ফরজ গোসল কিভাবে করবেন?

মুফতি মাহমুদ হাসান

পবিত্রতা ইসলাম ধর্মের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। ইসলাম সর্বদা পবিত্রতার সঙ্গে থাকার নির্দেশ দিয়েছে।

মহান আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘তোমরা যদি নাপাক (জানাবাত) অবস্থায় থাকো, তবে নিজেদের দেহ (গোসলের মাধ্যমে) ভালোভাবে পবিত্র করে নাও। ‘ (সুরা মায়েদা ৬) পবিত্র কোরআনে অন্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা যাঁরা অধিক পবিত্রতা অর্জন করেন, তাঁদের প্রশংসা করেছেন।

ফরজ গোসল ইসলামী জীবন বিধানের গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। কারো ওপর গোসল ফরজ হলে সঠিক পদ্ধতিতে গোসল আদায় না করা পর্যন্ত ওই ব্যক্তি নাপাক থাকে। এ বিষয়ে অনেকেরই সঠিক জ্ঞান না থাকায় সমস্যায় পতিত হচ্ছেন। অনেক লোক অজ্ঞতাবশত ভুলের কারণে সপ্তাহ, মাস এমনকি সর্বদাই নাপাক অবস্থায় রয়ে যাচ্ছেন। ফলে তাদের নামাজ ইত্যাদি ইবাদত শুদ্ধ হয় না। ইসলামের বহু আমল সঠিকভাবে সম্পাদন করার জন্য শারীরিক পবিত্রতা অপরিহার্য।

গোসল ফরজ হওয়ার কারণ

এক. জাগ্রত বা ঘুমন্ত অবস্থায় উত্তেজনার সঙ্গে বীর্যপাত হওয়া।

ঘুমন্ত অবস্থায় উত্তেজনা অনুভব না হলেও গোসল ফরজ। কেননা ঘুমন্ত অবস্থায় স্বপ্নদোষ হলে মানুষ অনেক সময় টের পায় না। তাই কোনো ব্যক্তি ঘুম থেকে ওঠার পর যদি তার কাপড়ে নাপাকির চিহ্ন দেখে, তাহলে তার স্বপ্নদোষ বা বীর্যপাতের কথা স্মরণ থাকুক বা না থাকুক, সর্বাবস্থায় গোসল ফরজ হবে। (হেদায়া ১/৪৫, আন নুতাফ ফিল ফাতাওয়া পৃ. ২৯)

দুই. স্ত্রী সহবাস করা। সহবাসের ক্ষেত্রে স্ত্রীর যৌনাঙ্গে পুরুষাঙ্গের সর্বনিম্ন সুপারি পরিমাণ অংশ প্রবেশ করালেই উভয়ের ওপর গোসল ফরজ হয়ে যাবে, চাই বীর্যপাত হোক বা না হোক। (বুখারি, হা. ২৯১, মুসলিম, হা. ৩৪৩)

তিন. নারীদের ঋতুস্রাব বা নেফাস (সন্তান প্রসবোত্তর স্রাব) বন্ধ হওয়ার পরও গোসল ফরজ। (রদ্দুল মুহতার ১/১৬৫)

ফরজ গোসলের ফরজ

গোসলের ফরজ তিনটি। এ তিনটির কোনো একটি ছুটে গেলে ফরজ গোসল আদায় হবে না।

এক. কুলি করা। দুই. নাকে পানি দেওয়া। তিন. পুরো শরীরে পানি পৌঁছানো। (হেদায়া ১/২৯)

গোসলের সুন্নত

এক. গোসলের নিয়ত করা। দুই. বিসমিল্লাহ পড়া। তিন. দুই হাত কবজি পর্যন্ত ধোয়া। চার. মিসওয়াক করা। পাঁচ. প্রথমে ওজু করা। ছয়. শরীরে কোনো নাপাকি লেগে থাকলে তা দূর করা। সাত. সারা দেহে তিনবার পানি ঢালা। আট. ফরজ কাজগুলোর মাঝে ক্রমধারাবাহিকতা বজায় রাখা। (ফাতাওয়া কাজিখান ১/৭৯, রদ্দুল মুহতার ১/১৫৬)

ফরজ গোসলের সঠিক পদ্ধতি

গোসলের আগে ইস্তিনজা (প্রস্রাব-পায়খানা) সেরে নেবে। প্রথমে দুই হাত কবজি পর্যন্ত তিনবার ধৌত করবে। এরপর ডান হাতে পানি নিয়ে বাঁ হাত দিয়ে শরীরের যেসব জায়গায় বীর্য ও নাপাকি লেগে থাকে, তা ধুয়ে পরিষ্কার করবে। এবার বাঁ হাত ভালো করে ধুয়ে ফেলবে। তারপর অজু করবে, তবে পা ধৌত করবে না। অতঃপর পুরো শরীর ধোয়ার জন্য প্রথমে তিনবার ডানে, তারপর তিনবার বাঁয়ে পানি ঢেলে ভালোভাবে ধুতে হবে, যেন শরীরের কোনো অংশ এমনকি কোনো লোমও শুকনো না থাকে। নাভি, বগল ও অন্যান্য জায়গায় পানি দিয়ে ভালোভাবে ধুতে হবে। সব শেষে গোসলের জায়গা থেকে সামান্য সরে গিয়ে দুই পা তিনবার ধুয়ে নেবে। (হেদায়া ১/৩০)

গোসলের আদব

উঁচু স্থানে বসে গোসল করা, যাতে পানি গড়িয়ে যায় ও গায়ে ছিটা না লাগে। পানির অপচয় না করা। বসে বসে গোসল করা।

লোক সমাগমের স্থানে গোসল না করা। পাক জায়গায় গোসল করা। ডান দিক থেকে গোসল শুরু করা। (বাদায়েউস সানায়ে ১/৩৪, রদ্দুল মুহতার ১/৯৪)

কিছু জরুরি মাসায়েল

বাহ্যিক অঙ্গের চুল পরিমাণ জায়গাও শুকনো থাকলে ফরজ গোসল শুদ্ধ হবে না। (শরহে মুখতাসারুত তাহাভি ১/৫১০)

নেইলপলিশ, রং বা সুপার গ্লুু ইত্যাদি যা শরীরে পানি পৌঁছার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধক হয়, তা উঠিয়ে নিচে পানি পৌঁছানো জরুরি, অন্যথায় গোসল শুদ্ধ হবে না। (ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/১৩)

ফরজ গোসলে পুরুষের দাড়ি ও মাথার চুল গোড়াসহ সম্পূর্ণ ভালোভাবে ভিজতে হবে। মহিলাদের চুল বাঁধা থাকলে খোলা ব্যতীত যদি চুলের গোড়ায় পানি পৌঁছানো সম্ভব হয়, তাহলে না খুলে শুধু গোড়ায় পানি পৌঁছানোই যথেষ্ট। আর যদি চুল খোলা থাকে তাহলে পুরুষের মতো সম্পূর্ণ চুল ধৌত করা ফরজ। (বাদায়েউস সানায়ে ১/৩৪, রদ্দুল মুহতার ১/১৪২)

অনুরূপ ফরজ গোসলে মহিলাদের কান ও নাকফুল নাড়িয়ে ছিদ্রে পানি পৌঁছানো জরুরি। (আল মুহীতুল বুরহানি ১/৮০)

বিভিন্ন রোগের কারণে অনেকের দাঁতে এমনভাবে ক্যাপ লাগানো হয়ে থাকে, যার দরুন কুলি করলে নিচে পানি পৌঁছে না এবং তা খুললেও ক্ষতির আশঙ্কা হয়, তাহলে গোসলের সময় তা খোলা জরুরি নয়, আর যদি এমন কিছু লাগানো থাকে, যা সহজে খোলা যায়, তাহলে খুলে তার নিচে পানি পৌঁছানো জরুরি। (রদ্দুল মুহতার ১/১৫৪, আহসানুল ফাতাওয়া ২/৩২)

লেখক : ফতোয়া গবেষক

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
দয়া করে আপনার নাম লিখুন