মুমিনের নতুন বছরের ভাবনা

মুফতি রিদওয়ানুল কাদির

ইতিহাসের তথ্য অনুযায়ী, খ্রিস্টপূর্ব ৪৬ সালে জুলিয়াস সিজার সর্বপ্রথম ইংরেজি নববর্ষ উত্সবের প্রচলন করেন। গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার প্রবর্তনের পর পহেলা জানুয়ারি পাকাপোক্তভাবে নববর্ষের দিন হিসেবে নির্দিষ্ট হয় ১৫৮২ সালে। ধীরে ধীরে ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার (খ্রিস্টানদের ধর্মযাজক পোপ গ্রেগরির নামানুসারে যে ক্যালেন্ডার) অনুযায়ী নববর্ষ পালন করা হচ্ছে। ইরানে নওরোজ বা নববর্ষ শুরু হয় পুরনো বছরের শেষ বুধবার এবং উত্সব চলতে থাকে নতুন বছরের ১৩ তারিখ পর্যন্ত। সাধারণভাবে প্রাচীন পারস্যের সম্রাট জমশিদ খ্রিস্টপূর্ব ৮০০ সালে এই নওরোজের প্রবর্তন করেছিলেন। মেসোপটেমিয়ায় আকিতু বা নববর্ষ শুরু হতো নতুন চাঁদের সঙ্গে। ব্যাবিলনিয়ায় নববর্ষ শুরু হতো মহাবিষুবের দিনে ২০ মার্চ। অ্যাসিরিয়ায় শুরু হতো জলবিষুবের দিনে ২১ সেপ্টেম্বর। মিসর, ফিনিসিয়া ও পারসিকদের নতুন বছর শুরু হতো ২১ সেপ্টেম্বর। গ্রিকদের নববর্ষ শুরু হতো খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দী পর্যন্ত ২১ ডিসেম্বর। রোমান প্রজাতন্ত্রের পঞ্জিকা অনুযায়ী নববর্ষ শুরু হতো ১ মার্চ এবং খ্রিস্টপূর্ব ১৫৩ সালের পর ১ জানুয়ারি। মধ্যযুগে ইউরোপের বেশির ভাগ দেশে নববর্ষ শুরু হতো ২৫ মার্চ। পহেলা জানুয়ারি পাকাপোক্তভাবে নববর্ষের দিন হিসেবে নির্দিষ্ট হয় ১৫৮২ সালে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার প্রবর্তনের পর। ধীরে ধীরে ইউরোপসহ সারা বিশ্বে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ইংরেজি নববর্ষ পালন করা হচ্ছে।

বছরের বিদায়বেলায় একজন মুমিনের অনুভূতি

বর্তমানে বর্ষবরণ নামে যে অশ্লীলতা, বেহায়াপনা, হৈ-হুল্লোড় ও নগ্নতার প্রদর্শন চলে, তা কি একজন নিম্নস্তরের মুমিনের জন্যও শোভা পায়? বছরের সূচনালগ্নে যখন একজন মুমিন উপস্থিত হয়, তখন তার অনুভূতি এ ধরনের হওয়া দরকার—যে দিনগুলো আমার শেষ হয়ে গেল, তা তো আমার জীবনেরই একটি মূল্যবান অংশ। একটি বছর শেষ হওয়ার সরল অর্থ, আমার জীবনের দালান থেকে ৩৬৫ দিনের ৩৬৫টি পাথর যেন খসে পড়ল। আমার জীবন সংকীর্ণ হয়ে এলো। এটা আনন্দের নয়, চিন্তার ব্যাপার। এখন আনন্দ-উল্লাসের সময় নয়, বরং সময় হলো হিসাব-নিকাশের। কাজেই একটি বছরের উপসংহারে দাঁড়িয়ে মুমিনের মানসপটে প্রশ্ন উত্থাপিত হয় যে একটি বছর তো আমি শেষ করেছি, কিন্তু যে মহান উদ্দেশ্যে (তাঁর ইবাদত-বন্দেগির জন্য) মহান আল্লাহ আমাকে এই বসুন্ধরায় পাঠালেন, সে পথে কতটুকু অগ্রসর হয়েছি? সে পথে আমার প্রাপ্তি কতটুকু? ইসলামী জাহানের দ্বিতীয় খলিফা হজরত ওমর (রা.) (মৃ. ২৩ হি.) একবার মিম্বরে দাঁড়িয়ে তাঁর খুতবায় এক ঐতিহাসিক উক্তি উপস্থাপন করেছিলেন, যা ইমাম তিরমিজি (রহ.) (২০৯-২৭৯ হি.) স্বীয় গ্রন্থ তিরমিজি শরিফ এবং ইমাম ইবনে আবি শায়বা (রহ.) (মৃ. ২৩৫ হি.) স্বীয় গ্রন্থ মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বায় উল্লেখ করেন। হজরত ওমর (রা.) বলেছিলেন, ‘হিসাব চাওয়ার আগে নিজের হিসাব করে নাও, তোমার কাজ পরিমাপ করার আগে নিজেই নিজের কাজের পরিমাপ করে নাও।’ (জামে তিরমিজি, ৪/৬৩৮)

ইসলাম ধর্মে উত্সবের রূপরেখা

আমরা অনেকে উপলব্ধি না করলেও উত্সব সাধারণত একটি জাতির ধর্মীয় মূল্যবোধের সঙ্গে সম্পৃক্ত। উত্সবের উপলক্ষগুলো খোঁজ করলে পাওয়া যাবে, উত্সব পালনকারী জাতির ধমনিতে প্রবাহিত ধর্মীয় অনুভূতি, সংস্কার ও ধ্যান-ধারণার ছোঁয়া। যেমন—খ্রিস্টানদের বড়দিন তাদের বিশ্বাস মতে স্রষ্টার পুত্রের জন্মদিন। ইহুদিদের নববর্ষ ‘রোজ হাশানাহ’ ওল্ড টেস্টামেন্টে বর্ণিত ইহুদিদের ধর্মীয় পবিত্র দিন ‘সাবাত’ হিসেবে পালিত হয়। এমনিভাবে প্রায় সব জাতির উত্সব উপলক্ষের মাঝেই ধর্মীয় চিন্তাধারা খুঁজে পাওয়া যাবে। আর এ জন্যই প্রিয় নবী (সা.) দ্ব্যর্থহীনভাবে মুসলিম জাতির উত্সব নির্ধারণ করে দিয়েছেন। ফলে অন্যদের উত্সব এ জাতির সংস্কৃতিতে অনুপ্রবেশের কোনো সুযোগ নেই। রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, ‘প্রত্যেক জাতির নিজস্ব ঈদ (উত্সব) রয়েছে, আর এটা (ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা) আমাদের মুসলিম জাতির ঈদ।’ (বুখারি ও মুসলিম শরিফ)

এ হাদিস থেকে মুসলিম ও অমুসলিম জাতির উত্সবের মৌলিক একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য প্রতিভাত হয়। অমুসলিম সম্প্রদায়ের উত্সবের দিনগুলো হচ্ছে তাদের জন্য উচ্ছৃঙ্খল আচরণের দিন। এ দিনে তারা নৈতিকতার সব বাঁধ ভেঙে দিয়ে অশ্লীল কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয়, আর এই কর্মকাণ্ডের অবধারিত রূপ হচ্ছে মদ্যপান ও ব্যভিচার। অপর দিকে মুসলিম জাতির উত্সব হচ্ছে ইবাদতের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। বিষয়টি আমাদের গভীরভাবে উপলব্ধি করতে হবে। ইসলাম কেবল কিছু আচার-অনুষ্ঠান ও আনুষ্ঠানিকতার নাম নয়, বরং তা মানুষের পুরো জীবনকে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও নির্দেশ অনুযায়ী বিন্যস্ত ও সজ্জিত করতে উদ্যোগী হয়। সে জন্য মুসলিম জাতির আনন্দ-উত্সব আল্লাহর বিরুদ্ধাচরণ ও অশ্লীলতায় নিহিত নয়, বরং আল্লাহর নির্দেশ পালন ও নিষেধ থেকে বিরত থাকার মধ্যেই নিহিত। তাই তাদের প্রতিটি কাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে জড়িয়ে থাকবে তাদের ধর্মীয় মূল্যবোধ, তাদের ইমান, আখিরাতের প্রতি তাদের অবিচল বিশ্বাস, আল্লাহর প্রতি ভয় ও ভালোবাসা।

আমাদের করণীয়

ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে ইংরেজি নববর্ষ-সংক্রান্ত যাবতীয় অনুষ্ঠান সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কারণ এতে কয়েক ধরনের ইসলামবিরোধী কর্মকাণ্ড রয়েছে। এক. শিরকপূর্ণ অনুষ্ঠানাদি, চিন্তাধারা ও সংগীত। দুই. নগ্নতা, অশ্লীলতা, ব্যভিচারপূর্ণ অনুষ্ঠান। তিন. গান ও বাদ্যপূর্ণ অনুষ্ঠান। চার. সময় অপচয়কারী অনর্থক বাজে কথা ও কাজ। এমতাবস্থায় প্রতিটি মুসলিমের দায়িত্ব হলো, নিজে এগুলো থেকে সম্পূর্ণরূপে বিরত থাকা এবং মুসলিম সমাজ থেকে এই ইমানবিধ্বংসী প্রথা উচ্ছেদে নিজ নিজ সাধ্য ও অবস্থান অনুযায়ী সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানো। এ প্রসঙ্গে আমাদের করণীয় হলো—এক. যাদের নিজস্ব প্রভাব ও দাপট রয়েছে, তাদের কর্তব্য হবে অধীনস্থদের এ কাজ থেকে বিরত রাখা।

দুই. মসজিদের ইমামরা এ বিষয়ে মুসল্লিদের সচেতন করে বিরত থাকার উপদেশ দিতে পারেন।

তিন. পরিবার প্রধানরা এ বিষয়টি নিশ্চিত করবেন যে তার পুত্র-কন্যা, স্ত্রী কিংবা তাঁর অধীনস্থ অন্য কেউ যেন নববর্ষের কোনো অনুষ্ঠানে যোগ না দেয়।

চার. এ ছাড়া ব্যক্তিগতভাবে প্রত্যেকে তাঁর বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন, সহকর্মী, সহপাঠী, পরিবারের মানুষ ও প্রতিবেশীকে উপদেশ দিতে পারেন এবং নববর্ষ পালনের সঙ্গে কোনোভাবে সম্পৃক্ত হওয়া থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করবেন। জাগ্রত হোক জাতির বিবেক, এই প্রত্যাশায়।

লেখক : আলেম ও গবেষক

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
দয়া করে আপনার নাম লিখুন