শীতকাল : পবিত্রতা ও কিছু প্রয়োজনীয় মাসায়েল

মুফতি মাহমুদ হাসান

রাত-দিনের পরিবর্তন মহান প্রতিপালক আল্লাহ তায়ালার বিস্ময়কর মহিমা। তেমনি ঋতুপরিক্রমাও স্রষ্টার অপার কুদরতের নিদর্শন। ইরশাদ হচ্ছে- ‘নিশ্চয়ই আকাশমণ্ডল ও পৃথিবীর সৃজনে ও রাত-দিনের পালাক্রমে আগমনে বুদ্ধিমানদের জন্য আল্লাহ তায়ালার নিদর্শনাবলি রয়েছে।’ (আলে ইমরান : ১৯১)

প্রত্যেক মৌসুমেরই রয়েছে বৈচিত্র্যময় বৈশিষ্ট্য, প্রাকৃতিক এই পরিবর্তন-পরিবর্ধন নিত্য-নতুন নিয়ামতের তোহফা নিয়ে হাজির হয় আমাদের কাছে। প্রকৃত মুমিন সেই, যে এই নিত্য-নতুন নেয়ামতরাজির ওপর স্রষ্টার শুকরিয়া আদায় করে, তাঁর বিধানাবলির প্রতি আরো আকৃষ্ট হয়।

মহান প্রভু আমাদের প্রতি তাঁর বিধানাবলিকেও করে দিয়েছেন মৌসুম উপযোগী, তাঁর কোনো হুকুমই এমন নেই, যা তাঁর বান্দাদের কষ্টসাধ্য হয়। কোরআনে কারিমে ইরশাদ হয়েছে- ‘আল্লাহ তায়ালা তোমাদের থেকে সহজ জিনিসেরই দাবি করেন। কঠিন ও দুঃসহ জিনিসের প্রত্যাশী নন।’ (বাকারা : ১৮৫)

প্রত্যেক বিধানেই চিন্তা করলে আমরা উপলব্ধি করি এর বাস্তবতা, যেমন শীত মৌসুমের সঙ্গে আল্লাহ তায়ালার অনেক বিধানের সামঞ্জস্যতার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। তন্মধ্যে একটি হচ্ছে, তায়াম্মুমের বিধান-

এমন ব্যক্তি যে ঠাণ্ডা পানি ব্যবহারে অসুস্থ হয়ে যাওয়ার প্রবল আশঙ্কা থাকে কিংবা অসুস্থতা বেড়ে যাওয়ার প্রবল আশঙ্কা হয়, শরিয়ত তাকে তায়াম্মুমের নির্দেশ দিয়েছে। তায়াম্মুম হলো নিয়ত করে মাটি অথবা মাটি প্রকৃতির জিনিস যথা বালু, পাথর, চুনা ইত্যাদির মধ্যে হাত স্পর্শ করে একবার পুরো চেহারা মোছা, দ্বিতীয়বার হাত স্পর্শ করে উভয় হাতের কনুই পর্যন্ত ভালোভাবে মোছা। (রদ্দুল মুহতার ১/২২৮,২২৯)

আরেকটি বিধান হচ্ছে, অজুতে চামড়ার মোজার উপর মাসেহ করা। কারো তায়াম্মুমের পরিমাণ ওজর না হলেও সবার জন্য এ বিধান প্রযোজ্য। তা হলো, অজু করে মোজা পরিধান করলে মুকিম ব্যক্তির জন্য পরবর্তী একদিন পর্যন্ত যতবার অজুর প্রয়োজন, তাতে পা ধোয়ার প্রয়োজন হবে না। বরং তিন আঙুল পরিমাণ মোজার ওপর মাসাহ করে নিলেই চলবে। মুসাফিরের জন্য এ সুযোগ তিন দিন পর্যন্ত। অসংখ্য হাদিস শরিফে রাসুল (সা.) অনুরূপ আমলের কথা উল্লেখ পাওয়া যায়। (রদ্দুল মুহতার : ১/২৬০)

তবে এখানে একটি ভুল ধারণার নিরসন প্রয়োজন। আমাদের অনেকেই মনে করেন, সব মোজার ওপরই মাসাহ করা যায়, যেমন সুতা, নায়লনের মোজার ওপরও মাসাহ হয়, তা সঠিক নয়। বরং মোজার ওপর মাসাহ করার জন্য মোজাটি এমন চামড়ার মোজা হতে হবে, যা টাখনু পর্যন্ত ঢেকে ফেলে অথবা চামড়ার মোজার গুণে গুণান্বিত এমন মোজা হতে হবে। গুণগুলো ফিকাহবিদগণ ফিকাহগ্রন্থগুলোতে উল্লেখ করেছেন, যা রাসুল (সা)-এর হাদিস ও সাহাবায়ে কেরামের আমল থেকেই সংগৃহীত।

এক. মোজা এমন মোটা হতে হবে যেন উপরে পানি পড়লে ভেতরে না পৌঁছে।

দুই. সংকীর্ণতা বা রাবার অথবা সুতা ইত্যাদি দিয়ে বাঁধা ছাড়াও স্বয়ংসম্পূর্ণভাবে পায়ের সঙ্গে লেগে থাকে।

তিন. শুধু ওই মোজা পরিধান করেই দুই-তিন মাইল চলা যায়। (মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা ১/১৮৮ ,ফাতহুল ক্বদীর ১/১০৯)

বিশেষ সতর্কতা : শীতকালে অজুর সময় একটি বিশেষ সতর্কতা হলো, শীতের কারণে চামড়া ফেটে যাওয়ায় শীতের মৌসুমে পা ধুইলেও মাঝে মাঝে শুকনো থেকে যায়। অথচ অজুর অঙ্গ একচুল পরিমাণও শুকনো থাকলে অজু হবে না। এ জন্য ওলামায়ে কেরাম বলেন, অজুর শুরুতে একবার পা ভিজিয়ে নেওয়া উত্তম এবং অঙ্গ ধোয়ার সময় হাত দিয়ে মলে মলে ধৌত করলে আর শুকনো থাকার ভয় থাকে না।

লেখক : ইসলামী ফিকাহবিদ

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
দয়া করে আপনার নাম লিখুন