রোগীর শুশ্রূষায় ইসলামের নির্দেশনা

মাওলানা হেদায়েতুল্লাহ

সুস্থতা ও অসুস্থতা আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে বিশেষ নিয়ামত। একজন মানুষ সুস্থ অবস্থায় যেমন অনেক কাজ করতে পারে, তেমনি অসুস্থ অবস্থায়ও অনেক কিছু করতে পারে। তা ছাড়া আল্লাহর বিধি-নিষেধ মতে, জীবন পরিচালনা করলে একজন মুসলিমের পুরো জীবন আল্লাহর কাছে ইবাদত বলে গণ্য হবে। তাই রাসুল (সা.) বলেন, ‘মুমিনের সব কিছুই বিস্ময়কর। তার সব কিছুতেই কল্যাণ নিহিত। এমনটি শুধু মুমিনের জন্যই প্রযোজ্য। সে ভালো অবস্থায় থেকে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করলে, তার জন্য এটা কল্যাণ বয়ে আনবে। আর বিপদগ্রস্ত হয়ে ধৈর্য ধারণ করলে, এটাও তার জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে।’ (সহিহ মুসলিম : ২৯৯৯)

অসুস্থ ব্যক্তিকে দেখতে যাওয়া, তার দেখাশোনা ও শুশ্রূষায় নিয়োজিত থাকা অনেক বড় পুণ্যের কাজ। অসুস্থ ব্যক্তিকে দেখতে এলে ভ্রাতৃত্ববোধ উপলব্ধি হয় রোগীর মনে। এতে তার দুঃখ-ব্যথা, চিন্তা ও হতাশাবোধ কেটে যায়। অসুস্থের শুশ্রূষা করা একজন মুসলিমের অন্যতম দায়িত্ব ও কর্তব্য। তাই রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, “একজন মুসলিমের ওপর অন্য মুসলিমের ছয়টি হক আছে। সাহাবারা বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, তা কী কী? রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তোমার সঙ্গে কোনো মুসলিমের সাক্ষাৎ হলে তাকে সালাম দেবে। কোনো কাজে ডাকলে সাড়া দেবে। পরামর্শ চাইলে পরামর্শ দেবে।’ হাঁচি দিয়ে ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বললে, উত্তরে ‘ইয়ারহামুকাল্লাহ’ বলবে। অসুস্থ হলে দেখতে যাবে। মারা গেলে তার জানাজায় অংশগ্রহণ করবে।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৫৭০২)

অসুস্থতার অন্যতম উপকারিতা হলো, মানুষের পাষাণ মন নরম হয়। অন্তর মুক্তি পায় সব রকম রোগব্যাধি থেকে।

হাদিসে বর্ণিত রোগী দেখার কিছু সুন্নাত আমল নিম্নে বর্ণনা করা হলো—

উপযুক্ত সময় নির্ধারণ করা : রোগীর সঙ্গে দেখা করতে চাইলে উপযুক্ত সময়ে যেতে হবে। অনেক সাক্ষাত্প্রার্থী যখন-তখন রোগীর সঙ্গে দেখা করতে আসে। এতে রোগীর খুব কষ্ট হয়। অপারেশন থেকে সবেমাত্র বের করা রোগীর সঙ্গেও অনেকে দেখা করতে উদগ্রীব হয়ে যায়। আবার অনেকে রোগীর বিশ্রামের সময়ও সাক্ষাৎ করতে আসে। রোগীর ঘুমের সময় ও খাবার গ্রহণের সময়ও সাক্ষাৎ করা উচিত নয়। আনাস (রা.) বর্ণনা করেন, ‘রাসুল (সা.) রোগী দেখতে যেতেন তিন দিন অতিবাহিত হওয়ার পর।’ (ইবনে মাজাহ : ১৪৩৭)

রোগীর অবস্থা জিজ্ঞেস করা : রোগীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এলে তার শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করাও সুন্নাত। তবে রোগী যদি কথা বলতে না পারে, তাহলে কথা না বলাই ভালো। নাফে (রহ.) বর্ণনা করেন, ‘ওমর (রা.) কোনো রোগীকে দেখতে এলে তার অবস্থা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতেন। আর রোগীর কাছ থেকে উঠে গেলে বলতেন, আল্লাহ তোমার ভালো করুন।’ (আল আদাবুল মুফরাদ : ৫২৭)

অসুস্থ ব্যক্তির জন্য দোয়া করা : রোগী দেখতে এসে তার জন্য দোয়া করা সুন্নাত। এতে প্রশান্ত হয় রোগীর অন্তর। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুল (সা.) কোনো রোগী দেখতে এলে রোগীর শিয়রে গিয়ে বসতেন। অতঃপর সাতবার এই দোয়া পড়তেন, ‘আসআলুল্লাহাল আজিম, রাব্বাল আরশিল আজিম, আন ইয়াশফায়াকা।’ (অর্থ : আমি মহান আল্লাহর কাছে কামনা করছি, আরশের মহান রবের কাছেও কামনা করছি, তিনি যেন তোমাকে সুস্থ করে দেন)। এতে রোগী দেরিতে হলেও সুস্থ হয়ে উঠত।’ (মুসনাদে আহমাদ : ২২১২৯, আল আদাবুল মুফরাদ : ৫৩৬)

রোগীকে সাহস জোগানো : রোগীকে দেখতে এসে তার মনে সাহস জোগানো উচিত। তার সঙ্গে এমনভাবে কথা বলা, যেন তার অন্তরে বেঁচে থাকার আশা জেগে ওঠে। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘রোগীর সঙ্গে এমনভাবে কথা বলো, যেন সে অন্তরে সান্ত্বনা লাভ করে।’ (তিরমিজি : ২০৯৪) এ ছাড়া রোগীকে ধৈর্য ধারণ করতে বলাও সুন্নাত। এ সময় ধৈর্যের সওয়াব সম্পর্কে বলা। হাদিসে কুদসিতে আছে, আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘আমি কোনো মুমিন বান্দাকে পরীক্ষায় ফেললে, সে এতে ধৈর্য ধারণ করল এবং সওয়াবের প্রত্যাশা করল আর আমার প্রশংসা করল, সে বিছানা থেকে গুনাহমুক্ত হয়ে এমনভাবে উঠবে যেন সে সদ্যোভূমিষ্ঠ শিশু।’ (মুসনাদে আহমাদ : ১৭২৪৮)

অসুস্থ ব্যক্তির কাছে দোয়া প্রার্থনা করা : অসুস্থ ব্যক্তির কাছে দোয়া প্রার্থনা করা মুস্তাহাব। এ সময় সে আল্লাহর খুব কাছে থাকে। তাই আল্লাহর কাছে তার দোয়াগুলো দ্রুত কবুল হয়। ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) আমাকে বলেন, ‘তুমি কোনো রোগীর কাছে গেলে তাকে তোমার জন্য দোয়া করতে বলবে। তার দোয়া ফেরেশতাদের মতো আল্লাহর কাছে কবুল হয়।’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ১৪৪১)

লেখক : অনুবাদক ও গ্রন্থকার

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
দয়া করে আপনার নাম লিখুন