবর্তিত সমাজব্যবস্থায়ও ‘রক্তদান’, ‘চক্ষুদান’, ‘মরণোত্তর দেহ দানের’ সঙ্গে সঙ্গে বৈধ অবৈধ উপায়ে মানব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ক্রয়-বিক্রয়ের মতো জঘন্য অপরাধ সমাজে বিস্তার হতে শুরু করেছে। সম্প্রতি কাতারে তিন হাজার বাংলাদেশির নানা ধরনের সুবিধা ভোগের আশায় অঙ্গ দানের খবর গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। বজ্রাঘাতে নিহত ব্যক্তির লাশ বেচাকেনা, কিডনি ব্যবসায়ী চক্রসহ ‘ছেলা ধরা’ অপরাধ শহরে-গ্রামে সমানতালে ছড়িয়ে পড়ছে। এ বিষয়ে ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি নিরূপণে ও শরিয়তের বিধান অন্বেষণে আমরা আরব-অনারবের বিজ্ঞ ইসলামী স্কলারদের রচিত ফতোয়া, গবেষণালব্ধ গ্রন্থ প্রবন্ধ পাঠ করার সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় মুফতিদের সঙ্গে কথা বলে তাঁদের সুচিন্তিত অভিমতও এখানে তুলে ধরার প্রয়াস চালিয়েছি। তবে আমাদের মূল আলোচনা তাফসিরে মা’আরেফুল কোরআন প্রণেতা, পাকিস্তানের মুফতিয়ে আজম (প্রধান মুফতি) আল্লামা মোহাম্মদ শফী সাহেব (রহ.) রচিত ‘জাওয়াহিরুল ফিকহ’ অবলম্বনে চয়ন করা হয়েছে। এ বিষয়ে ওই ফতোয়াগ্রন্থের প্রতি বিশেষ গুরুত্বারোপের কারণ হলো, এ ফতোয়াটি পাক-ভারত উপমহাদেশের শীর্ষস্থানীয় মুফতিদের সমন্বয়ে গঠিত ফতোয়া বোর্ড কর্তৃক রচিত ও স্বাক্ষরিত হয়েছে।

রক্তদান ও ক্রয়-বিক্রয়ের বিধান

মুফতি শফী সাহেব (রহ.) লিখেন, ‘রক্ত মানব দেহের অংশবিশেষ। দেহ থেকে নির্গত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তা নাপাক হয়ে যায়। নাপাক বস্তুর ব্যবহার নিষিদ্ধ বিধায় এবং সৃষ্টির সেরা জীব মানব অঙ্গের মর্যাদার কথা বিবেচনা করে স্বাভাবিক অবস্থায় রক্তদান নিষিদ্ধ হওয়ারই কথা। তবে অস্বাভাবিক অবস্থায় বিশেষত চিকিৎসার ক্ষেত্রে ইসলাম যেহেতু কিছুটা শিথিলতা প্রদর্শন করেছে, তাই বিশেষ বিবেচনায় রক্তদানকে বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। এর কারণ হলো, রক্তের দেহান্তর ও অঙ্গান্তরে কোনো রকম কাটাছেঁড়ার প্রয়োজন হয় না; বরং ইনজেকশনের মাধ্যমে খুব সহজেই তা দেহ থেকে দেহে স্থানান্তর করা যায়। যেভাবে কাটাছেঁড়া ছাড়া মায়ের দুধ শিশুর দেহে স্থানান্তরিত হয়ে শিশুর দৈহিক বিকাশে অসাধারণ ভূমিকা রাখে। আর শিশুকে দুগ্ধপান করানো কেবলই বৈধ নয়, বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে ওয়াজিব বা অত্যাবশ্যকীয়ও বটে। তাছাড়া রক্তদান করলেও প্রাকৃতিকভাবেই দেহের মাঝে নতুন রক্তের সৃষ্টি ও সঞ্চার করে থাকে। অতএব, যখন কোনো অভিজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ মতে অন্যের রক্ত ছাড়া রুগ্ণ ব্যক্তির জীবন-মরণ সংকট সৃষ্টি হয়, সে ক্ষেত্রে তাকে রক্তদান করা বৈধ। তবে রক্ত বিক্রয় করা কোনো অবস্থায়ই বৈধ নয়। তবে হ্যাঁ, রোগীর সংকটাপন্ন পরিস্থিতিতে অর্থ ছাড়া রক্ত পাওয়া না গেলে অর্থের বিনিময়েও রক্ত সংগ্রহ করা বৈধ। কিন্তু রক্তদাতার জন্য অর্থগ্রহণ করা বৈধ নয়। স্বামী-স্ত্রী পরস্পর রক্তবিনিময় করলেও বিবাহের মধ্যে কোনোরূপ ত্রুটি বা ক্ষতি সাধিত হয় না। এমনকি রক্তদানের ক্ষেত্রে মুসলিম-অমুসলিমেরও পার্থক্য নেই।’

মানব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ক্রয়-বিক্রয়ের বিধান

রক্তদান বা ক্রয়ের বিধান ছাড়া মানব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের অন্য কোনো অংশ ক্রয়-বিক্রয় করা ইসলামী শরিয়তে হারাম ও নিষিদ্ধ। আরব-অনারবের কোনো আলেম এ মাসআলার ক্ষেত্রে দ্বিমত পোষণ করেননি। সবার ঐকমত্যে মানব অঙ্গ বেচাকেনা করা হারাম। এর কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, প্রথমত. বেচাকেনা বৈধ হওয়ার জন্য বস্তুর মালিকানা স্বত্বের অধিকারী হওয়া অপরিহার্য। ইসলামী শরিয়ত মতে মানুষ তার দেহের মালিক নয়। বরং এটি আল্লাহর পবিত্র আমানত। তার মালিকানা বহির্ভূত বস্তু ক্রয়-বিক্রয় করা ও দান করা হারাম।

দ্বিতীয়ত. ইসলাম মনে করে মানুষ ‘আশরাফুল মাখলুকাত’। তাই তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গও অত্যন্ত সম্মানিত বস্তু। কাজেই সাধারণ খেলনা ও পণ্য সামগ্রীর মতো মানব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ক্রয়-বিক্রয় করা নিষিদ্ধ।

তৃতীয়ত. যদি এগুলোর বেচাকেনা বৈধ বলে ঘোষিত হয়, সে ক্ষেত্রে ‘ছেলেধরার’ মতো ‘লাশ ধরা’ চক্রের আবির্ভাব ঘটবে। অর্থ-সম্পদের মতো মানব ছিনতাই শুরু হবে। সর্বোপরি অসুস্থ বিত্তবানদের অর্থের কাছে দুস্থ, অনাথ, অসহায় মানুষের জীবন জিম্মি হয়ে পড়বে।

মানব অঙ্গ সংযোজন ও দানের বিধান

অঙ্গ সংযোজনের তিনটি পদ্ধতি আমাদের মধ্যে প্রচলিত রয়েছে। প্রথমত. জড় বস্তুর মাধ্যমে কৃত্রিম উপায়ে অঙ্গ সংযোজন করা যেমন- কৃত্রিম দাঁত, শ্রবণ যন্ত্র, কৃত্রিম পা প্রতিস্থাপন ইত্যাদি। দ্বিতীয়ত. বিগত জামানায় চিকিৎসার জন্য মানবদেহে অন্যান্য প্রাণীর অঙ্গবিশেষ প্রতিস্থাপন করা হতো। ইসলামী শরিয়ত মতে, উপরোক্ত দুটি পদ্ধতিই বৈধ। তবে তৃতীয় পদ্ধতি অর্থাৎ মানব দেহে একে অপরের অঙ্গ সংযোজন বা দান করা অবৈধ। কেননা, সুন্দর এ পৃথিবীর সৃষ্টি মানুষকে কেন্দ্র করেই হয়েছে। তাই এ পৃথিবীর সব কিছুই মানুষের কল্যাণে নিবেদিত। অতএব অন্যান্য জীবজন্তু ও কীট-পতঙ্গের মতো মানব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের যথেচ্ছ ব্যবহার, বেচাকেনা, আদান-প্রদান, কাটাছেঁড়া করা মানব সৃষ্টির উদ্দেশ্য বহির্ভূত এবং মানব মর্যাদার সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ। ‘সবার ওপরে মানুষ সত্য’- এ সত্য মনেপ্রাণে বিশ্বাস করলে জীবজন্তুর মতো মানুষ কেটে টুকরো টুকরো করা কিংবা মানব অবয়বে বিকৃতি সাধন করা মানুষকে ‘সবার ওপরে’ স্থান দেওয়ার প্রমাণ বহন করে না। স্মরণ রাখতে হবে যে ওপরে বর্ণিত ইসলামী বিধান কেবল মুসলিমদেরই শরয়ী বিধান। আর ইসলামের বিধি-বিধান কেবল মুসলিমদের জন্যই প্রযোজ্য। আমাদের সমাজে যারা মরণোত্তর দেহ দান করছেন, তাঁদের লুক্কায়িত বাসনা যদি এই হয়ে থাকে যে ‘মৃত্যুর পর আর কোনো জীবন নেই’। তবে সে ক্ষেত্রে তো তারা মুসলিম বলেই গণ্য হবেন না!

বাংলাদেশি উলামায়ে কেরামের অভিমত

কেন্দ্রীয় ইসলামী গবেষণা ও ফতোয়া প্রতিষ্ঠান, ‘ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার’ বসুন্ধরার প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক, সর্বজন শ্রদ্ধেয় মহান আধ্যাত্মিক সাধক ফকি্বহুল মিল্লাত মুফতি আবদুর রহমান সাহেব (দা. বা.) বলেন, ‘পবিত্র কোরআনের পরতে পরতে মানব মর্যাদার ধারণাকে আল্লাহ তায়ালা যে অলৌকিক বাচনিক ভঙ্গিমায় ব্যক্ত ও চিত্রিত করেছেন, দ্বীনের অগাধ পাণ্ডিত্যের অধিকারী বিজ্ঞ আলেম ও কোরআন ব্যাখ্যাকারীগণের পক্ষেই কেবল তা উপলব্ধি, অনুধাবন ও হৃদয়ঙ্গম করা সম্ভব। এরই পথ ধরে রাসুল (সা.) মুসলমানের জীবনাচার ও সব কর্মকাণ্ডে মানব মর্যাদার ধারণাকে রূপায়িত ও বাস্তবায়িত করেছেন। এমনকি সর্বোচ্চ শিখরে অধিষ্ঠিত মানব মর্যাদাকে সমুন্নত রাখতে তিনি মানুষের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অঙ্গ উদাহরণত চুলের ক্রয়-বিক্রয় ও দানে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছেন। কোরআন-সুন্নাহর এহেন সুপ্রমাণিত সুস্পষ্ট বিধান বিদ্যমান থাকা অবস্থায় সঠিক জ্ঞানপ্রাপ্ত কোনো মুসলিমের পক্ষে নিজ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ক্রয়-বিক্রয় করা তো দূরের কথা- দান করারও ন্যূনতম অবকাশ নেই। তবে ইসলামের উদারতা ও সহজবোধ্যতা সুবিদিত। তাই চিকিৎসার নিমিত্তে শর্তসাপেক্ষে রক্ত দান ও দুগ্ধ দান করাকে বৈধ বলে ঘোষণা করা হয়েছে।

আল-জামিয়া আল-ইসলামিয়া পটিয়ার প্রধান মুফতি ও উপমহাদেশের অন্যতম হাদিস বিশারদ আল্লামা হাফেজ আহমদুল্লাহ সাহেব (দা. বা.) বলেন, ‘মানুষ তার দেহের মালিক নন। এটি আল্লাহর আমানত। এ কারণে আত্মহত্যা করা ইসলামে মহাপাপ। (ইসলামের এ বিধানটি সর্বজন স্বীকৃত) আর একই কারণে জীবদ্দশায় বা মরণোত্তর দেহ দান ও ক্রয়-বিক্রয় করা হারাম। বোখারি শরিফের হাদিসেও এ বিষয়ে সুস্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা পাওয়া যায়। রাসুল (সা.) চুল দানকারিণী ও গ্রহণকারিণী নারীদের অভিসম্পাত করেছেন। যেখানে চুলের মতো ক্ষুদ্র বস্তু দান করার নিষেধাজ্ঞা আরোপিত হয়েছে, সেখানে অন্যান্য সম্মানিত অঙ্গ দান বা ক্রয়-বিক্রয়ের প্রশ্নই আসে না। বিজ্ঞ মুফতি সাহেব আরো বলেন, ‘জিদ্দত পছন্দ’ বা অতি আধুনিক কিছু মানুষ দেহকে সম্পদের ওপর ‘কিয়াস’ বা তুলনা করেছেন অথচ দুটির মধ্যে বিস্তর ফারাক রয়েছে। সম্পদের ওপর জাকাত আসে; দেহের ওপর আসে না।’

জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়ার প্রধান মুফতি ও শায়খুল হাদিস মুফতি মনসুরুল হক সাহেব (দা. বা.) বলেন, ‘এ বিষয়ে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি হলো সর্বসাধারণের জন্য রক্তদান করা বৈধ আর মহিলার জন্য কারো অসুস্থতার দরুন অন্য উপায় না থাকলে দুগ্ধ দান করা বৈধ। আরবের মডার্ন টাইফের কিছু লোক দেহদানকে বৈধ বললেও তাঁদের সঙ্গে আমরা সহমত পোষণ করি না। উদাহরণত কিছু দিন আগে মক্কাস্থ ‘হাইআতুল আমরি বিল মা’রুফ ওয়ান্নাহয়ি আনিল মুনকারে’র চেয়ারম্যান ড. আহমদ আল গামেদি মহিলাদের সঙ্গে ‘মুসাফাহা’ বা করমর্দন করাকে ‘সুনানে হুদা’ বা বিশেষ সুন্নত বলেছেন। সারা বিশ্ব থেকে এর প্রতিবাদ ওঠে। অবশেষে তিনি পদত্যাগে বাধ্য হন। বলেন, ‘দেহ দান বা ক্রয়-বিক্রয় সংক্রান্ত বিস্তারিত বিধান ও প্রমাণ আমাদের প্রকাশিত ‘ফাতওয়ায়ে রাহমানিয়াতে’ সন্নিবেশিত হয়েছে।’

আল-জামিয়া আহলিয়া মঈনুল ইসলাম হাটহাজারীর সিনিয়র মুফতি আল্লামা মুফতি জসীম উদ্দীন সাহেব বলেন, ‘আমাদের গবেষণা ও পঠিত গ্রন্থগুলোর আলোকে বলছি, দেহদান বা ক্রয়-বিক্রয় নিষিদ্ধ।’ ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার বসুন্ধরার সিনিয়র মুফতি আল্লামা মুফতি এনামুল হক সাহেব বলেন, ‘আমরা মনে করি, মানব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ক্রয়-বিক্রয় বা দান করা অবৈধ। এটি কেবল আমাদেরই কথা নয়; বরং বেশির ভাগ আলেমের ‘মুহাক্কক’ বা গবেষণালব্ধ কথা।’

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
দয়া করে আপনার নাম লিখুন