ভাষার বাহনে জান্নাতের ঠিকানায়

মোহাম্মদ মাকছুদ উল্লাহ

ভাষা মানুষের জন্য জীবনের সার্বিক কল্যাণ, উন্নয়ন ও বিকাশের বাহন হিসেবে আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের সবচেয়ে বড় নিয়ামত। ভাষা হেদায়েত ও মুক্তির বাহন। কারণ যুগে যুগে মানবজাতির জাগতিক ও পারলৌকিক সর্বোচ্চ কল্যাণের নির্দেশনা দিয়ে মহান আল্লাহ অসংখ্য নবী ও রাসুলকে দুনিয়ায় পাঠিয়েছেন। নবী-রাসুলরা তাঁদের উম্মতের সামনে হেদায়েতের বাণী যেমন মাতৃভাষায় উপস্থাপন করেছেন, তেমনি জাগতিক বিষয়াবলির শিক্ষা ও প্রশিক্ষণও দিয়েছেন মাতৃভাষায়ই।

নবীরা মানুষকে জাগতিক বিষয় শিক্ষা দিয়েছেন, কথাটা শুনে ইসলামের সঙ্গে যাঁদের অ্যালার্জিক সম্পর্ক, তাঁরা হয়তো মোল্লার পাঁচালি বলে উড়িয়ে দেবেন; আর যাঁরা নিজেদেরকে খাঁটি ধার্মিক ভাবেন, তাঁরা হয়তো বলবেন, একেবারে ধর্মবিরোধী কথা। উভয়ের প্রতি আমাদের জিজ্ঞাসা, দ্বিন আর দুনিয়াকে আলাদা করল কে? যাবতীয় জ্ঞান-বিজ্ঞানের একমাত্র উৎস হলেন আল্লাহ রাব্বুল আলামিন। আর মহান আল্লাহ মানবজাতিকে সব জ্ঞানের শিক্ষা দিয়েছেন নবী-রাসুলদের মাধ্যমে। কৃষিতে হজরত আদম (আ.), চিকিৎসায় ঈসা (আ.), প্রকৌশলে দাউদ (আ.), পরিকল্পনায় ইউসুফ (আ.), নদীবিজ্ঞানে খিজির (আ.)-এর বিজ্ঞতার বিবরণ পবিত্র কোরআনেই রয়েছে।

আমার কথায় যদি কোনো নিন্দুকের হাসি পায়, তাহলে তাকে বলি, ১৪৬৩ সালে লিউয়েন যে অণুবীক্ষণযন্ত্র আবিষ্কার করেছিলেন, ১৮৩৬ সালে চার্লস ব্যাবেজ যে ক্যালকুলেটর আবিষ্কার করেছিলেন, ১৯৪৪ সালে এইকেন যে কম্পিউটার আবিষ্কার করেছিলেন, সেগুলোর আকৃতি দেখেও কি আপনার হাসি পায়? আজকের আধুনিক অণুবীক্ষণযন্ত্র, ক্যালকুলেটর ও কম্পিউটরের জনক যে তাঁরাই। নিজের মাথাটা খাটালে এ কথাও কারো বুঝতে মোটেও অসুবিধা হওয়ার কথা নয় যে মহান আল্লাহ নবীদের মাধ্যমে মানবজাতিকে সব জ্ঞান আর বিজ্ঞানের তাত্ত্বিক ও মৌলিক বিষয়গুলো শিক্ষা দিয়েছেন। আর তার উৎকর্ষ সাধনের দায়িত্ব ছেড়ে দিয়েছেন মানুষের ওপর। সুতরাং আজ পর্যন্ত পৃথিবীতে জ্ঞান-বিজ্ঞানের যত শাখা-প্রশাখা বিস্তার লাভ করেছে, সবগুলোই মহান আল্লাহর সীমাহীন জ্ঞানভাণ্ডার থেকে উৎসারিত—এ কথা আমরা হলফ করে বলতে পারি। বিজ্ঞানের যেকোনো আবিষ্কারের ইতিবৃত্ত যদি ভাষার বাহনে প্রজন্মান্তরে সংরক্ষিত না হতো, তাহলে মানবজাতি পাথরের যুগ পেরিয়ে আজকের সভ্যতার মুখ দেখতে পেত না কোনো দিন।

জ্ঞান-বিজ্ঞানের উৎকর্ষতা পার্থিব জীবনের উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য আর মহান আল্লাহর ইবাদত তথা জীবনের সব ক্ষেত্রে আল্লাহর আনুগত্য পরকালীন জীবনের সাফল্য তথা জান্নাতপ্রাপ্তির জন্য অপরিহার্য। পার্থিব জীবনের সফলতার পথ ধরেই পরকালীন জীবনের মুক্তি আসতে পারে—এটাই ইসলামের শিক্ষা। জীবনের বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে সন্ন্যাসব্রত না ইহকালীন জীবনে কোনো প্রাপ্তি যোগ করতে পারে আর না পরকালীন জীবনে মুক্তির ঠিকানায় পৌঁছাতে পারে। তাইতো রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আদ্দুন্ইয়া মাজরাআতুল আখিরাহ’—অর্থাৎ দুনিয়া হলো আখিরাতের শস্যক্ষেত্র। পার্থিব জীবনের সার্বিক কর্মকাণ্ড সুচারুরূপে পরিচালিত করে জান্নাতের পথে মানুষের যাত্রাকে অবিচ্ছিন্ন রাখতেই মহান আল্লাহ নবী-রাসুলদের উম্মতের গাইড হিসেবে দুনিয়ায় পাঠিয়েছেন এবং গাইডবুক হিসেবে দিয়েছেন আসমানি গ্রন্থ। আর সে লক্ষ্যে ভাষাটাই সবচেয়ে বড় মাধ্যম। তাই পৃথিবীর সব নবীকেই তাঁর স্বজাতির ভাষাভাষী করে পাঠানো হয়েছে এবং নবীদের দেওয়া আসমানি কিতাবগুলো তাঁদের স্বজাতির ভাষায়ই নাজিল করা হয়েছে।

মুসা (আ.)-কে হিব্রুভাষী জনগোষ্ঠীর নবী হিসেবে পাঠানো হয়েছিল এবং তাঁর ওপর নাজিলকৃত কিতাব তাওরাত ছিল একই ভাষার। ঈসা (আ.) ও তাঁর ওপর নাজিলকৃত কিতাব ইঞ্জিলের ভাষা ছিল স্বজাতির ভাষা সুরিয়ানি বা গ্রিক। দাউদ (আ.)-এর স্বজাতি এবং তাঁর ওপর নাজিলকৃত কিতাব জাবুরের ভাষা ছিল ইউনানি। আর মোহাম্মদ (সা.) ও তাঁর স্বজাতির ভাষা আরবিতে নাজিল করা হয়েছিল আল কোরআন। যেহেতু ভাষা এমনই একটি মাধ্যম, যা একই সঙ্গে মানুষের জাগতিক উন্নয়নের সোপান ও পারলৌকিক জীবনের মুক্তির বাহন হতে পারে, সে জন্য রাসুলুল্লাহ (সা.) ভাষা শিক্ষার ওপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্বারোপ করতেন। তাইতো তিনি তাঁর নিরক্ষর সাহাবিদের ভাষা শিক্ষা দানকে ইসলাম ও মুসলমানদের নির্মূল করতে ধেয়ে আসা বদরের কুরাইশ বন্দিদের মুক্তিপণ হিসেবে গণ্য করেছিলেন।

বিশিষ্ট ইতিহাস লেখক গোলাম মোস্তফা বদর যুদ্ধে মুসলমানদের হাতে বন্দিদের সম্পর্কে লিখেছেন, ‘বন্দিদের মুক্তিদানের ব্যাপারেও হজরত কম সহৃদয়তা দেখান নাই। বন্দীদিগের সাধ্যানুসারে মুক্তিপণ নির্ধারণ করিয়াছিলেন। যাহারা সঙ্গতিসম্পন্ন, তাহাদের প্রত্যেককে ২০০০ হইতে ৬০০০ দিরহাম দিতে হইয়াছিল; কিন্তু দরিদ্র লোকদিগের জন্য মাত্র ৪০০ দিরহাম পণ ধার্য করিয়া দিয়াছিলেন। আবার বন্দীদিগের মধ্যে যাহারা শিক্ষিত ছিল, তাহাদের সম্বন্ধে সুন্দর ব্যবস্থা করা হইয়াছিল। তাহাদের প্রত্যেককে মদিনার দশটি বালক-বালিকাকে লেখাপড়া শিখাইয়া দিতে বলা হইয়াছিল এবং উহাই তাহাদের মুক্তিপণরূপে গণ্য করা হইয়াছিল। শিক্ষার প্রতি হজরতের এই অনুরাগ সত্যিই প্রশংসনীয়।’ (বিশ্বনবী, ঢাকা : আহমদ পাবলিশিং হাউস, ১৯৪২ ইং, পৃষ্ঠা ১৬৮)

মাতৃভাষার সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে একজন মুমিন জান্নাত লাভ করতে পারে। হজরত আবু হাযেম (রা.) সাহল ইবনে সাদ (রা.) থেকে একটি হাদিস বর্ণনা করেছেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি আমার জন্য তার লজ্জাস্থান ও জিহ্বার (সঠিক ব্যবহারের) জিম্মাদার হবে, আমি তার জন্য জান্নাতের জিম্মাদার হব। (বুখারি, হাদীস : ৬১০৯) আমাদের মাতৃভাষা বাংলা, মহান আল্লাহর শ্রেষ্ঠ নেয়ামত। এই ভাষার পথ ধরেই এসেছে আমাদের স্বাধীনতা। আর বাংলা ভাষাই হতে পারে আমাদের জান্নাতে পৌঁছার বাহন। মহান আল্লাহ আমাদের বাংলা ভাষার সর্বোচ্চ সুন্দর ব্যবহারের তাওফিক দান করুন!

লেখক : সাংবাদিক, গ্রন্থকার ও পেশ ইমাম

রাজশাহী কলেজ কেন্দ্রীয় মসজিদ।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
দয়া করে আপনার নাম লিখুন