সামাজিক কাজের মাধ্যমে নিজেকে অপরিহার্য করে গড়ে তোলা সময়ের দাবী

সৈয়দ শামছুল হুদা

এক. বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পুর্বের তুলনায় আরো অনেক বেশি জটিল ও কুটিল। বাঘা বাঘা রাজনীতিবিদরা পর্যন্ত হিসাব মিলাতে পারছেন না আসলে কী হচ্ছে? ঐক্যফ্রন্টের সামনের সারিতে যারা ছিলেন তারা বর্তমান বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে শ্রেষ্ঠত্বের দাবীদার। অন্যদিকে আওয়ামীশিবিরে যারা নিজেদেরকে খুবই ইমপোর্টেন্ট মনে করতেন, আজ দেখেন তাদের অবস্থা কী দাঁড়িয়েছে। যারা স্বপ্নেও ভাবেননি, আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় আসবে, আর তারা মন্ত্রী পরিষদে স্থান পাবেন না, অথচ বাস্তবে সেটাই হলো। এই অবস্থায় ইসলামী দলগুলো রাজনীতিতে যে কোন কিছুই করতে পারবে না তা দিবালোকের মতই স্পষ্ট।

এই অবস্থায় আমাদের সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ বিষয় হলো, নিজ নিজ এলাকায় সামাজিক কাজগুলোর সাথে সম্পৃক্ততা বাড়ানো। সেখানে নিজেদের অপরিহার্য করে গড়ে তোলা। মানুষের সুখ-দুখের সাথে নিবিড়ভাবে মিশে যাওয়া। পরিবার ও সামাজিকভাবে যে সকল অপরাধ ছড়িয়ে পড়েছে তা ধীরে ধীরে রুখে দেওয়া। মানুষের আস্থা অর্জন করা। বেশি বেশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা। অসহায়দের সেবার ব্যবস্থা করা। দুর্বলদের পাশে দাঁড়ানো। তৃণমূলে নিজেদের কাজের পরিধি বাড়ানো। আর বৃহত্তর পর্যায়ে আলেমদের সাথে ঐক্য জোরালো করা।

আমরা জাতীয় ঐক্যের কথা খুব বেশি বেশি বলি। কিন্তু আফসোস হলো, আমরা যে মহল্লায় থাকি, যে এলাকায় বাস করি, সেই এলাকায় থাকা আলেম, উলামা, ইমাম, মুয়াজ্জিন, কুরআন ও হাদীসের খেদমতে নিয়োজিত ভাইদের সাথেই আমার ঐক্য নাই। তাদের সাথেই আমার মিল-মহব্বত নাই। সুখে-দুখে তাদের পাশেই দাঁড়াই না। আর খালি বড়দের দোষ ধরি। পাড়ায়-পাড়ায়, মহল্লায়-মহল্লায় তৌহিদী জনতার ঐক্য গড়ে তুলুন, তার আগে নিজেদের মধ্যে মধ্যে ঐক্য গড়ে তুলুন। সম্প্রীতি বাড়ান। একসাথে বসার ব্যবস্থা করুন।

বর্তমান রাজনীতির হালচাল আমার কাছে খুবই দুর্বিষহ মনে হচ্ছে। সে কারণে ইসলামী রাজনীতিতে মুরুব্বিগণকে সামনে রেখে তরুণদের এগিয়ে আসা দরকার। আর তরুণদের মধ্যে ঐক্যের জন্য কাজ হওয়া দরকার। দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক ভাবনাকে সামনে রেখে কাজ করতে প্রস্তুত থাকতে হবে আমাদের। বাংলাদেশের আলেমদের সংখ্যা অনেক। কিন্তু কার্যত তাদের মধ্যে গভীর কোন ঐক্য নেই। নেতৃত্ব নেই। এহেন অবস্থায় আমাদের ওপর জাতীয় কোন বিপর্যয় দেখা দিলে আঘাতটা আলেমদের ওপরেই বেশি আসবে।সেটা মাথায় রেখেই আমাদের কাজ করতে হবে। সাময়িক লোভ-লালসার মধ্যে পড়ে গেলে উম্মাহর ক্ষতি ছাড়া কোন লাভ নেই। দুয়েক জন ব্যক্তির সুবিধা-অসুবিধা বড় কথা নয়। সামগ্রীক বিষয় চিন্তা করতে হবে।

দুই. ইসলামী শিক্ষার ওপরও নেমে আসতে পারে নানারকম বিধিনিষেধ। এ জন্য প্রস্তুত থাকা ভালো। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে স্বেচ্ছাচারিত বন্ধ করতে হবে। সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে কোন না কোন বোর্ডের সাথে সম্পৃক্ত করতে হবে। বাংলাদেশের আলেমদের বড় একটি কর্মক্ষেত্র হলো মাদ্রাসা অঙ্গন। সেখানেও নানা অনিয়ম বিস্তার করে আছে। ছাত্র, শিক্ষক, প্রিন্সিপ্যালের মধ্যে থাকে অনেক দূরত্ব। আল্লাহর ওয়াস্তে, দেশের শঙ্কিত রাজনীতির সময়ে এসব অভ্যন্তরীন বিরোধ কমিয়ে মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষকদেরকে বহিঃর্মুখি করুন। ছাত্রদেরকে সমাজের বাস্তবতা সম্পর্কে ধারণা দিতে হবে। প্রশাসন, আইন শৃংখলা বাহিনী, রাজনৈতিক নেতাদের চাল-চলন, চিন্তা-ভাবনা, ধ্যান-ধাারণা, মেজাজ সম্পর্কে মাদ্রাসা ছাত্রদের ধারণা দিতে হবে।

মাদ্রাসাগুলো দ্বীনের দুর্গ। তবে এ দুর্গে বসে থাকলে হবে না। এখান থেকে ছড়িয়ে পড়তে হবে। প্রতিটি মাদ্রাসার প্রতিবেশি যেন মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের ওপর সন্তুষ্ট থাকে, খুশি থাকে সেভাবে কাজ করতে হবে। সমাজের প্রতিটি পরতে পরতে অনাচার, অনিয়ম, দুর্নীতি, দুর্বৃত্তপনা ছড়িয়ে পড়েছে। এগুলো সামাজিকভাবেই মোকাবেলা করতে হবে।

বিশেষভাবে অশ্লীলতা যেভাবে ছড়িয়ে পড়েছে সেগুলো প্রতিরোধ করতে না পারলে মসজিদ মাদ্রাসার অপরিহার্যতা হাস্যকর হয়ে দাঁড়াবে। সেই শক্তিটা এখনো আমাদের আছে। আমরা যেন এই সুযোগটা কাজে লাগাই। রাস্তাঘাটে, পরিবারে, সমাজে বিস্তার লাভ করা বেহায়াপনা দূর করতে হেকমতের সাথে শক্তি প্রয়োগ অব্যাহত রাখতে হবে। আর নিজ নিজ খেদমতের জায়গাগুলো নিরাপদ রাখতে সমাজের ভালো মানুষদের সাহস দিতে হবে। তাদের সঙ্গ পেতে প্রেরণা যোগাতে হবে।

তিন. রাস্ট্রীয় ক্ষমতা পাওয়াকেই সবকিছু মনে করা ঠিক হবে না। ক্ষমতা এমনে এমনেই আসে না। সামাজিক সেবার মাধ্যমেই সামাজিক নেতৃত্ব গ্রহন সম্ভব। নেতা হওয়ার পরে সামাজিক সেবা নয়, সেবার মাধ্যমে নেতায় পরিণত হতে হবে। আলেম-উলামা, দ্বীনদার ব্যক্তি, ইসলামপ্রিয় তৌহিদী জনতার সাথে মিশতে হবে। সবার সাথে মিশতে হবে। এখানে কে আহলে হাদীস, কে বেদাতি, কে সুন্নি, ওয়াহাবি, এগুলো যতদূর সম্ভব এড়িয়ে যেতে হবে। মেজাজের মধ্যে সকল প্রকার উগ্রতার বীজ মিটিয়ে ফেলতে হবে। সবার জন্য নিজেকে উজাড় করে দিতে হবে। কৃষাণ, শ্রমিক, মজুরদের ভাই মনে করে বুকে টানতে হবে।

এভাবে আগামী ১০টা বছর কাজ করুন, ইনশাআল্লাহ, সুদিন তাওহীদি জনতার আসবেই। বিরোধ পরিহার করুন। হিংসা, বিদ্বেষ মুছে ফেলুন, এর ফল কি আমরা দেখেছি। নতুবা ঝড় আসলে আমরা সামাল দিতে পারবো না। ঝড় আসার আগেই ঝড় মোকাবেলা করে ঠিকে থাকার প্রস্তুতি নেওয়ার এখনই সময়।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
দয়া করে আপনার নাম লিখুন