চুড়িহাট্টাবাসীর আতঙ্ক এখনো কাটছে না

অগ্নিকাণ্ডের সময় স্থানীয় যারা বাসাবাড়ি ছেড়ে সরে যেতে পেরেছেন, তাদের কেউ কেউ ফিরলেও এখনও আতঙ্ক বিরাজ করছে অনেকের মধ্যেই। চুড়িহাট্টা মোড় থেকে পূর্ব দিকে কয়েক গজ গেলে বাম দিকের গলির শেষ মাথার বাড়ির মালিক মো. মঈন উদ্দিন।

তার সামনের ভবনে আগুন লাগায় পরিবারের সবাইকে নিয়ে বাড়ির পেছনের গেইট দিয়ে বেরিয়ে গিয়েছিলেন বুধবার রাতে। তার বাড়ির অর্ধেক ভাড়াটিয়া ফিরে এলেও অন্যরা আতঙ্কে ফিরছেন না বলে জানান তিনি।

“তাদেরকে ভরসা দিচ্ছি যে কিছু আর হবে না, কিন্তু তারা ভরসা পাচ্ছে না,” বলেন ষাটোর্ধ্ব মঈন উদ্দিন।

নন্দ কুমার দত্ত লেনের পাশে হায়দার বখশ লেইনের একটি বাড়ির বাসিন্দা ৫২ বছর বয়সী মো. আনোয়ার হোসেনের চোখে এখনও আটকে আছে ভয়াল সেই রাতের বিভীষিকা।

চুড়িহাট্টা শাহী মসজিদের পাশেই তার বাসা। আগুন লাগার পর ভবনের আর সব বাসিন্দাদের সঙ্গে প্রাণ বাঁচাতে তিনিও সপরিবারে ছুটেছিলেন নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে। দৌঁড়াতে গিয়ে আহত হন তার স্ত্রী মুনিরা বেগম।

সেই রাতের কথা মনে করে শিউরে ওঠেন আনোয়ার।

ওয়াহেদ ম্যানশনের নিচতলায় রাসায়নিকের দোকানে পুড়ে যাওয়া বস্তা।ছবি: মাহমুদ জামান অভি

“আমরা এখনো ঘুমাইতে পারি না। ঘুমের মধ্যেও কান্নার আওয়াজ পাই। সকালে এলাকায় আইস্যা দেখি, লাশ আর লাশ! এই দৃশ্য সহ্য করা যায় না।”

নন্দ কুমার দত্ত লেইনের হায়দার ফার্মেসির মর্মান্তিক ঘটনার বর্ণনা দেন প্লাস্টিক ব্যবসায়ী শরীফ হোসেন। এই সড়কে তার বসবাস ২৩ বছর ধরে।

“আগুন লাগার আগে ফার্মেসিতে অন্তত নয়জন ছিল। ডাক্তার মঞ্জু ভাই, তার দুজন সহকর্মী, আর বাচ্চা কোলে আসা মহিলা…. আরও কেউ কেউ…… আগুন লাগার পরে বাঁচার জন্য শাটার নামায়া দিছিল….. ভাইরে… ভিতরে সব পুইড়া মরল। সকালে তাদের লাশ যখন বাইর করে…” বলতে বলতে কেঁদে উঠেন শরীফ।

তাকে সান্তনা দিতে এসে তাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে উঠেন আনোয়ার হোসেনসহ চুড়িহাট্টার আরো দুই বাসিন্দা।

আগুনে সবচেয়ে বেশি ক্ষতগ্রস্ত ওয়াহেদ ম্যানশনের তৃতীয় তলার বাসিন্দা মো. রফিকুল ইসলামকে পাওয়া যায় চুড়িহাট্টা মোড়ের এক কোণে। ফ্যালফ্যাল চোখে তিনি তাকিয়ে ছিলেন পোড়া বাসার দিকে।

তিনি বলেন, “বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে বের হয়ে আসতে পেরেছি। কীভাবে বের হয়ে গেছি সবাই জানি না।”

ওয়াহেদ ম্যানশনের নিচতলাতেই একসঙ্গে ২৪টি মৃতদেহ পাওয়া যায়, সিঁড়ি ঘরের ফ্লোরে দলা পাকানো অবস্থায় ছিল পোড়া লাশগুলো। বেরিয়ে আসার চেষ্টা করেও পারেনি হতভাগ্য মানুষগুলো।

চকবাজারের ব্যবসায়ী নূর হোসেন মাত্র মিনিট কয়েকের জন্য প্রাণে বেঁচে গিয়েছিলেন।

তিনি বলেন, “মাত্র মিনিট কয়েক আগে আমি রানা–রাজুর দোকান আসছিলাম। আমার এক বন্ধু কামালও আমারে চা খাওয়াতে চাইছিল। আমি বললাম, কালকে খামু।

“একটু পরে জোরে জোরে আওয়াজ আর বিস্ফোরণ। চারপাশে আগুন আর আগুন। এমন ঘটনা আমি আর কখনো দেখি নাই। বিশ্বাস করেন, রাতে দুই চোখের পাতা এক করলে এখন খালি রানা-রাজু আর কামাল ভাইরে দেখি। কত ভালা ভালা মানুষগুলা কেমন কইরা চইলা গেল।”

ওয়াহেদ ম্যানশনের দ্বিতীয় তলায় পারফিউমের ক্যানের স্তূপ সরাচ্ছেন স্বেচ্ছাসেবীরা। ছবি: মাহমুদ জামান অভি

অগ্নিকাণ্ডের পর ধ্বংসস্তুপ থেকে মৃতদের লাশ বের করতে সহযোগিতা করেছিলেন মোহাম্মদ সুরুজ। মঞ্জুর ফার্মেসি, মদিনা ডেকোরেটর্স আর সড়ক থেকে ৩০টি লাশ তিনি নিজ হাতে উদ্ধার করেন।

শুক্রবার দুপুরে তিনি ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন নন্দ কুমার দত্ত লেইনে। বললেন, দুর্ঘটনার বর্ণনা শোনার পর তার দুই শিশু কন্যার মনেও বড় প্রভাব পড়েছে।

“আমার বড় মাইয়াডা ভয়ে আমারে সারাক্ষণ জড়ায়া থাকে। এই যে আসছি, সে তো আসতেই দিতে চাইতাছিল না। খালি কয়, আব্বা আবার যদি আগুন লাইগ্যা যায়, তুমি যাইও না।”

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
দয়া করে আপনার নাম লিখুন