মদিনার ফাজায়েল

মুফতি মুহাম্মদ মর্তুজা

সৌদি আরবের হিজাজ অঞ্চলের একটি প্রাচীন শহর মদিনাতুল মুনাওয়ারাহ। যেখানে শুয়ে আছেন প্রিয়নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)। ঐতিহাসিকভাবে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি শহর। যেখানে ইসলামের গৌরবময় অতীত ধারণ করে দাঁড়িয়ে আছে মুসলমানের প্রাচীনতম গুরুত্বপূর্ণ তিনটি মসজিদ, মসজিদে নববী, কুবা ও কিবলাতাইন। যখন রসুলুল্লাহ (সা.) হিজরত করেন তখন রব্বুল আলামিনের দরবারে এ দোয়া করেছিলেন, ‘হে আল্লাহ! আপনার সবচেয়ে মকবুল জায়গা থেকে বের হয়ে এসেছি। এবার আপনার সবচেয়ে প্রিয় জায়গায় নিয়ে চলুন।’ আল্লাহতায়ালা রসুল (সা.)-এর দোয়া কবুল করলেন এবং তাঁর প্রবল রহমতে সিক্ত করে মদিনায় পৌঁছালেন। এতে বোঝা যায়, মদিনাই আল্লাহতায়ালার সবচেয়ে প্রিয় জায়গা। এ কারণেই হয়তো মক্কা বিজয়ের পরও প্রিয়নবী (সা.) মদিনায় থেকে যান।

মদিনা ছিল রসুল (সা.)-এর প্রাণের শহর। যখন প্রিয় নবী সফর থেকে মদিনার কাছাকাছি আসতেন, মদিনার টানে তিনি সাওয়ারিকে আরও দ্রুত চালাতেন। নিজের চেহারার কাপড় সরিয়ে দিতেন, যাতে মদিনার পবিত্র হাওয়ায় প্রাণ খুলে নিঃশ্বাস নেওয়া যায়।

সাহাবায়ে কিরামদেরও মদিনার প্রতি ছিল অগাধ ভালোবাসা। তারা সর্বদাই আল্লাহতায়ালার দরবারে মদিনায় মৃত্যুলাভের দোয়া করতেন। হজরত ওমর (রা.) বেশির ভাগ সময় দোয়া করতেন, ‘হে আল্লাহ! আমাকে তোমার রাস্তায় শাহাদাত লাভের তৌফিক দান কর এবং আমার মৃত্যু তোমার রসুলের শহরে প্রদান করো।’ (বুখারি : ১৮৯০)।

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত। নবী (সা.) বলেন, হে আল্লাহ! ইবরাহিম (আ.) তোমার বন্ধু ও নবী। তুমি মক্কাকে ইবরাহিম (আ.)-এর জবানিতে (দোয়ার পরিপ্রেক্ষিতে) হারাম (সম্মানিত) ঘোষণা করেছ। হে আল্লাহ! আমিও তোমার বান্দা ও নবী। অতএব আমি মদিনাকে, তার দুই প্রস্তরময় জমিনের মধ্যস্থল হারাম ঘোষণা করছি। (বুখারি : ৩১১৩)।

মদিনার জন্য রসুল (সা.) এত বেশি দোয়া করেছেন যে, আল্লাহর রহমতে কোনো ব্যক্তি যদি সকালের নাস্তায় মদিনার সাতটি আজওয়া খেজুর ভক্ষণ করে তবে ওই দিন তার ওপর কোনো বিষ কিংবা জাদু কাজ করে না। (বুখারি : ৫৪৪৫)।

মদিনার মাটিকেই রসুল (সা.) জান্নাতের বাগান বলে আখ্যা দিয়েছেন। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত। নবী (সা.) ইরশাদ করেছেন, আমার ঘর ও মিম্বারের মধ্যবর্তী স্থানটি হলো জান্নাতের একটি বাগান, আর আমার মিম্বারটি হলো আমার হাউস (কাউসার)-এর ওপর অবস্থিত। (বুখারি : ১৮৮৮)। এ ছাড়া মদিনা সেই পবিত্র ভূমির একটি যেখানে দাজ্জাল প্রবেশ করতে পারবে না। যেই ভূমিটিকে আল্লাহ রব্বুল আলামিন দাজ্জালের ফিতনা থেকে মুক্ত রাখবেন। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, মদিনায় প্রবেশপথসমূহের পাহারায় ফেরেশতা নিয়োজিত রয়েছে। তাই প্লেগ রোগ ও দাজ্জাল মদিনায় প্রবেশ করতে পারবে না। (বুখারি : ১৮৮০)।

মদিনার অগণিত ফজিলত জানতে পেরেই হয়তো মহান আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করে কবি বলেছিলেন, ‘ওহ দিন খোদা করে কে মদিনে কো যায়ে হাম, কেহ্ খাকে দরে রসুলে সুরমা লাগায়ে হাম’— অর্থ : ‘মহান আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ! আল্লাহ যেন আমাকে মদিনায় যাওয়ার তৌফিক দান করেন, যেন রসুলের ভূমির মাটিকে সুরমা হিসেবে লাগাতে পারি।’ আল্লাহ আমাদের সবাইকে পবিত্র কাবা তাওয়াফের পাশাপাশি রসুল (সা.)-এর রওজা জিয়ারতের তৌফিক দান করুন। আমিন।

লেখক : প্রাবন্ধিক, গবেষক

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
দয়া করে আপনার নাম লিখুন