হুমায়ূন আহমেদের ধর্মচিন্তা

ড. মুহাম্মদ আবদুল হাননান

হুমায়ূন আহমেদ বাংলা সাহিত্যে এমন এক স্তরে প্রবেশ করেছিলেন যে তাঁর সৃষ্টিজগৎ নিয়ে বহুবিধ তত্ত্বালোচনা ও দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি বিচার প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠবে। বিশেষ করে ধর্মাদর্শ ও স্রষ্টা-চেতনা তাঁর সৃজনশীল রচনাসমগ্রের অন্যতম স্পর্শকাতর বিষয় হিসেবে সমালোচকদের সামনে চলে এসেছে।
হুমায়ূন আহমেদের সৃষ্টিকর্তা সম্পর্কিত ভাবনা ও ধর্মানুভূতি অন্য রকম। এখানে কোনো রাখঢাক নেই। আলাদা কোনো দর্শন নেই। একেবারেই চিরপ্রচলিত ‘ট্র্যাডিশনাল’ সৃষ্টিকর্তাকেই তিনি সামনে রেখেছেন। তবে তাঁর সৃষ্টিকর্তা ও ধর্ম সম্পর্কিত চেতনা খানিকটা বুদ্ধিবৃত্তিক ও উদার জাগতিক মানুষের। স্রষ্টার প্রতি তাঁর ভালোবাসা চিরসবুজ এবং অনেকটা লোকজ আন্তরিকতায় পূর্ণ।

শৈশব-কৈশোরের পরিবেশে ধর্মানুভূতি উন্মেষ

হুমায়ূন আহমেদের ধর্মীয় চেতনার বিকাশের পটভ‚মিতে রয়েছে তাঁর কৈশোর-শৈশবের পরিবেশ। এ পরিবেশের বেড়াজালে প্রোথিত রয়েছে তাঁর আধ্যাত্মিক চিন্তাভাবনার শেকড়। তাঁর নিজস্ব বয়ানে শোনা যেতে পারে : ‘আসলে আমি মানুষ হয়েছি অদ্ভুত পরিবেশে। একা একটি বাড়ির অগুনতি রহস্যময় কোঠা। বাড়ির পেছনে জড়াজড়ি করা বাঁশবন। দিনমানেই শেয়াল ডাকছে চারদিকে। সন্ধ্যা হব-হব সময়ে বাঁশবনের এখানে-ওখানে জ্বলে উঠছে ভ‚তের আগুন। দোতলার বারান্দায় পা ছড়িয়ে বিচিত্র সুরে কোরআন পড়তে শুরু করেছে কানাবিবি। সমস্তই অবিমিশ্র ভয়ের।’
এখানে ‘বিচিত্র সুরে কোরআন’ এবং ‘দুলে দুলে কোরআন পাঠ শুনলেই বুকের ভেতর ধক্ করে’ ওঠার বিষয়টি খুব গুরুত্বপূর্ণ। লেখকের শিশু মনে তার ইতিবাচক প্রভাব পড়েছিল। কোরআনের পর কালেমা পড়ার বিষয়টিও তাঁর শৈশবের ঘটনাবলিতে দাগ কেটেছিল, ‘আমি এসেছি অতি কঠিন গোঁড়া মুসলিম পরিবেশ থেকে। আমার দাদা মাওলানা আজিমুদ্দিন আহমেদ ছিলেন মাদ্রাসা শিক্ষক। তাঁর বাবা জাহাঙ্গির মুনশি ছিলেন পীর মানুষ। আমার দাদার বাড়ি ‘মৌলবিবাড়ি’ নামে এখনো পরিচিত।’ (হুমায়ূন আহমেদ, ফাউন্টেনপেন, অন্যপ্রকাশ, ঢাকা-২০১১, পৃষ্ঠা ১৯)

স্রষ্টার প্রতি অগাধ আস্থা

হুমায়ূন রচনাবলি অনুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ধর্ম ও স্রষ্টার প্রতি তাঁর ছিল বরাবর অগাধ আস্থা। সব ক্ষেত্রে আল্লাহর মহত্ত্ব ও বড়ত্ব প্রকাশে তিনি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন। বিভিন্ন রচনার ফাঁকে ফাঁকে এসেছে এমন অনেক বাক্য :

‘আমার সেই মহান ম্যাজিশিয়ানের স্বরূপ জানতে ইচ্ছা করে, যিনি আমাদের সবাইকে অন্তহীন ম্যাজিকে ডুবিয়ে রেখেছেন।’ (বলপয়েন্ট, অন্যপ্রকাশ, ঢাকা ২০০৯, পৃষ্ঠা ৯৫ )

এসব মন্তব্য ও সংলাপে রয়েছে স্রষ্টার প্রতি তাঁর গভীর ভালোবাসা। এতে তাঁর ধর্মপ্রাণতার প্রবণতা প্রকাশ করে। সব ক্ষেত্রেই এ রকম একজন আস্তিক মানুষের ছায়া ঘুরে বেড়ায় হুমায়ূন রচনাবলির পরতে পরতে, যা তাঁর সমকালের অন্যান্য লেখক-শিল্পীর মধ্যে নেই বললেই চলে।

কোরআন-হাদিসের তত্ত্বকথা প্রচার

পবিত্র কোরআন ও হাদিস সম্পর্কে হুমায়ূন আহমেদের অগাধ পাণ্ডিত্য যেকোনো ধর্মবেত্তাকে বিস্মিত করবে। তিনি তাঁর বিভিন্ন লেখায় কোরআন-হাদিসের বিভিন্ন উদ্ধৃতি অকাতরে ব্যবহার করেছেন। এই অকাতর ব্যবহারের আধিক্য দেখে অনুমিত হয়, কোরআন ও হাদিসের সুন্দর বাক্যাবলি তিনি মানবসমাজে এবং তাঁর পাঠকমহলে প্রচার করার চেষ্টা করেছেন। এতে তাঁর ধর্মপ্রাণতার দ্বায়ি (দ্বিনের কথার প্রচারক অথবা তাবলিগ) চরিত্র উদ্ঘাটিত হয়। এটা তিনি করেছেন স্বচ্ছন্দে ও স্বতঃস্ফূর্তভাবে। যেমন-একটি গদ্য রচনায় ‘বিগব্যাং’ সম্পর্কে লিখতে গিয়ে তিনি কোরআনের উদ্ধৃতি ব্যবহার করেছেন, ‘আমাদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ কোরআন শরিফে সৃষ্টির শুরুর ঘটনা ঠিক এভাবেই উলে­খ করা আছে। সুরা আম্বিয়ায় বলা হয়েছে, ‘অবিশ্বাসীরা কি দেখে না যে সব আকাশ ও ভূমণ্ডল একটি একক ছিল এবং আমরা তাকে বিচ্ছিন্ন করলাম? (২১:৩০)।’ (রঙপেন্সিল, অন্যপ্রকাশ, ঢাকা, পৃষ্ঠা ৪১ )

‘বিগব্যাং’ বিষয়ে সাম্প্রতিক বিতর্ক সামনে রেখে তিনি দেড় হাজার বছর আগে প্রবর্তিত আল্লাহ সোবহানাহু তাআলার কোরআনের তত্ত্বকে এখানে হাজির করছেন। ‘বিগব্যাং’তত্ত্বের বিজ্ঞানীরা বলছেন, বর্তমান দৃশ্যমান ও অদৃশ্য জগতের সবটাই সৃষ্টির শুরুতে একটি বিন্দুতে আটকে ছিল। হঠাৎ তা অকল্পনীয় গতিতে বিন্দুবিচ্ছিন্ন হতে শুরু করল। হুমায়ূন আহমেদ কোরআনের উদ্ধৃতি ব্যবহার করে জানাচ্ছেন, পবিত্র কোরআন তো দেড় হাজার বছর আগেই এই তত্ত্ব বলে গেছে। তিনি এই জন্য কোরআনের সুরা আম্বিয়ার ৩০ নম্বর আয়াত ব্যবহার করেছেন। পবিত্র কোরআনের ওপর তাঁর অসাধারণ ব্যুৎপত্তি দেখে বিস্মিত হতে হয়।

আল্লাহ পাকের প্রতি অসীম আস্থা প্রকাশে তাঁর আরেকটি সংগ্রহ তিনি উলে­খ করেছেন তাঁর গ্রন্থে, যেখানে দুনিয়াবি ভালোবাসা থেকে মানুষকে উঠে আসার আহ্বান রয়েছে। রয়েছে মৃত্যু বিষয়ে স্রষ্টার প্রতি নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের এক গভীর ইচ্ছা : আমেরিকান প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকনের দুটি ছেলে নিতান্ত অল্প বয়সে হোয়াইট হাউসে মারা যায়। আব্রাহাম লিংকন তারপর হতাশ হয়ে লিখলেন, গডের সৃষ্টি কোনো জিনিসকে বেশি ভালোবাসতে নেই। কারণ তিনি কখন তাঁর সৃষ্টি মুছে ফেলবেন তা তিনি জানেন। আমরা জানি না। (নিউ ইয়র্কের নীলাকাশে ঝকঝকে রোদ, পৃষ্ঠা ৩১ )
গাছপালা ও বৃক্ষরাজি সম্পর্কে হুমায়ূন আহমেদের আগ্রহ বহুল প্রচারিত। বৃক্ষ দিয়ে বিশাল বনমালা গড়ে তোলার প্রচেষ্টাও বাস্তবজীবনে তিনি করে দেখিয়েছেন। এ সম্পর্কে তাঁর একটি বিশেষ আগ্রহ লক্ষণীয় :
গাছপালা বিষয়ে নবিজি (সা.)-এর একটি চমৎকার হাদিস আছে। তিনি বলেছেন, মনে করো তোমার হাতে গাছের একটি চারা আছে। যেকোনোভাবেই হোক, তুমি জেনে ফেলেছ পরদিন রোজ কেয়ামত। বিশ্বজগৎ ধ্বংস হয়ে যাবে। তার পরও গাছের চারাটি তুমি মাটিতে লাগিয়ো। (ফাউন্টেনপেন, পৃষ্ঠা ৩০)
হুমায়ূন আহমেদের গবেষণায় আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ, তা হলো, মানুষের পাপের শাস্তি তিনি আল্লাহ সোবহানাহু তাআলার কাছ থেকে সরাসরি কামনা করছেন। বলছেন, আল্লাহ পাক যদি সরাসরি শাস্তি দিতেন, তাহলে পৃথিবীর চেহারা অন্য রকম হতো। দেখা যেতে পারে এই বিষয়ে তাঁর পর্যবেক্ষণ হলো,
প্রচলিত ধারণা হচ্ছে, অতি অতি দুষ্টদের আল্লাহ পাক বজ্রপাতের মাধ্যমে সরাসরি শাস্তি দেন।
উদাহরণ, সিরাজউদ্দৌলার হত্যাকারী মিরন। তার ঘটনা এ রকম : সিরাজউদ্দৌলার আপন খালা ঘসেটি বেগম বজরায় করে বুড়িগঙ্গা নদী পার হচ্ছেন। ব্যবস্থা করে দিয়েছে মিরন। ঘসেটি বেগম হঠাৎ দেখলেন, মাঝনদীতে বজরা আসামাত্র নৌকার মাঝিমাল্লারা বজরা ফেলে ঝাঁপিয়ে বুড়িগঙ্গায় পড়ল এবং প্রাণপণে সাঁতরাতে লাগল তীরের দিকে। বজরার নিচ ফুটো করা হয়েছে। বজরা পানিতে ডুবতে শুরু করেছে। ঘসেটি বেগম মিরনের ষড়যন্ত্র বুঝতে পারলেন। তিনি বজরার ছাদে উঠে চিৎকার করে বললেন, মিরন! তুই মারা যাবি বজ্রাঘাতে।
ইতিহাস বলে, বজ্রপাতের কারণেই মিরনের মৃত্যু হয়েছে। আমার কথা হচ্ছে, আল্লাহ পাক কি সরাসরি শাস্তি দেন? যদি দিতেন, তাহলে পৃথিবীর চেহারা অন্য রকম হতো। [ফাউন্টেনপেন, পৃষ্ঠা ৭১ ]

বেহেশত প্রসঙ্গে তাঁর আগ্রহ ও বিশ্বাস

জান্নাত অথবা বেহেশত প্রসঙ্গে হুমায়ূন আহমেদের আগ্রহ আমরা লক্ষ্য করি। তবে এ ব্যাপারে তার ধারণার একটা নিজস্ব দর্শন আছে, কিন্তু ধর্মের সঙ্গে তা সাংঘর্ষিক হয়নি, ‘পবিত্র কোরআন শরিফের একটি আয়াতে আল্লাহ পাক বলছেন, ‘এবং বেহেশতে তোমরা প্রবেশ করবে ঈর্ষামুক্ত অবস্থায়।’
এর সরল অর্থ, শুধু বেহেশতেই মানুষ ঈর্ষামুক্ত, ধুলা-কাদার পৃথিবীতে নয়। বিস্ময়কর হলেও সত্যি, ঈর্ষা এক অর্থে আমাদের চালিকাশক্তি। মানবসভ্যতার বিকাশের জন্য ঈর্ষার প্রয়োজন আছে। বেহেশতে যেহেতু সভ্যতা বিকাশের কিছু নেই, ঈর্ষার প্রয়োজন নেই। [ রঙপেন্সিল, পৃষ্ঠা ৯৩ ]

পারিবারিকভাবেই ধর্মাচারে অভ্যস্ত

হুমায়ূন আহমেদকে আমরা দেখতে পাই পারিবারিকভাবেই তিনি ইসলাম ধর্মের আচার ও কানুনগুলোতে অভ্যস্ত। তাঁর লেখনীতেও সেগুলো প্রতিফলিত হয়েছে। প্রসঙ্গক্রমে অথবা প্রসঙ্গ ছাড়াই ধর্মীয় শব্দ, ধর্মীয় সময় এবং দোয়া-দরুদের কথা তিনি বলার চেষ্টা করেছেন। এতে তাঁর প্রবল ধর্মানুভ‚তির প্রকাশ ঘটেছে।

পরকাল উপলব্ধি

হতে পারে, দুনিয়া ও আখেরাতের বিষয়ে তাঁর চিন্তা-চেতনা জীবনসায়াহ্নে এসে একটা পরিণতি লাভ করেছে। তবে বরাবরই তিনি একজন বিশ্বাসী। শেষজীবনে দুনিয়ার প্রতি তাঁর মোহ একটা প্রবল ধাক্কাই খেয়েছিল, মজার ব্যাপার হলো, আমরা মানুষরাও প্রবল বিভ্রমে বাস করি। আমাদের সবার বাস্তবতাই আলাদা। মানুষ হিসেবে আমরা আলাদা। আমাদের রিয়ালিটিও আলাদা। [ নিউ ইয়র্কের নীলাকাশে ঝকঝকে রোদ, পৃষ্ঠা ৩৪ ]
আর এই উপলব্ধির ফলে দুনিয়া ছেড়ে যে মানুষকে খালি হাতে চলে যেতে হবে, সেই চরম সত্যটি উদ্ঘাটিত হতে দেখি তাঁর কলমে, ‘বিত্তবানদের মনে রাখা উচিত, কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা ব্যাংকে জমা রেখে তাঁদের একদিন শূন্য হাতেই চলে যেতে হবে।’ [ নিউ ইয়র্কের নীলাকাশে ঝকঝকে রোদ, পৃষ্ঠা ২১-২২ ]
এই উপলব্ধি হুমায়ূন আহমেদের লেখালেখির জীবনে একটি বড় অর্জন। আর তা প্রকাশ করতে দ্বিধা করেননি তিনি।
লেখক : বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
দয়া করে আপনার নাম লিখুন