ভারতবর্ষে অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির রূপকার মাওলানা মুহাম্মদ আলী

মাওলানা জসিম শফিক 

মাওলানা মুহাম্মদ আলী জাওহার ১৮৭৮ সালে ভারতের রামপুরে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি একাধারে দারুল উলুম দেওবন্দ ও আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন। ১৮৯৮ সালে তিনি অক্সফোর্ডের লিঙ্কন কলেজে আধুনিক ইতিহাস বিষয়ে অধ্যয়ন করেন। বর্ণাঢ্য কর্মজীবনে এই মহান মুসলিম মনীষী একাধারে রাজনীতিবিদ, শিক্ষক ও সাংবাদিক ছিলেন। কর্মজীবনে প্রথমে তিনি রামপুর রাজ্যের শিক্ষানির্দেশক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯১১ সালে তিনি উর্দু ভাষায় ‘হামদর্দ’ ও ইংরেজি ভাষায় ‘দ্য কমরেড’ নামের সাপ্তাহিক চালু করেন। রাজনীতি ও সাংবাদিকতার পাশাপাশি তিনি সাহিত্যচর্চাও করতেন। লিখতেন কবিতাও।

১৯০৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর ‘অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগ’-এর জন্ম হয়। এর পেছনে মাওলানা মুহাম্মদ আলীর বিশেষ ভূমিকা ছিল। মুসলিম লীগের সংবিধান প্রণয়নেও তাঁর অসামান্য অবদান ছিল। ১৯১৩ সালে যখন ইতালি ত্রিপোলি দখল করে, তিনি গোপনে ব্রিটেনে চলে যান। এবং ব্রিটিশ সংবাদপত্রে ইতালির বিরুদ্ধে বিভিন্ন প্রচারণা চালান। তিনি ভারত সরকারের কাছে আবেদন জানান, সরকার যেন ভারতের মুসলমানদের অনুভূতির আবেদনে সাড়া দেয়।

১৯১৭ সালের ডিসেম্বর থেকে ১৯১৮ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত মুসলিম লীগের ১১তম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকে মাওলানা মুহাম্মদ আলীকে তাঁর অনুপস্থিতিতে মুসলিম লীগের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করা হয়। এ সময় খেলাফত আন্দোলনের আলোচনা জোরালো হয়।

১৯১৯ সালে তিনি জেল থেকে মুক্ত হয়ে অমৃতসর পৌঁছলে কংগ্রেসের মোতিলাল নেহরু তাঁকে স্বাগত জানান। তিনি মাওলানার কাছে আবেদন করে বলেন, আপনি ভারতের মহান নেতা, আপনি আমাদের সভায়ও বক্তব্য দিন। সম্প্রীতির স্বার্থে মাওলানা মুহাম্মদ আলী কংগ্রেসের সভায় বক্তব্য দেন।

এরপর মাওলানা মুহাম্মদ আলী খেলাফত আন্দোলন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। ওই খেলাফত আন্দোলনের প্রধান লক্ষ্য ছিল তুরস্কে খেলাফত টিকিয়ে রাখা। খেলাফত আন্দোলনে রাজদ্রোহী বক্তৃতা প্রদানের দায়ে ১৯২০ সালে তিনি আবার দুই বছরের জন্য কারারুদ্ধ হন। কারাগারে তিনি কবিতাচর্চার পাশাপাশি কোরআন, হাদিস ও ইসলামী ইতিহাসের গভীর অধ্যয়ন করেন। এই সময়ে মুসলিম লীগ দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। এক ভাগ ‘খেলাফতি মুসলিম লীগ’ নামে পরিচিতি পায় এবং তারা খেলাফত আন্দোলনে মাওলানা মুহাম্মদ আলীকে সাহায্য করতে থাকে। কিন্তু যখন কামাল আতাতুর্কের হাতে তুরস্কেই খেলাফত ধ্বংস হয়ে যায়, তখন তিনি আড়ালে চলে যান। কয়েক বছর পর ১৯২৫ সালে আবার তিনি ভারত থেকে সীমান্ত আলাদা করার চেষ্টা শুরু করেন। এবং মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ১৪ দফার প্রতি সমর্থন জানান।

১৯৩০ সালে ভারতে সায়মন কমিশন ঘটিত হয়, এটি হিন্দুদের কংগ্রেস ও মুসলমানদের মুসলিম লীগ কাউকে তুষ্ট করতে পারেনি। সংগত কারণেই মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ তা প্রত্যাখ্যান করেন। কিন্তু মুফতি মুহাম্মদ শফি ও আল্লামা ইকবাল সায়মন কমিশন বয়কটের সমর্থনে ছিলেন না। পরে নানা নাটকীয়তার পর মুসলিম লীগের দুই অংশ একত্রিত হয়ে যায়।

মাওলানা মুহাম্মদ আলীর শ্রেষ্ঠ কীর্তি হলো উপমহাদেশে খেলাফত আন্দোলন প্রতিষ্ঠা। তুর্কি খেলাফত রক্ষায় ১৯১৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে উপমহাদেশে খেলাফত আন্দোলন শুরু হয়। আলী ভ্রাতৃদ্বয় মুহাম্মদ আলী ও শওকত আলী, মাওলানা আবুল কালাম আজাদ, ড. এম এ আনসারী ও হজরত মোহানীর নেতৃত্বে এ আন্দোলন সূচিত হয়। মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী ১৯১৯ সালে অহিংস আন্দোলন ‘সত্যাগ্রহ’ শুরু করেন। তাঁর আন্দোলনের প্রতি মুসলমানদের সমর্থন নিশ্চিত করার জন্য গান্ধী খেলাফত আন্দোলন সমর্থন করেন। তাঁর সঙ্গে বহু হিন্দু মনীষী এই আন্দোলন সমর্থন করেন। ১৯২০ সালের মাঝামাঝি খেলাফত আন্দোলনের প্রতি গান্ধীর সমর্থনের বিনিময়ে খেলাফত নেতারা গান্ধীর অহিংস অসহযোগ আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করেন। এভাবে ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায় একটি সম্মিলিত ফ্রন্ট গড়ে তোলে। জমিয়তে উলামা-ই-হিন্দ তথা দেওবন্দের আলেমসমাজও এ আন্দোলনে যোগদান করেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কামাল আতাতুর্কের ক্ষমতা দখলের মধ্য দিয়ে ১৯২২ সালের নভেম্বর মাসে তুর্কি খেলাফত বিলুপ্ত হয়। ফলে ১৯২৪ সালের মার্চ মাসে খেলাফত আন্দোলনেরও বিলুপ্তি ঘটে।

আকস্মিকভাবে খেলাফত আন্দোলনের পরিসমাপ্তি ঘটলেও এ আন্দোলনের ফলে যে রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা অর্জিত হয়, তা ১৯৪৭ সালের ভারত বিভক্তির পর বাঙালি মুসলমানদের কাছে খুবই মূল্যবান বিবেচিত হয়।

এর আন্দোলনের ফসল হিসেবে মুসলমানদের জন্য পৃথক রাষ্ট্র গঠিত হয়।

১৯৩২ সালের ৪ জানুয়ারি মাওলানা মুহাম্মদ আলী লন্ডনে ইন্তেকাল করেন। তাঁর ইচ্ছানুযায়ী নবীদের পুণ্যভূমি বায়তুল মুকাদ্দাসে তিনি সমাহিত হন। ফিলিস্তিনের প্রধান মুফতি তাঁর জানাজা পড়িয়েছেন। মাওলানা মুহাম্মাদ আলী জাওহারের ইন্তেকালের পর মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর মতো প্রভাবশালী নেতার চোখে পানি এসে যায়। তিনি বলেন, ‘ইসলামের সৈনিক আমাদের ছেড়ে দূরে চলে গেলেন।’ সত্যিই তাঁর মৃত্যুতে উপমহাদেশে মুসলমানরা রাজনৈতিক নেতাশূন্য হয়ে পড়ে।

লেখক : সাংবাদিক, গবেষক

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
দয়া করে আপনার নাম লিখুন