আবার যাবো কাশ্মীর

১.
ঢাকা থেকে বাসে বেনাপোল বর্ডার গেলাম প্রথমে। ইন্ডিয়ান কাস্টমস সাথে এক হাজার রুপি থাকার অপরাধে ৩০০ রুপি ঘুষ নিয়ে ছেড়ে দিলো। এরপর ৩০ রুপি দিয়ে বনগাঁ রেলস্টেশন, সেখান থেকে ২০ রূপিতে ট্রেনে শিয়ালদহ। সারাদিন কলকাতা ঘুরে সন্ধায় এলাম সুভাষ চন্দ্র ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট এ। রাত ৯ টায় উঠলাম জেট এয়ারওয়েজের একটা বড়সড় বিমানে। এই বিমানের এয়ারক্রুরা বেশ স্মার্ট ছিলো। বিমান আকাশে উড়ার সাথে সাথে একটু গরম লাগা শুরু হয়েছিলো। কিন্তু অনেক টানাটানি করেও জানালা খুলতে পারিনি। পরে বুঝেছি বিমানে এসি ছিলো! তখন ঠান্ডায় জমে গেছিলাম। ঠাণ্ডা দূর করার জন্য এয়ারক্রুরা ওয়েটার সেজে বেশকিছু আইটেমের খাবার দিলো। খুবই টেস্টি এবং মিস্টি।

প্রায় দুই ঘন্টা পর দিল্লী নেমে বিমান পালটে জম্মু হয়ে শ্রীনগর পৌছলাম পরদিন দুপুর ১টায়। এয়ারপোর্ট নেমেই কাশ্মীরের রূপ দেখা শুরু। কিন্তু কাশ্মীর দেখলাম কেমন অন্ধকারময়! মন খারাপ হওয়া শুরু হয়েছিল। সানগ্লাসটা চোখ থেকে নামানোর পর দেখি, নাহ, সব ঠিকই আছে!

আমাদের বোট হাউজের ভেতরের অংশ। ড্রইংরুম।

এয়ারপোর্ট নামার সাথে সাথেই বেশকিছু ট্যাক্সি ড্রাইভার-বোটহাউজ দালাল ঘিরে ধরলো। আমি ট্যাক্সি নেয়ার বিলাসিতা না করে বাসে ৩০ টাকা ভাড়া দিয়ে চলে গেলাম লালচক। সেখান থেকে আবারো অটোতে করে ১০০ টাকায় ‘ডাল লেকে’! ওখানে গেলে আবারো ঘিরে ধরে একঝাঁক বোট হাউজ মালিক-কর্মচারী। ডাল লেকের শুরু থেকে শেষ মাথা অব্দি অনেকগুলো গেট বা ঘাট। এসব ঘাট ১, ২, ৩ এভাবে নাম্বার দেয়া। ঘাটের সংখ্যা যত বাড়বে ‘বোট হাউজের’ দাম তত কমবে কিন্তু সৌন্দর্য আরোও বাড়বে। আমরা ছিলাম মূল লেকে, ঘাট নাম্বার ১৭ তে। এসব ঘাট থেকে ছোট নৌকায় করে লেকের ওপারে থাকা বোটে নিয়ে যাওয়া হয়। বোট হাউজটা খুব সুন্দর ছিল। (আসলে সবই সুন্দর!) এক রাত ছিলাম ১০০০ রুপিতে (বাংলা টাকায় ১৩০০ প্রায়)। বোট হাউজে আমাদের পারাপার করছিল সৈয়দ রেহান নামে এক স্মার্ট মাঝি। শখের মাঝি মূলত ছাত্র। সে আমাদের ভাসমান মার্কেটে নিয়ে গিয়েছিল শখ করে। আমি ওর ছবি তুলেছি। ছবি ভালো আসেনি বলে মাঝি খুব মন খারাপ করে।

আমাদের মাঝি সৈয়দ রেহান। বেশ কয়েকটা পোজ দিয়েছে ছবির জন্য। কিন্তু বেচারার চেহারা কেমন যেন বিমর্ষ আসছিল। ছবি দেখে আমরাও কিছুটা বিমর্ষ হয়েছিলাম!

ডাল লেক নাম শুনে কেউ আবার এই লেকের পানি দিয়ে ভাত খাওয়ার চিন্তা করবেন না। ডাল লেকের পানিতে ডাল নেই, একেবারে সাদামাটা পানি। লেকের একপাশে বিশালাকার পাহাড়। পাহাড়ের সাথে লেকের পানির সৌন্দর্য কোনো ক্যামেরায় তুলে আনা সম্ভব নয়, আমিও পারিনি। বিকেলবেলা লেকের পানিতে ২০০-৩০০ রূপিতে এক ঘন্টার জন্য নৌকা ভ্রমণ করা যায়, স্থানীয় ভাষায় একে ‘শিকারা রাইড’ বলে। ভালোই লেগেছে এটা।

ডাল লেকের সামনের রাস্তার ফুটপাতে বিকেল হলে হকাররা বসে স্থানীয় শাল, চাদর, বাদাম ইত্যাদি আইটেম বিক্রির জন্য। দাম খুব কম মনে হয়েছে আমার। কোয়ালিটি ভালো। আপেলের কেজি ৫০ রুপি। যদিও বিশাল সাইজের আপেলগুলো পানসে।

কাশ্মীরে সন্ধ্যা হয় ‘রাত আটটায়’, সিঙ্গাপুরের মতো। তবে শ্রীনগরের ডাল লেক এলাকা ছাড়া অন্যান্য এলাকা সন্ধ্যার পরই জনশূন্য হয়ে যায়। শ্রীনগরের পথেপথে প্রচুর কুকুর দেখা যায়। বিশালাকার লোমশ পাহাড়ি কুকুরগুলো দেখতে ভয়ানক হলেও আচরণে ভাল। ঘেউঘেউ দূরে থাক, মিউমিউও করে না।

বোটহাউজ থেকে পুরো ডাল লেক দেখা যায়। কিন্তু বোটহাউজে একদিনের বেশি থাকার কোন মানেই হয় না। অনেক ব্লগে বোটহাউজের যত প্রশংসা শুনেছি সে অনুযায়ী আমার কাছে তেমন ভালো লাগেনি। আবার এসব বোট হাউজের মালিকেরা সবাই ‘প্যাকেজ ট্যুর’ অফার করে। ভুলেও নিবেন না। এদের এইসব অফার থেকে বেঁচে থাকাটা কাশ্মীরের একমাত্র চ্যালেঞ্জ। কাশ্মীর ভ্রমণ ব্যয়বহুল হয়ে যায় এদের প্যাকেজের কারণেই। আমরা রীতিমতো যুদ্ধ করে আমাদের বোট মালিকের অফার ফিরিয়ে দিয়ে পরেরদিন গেট নং ২ এর পাশে হোটেল তুলিতে উঠলাম। অসাধারণ রুম মাত্র ৯০০ রুপিতে। তিনজন অনায়াসে থাকা যাবে, তবে মেসে থাকার অভিজ্ঞতা থাকলে চারজনও থাকতে পারবেন।

শ্রীনগরে দেখার মত ডাল লেক ছাড়া কয়েকটি বাগান আছে যেগুলো সম্রাটরা বানিয়েছিলেন মূলত হেরেম হিসেবে। এগুলো দেখার চেয়ে আমাদের বোটানিক্যাল গার্ডেন দেখা ২০৫ গুণ ভালো। তবে হযরতবাল দরগাহ দেখে আসুন। অটোতে করে ডাল লেক থেকে ১৫০ রুপি করে নিবে। একটা অটোতে চারজন আরামসে বসা যায়।

শুধু শ্রীনগরের নয়, পুরো কাশ্মীরের খাবার খুবই টেস্টি। এদের ভাতগুলো লম্বায় ছোটখাটো খাম্বার সমান। দাম কক্সবাজারের চেয়েও কম। ঘুরতে গেলে পেটপুরে খাওয়ার নিয়ম। তাই খাবেন প্রচুর। আর খাওয়ার জন্য শ্রীনগরের লেকের পাশের রেস্টুরেন্টগুলোই ভালো, চাইলে লালচকও যেতে পারেন।

শ্রীনগরে একটা বাজারে সেদিন স্বাধীনতাকামীরা হামলা চালিয়েছিল পুলিশের উপর। তাই দুইবার চেকিং এর মুখোমুখি হলাম। যেখানেই শুনে ট্যুরিস্ট, সাথে সাথে পুলিশের ব্যবহার হয়ে যায় অমায়িক। রাগী পুলিশও আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞেস করে ‘কেমন লাগলো কাশ্মীর?’ যেন আমাদের মুখের হাসিটাই এদের একান্ত কাম্য। এছাড়াও সার্বক্ষণিক প্রস্তুতি নিয়ে পুলিশী পাহারা চোখে পড়বে কাশ্মীরের সর্বত্র, যেন এখুনি যুদ্ধ শুরু হচ্ছে। ভয় নেই। আমার বিশ্বাস কাশ্মীর দুনিয়ার সবচে নিরাপদ ট্যুরিস্ট স্পট।

যাতায়াতের জন্য আমরা শেয়ারিং জীপ কিংবা মিনিবাস কিংবা অটো ব্যবহার করেছি। এতে যাতায়াত খরচ ১০ ভাগ কমে যাওয়ার পাশাপাশি লোকাল কাশ্মীরিদের সান্নিধ্য পাওয়া গেছে। অথচ যাতায়াত রিজার্ভ জীপের মতোই আরামদায়ক ছিলো।

কাশ্মীরকে শুধুমাত্র এর সৌন্দর্যের জন্য ‘ভূস্বর্গ’ বলা হলে সেটা অতি অবশ্যই ভুল। কাশ্মীর ভূস্বর্গ হয়েছে সেখানকার মানুষের ব্যবহারের কারণে। যখনি এরা বুঝবে যে আপনি অতিথি, তাও আবার বাংলাদেশ থেকে; আপনাকে খুব সমীহ করবে। নিজে থেকে যেচে কথা বলার মতো এত আন্তরিকতা দুনিয়ার আর কোথাও আছে কিনা আমার জানা নেই। মুসলিম পরিচয় পেলে আরো খুশি হয়। কাশ্মীরের লোকজন যথেষ্ট গরীব হলেও এদের ব্যক্তিত্ব আপনাকে মুগ্ধ করবে। রাস্তাঘাট যথেষ্ট পরিষ্কার। অযথা গাড়ীর প্যাঁ প্যাঁ নেই। শহরের বাড়ীগুলোর ডিজাইন দেখলে মনে হবে এরা বুঝি সবাই কোটিপতি। একটা বাড়ী থেকে অন্যটার যথেষ্ট দূরত্ব আছে। এসব দেখে আমার মতো আপনারও থেকে যেতে মন চাইবে বিপদজনক এই উপত্যকায়।

২.
পরদিন শ্রীনগরের ডাল লেকের সামনে থেকে আমরা দুজন অটোতে ১০০ রূপি দিয়ে চলে গেলাম পারিমপুরা বাস স্ট্যান্ড এ। সেখানে শেয়ারিং জীপ ড্রাইভার গলা ফাটিয়ে ডাকছে ‘ট্যানমার্গ’। একজন ৭০ রুপি করে। ড্রাইভারের পাশে দুজনে বসে স্বর্গ দেখতে দেখতে ৩০-৪০ মিনিটেই চলে এলাম ট্যানমার্গ।

সেখান থেকে আবার শেয়ারিং জীপে ৪০ রুপিতে গুলমার্গ। এই শেয়ারিং জীপ খুবই এভেইলেবল এবং কমফোর্টেবল। আমাদের শেয়ারিং জীপে শুধু আমরাই ছিলাম। অথচ রিজার্ভ নিলে খরচ হতো ১৫০০ রুপি! তাই শুধু মনে রাখতে হবে বাসস্ট্যান্ড এর নামগুলো। সামান্য এই তথ্যগুলো না জানার জন্য বেশীরভাগ টুরিস্ট যাতায়াতে রিজার্ভ জীপের জন্য খরচ হয় অস্বাভাবিক বেশী।

ট্যানমার্গ থেকে গুলমার্গ পাহাড়ী উঁচু রাস্তা। পুরো রাস্তার দুধারে সাদা ডেইজী কিংবা নাম না জানা বাহারি ফুলের কার্পেট বিছানো। গুলমার্গ ঢোকার ঠিক আগে পুলিশী চেক পয়েন্টে ট্যুরিস্ট পরিচয় দিলেই রাজকীয় অভ্যর্থনা মিলবে।

গুলমার্গ বাস স্ট্যান্ডের বাম পাশেই গন্ডোলা রাইড, মানে ক্যাবল কার। এগুলো সরকারি এবং খরচ পুরো রাইডে ১৭০০ রুপি। অর্ধেক চড়লে ৯৫০ রুপির মতো। খরচ অবশ্যই অস্বাভাবিক বেশী। এরচে নন্দন পার্কের ক্যাবল কারে চড়া আরামদায়ক। আমরা গন্ডোলায় না চড়ে ঘোড়ায় চড়ে পাহাড়ের উপর যেখানে গন্ডোলায় করে লোকজন যায়, সেখানে গিয়েছি। ঘোড়ায় চড়াকে স্থানীয় ভাষায় বলে ‘পনি রাইড’। ঘোড়াওয়ালারা গরিব এবং শুধুমাত্র গ্রীষ্মকালেই ওদের আয় হয়। তাই সরকারকে টাকা না দিয়ে ঘোড়ায় চড়াই বুদ্ধিমানের কাজ। একটা ঘোড়ায় একজন বসতে পারে আর ভাড়া ৪০০-৭০০ রুপি।

আমরা প্রথমে ভুল করে ডান পাশের গ্রাম্য রাস্তায় হাটছিলাম স্থানীয় কিছু পরিবারের সাথে। একটা পিচ্চি মেয়েকে নাম জিজ্ঞেস করলাম। বললো, সাহির মালিক। সাহির মালিক দেখতে তার নামের মতই মিষ্টি।

মিষ্টি সাহির মালিক।

গুলমার্গের যে পাহাড়ে আমরা উঠেছিলাম তার ওপারেই পাকিস্তান। পাহাড়ে মেঘের সারি, হুট করে বৃষ্টি, ঠাণ্ডা বাতাস, ভেড়ার পালের চড়িয়ে বেড়ানো সবকিছুই অসাধারণ। এখানে ছবি তুলে প্রোফাইল পিকচার দিলে যারা লাইক পায় না তারাও শতাধিক লাইক পাবে, গ্যারান্টি!

পাহাড়ের চূড়ায় আমরা কাশ্মীরী বিরিয়ানি খেয়েছি মাত্র ১৫০ রুপিতে, সাথে নুডুলস ৮০ রুপি। এত টেস্টি বিরিয়ানি আর নুডুলস কাশ্মীর আর স্বর্গ ছাড়া কোথাও পাওয়া যাওয়ার কথা না। পাহাড় থেকে নামার সময় ‘লিটল চেরি’ নামের ভিটামিন এ ক্যাপসুলের মতো লালচে ছোট ফল পেয়েছি। যেহেতু ফ্রি, ইচ্ছেমতো খেয়ে নিন।

 

বুনো লিটল চেরি। খেয়েই দেখুনতো…!

পুরো গুলমার্গ যেন ফুলের বাগান। বাগানের উপরে মেঘেদের বিচরণ। এখানে ঠাণ্ডা থাকে সারাবছর। তাই শীতের কাপড় নেয়াটা সার্থক ছিলো। পাহাড়ের চূড়ায় একটু পরপর বৃষ্টি হয়। ওখানে একটা ‘সেভেন ওয়াটার ফল’ কানেকশন আছে। পানি হাতে নিয়ে তাজ্জব হয়ে গেলাম! অস্বাভাবিক এবং অবিশ্বাস্য ঠাণ্ডা! এই পানি সবারই ছুঁয়ে দেখা উচিত!

গুলমার্গে না থেকে সেদিনই ফিরে আসি আমরা। ফিরতি গাড়ি সন্ধ্যা ৬ টা অব্দি এভেইলেবল।

৩.
পরদিন সকালে বাক্সপেটরা নিয়ে রওনা দিই ৬৬ কিলোমিটার দূরে পেহেলগামের উদ্দ্যেশ্যে।

 

ডেইজী ফুলের উপর ভেসে বেড়াচ্ছে সাদা মেঘের ভেলা। হাত বাড়ালেই স্বপ্ন। (গুলমার্গ)

এবার ডাল লেক থেকে ৬০ রুপি দিয়ে অটোতে করে লালচক বাসস্ট্যান্ড এ গেলাম। সেখান থেকে শেয়ারিং জীপে ৮০ রুপিতে গেলাম অনন্তনাগ। সেখান থেকে ৬০ রুপিতে সরাসরি পেহেলগাম। কাশ্মীরের সবচে সুন্দর জায়গা।

শেয়ারিং জীপে যাওয়ার পথে মোজাফফর নামে এক ইয়াং স্থানীয় স্কুল শিক্ষক খুব ভালো ইংরেজিতে আলাপ জুড়ে দিলেন। ভালো লাগল। তিনি একটা বাজার দেখালেন যেখানে কিছুদিন আগেই একসাথে ৪০ জন স্বাধীনতাকামীকে হত্যা করেছে ভারতীয় বাহিনী। অনেক কিছুই নাকি মিডিয়ায় আসে না!

আসার আগে উনি আমাদের জোর করে বেশকিছু কাজু বাদাম আর চকলেট দিলেন। অনেক সুস্বাদু ছিল বলে সব সাথে সাথেই খেয়ে ফেলেছি। এখন আর কেউ চাইলেও দিতে পারবো না!

পথে যেতে যেতে চোখে পড়ল সারি সারি আপেল গাছ। আপেল ভালো করে পাকেনি। নইলে কয়েকটা লুকিয়ে বাংলাদেশে নিয়ে আসতাম। আপনারাও খেতে পারতেন!

রাস্তার পাশেই লিডার নদী আর পেহেলগাম নদী। খুব বড় না, কিন্তু পানির রঙ নীল প্রচুর স্রোত। নদীতে প্রচুর পরিমাণে পাথর।

বাস স্ট্যান্ডের পাশেই অনেক হোটেল। আমরা ওঠলাম হোটেল এক্সিলেন্টে। ভাড়া ৮০০ রুপি, কোয়ালিটি ৭ স্টার! পুরো হোটেল কাঠের আবরণ দেয়া। ফ্লোরে কার্পেট। জানালা দিয়ে নদী, পাহাড়, বাগান-ফুল, হেলিকপ্টার সবই দেখা যায়। এই কোয়ালিটির পাহাড়ী রিসোর্ট-এ বান্দরবানে থাকতে প্রতিরাত ১০,০০০ টাকা দিয়েও হবে না।

 

বাইসারানকে মিনি সুইজারল্যান্ড বলা হয়।

পেহেলগামে ঘোরার জন্য আছে আরু ভ্যালি, বেতাব ভ্যালি, চন্দনওয়ারী, বাইসারান। এতসব জায়গা না ঘুরে ঘোড়ায় করে ৪০০ রুপি দিয়ে কেবল বাইসারান ঘুরলেই হলো। বাইসারানকে মিনি সুইজারল্যান্ড বলা হয়। অনেক বিখ্যাত সিনেমার শ্যুটিংস্পট এই জায়গা। আমরা বাইসারান গিয়েছিলাম, যাবার পথেই পড়বে আরু ভ্যালি, বেতাব ভ্যালী এসব স্পট। ঘোড়াওয়ালারা আপনাকে বলবে প্রতিটা স্পট ঘুরিয়ে আনবো ৫০০ টাকা করে। এটা একটা ভাঁওতাবাজি। আপনি শুধু বাইসারান ঘুরবেন, বাকি স্পটগুলো অটোমেটিক চলে আসবে।

কাশ্মীরের ভাষা কাশ্মীরি। আমাদের ঘোড়ার পাইলট কাশ্মীরি, উর্দু আর ইংরেজি মিলিয়ে কথা বলে। আমি বাংলা, হিন্দী আর ইংরেজী মিলিয়ে কথা বলি। সবাই সবার ভাষা বুঝি।

 

জানালা খুললেই দেখা যায় পাহাড়, ফুল, পাখি, নদী আর নীল আকাশ। এমন সৌন্দর্যের মিশেল কেবল পেহেলগামেই দেখা যায়

পেহেলগামের বিভিন্ন স্পট ঘিরে খুবই গরিব পরিবার দেখা যায়, যারা পাহাড়ের কোল ঘেঁষে খুপরি ঘর বানিয়ে থাকছে। অথচ তাদের পোশাকাদি ভালো। ব্যক্তিত্ব অসাধারণ। ছোট ছোট বাচ্চারা কিউট খরগোশ হাতে নিয়ে রিকুয়েস্ট করবে ছবি তোলার জন্য। বিনিময়ে ১০ রুপি থেকে ১০০ রুপি যা খুশি দিবেন, ওরা খুশিতে লাফাবে।

তবে আমার কাছে পেহেলগামের মূল শহরটা, মানে বাসস্ট্যান্ডের সামনের জায়গাটাই অসাধারণ লেগেছে। লিডার নদী এবং পেহেলগাম নদী দুটি এক হয়ে মিশে গেছে আমাদের হোটেলের সামনেই। এসব নদীর উপর দিয়ে ব্রিজ আছে কয়েকটি। আলোচিত দুই নদীর মাঝখানে আবার ফুলের বাগান। সেখান থেকে হাতছানি দেয় থরেথরে সাজানো পাহাড়ের সারি, তার উপর জমে থাকা সাদা বরফ। পাথরের ওপর বসে পাহাড়ীআপেল আর পাকা টসটসে আলু বোখারা খাচ্ছিলাম। জান্নাত বুঝি একেই বলে!

লিডার নদীর কলকল শব্দ শুনতে পাচ্ছেন?

 

নদীর ধার ঘেঁষে আমরা হাটছিলাম সেদিন বিকেলে। এক পাশে ব্যারিকেড দেয়া। সেই ব্যারিকেড টপকে ওপারে গিয়ে পাকিস্তানে যাওয়ার ফিলিংস এসেছিল। নিজেকে যখন বজরংগী ভাইজান মনে হচ্ছিল তখনি এক পুলিশ এসে ২০ রুপির একটি টিকেট ধরিয়ে বললো, এটিও বাগান!

কাশ্মীর গেলে পেহেলগামের জন্য দুটি রাত বরাদ্দ রাখা উচিত। যেহেতু হোটেল একেবারেই এভেইলেবল এবং ভাড়াও খুবই কম, প্রকৃতির সব রস এখান থেকেই নিয়ে আসা যায়।

কাশ্মীর যাবেন বিমানে। অন্তত কলকাতা থেকে দিল্লী হয়ে শ্রীনগর যাবেন বিমানে, আসবেনও বিমানে। কারণ দীর্ঘ পথ ট্রেনে বিরক্ত লাগবে, আর দুই মাস আগে টিকেট কাটলে বিমানের ভাড়া ট্রেনের ভাড়ার প্রায় সমানই পড়ে। আমাদের দুজনের বিমানে যাওয়া-আসা, থাকা-খাওয়া, সাইট সিয়িং খরচ মিলিয়ে ৫০০০০ পড়েছে। এরমধ্যে যখন যা খুশি খাওয়া, একেবারে ছোটখাটো সব খরচা, ট্রাভেল ট্যাক্স সবই অন্তর্ভুক্ত।

আমি শুরুতেই বলেছি আবার যাবো কাশ্মীর। এরপরে যাবো শীতে বরফ আর তুষারপাত দেখতে। কারণ কাশ্মীরের রূপ তখন একেবারেই পালটে যায়। প্রায় সর্বত্র বরফে ঢাকা থাকে। সেক্ষেত্রে অবশ্য স্পট কমিয়ে ফেলে খরচ আরো কমানো যায়।

এবার আপনাকেও রিকুয়েস্ট করছি একবারের জন্য হলেও টাকা জমিয়ে, সময় করে ঘুরে আসুন ভূস্বর্গ কাশ্মীর!

এখন কথা হচ্ছে, সবই তো ঘুরলেন। কিন্তু কাশ্মীর কই?
আসলে বাংলাদেশ ঘুরতে এসে যেমন কেউ বাংলাদেশ পাবে না তেমনি কাশ্মীর গিয়েও কাশ্মীর পাবে না। শ্রীনগর হচ্ছে কাশ্মীরের ঢাকা। গুলমার্গ, সোনমার্গ, পেহেলগাম, দুধপাত্রী এসব হচ্ছে মূল স্পট।

( টিকা- কাশ্মীর গেলে কখনওই আগে থেকে হোটেল বা বোট হাউজ বুকিং দেবেন না। আর সবার সাথে ভালো আচরণ করবেন।

যেভাবে যাবেন-আসবেন-
প্রথমে বাই রোডে সরাসরি কলকাতা চলে যাবেন ঢাকা থেকে। ইমিগ্রেশনে জিজ্ঞেস করলে বলবেন দিল্লি যাবেন। নইলে ভাববে টাকা আছে অনেক। সেখান থেকে বিমানে যাবেন দিল্লী। দিল্লী থেকে ট্রেনে যাবেন জম্মু। সেখান থেকে শেয়ারিং জীপে যাবেন অনন্তনাগ। অনন্তনাগ থেকে যাবেন পেহেলগাম। এখানে থাকবেন এক-দুদিন। এখানে ঘুরাঘুরি শেষে যাবেন শ্রীনগর, শেয়ারিং জীপেই। শ্রীনগরের ডাল লেক এলাকায় থাকবেন রাতে। পরদিন সকালেই চলে যাবেন পারিম্পুরা বাস স্ট্যান্ড। সেখান থেকে শেয়ারিং জীপে চলে যাবেন ট্যানমার্গ। সেখান থেকে আবারো শেয়ারিং জীপে যাবেন গুলমার্গ। গুলমার্গে শুধু গন্ডোলা রাইডে চড়তে পারেন অথবা পনি রাইড মানে ঘোড়ায় চড়ে ফেইজ এক অব্দি যেতে পারেন। ঘোড়ার ভাড়া নিবে ২৫০ রুপি থেকে ৩০০ রুপি। চাইবে ১৫০০ রুপি! মাঝখানে দালালরা মাথা খারাপ করে দিবে যা খুবই বিরক্তিকর। তাদের কথায় কান দেবেন না। ভুলেও প্যাকেজ নিবেন না। হাউজ বোটে থাকবেন শেষের এক রাত। এরপর ফিরবেন এয়ারপোর্ট, সেখান থেকে দিল্লী, সেখান থেকে কলকাতা। তারপর ঢাকা।)

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
দয়া করে আপনার নাম লিখুন