ইসলামে বৈষম্য নেই

মুফতি মুহাম্মদ মর্তুজা

আমরা সবাই আল্লাহর বান্দা। তার কাছে ধনী-গরিব, কালো-সাদা সবাই সমান। কিন্তু আমাদের সমাজব্যবস্থায় কালো বা অসুন্দর কিংবা গরিব হওয়াকে অভিশাপ মনে করা হয়। বর্ণে কালো হলে অথবা অর্থে দুর্বল হলে পদে পদে তাকে অপমান-অপদস্থ হতে হয়, যা সইতে না পেরে কখনো কখনো ঘটে যায় অপ্রীতিকর ঘটনা। অথচ হাদিস শরিফে আছে, হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রসুল (সা.) এরশাদ করেন, আল্লাহ তোমাদের চেহারা এবং ধনসম্পদ দেখেন না বরং তিনি তোমাদের অন্তর ও আমল দেখেন। (সহিহ মুসলিম, ২৫৬৪)। অন্যত্র এরশাদ হচ্ছে, হজরত আবু নাজরা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন যিনি রসুল (সা.) খুতবা শুনেছেন আইয়্যামে তাশরিকের দিনে। রসুল (সা.) বলেন, হে লোক সকল! মনে রেখ, তোমাদের পালনকর্তা এক এবং তোমাদের পিতা একজন। মনে রেখ, আরবি-অনারবিদের ওপর কোনো প্রাধান্য নেই এবং অনারবিদেরও আরবিদের ওপর কোনো প্রাধান্য নেই, সুন্দরদের কালোর ওপর কোনো প্রাধান্য নেই এবং কালোদেরও সুন্দরদের ওপর কোনো প্রাধান্য নেই যদি তাকওয়া না থাকে। (মুসনাদে আহমদ : ২৩৪৮৯)। এভাবে বর্ণ নিয়ে কারও ওপর অহঙ্কার করা জাহেলি রীতি ছাড়া আর কিছু নয়। আমাদের সমাজকে ধ্বংস করতে জাহেলি কুসংস্কারগুলোকে নতুন রূপ দেওয়া হচ্ছে মাত্র। মানুষ হয়ে যাচ্ছে দিন দিন অর্থ ও সুন্দরের পূজারি। এ আগুনকে আরও প্রজ্বলিত করতে জ্বালানির কাজ করছে বিভিন্ন টিভি সিরিয়াল ও বিদেশি চ্যানেলগুলো, যার প্রভাবে বেড়ে যাচ্ছে বিভিন্নধর্মী অপরাধ ও পরকীয়া। আর তা থেকে সৃষ্টি হচ্ছে সামাজিক ও সাংসারিক অস্থিরতা। পাশাপাশি অসুন্দররা সুন্দর কর্তৃক অথবা অসচ্ছলরা সচ্ছল কর্তৃক মানসিকভাবে নির্যাতিত হচ্ছে, যা সইতে না পেরে কেউ কেউ বেছে নেয় আত্দহত্যার পথ। অথচ প্রিয় নবী রসুল (সা.) এমন অহঙ্কার ও তিরস্কারকে জোরালোভাবে নিষেধ করেছেন।

এরশাদ হচ্ছে, হজরত আবু উমামা (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, একদা আবু জর (রা.) হজরত বেলাল (রা.)-কে উদ্দেশ করে মা নিয়ে রহস্য করে বলেন, ইয়া ইবনুস সাউদা (হে কালির ছেলে)। অতঃপর বেলাল (রা.) রসুল (সা.)-এর দরবারে এসে ব্যাপারটি রসুল (সা.)কে অবগত করেন। যাতে তিনি খুব ক্ষুব্ধ হন। পরে হজরত আবু জর (রা.) রসুল (সা.)-এর দরবারে এলে তিনি ব্যাপারটি অাঁচ করতে পারেননি। যে রসুল (সা.) তার থেকে মুখ ফিরিয়ে আছেন। তখন আবু জর (রা.) রসুল (সা.)-কে বললেন, ইয়া রসুলাল্লাহ! আপনি কী আমার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন? আমার ব্যাপারে কী কেউ কোনো নালিশ করেছে? রসুল (সা.) বললেন, তুমি সেই ব্যক্তি বেলালের (রা.) মাকে নিয়ে রহস্য করেছিলে! অতঃপর প্রিয় নবী রসুল (সা.) বলেন, ওই সত্তার কসম যিনি মুহাম্মদের (সা.)-এর ওপর কোরআন নাজিল করেছেন, আমলবিহীন কারও ওপর কারও কোনো প্রাধান্য নেই। (শুআবুল ইমান ৪৭৭২)। অপর হাদিসে এরশাদ হচ্ছে, হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রসুল (সা.) এরশাদ করেন, আল্লাহ তোমাদের মধ্য থেকে জাহেলি রীতিনীতি দূর করেছেন এবং দূর করেছেন বাবা-দাদাদের নিয়ে অহঙ্কার করাকে। মুমিনরা হচ্ছে মুত্তাকি এবং গুনাহগাররা হচ্ছে দুর্ভাগা। তোমরা সবাই আদম সন্তান আর আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করা হয়েছে মাটি থেকে। (আবু দাউদ ৫১১৬)।

উলি্লখিত আলোচনা থেকে বোঝা যায়, একজন মানুষ যতক্ষণ মুমিন কিংবা মুত্তাকি না হবে ততক্ষণ আল্লাহ ও তার রসুল (সা.)-এর কাছে তার কোনো মূল্য নেই। তাই আমরা অর্থ ও সৌন্দর্যের বলে কাউকে অবহেলা, অপমান করা থেকে বিরত থাকব। সূরায়ে হুজুরাতের ১১ নম্বর আয়াতে আল্লাহতায়ালা বলেন, কোনো সম্প্রদায় যেন অপর কোনো সম্প্রদায়কে বিদ্রূপ না করে, হতে পারে তারা বিদ্রূপকারীদের চেয়ে উত্তম। আর কোনো নারীও যেন অন্য নারীকে বিদ্রূপ না করে, হতে পারে তারা বিদ্রূপকারীদের চেয়ে উত্তম। আর তোমরা একে অপরের নিন্দা কর না এবং তোমরা একে অপরকে মন্দ উপনামে ডেক না। ইমানের পর মন্দ নাম কতই না নিকৃষ্ট! আর যারা তাওবা করে না, তারাই তো জালিম। (সূরা হুজরাত, ১১)। আল্লাহ আমাদের এমন নিকৃষ্ট কাজ থেকে বিরত থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন।

লেখক : প্রাবন্ধিক, গবেষক।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
দয়া করে আপনার নাম লিখুন