মুহাম্মাদ মিনহাজ উদ্দিন

ইসলামের শুরুর যুগেই ভারতবর্ষে ইসলামের আলোকধারা বিচ্ছুরিত হয়। ইসলাম প্রচারের জন্য ও ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের কারণে রাসুল (সা.)-এর জীবদ্দশায়ই এখানে ছুটে আসে সাহাবায়ে কেরামের কাফেলা।

সে সুবাদে তখন ভারতবর্ষে মসজিদ ও ইবাদতখানা নির্মিত হয়। ভারতবর্ষে প্রতিষ্ঠিত প্রথম মসজিদ হচ্ছে—ভারতের কেরালা রাজ্যের ত্রিসুর অঞ্চলের কুদুঙ্গালুর তালুক শহরের মিথালা নামক গ্রামে অবস্থিত চেরামান জামে মসজিদ। মসজিদটির সম্মুখভাগে স্থাপিত শিলালিপির ভাষ্যানুযায়ী পঞ্চম হিজরি মোতাবেক ৬২৯ খ্রিস্টাব্দে সাহাবি হজরত মালিক বিন দিনার (রা.) [মৃত্যু : ১২৭/১৩০ হিজরি] মসজিদটি প্রতিষ্ঠা করেন। স্থানীয় মুসলমানরা এটিকে ‘চেরামান জুমা মসজিদ’ও বলে থাকে।
ইসলামপূর্ব প্রাচীনকাল থেকে কেরালার সঙ্গে আরবের বাণিজ্যিক সম্পর্ক বিদ্যমান ছিল। কেরালা ভারত মহাসাগর ও আরব উপসাগরের সমুদ্র উপকূলীয় এলাকা হওয়ায় আরবদের এতদাঞ্চলে যাতায়াত বেশি ছিল। প্রাচীন ভারতীয় পাণ্ডুলিপিতে আছে, কেরালার রাজা চেরামান পেরুমল (ঈযবত্ধসধহ চবত্ঁসধষ) আরব বণিকদের কাছে ইসলামের অনুপম সাম্য ও সম্প্রীতি দেখে ভীষণ আকৃষ্ট ও প্রীত হন। এ পরিপ্রেক্ষিতে তিনি আরব মুসলিম বণিকদের সঙ্গে মক্কা নগরীতে গিয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং তাজউদ্দিন নাম ধারণ করেন।

বিখ্যাত হাদিসগ্রন্থ ‘মুসতাদরাকে হাকিম’-এ হজরত আবু সাইদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত আছে, ‘রাসুল (সা.)-এর কাছে ভারতবর্ষের রাজা আদাভর্তি একটি কলসি উপহার পাঠান।

রাসুল (সা.) প্রত্যেককে এক টুকরা করে খেতে দেন। আমাকেও এক টুকরা দিয়েছিলেন। ’
লন্ডনভিত্তিক ভারতীয় এনসাইক্লোপিডিয়ার বরাতে ব্রিটিশ ও ভারতীয় ইতিহাসবেত্তারা দাবি করেন, হাদিসে উল্লিখিত ভারতীয় রাজা হলেন কেরালার রাজা চেরামান পেরুমল। একটি ঐতিহাসিক তথ্য মতে এবং প্রজন্মপরম্পরায় কেরালার মুসলমানদের কাছে জনশ্রুতিও রয়েছে যে রাজা চেরামান পেরুমল ১৭ রজব ৬১৭ খ্রিস্টাব্দে মহানবী (সা.)-এর আঙুলের ইশারায় চাঁদ দ্বিখণ্ডিত হতে দেখেন। তিনি তাঁর রাজ্যের ধর্মীয় পুরোহিতদের কাছে এ অদ্ভুত রহস্য জানতে চান। কিন্তু তাঁর রাজ্যের পুরোহিতরা তাঁকে কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। পরে আরব মুসলিম বণিকদের কাছে ঘটনার সত্যতা ও রহস্য জানতে পারেন তিনি। এর পরিপ্রেক্ষিতে উত্তরসূরিদের কাছে রাজ্যের দায়িত্বভার অর্পণ করে আরব বণিকদের সঙ্গে তিনি মক্কা গমন করেন এবং রাসুলের দরবারে গিয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন। ইসলাম গ্রহণের পর চেরামান পেরুমল ১৪ জনের একটি কাফেলা নিয়ে কেরালার উদ্দেশে রওনা হন। তাঁর সে কাফেলায় সাহাবি মালিক ইবনে দিনার (রা.) ও হাবিব ইবনে মালিক (রা.) ছিলেন। কিন্তু ওমানের ঝিফার (সালালাহ্) অঞ্চলে পৌঁছার পর তিনি ভীষণভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। মৃত্যু অত্যাসন্ন বুঝে মালিক ইবনে দিনার মারফত তাঁর আত্মীয়স্বজনদের কাছে একখানা পত্র লিখে অসিয়ত করেন, তারা যেন এ কাফেলাটির যথাসম্ভব সাহায্য-সহযোগিতা করে।

কেরালার শাসকবর্গ কাফেলাটিকে অত্যন্ত সম্মানের সঙ্গে বরণ করে এবং ইসলাম প্রচারের সুবিধার্থে মসজিদ নির্মাণের অনুমতি দেয়। তাদের অনুমতির পর কুদুঙ্গালুর তালুকে নির্মিত ‘চেরামান মসজিদ’টিই হচ্ছে ভারতবর্ষে প্রতিষ্ঠিত প্রথম মসজিদ। হজরত মালিক ইবনে দিনার ছিলেন এই মসজিদের প্রথম ইমাম ও তত্ত্বাবধায়ক। তাঁর পরে হজরত হাবিব ইবনে মালিক ইমাম তত্ত্বাবধায়ক নিযুক্ত হন।

একাদশ শতাব্দীতে মসজিদটির সংস্কার ও পুনর্নির্মাণ করা হয়। ক্রমান্বয়ে মুসল্লি বৃদ্ধির ফলে ১৯৭৪, ১৯৯৪ ও ২০০১ সালে মসজিদের সামনের অংশ ভেঙে আয়তন সম্প্রসারিত করা হয়। প্রাচীন মসজিদের অভ্যন্তরীণ অংশ, মিহরাব ও মিনার এখনো আগের মতো অক্ষত রয়েছে। মসজিদের বহির্ভাগ কংক্রিট দিয়ে তৈরি হয়। অজু করার জন্য তখনকার নির্মিত পুকুর এখনো আগের মতো আছে। মসজিদের পাশঘেঁষা খালি জায়গায় দুটি কবর বিদ্যমান। মনে করা হয়, একটি হাবিব ইবনে মালিকের, অন্যটি তাঁর স্ত্রী মুহতারামা হুমায়রার। রমজান মাসে বিপুলসংখ্যক মুসল্লি ইবাদত-বন্দেগির উদ্দেশ্যে এ মসজিদে আগমন করে থাকেন।

লেখক : তরুণ আলেম

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
দয়া করে আপনার নাম লিখুন