উপমহাদেশের প্রথম হাদিসচর্চা কেন্দ্র

মুফতি মাহমুদ হাসান

যেসব মহা মনীষী মানবতার কল্যাণে সর্বস্ব ত্যাগ করে শত-সহস্র মাইল পেরিয়ে দূর-দুরান্তে গিয়ে দ্বীনি জ্ঞান-বিজ্ঞান ও মহান আল্লাহর বাণীর তাবলিগের কাজে ব্রত হয়েছেন, যাঁদের কাজ ছিল মানুষকে তার সৃষ্টিকর্তা ও প্রতিপালকের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া, হিজরি সপ্তম শতাব্দীর শায়েখ শরফুদ্দীন আবু তাওয়ামা বোখারি আদ-দেহলবী আল-হানাফী (রহ.) ছিলেন তাঁদেরই একজন।

তাঁর জন্ম বোখারা শহরে, বলা হয় তিনি পারসিক বংশোদ্ভুত, অন্য এক সূত্র মতে, তিনি ছিলেন ইয়েমেনের অধিবাসী।
তিনি হাদিস ও ফিকাহ শাস্ত্রের গভীর জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন, সঙ্গে সঙ্গে ভূগোল, গণিত ও রসায়ন শাস্ত্রেরও সুপণ্ডিত ছিলেন।

আনুমানিক ৬৬৮ হিজরি মোতাবেক ১২৭০ ঈসায়ী সালে শায়েখ শরফুদ্দীন দ্বীন প্রচারে সুলতান গিয়াসুদ্দীন বলবনের শাসনামলে দিল্লীতে আসেন, সুলতান গিয়াসুদ্দীনের অনুরোধে ১২৭৮ সালে দ্বীন প্রচারে বাংলায় আসেন। প্রাচীন বাংলার রাজধানী সোনারগাঁয়ে এসে তিনি দ্বীন প্রচারে আত্মনিয়োগ করেন। সোনারগাঁয়ে গড়ে তোলেন একটি বৃহৎ মাদ্রাসা ও সমৃদ্ধ লাইব্রেরি। ঐতিহাসিকদের মতে, এটিই ছিল উপমহাদেশে ইলমে হাদিসের সর্বপ্রথম বিদ্যাপীঠ। দূর-দূরান্ত থেকে এখানে ছাত্ররা ইলম অর্জনের উদ্দেশ্যে ছুটে আসে। ধারণা করা হয়, তখন এ মাদ্রাসার ছাত্রসংখ্যা ছিল ১০ হাজার। তিনি এখানে দীর্ঘ ২৩ বছর ইলমের খেদমতে নিয়োজিত ছিলেন। পাশাপাশি সেখানে জনসাধারণের আত্মশুদ্ধির মানসে একটি খানকাও প্রতিষ্ঠা করেন।
তিনি ছিলেন সোহরাওয়ার্দি তরিকার শায়েখ। তিনি ‘মানযিলে মাকামাত’ নামে তাসাউফ সম্বন্ধে একটি বই লিখেছেন বলে জানা যায়। এ ছাড়াও সোনারগাঁও বিদ্যাপীঠে অবস্থানকালে শায়েখ ছাত্রদের উদ্দেশে ফিকাহবিষয়ক যেসব বক্তৃতা দিয়েছেন, সেগুলোর সংকলন নিয়ে ফার্সি ভাষায় রচিত ‘নামায়ে হক্ব’ নামে একটি কাব্যগ্রন্থের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। এ গ্রন্থে ১৮০টি কবিতা আছে। কেউ কেউ তা ‘মছনবী বনামে হক্ব’ নামে অভিহিত করেছেন। গ্রন্থটি ১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দে বোম্বাই থেকে এবং ১৯১৩ খ্রিস্টাব্দে কানপুর থেকে প্রকাশিত হয়। জানা যায়, শায়েখ শরফুদ্দীন আবু তাওয়ামার লিখিত পাণ্ডুলিপির অস্তিত্ব ব্রিটিশ জাদুঘরের আর্কাইভ ভবনে রক্ষিত আছে।

বিহারের সুপ্রসিদ্ধ শায়েখ শরফুদ্দীন আহমদ ইবনে ইয়াহইয়া মুনীরী (রহ.) সুদূর বিহার থেকে এসে জ্ঞান অর্জন ও তাঁর সংস্রব লাভে ধন্য হন। একপর্যায়ে শায়েখ মুনীরী তাঁর শায়েখের কন্যাকে বিবাহ করেন, সেখানে তাঁর তিনটি সন্তানও হয়। তিনি দীর্ঘ ২২ বছর শায়েখের সংস্রব লাভ করে নিজ দেশে ফিরে যান।

শায়েখ আবু তাওয়ামা ৭০০ হিজরি মোতাবেক ১৩০০ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন বলে জানা যায়। তাঁর মৃত্যুর পরও ওই মাদ্রাসা অনেক দিন স্থায়ী হয়। এ ঐতিহাসিক বিদ্যাপীঠটি ধীরে ধীরে কালের ধুলোয় হারিয়ে যেতে শুরু করেছে। ভৌগোলিকভাবে তা বর্তমান নারায়ণগঞ্জ জেলার সোনারগাঁ উপজেলার মোগরাপাড়ার দরগাবাড়ি প্রাঙ্গণে অবস্থিত। মোগরাপাড়ায় প্রাপ্ত একটি শিলালিপিতে কয়েকজন উচ্চপদস্থ প্রশাসনিক কর্মকর্তার নাম পাওয়া যায়, যাদের প্রত্যেকের নামের শুরুতে পদবি হিসেবে মুহাদ্দিস (হাদিস বিশারদ) শব্দটি যুক্ত ছিল। ধারণা করা হয়, তাঁরা সবাই সরাসরি বা শিক্ষাপরম্পরায় শায়েখ আবু তাওয়ামার ছাত্র ছিলেন। প্রশাসনিক কাজের পাশাপাশি প্রত্যেকেই হয়তো মাদ্রাসায় শিক্ষকতা ও হাদিস শিক্ষাদানে নিযুক্ত ছিলেন।

এখানে ঐতিহাসিক বিদ্যাপীঠটির ভবনের কিছু ধ্বংসাবশেষ রয়েছে। ওই ভবনের দেয়ালগুলোতে বৃহৎ, মাঝারি ও ক্ষুদ্রাকার চতুষ্কোণবিশিষ্ট খোপ লক্ষ করা যায়। ধারণা করা হয়, এসব খোপে হয়তো কিতাবাদি রাখা হতো। এ ভবনের পূর্ব পাশ দিয়ে একটি অপ্রশস্ত সিঁড়ি ভূগর্ভস্থ কুঠুরিতে চলে গেছে, বর্তমানে স্থানীয়রা তাকে ‘আন্ধার কোঠা’ নামে অভিহিত করে থাকে। জানা গেছে, শায়খ এই কুঠুরিতে বসে নির্জনে জিকির ও ধ্যান করতেন। টিকে থাকা এ জীর্ণ ভবনটির লাগোয়া অনেক ভবন ছিল, যা ইতিমধ্যে ধ্বংস হয়ে গেছে।

আমাদের অবহেলায় আমরা ধরে রাখতে পারিনি আমাদের গৌরবোজ্জল সোনালি ঐতিহ্যের নীরব সাক্ষী এই বিদ্যাপীঠকে। দীর্ঘ ৭০০ বছর পর হজরত সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদবী (রহ.) হিন্দুস্থান থেকে সোনারগাঁয়ে এসে খুঁজে বের করলেন সেই স্থান এবং শায়খের কবর যিয়ারত ও মুনাজাত করেন। এখানে এসে তিনি অশ্রুসংবরণ করতে পারলেন না। নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া এ ঐতিহ্যের সঙ্গে এহেন অবিচার ও ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ উপলব্ধি করে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলেন হজরত নদবী। এরপর তিনি এর অদূরে ওই এলাকায় ‘মাদ্রাসাতুশ-শরফ’ নামে একটি মাদ্রাসাও প্রতিষ্ঠা করে যান।

বর্তমানে জীর্ণ ভবনটি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে। স্থানীয় লোকদের মাধ্যমে জানা গেছে, গত তিন-চার বছর আগে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের লোকজন স্থানটি পরিদর্শন করে গেলেও এখন পর্যন্ত তা সংস্কারের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। অনতিবিলম্বে তা সংরক্ষণ করা না গেলে অচিরেই ধ্বংসস্তূপে পরিণত হবে ঐতিহাসিক এ স্থানটি। তাই দ্রুত এর সংস্কার প্রয়োজন। এ বিষয়ে সর্বপ্রথম এগিয়ে আসতে হবে স্থানীয় নেতাদেরই। সরকার যদি এ মহৎ কাজের উদ্যোগ গ্রহণ করে, তারাও হতে পারবেন আমাদের ঐতিহ্যের গর্বিত অংশীদার। ইতিহাসের স্বর্ণখচিত অক্ষরে রচিত হবে তাঁদের নামও।

লেখক : ফতোয়া সংকলন প্রকল্পের গবেষক

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
দয়া করে আপনার নাম লিখুন