এবার সৌদিকে আমেরিকার হুঁশিয়ারি

ইয়েমেনে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন জোটের বিমান হামলায় একের পর এক বেসামরিক হত্যার ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ বাড়ছে। মার্কিন সামরিক কর্তৃপক্ষের পর এবার সৌদি আরবকে সতর্ক করে দিয়েছেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেমস ম্যাটিস। ইঙ্গিত দিয়েছেন, সৌদি জোটকে দেওয়া সামরিক সমর্থন কমানোর। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন এখবর জানিয়েছে।

আগস্টের শুরুতে ইয়েমেনে একটি স্কুল বাসে হামলা চালিয়ে ৪০ শিশু হত্যার অভিযোগ ওঠে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের বিরুদ্ধে। ওই হামলার পর জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ইয়েমেনে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ তোলে।

প্রভাবশালী মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউ ইয়র্ক টাইমস তাদের এক মন্তব্য প্রতিবেদনে দাবি করেছে, ইয়েমেনে সৌদি জোটের যুদ্ধাপরাধে সহযোগিতা করছে যুক্তরাষ্ট্র।

প্রতিবেদনে জাতিসংঘ ও হিউম্যান রাইটস ওয়াচকে উদ্ধৃত করে ইয়েমেন যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকার নিন্দা জানানো হয়।

সৌদি জোটকে সহায়তা প্রদান যুদ্ধাপরাধে অংশ নেওয়ারই শামিল বলে উল্লেখ করা হয়। বলা হয়, ‘যুক্তরাষ্ট্র সৌদি জোটের কাছে শুধু অস্ত্রই বিক্রি করছে না, সামরিক সহায়তাও দিচ্ছে’।

 

এই সমালোচনার মধ্যেই মার্কিন প্রতিরক্ষা দফতর সৌদি আরবকে সতর্ক করে জানায়, বেসামরিক প্রাণ রক্ষায় পদক্ষেপ না নেওয়া হলে ইয়েমেনে তাদের জোটকে সামরিক ও গোয়েন্দা সমর্থন কমিয়ে দেবে তারা।

পেন্টাগনের এই সতর্কতা পর মঙ্গলবার জেমস ম্যাটিস বলেছেন, নিরপরাধ মানুষের প্রাণহানি এড়াতে মানুষের পক্ষে সম্ভব সবকিছুই করা হবে। তিনি বলেন, ইয়েমেন যুদ্ধে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটকে দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন শর্তহীন নয়।

পেন্টাগনের সতর্কতার সঙ্গে সরাসরি জড়িত দুই মার্কিন কর্মকর্তা সিএনএনকে বলেছেন, ‘সৌদি জোটকে নিয়ে তাদের হতাশা বাড়ছে।’

ম্যাটিস ও মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক দলের প্রধান জেনারেল জোসেফ ভোটেল সৌদি জোটের বিমান হামলায় বিপুল সংখ্যক বেসামরিক নাগরিক হত্যা নিয়ে বিশেষভাবে উদ্বিগ্ন।

 

ইয়েমেনে সৌদি জোটের কার্যক্রম নিয়ে মাসের পর মাস ধরে মানবাধিকার সংগঠন, কয়েকজন কংগ্রেস সদস্য ও জাতিসংঘ উদ্বেগ প্রকাশ করে আসলেও তাতে খুব বেশি সাড়া দেয়নি ট্রাম্প প্রশাসন।

তবে গত কয়েকদিনে একের পর এক হামলায় বেসামরিক নাগরিক নিহত হওয়ায় পেন্টাগন ও পররাষ্ট্র দফতর এসব প্রাণহানি নিয়ে সরাসরি সৌদি আরবের সঙ্গে কথা বলছে। এক কর্মকর্তা সিএনএনকে বলেছেন, ‘এই ইস্যুতে যা ঘটেছে তা যথেষ্ট হয়েছে’।

মঙ্গলবার ম্যাটিস বলেন, আমরা আমাদের সহযোগী সৌদি আরবকে আত্মরক্ষার অধিকারের প্রতি সমর্থন দিয়েছি। এধরনের বোমা হামলা এবং তার পুনরাবৃত্তি রোধে কেন ব্যর্থ হয়েছে তা নিরুপণ করতে সৌদি আরবের সঙ্গে কাজ করছে যুক্তরাষ্ট্র।

তিনি জোর দিয়ে বলেন, যখন আমরা বুঝতি পারি আমাদের অবজ্ঞা বা প্রত্যাখান করা হয়েছে তখন আমরা সঙ্গে সঙ্গেই উদ্বেগের কথা জানাই। ম্যাটিস জানান, আমাদের সামগ্রিক লক্ষ্য হলো ইয়েমেনের পক্ষগুলোর মধ্যে জাতিসংঘের মধ্যস্ততায় শান্তি স্থাপন।

তবে সৌদি আরবকে প্রয়োজনীয় মিত্র হিসেবে দেখা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সৌদি সমর্থন কমানোতে সায় দেবেন কি না তা পরিষ্কার নয়। বর্তমানে সৌদি বিমানকে তেল সরবরাহ ও গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে সমর্থন জানাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র।

গোয়েন্দা তথ্য দিলেও লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে কোনও সহায়তা দেওয়া হয় কিনা তা কখনোই পরিষ্কার করেনি যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছেন তারা বিমান হামলায় বেসামরিক হতাহত কমানো ও সৌদি জোটের প্রক্রিয়া উন্নত করতে একযোগে কাজ করে যাচ্ছে।

তবে মার্কিন সামরিক কর্মকর্তারা মনে করেন, এসব পদক্ষেপ কাজে আসছে না। গত ৯ আগস্ট উত্তর ইয়েমেনে স্কুলবাসে হামলার ঘটনার পর থেকে ইয়েমেন পরিস্থিতির ওপরে নজর রাখছেন মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী ম্যাটিস।

এর আগে সিএনএন’র খবরে বলা হয়, ওই ঘটনায় ১৫ বছরের কম বয়সী অনেক শিশুকে হত্যার জন্য ব্যবহার হয়েছে ২২৭ কেজি ওজনের লেজার নিয়ন্ত্রিত এমকে-৮২ বোমা।

এর প্রস্তুতকারক যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ সামরিক সরঞ্জাম নির্মাতা প্রতিষ্ঠান লকহেড মার্টিন। প্রতিষ্ঠানটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষাবাহিনীর সবচেয়ে বেশি সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহের চুক্তি পেয়ে থাকে।

ওই হামলার পর ম্যাটিস সাংবাদিকদের বলেছিলেন, স্কুলবাসে হামলা চালানোর ক্ষেত্রে কী ঘটেছিল তা জানতে সৌদির সঙ্গে আলাপ করতে একজন শীর্ষ জেনারেলকে পাঠাচ্ছেন তিনি।

এ থেকে পরিষ্কার বোঝা গিয়েছিল এই ঘটনার পর কঠোর অবস্থান নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কর্তৃপক্ষ।

গত ১২ আগস্ট থেকে মার্কিন লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাইকেল গ্যারেথ নিয়মিতভাবে সৌদি নেতৃত্বের সঙ্গে বৈঠক করছেন। অনির্ধারিত এসব বৈঠক থেকে সৌদি কর্তৃপক্ষকে কঠোর বার্তা দেওয়া হচ্ছে।

মার্কিন প্রতিরক্ষা দফতরের এক মুখপাত্র লেফেটন্যান্ট কমান্ডার রেবেকা রেবারিক বলেছেন, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর বিষয়ে মার্কিন সামরিক নেতৃত্ব মনে করছে এতে বিশেষ মনোযোগের দরকার, আর গ্যারেথের সফরের সময়ে এই বিষয়ে জোর দেওয়া হচ্ছে।

উদ্বেগপূর্ণ এসব বার্তা সহায়তা কমানোর ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে মার্কিন কর্মকর্তাদের ধারণা সমর্থন কমানো হলে সৌদি আরব বেসামরিক প্রাণ রক্ষায় আরও বেশি মনোযোগ দেবে।

সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সময়ে মানবাধিকার উদ্বেগ থেকে সৌদি আরবের কাছে রিমোট কন্ট্রোল দ্বারা পরিচালিত সামরিক প্রযুক্তি বিক্রি নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। ২০১৭ সালের মার্চে ট্রাম্প প্রশাসনের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসন ওই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেন।

সুত্র: এ. জি.

জেএস/

 

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
দয়া করে আপনার নাম লিখুন