পরিবারের ভরণ-পোষণে কার দায়িত্ব কতটুকু?

Ecology house and family in hands against spring green background

মুফতি মাহমুদ হাসান

ইসলাম মানবসমাজের ইহকাল ও পরকালের সফলতা এবং উন্নতির পথ বাতলে দিয়েছে। আর ইসলাম হচ্ছে দায়িত্ব পালনের নাম, অর্থাৎ যার যার অধিকার তাকে সঠিকভাবে পৌঁছে দেওয়াই হলো একজন মুসলিমের কাজ।

এই অধিকার দুই ধরনের—এক. আল্লাহর হক বা অধিকার, দ্বিতীয় হলো বান্দার হক। এই দুটি হক বা অধিকার সঠিকভাবে তার প্রাপ্যকে পৌঁছে দেওয়াই হলো ইসলাম ও শরিয়ত।

আমরা এখানে বান্দার হকবিষয়ক একটি শাখার আলোচনা করব, তা হচ্ছে পরিবার ও আত্মীয়-স্বজনের হক এবং অধিকারবিষয়ক। বিশেষ করে বর্তমানে নিকটাত্মীয়দের ভরণ-পোষণ ও ব্যয়ভারের অধিকার ও দায়িত্ব নিয়ে আলোচনা করব ইনশাআল্লাহ। আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা ও তাদের দেখভাল করা আল্লাহ তাআলার একটি মহান বিধান। কোরআন-হাদিসে এর অনেক গুরুত্ব রয়েছে।

আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা

মহান আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘আর তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, যার অসিলা দিয়ে তোমরা একে অপরের কাছে আত্মীয়তার অধিকার প্রার্থনা করো। ’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ১)

অন্য আয়াতে ইরশাদ হচ্ছে, ‘আর আত্মীয়-স্বজনরা একে অন্যের তুলনায় অগ্রগণ্য, আল্লাহর কিতাবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ প্রতিটি বিষয়ে মহাজ্ঞানী।

’ (সুরা : আনফাল, আয়াত : ৭৫)

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি তার রিজিকের প্রশস্ততা ও হায়াত বৃদ্ধি চায়, সে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে। (বুখারি : হাদিস ২০৬৭)

অন্য একটি হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না। ’ (বুখারি : হাদিস ৫৯৮৪)

পরিবারের জন্য ব্যয় করার ফজিলত

নিজের ও পরিবারের ভরণ-পোষণ খরচ বহনের বিষয়টি আমাদের কাছে শুধু একটি পার্থিব বিষয় মনে হলেও এটি একটি মহান দ্বিনি দায়িত্ব ও কর্তব্য। কোরআন ও হাদিস অন্যান্য ইবাদত-বন্দেগির চেয়ে এ অধ্যায়টিকে কোনো দিক দিয়ে কম গুরুত্ব দেয়নি। নিজের ও পরিবারের জন্য বৈধ রিজিকের সন্ধান করাও একজন মুসলিমের ফরজ দায়িত্ব। হাদিস শরিফে এসেছে, ‘হালাল রিজিকের সন্ধান করা অন্যান্য ফরজ ইবাদতের পর অন্যতম একটি ফরজ। ’ (আল মুজামুল কাবির, হাদিস : ৯৯৯৩) অন্য হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘মানুষের সর্বোত্তম মুদ্রা সেটি, যা সে তার পরিবারের খরচে ব্যয় করে। ’ (মুসলিম : হাদিস ৯৯৪) অন্য একটি হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘কোনো ব্যক্তি তার পরিবারে যে খরচ করে তা-ও সদকাস্বরূপ, অর্থাৎ এতেও সে সদকার সওয়াব পাবে। ’ (বুখারি : হাদিস ৪০০৬)

ভরণ-পোষণের দায়িত্ব যেভাবে বর্তায়

ভরণ-পোষণের ব্যয়ভার দুটি কারণে বর্তায় : এক. বৈবাহিক সম্পর্কের কারণে, দুই. আত্মীয়তার সম্পর্কে। শরিয়ত বিবাহের পর থেকেই স্বামীর ওপর স্ত্রীর জন্য যেসব অধিকার সাব্যস্ত করেছে, তার মধ্যে অন্যতম হলো স্ত্রীর ব্যয়ভার গ্রহণ করা। মহান আল্লাহ বলেন, ‘সন্তানের পিতার ওপর সন্তানের মায়ের জন্য অন্ন-বস্ত্রের উত্তম পন্থায় ব্যবস্থা করা একান্ত দায়িত্ব। ’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২৩৩)

অন্য আয়াতে ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা স্ত্রীদের জন্য তোমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী নিজেদের ঘরে বাসস্থানের ব্যবস্থা করো। ’ (সুরা : তালাক, আয়াত : ৬)

হাদিস শরিফে স্ত্রীদের ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ (সা.) পুরুষদের নির্দেশ দিয়েছেন, ‘তুমি যখন খাবে তাকেও খাওয়াবে এবং তুমি যখন পরবে তাকেও পরাবে। চেহারায় কখনো প্রহার করবে না, অসদাচরণ করবে না। ’ (আবু দাউদ : হাদিস ২১৪২)

স্ত্রীর ভরণ-পোষণের পরিমাণ

ভরণ-পোষণের ব্যাপারে ইসলামী শরিয়ত পরিমাণ নির্ধারিত করে দেয়নি। বরং শরিয়তের ভাষায় স্ত্রীকে প্রয়োজনীয় পরিমাণ ভরণ-পোষণ দেওয়া স্বামীর কর্তব্য। এই পরিমাণ পরিবেশ-পরিস্থিতি ও স্বামীর সামর্থ্যের ওপর নির্ভর করে। (আলমুহিতুল বুরহানি : ৩/৫২৯-৫৩০, ফাতহুল কাদির : ৩/১৯৪) কোরআনে কারিমে ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা স্ত্রীদের জন্য তোমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী নিজেদের ঘরে বাসস্থানের ব্যবস্থা করো। ’ (সুরা : তালাক, আয়াত : ৬)

মহানবী (সা.) বিদায় হজের ভাষণে দীর্ঘ বয়ানের একপর্যায়ে বলেছিলেন—‘অতএব, তোমরা স্ত্রীদের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাকে ভয় করো, কেননা তোমরা তাদের আল্লাহর আমানত ও প্রতিশ্রুতির ওপর গ্রহণ করেছ এবং তোমরা আল্লাহর হুকুমেই তাদের লজ্জাস্থান হালাল হিসেবে পেয়েছ। তাদের ওপর তোমাদের অধিকার হলো, তারা তোমাদের অপছন্দ হয় এমন লোককে তোমাদের বিছানায় আসতে দেবে না। যদি তারা এ অন্যায় কাজ করে, তাহলে তাদের হালকা প্রহার করতে পারবে, যাতে শরীরে কোনো জখম বা আঘাত না হয়। আর তোমাদের ওপর তাদের অধিকার হলো, তাদের জন্য প্রয়োজন অনুপাতে খাবার ও পোশাকের ব্যবস্থা করো। ’ (সহিহ মুসলিম : হাদিস ১২১৮)

স্বামী প্রয়োজনীয় খরচ না দিলে করণীয়

স্বামী যদি বিহিত কোনো কারণ ছাড়া স্ত্রী-সন্তানের তথা সাংসারিক জরুরি খরচ না দেয়, তাহলে স্ত্রী স্বামীর অনুমতি ছাড়াও স্বামীর সম্পদ থেকে প্রয়োজনমতো অপচয় না করে খরচ করতে পারবে। হাদিস শরিফে এসেছে, ‘সাহাবিয়া হিন্দ বিনতে উতবা (রা.) রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে এসে বলেন, হে আল্লাহর রাসুল! (আমার স্বামী) আবু সুফিয়ান সংসারের খরচে সংকীর্ণতাকারী, সে আমার ও আমার সন্তানের প্রয়োজনীয় পরিমাণে খরচ দেয় না, তবে আমি তার অগোচরে তার থেকে কিছু নিয়ে থাকি। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘হ্যাঁ, তুমি তোমার ও তোমার সন্তানের প্রয়োজন পরিমাণ তার অগোচরে তার থেকে নিতে পারবে। ’ (বুখারি : হাদিস ৫২৬৪, বাদায়েউস সানায়ে  : ২/২৭)

তবে স্বামী-স্ত্রী উভয়ের মালিকানা ভিন্ন হওয়ায় অনুমতি ছাড়া একে অন্যের সম্পদ ব্যয় করা অবৈধ। স্বামী যদি নিয়মমাফিক ভরণ-পোষণ ও স্বাভাবিক হাত খরচের প্রয়োজন পূরণ করে থাকে, তাহলে তার কাছ থেকে তার অগোচরে টাকা-পয়সা নিয়ে নেওয়া এবং তাকে না জানিয়ে বিভিন্ন খাতে ব্যয় করা বৈধ হবে না। (আলবাহরুর রায়েক : ৪/১৭৭)

স্ত্রীর বাসস্থান

স্ত্রী যদি উচ্চবিত্ত পরিবারের মেয়ে হয়, তাহলে সে যদি স্বামীর যৌথ পরিবার থেকে ভিন্ন ঘরের দাবি করে, তাহলে স্বামীর সামর্থ্য অনুযায়ী তাকে ভিন্ন ঘরের ব্যবস্থা করে দিতে হবে। স্বামীর মা-বাবার সঙ্গে যৌথভাবে থাকতে স্ত্রী বাধ্য নয়। আর মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে হলে তাকে স্বামীর পরিবারের সঙ্গে এক ঘরে রাখা গেলেও তার পৃথক কক্ষ, টয়লেট, গোসলখানা, রান্নাঘরসহ যাবতীয় প্রয়োজনীয় জিনিস ভিন্ন করারও দাবি করতে পারবে। এ ক্ষেত্রেও স্বামীর পরিবারের সঙ্গে যৌথভাবে থাকতে স্ত্রীকে বাধ্য করা যাবে না। আর নিম্নবিত্ত পরিবারের হলে টয়লেট, গোসলখানা, পাকের ঘর ইত্যাদি ভিন্ন দিতে বাধ্য না হলেও তার জন্য একটি পৃথক কক্ষের ব্যবস্থা অবশ্যই করতে হবে, যার হস্তক্ষেপ স্ত্রী ছাড়া অন্য কেউ করতে পারবে না। ওই কক্ষে স্বামীর মা-বাবা, ভাই-বোন বিনা অনুমতিতে প্রবেশ করতে পারবে না। স্ত্রীর এমন সংরক্ষিত কক্ষ দাবি করার অধিকার আছে। (বাদায়েউস সানায়ে : ৪/২৩, রদ্দুল মুহতার : ৩/৬০১)

আত্মীয়তার সম্পর্কে ব্যয়ভার

আত্মীয়তার সম্পর্কের কারণে যারা ভরণ-পোষণের খরচ পেতে পারে, এককথায় শরিয়তের ভাষায় তারা হলো, রক্তের সম্পর্কের মাহরাম আত্মীয়-স্বজন। এরা হলেন চার ধরনের আত্মীয়-স্বজন : ১. মা-বাবা, দাদা-দাদি, নানা-নানি ও তাদের ঊর্ধ্বতন। ২. ছেলে-মেয়ে, নাতি-নাতনি ও তাদের অধস্তন। ৩. ভাই-বোন ও তাদের সন্তান। ৪. চাচা, ফুফু, মামা, খালা। তবে একসঙ্গে সবার খরচ চালানো এক পক্ষের ওপর ওয়াজিব নয়, বরং এ ক্ষেত্রে শরিয়ত নিকটবর্তী ও দূরবর্তীদের মধ্যে তারতিব নির্ধারণ করে দিয়েছেন, প্রত্যেক পক্ষের নিকটবর্তী আত্মীয়ের উপস্থিতি ও সামর্থ্য অবস্থায় দূরবর্তীদের ওপর ভরণ-পোষণের দায়িত্ব বর্তাবে না। হ্যাঁ, নিকটবর্তীর অনুপস্থিতি ও অসামর্থ্যতায় দূরবর্তীদের ওপরও ভরণ-পোষণের দায়িত্ব বর্তাবে। (তাবঈনুল হাকায়েক : ৩/৬৩)

মা-বাবা ও ঊর্ধ্বতন আত্মীয়ের ব্যয়ভারের শর্ত

মা-বাবা, দাদা-দাদি, নানা-নানি—এ ধরনের ঊর্ধ্বতন আত্মীয়রা ভরণ-পোষণের অধিকারী হওয়ার জন্য শর্ত হলো দুটি—এক. তাঁরা এমন দরিদ্র হতে হবে যে তাঁরা নিজের মালিকানার সম্পদে চলতে অক্ষম। এখন কথা হলো, যদি তাঁরা উপার্জনের শক্তি রাখে, তাহলেও তাঁদের সন্তানদের ভরণ-পোষণ দিতে হবে কি না? এ ক্ষেত্রে বিধান হলো, তাঁদের উপার্জনের শক্তি থাকলেও যদি তাঁদের কাছে চলার মতো নগদ টাকাকড়ি না থাকে, তাঁদের সন্তানদের ভরণ-পোষণ দিতে হবে। তাদের সন্তানরা এ কথা বলতে পারবে না যে আপনি তো উপার্জনে সক্ষম, আপনি নিজে উপার্জন করে চলুন। তবে যদি তাঁরা ধনী হন, তথা তাঁদের মালিকানায় নগদ এমন সম্পত্তি থাকে, যা দ্বারা তাঁরা শান্তিতে কালাতিপাত করতে পারেন, তাহলে সন্তানদের ওপর তাঁদের ভরণ-পোষণ দেওয়া ওয়াজিব নয়।

দুই. সন্তান-সন্ততি সামর্থ্যবান ও উপার্জনে সক্ষম হতে হবে। তাদের সামর্থ্যবান হওয়ার পরিমাণ হলো, তাদের মালিকানার সম্পত্তি বা উপার্জনকৃত আয়ের দ্বারা নিজের ও নিজের স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততির স্বাভাবিক ভরণ-পোষণের পর অতিরিক্ত সম্পদ থাকতে হবে। অন্যথায় তাদের উপার্জনকৃত আয়ের মধ্য থেকে যদি তার নিজের ও স্ত্রী বা সন্তান-সন্ততির ভরণ-পোষণের অতিরিক্ত সম্পদ না থাকে, তাহলে মা-বাবা ও ঊর্ধ্বতন আত্মীয়ের ভরণ-পোষণ দেওয়া ওয়াজিব নয়। যদিও এ ক্ষেত্রে উত্তম হলো, কষ্ট হলেও যথাসাধ্য মা-বাবারও ভরণ-পোষণের খরচ চালিয়ে যাবে। (তাবঈনুল হাকায়েক : ৩/৬৪, রদ্দুল মুহতার : ২/৬৭৮)

এ ব্যাপারে হাদিস শরিফে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘খরচের ব্যাপারে তুমি আগে নিজের প্রয়োজনীয় খরচের দায়িত্বশীল, তারপর তোমার স্ত্রীর, তারপর সামর্থ্য হলে তোমার নিকটাত্মীয়ের খরচ তোমার ওপর বর্তাবে। ’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস ৯৯৭)

দরিদ্র ও উপার্জনে সক্ষম ছেলে অসমর্থ মা-বাবাকে নিয়ে একসঙ্গে খাবে

সন্তান তার উপার্জনকৃত আয় থেকে নিজের, স্ত্রীর ও সন্তান-সন্ততির ভরণ-পোষণের পর অতিরিক্ত সম্পদ না থাকলে যদিও মা-বাবাকে ভিন্নভাবে ভরণ-পোষণ দেওয়া ওয়াজিব নয়, কিন্তু অভাবগ্রস্ত ও উপার্জনে অক্ষম মা-বাবাকে ছেলে নিজের দারিদ্র্য সত্ত্বেও নিজের সংসারের সঙ্গে মিলিয়ে নিতে হবে এবং কষ্ট হলেও যথাসাধ্য মা-বাবারও ভরণ-পোষণ চালিয়ে যাবে। (ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়া : ১/৪৬৫)

সমর্থ থাকা সত্ত্বেও অভাবগ্রস্ত মা-বাবার খরচ না দিলে গুনাহগার হবে

সমর্থ থাকা সত্ত্বেও সন্তানরা অভাবগ্রস্ত মা-বাবার খরচ না দিলে গুনাহগার হবে। এ ক্ষেত্রে সন্তানরা স্বেচ্ছায় না দিলে অভাবগ্রস্ত মাতা-পিতা ছেলে-মেয়ের সম্পদ থেকে প্রয়োজন পরিমাণ তাদের অনুমতি ছাড়াও নিতে পারবেন। তবে মা-বাবা বিত্তবান হলে অনুমতি ছাড়া ছেলে-মেয়ের সম্পদ থেকে নেওয়া বৈধ হবে না। (ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়া : ১/৫৬৪)

পিতার একাধিক স্ত্রী থাকলে করণীয়

পিতার একাধিক স্ত্রী থাকলে ছেলের ওপর তার বাবা ও বাবার এক স্ত্রীর খরচ দেওয়া তার ওপর ওয়াজিব হবে, অতঃপর বাবা ওই খরচ তার উভয় স্ত্রীকে ভাগ করে দেবেন। দ্বিতীয় স্ত্রীর খরচ দেওয়া ছেলের দায়িত্বে নয়। (ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়া : ১/৪৬৫)

মা-বাবার ভরণ-পোষণের দায়িত্ব  কার কার ওপর?

মা-বাবার ভরণ-পোষণের দায়িত্ব উপরোক্ত দুই শর্তে সব ছেলে-মেয়ের ওপর ওয়াজিব। এ দায়িত্ব সব সাবালক সামর্থ্যবান ছেলে-মেয়ের ওপর সমভাবে বর্তাবে। এ ক্ষেত্রে ছেলে-মেয়ের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই, তাই কোনো মেয়ে যদি সামর্থ্যবান ও বিত্তবান হয়, তাহলে ছেলেদের মতো সমভাবে তার ওপরও মা-বাবার খরচের দায়িত্ব বর্তাবে। কেননা মা-বাবার জীবিত অবস্থায় সন্তানের জন্য খরচ ও উপহারে মেয়েরাও তাদের ভাইদের মতো সমঅধিকারী, তাই মা-বাবার খরচ বহনে তারাও সামর্থ্যের শর্তে তাদের ভাইদের সমদায়িত্বশীল হবে। ছেলে-মেয়ে না থাকলে তারপর সিরিয়াল আসবে নাতি-নাতনিদের। অতএব, তাদের ওপর সমভাবে এ দায়িত্ব বর্তাবে। (ফাতহুল কাদির : ৪/৪১৭)

সন্তান-সন্ততি ও অধস্তন আত্মীয়ের ভরণ-পোষণ

সন্তান-সন্ততি ও অধস্তন আত্মীয়ের ভরণ-পোষণের দায়িত্ব তাদের বাপ-দাদার ওপর বর্তাবে। (দেখুন সুরা বাকারা, আয়াত ২৩৩) তবে এ ক্ষেত্রেও দুই শর্তে সন্তান-সন্ততির ভরণ-পোষণ ওয়াজিব হবে—এক. যদি সন্তানরা এমন দরিদ্র হয় যে তারা নিজের মালিকানার সম্পদের সাহায্যে চলতে অক্ষম এবং তারা ছোট বা অসুস্থ অথবা প্রতিবন্ধী হওয়ার কারণে উপার্জনে অক্ষম হয়।

অতএব, নাবালেগ বা অসুস্থ অথবা প্রতিবন্ধী ছেলের খরচ বাবার ওপর বর্তাবে। আর মেয়েদের ক্ষেত্রে বালেগা হওয়ার পরও বিবাহের আগ পর্যন্ত ভরণ-পোষণের দায়িত্ব বাবার ওপর বর্তাবে। (ফাতহুল কদির : ৪/৪১৪, রদ্দুল মুহতার : ২/৬৮১)

দুই. বাপ-দাদা সামর্থ্যবান বা উপার্জনে সক্ষম হতে হবে। তাদের সামর্থ্যবান হওয়ার পরিমাণ হলো, তাদের মালিকানার সম্পত্তি বা উপার্জনের আয় দ্বারা নিজের ও স্ত্রীর স্বাভাবিক ভরণ-পোষণের অতিরিক্ত সম্পদ থাকতে হবে। অতএব, কোনো সামর্থ্যহীন বাবা যদি এমন দুর্বল বা অসুস্থ হন যে উপার্জনে অক্ষম, তাহলে তার ওপর সন্তানের ভরণ-পোষণ ওয়াজিব নয়; বরং এ ক্ষেত্র ওই সন্তানের দায়িত্ব বাবার পরবর্তী নিকটাত্মীয় যথা—মা, দাদা-দাদি, নানা-নানি, ভাই-বোন, মামা-চাচাদের ওপর সামর্থ্য অনুসারে বর্তাবে। (ফাতহুল কাদির : ৪/৪১৪, রদ্দুল মুহতার : ৩/৬১৫) মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর পিতার ওপর কর্তব্য, বিধিমোতাবেক মায়েদের খাবার ও পোশাক প্রদান করা। সাধ্যের অতিরিক্ত কোনো বক্তিকে দায়িত্ব প্রদান করা হয় না। কষ্ট দেওয়া যাবে না কোনো মাকে, তার সন্তানের জন্য কিংবা কোনো বাবাকে তার সন্তানের জন্য। ’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২৩৩)

দ্বিন শিক্ষারত সাবালক ছেলের ব্যয়ভার

সাবালক ছেলেকে যদি পিতা ইলমে দ্বিন শিক্ষার কাজে নিয়োজিত রাখে এবং ছেলে পড়ালেখায় ব্যস্ত থাকায় অর্থ উপার্জনের সুযোগ না পায়, সে ক্ষেত্রে ছেলের প্রয়োজনীয় খরচ বহন করা বাবার দায়িত্ব।

পক্ষান্তরে সাবালক ছেলে নিজ ইচ্ছায় পড়ালেখা করলে অথবা বাবার নির্দেশে পড়ালেখা করছে, কিন্তু তার জন্য পড়ালেখার সঙ্গে অর্থ উপার্জনের সুযোগও রয়েছে। এমতাবস্থায় শিক্ষার্থী ছেলের খরচ চালানো পিতার ওপর ওয়াজিব নয়। (ফাতাওয়ায়ে হিনদিয়া : ১/৫৬৩, আহসানুল ফাতওয়া : ৫/৪৬১)

দরিদ্র বাবার নাবালেগ সন্তানের ব্যয়ভার

বাবা যদি এমন দরিদ্র হন যে নাবালেগ সন্তান-সন্ততির খরচ বহন করতে অক্ষম, তাহলে নাবালেগ ছেলে যদি সাধারণ উপার্জনে সক্ষম হয়, যেমন কারো কর্মচারীরূপে কাজ করতে পারবে, তাহলে তাকে কাজে লাগিয়ে তার খরচ চালাতে পারবে। তবে তার খরচের অতিরিক্ত তার উপার্জনের অংশটি বাবা তার জন্য সংরক্ষণ করে রেখে দেবেন এবং সে বালেগ হওয়ার পর তা তাকে বুঝিয়ে দেবেন। তবে যদি অভিজাত পরিবারের সন্তান হয় যে কারো কর্মচারীরূপে কাজ করতে পারবে না অথবা তালেবে এলেম হয়, তাহলে ওই ছেলেকে সক্ষম ধরা হবে না এবং কাজে লাগাতে পারবেন না। তবে দরিদ্র বাবা তাঁর মেয়েকে মানুষের কর্মচারীরূপে কাজে লাগাতে পারবেন না; বরং বাবাকেই যথাসাধ্য তার খরচ চালিয়ে যেতে হবে, একেবারে অক্ষম হলে অন্য নিকটাত্মীয়ের ওপর তার ব্যয়ভারের দায়িত্ব আসবে। (ফাতওয়ায়ে হিনদিয়া : ১/৫৬২)

সন্তান-সন্ততির ভরণ-পোষণের দায়িত্ব কার ওপর?

যদি মা-বাবা, দাদা-দাদি, নানা-নানি, মামা-চাচা সবাই উপস্থিত থাকেন, তাহলে সন্তান-সন্ততির ভরণ-পোষণের দায়িত্ব সর্বপ্রথম বাবার ওপর বর্তাবে। বাবার অনুপস্থিতি বা অসামর্থ্যের কারণে তাঁর নিকটবর্তী আত্মীয়ের ওপর বর্তাবে, যথা প্রথমে মা ও দাদা-দাদি, তারপর নানা-নানি, তারপর ভাই-বোন, তারপর মামা-খালা, চাচা-ফুফু প্রমুখ। এঁদের মধ্যে যাঁরা উত্তরাধিকারী সম্পত্তির অধিকারী হয়ে থাকেন, তাঁদের ওপর উত্তরাধিকারী সম্পত্তির অধিকারের হারে ভরণ-পোষণের দায়িত্ব বর্তাবে। আর যারা উত্তরাধিকারী সম্পত্তির অধিকারী হয় না, তাদের ওপর আত্মীয়তার নৈকট্যের ভিত্তিতে ভরণ-পোষণের দায়িত্ব বর্তাবে। যদি সমপর্যায়ের একাধিক আত্মীয় থাকেন, তাহলে তাদের ওপর সমভাবে দায়িত্ব বর্তাবে। (ফাতহুল কাদির : ৪/৪১০, ৪২১)

ঊর্ধ্বতন ও অধস্তন উভয় দায়িত্বশীলের উপস্থিতিতে দায়িত্ব কার?

ঊর্ধ্বতন ও অধস্তন উভয় দায়িত্বশীলের উপস্থিতিতে দায়িত্ব কার? যেমন কারো সন্তানও আছে, বাবাও আছেন, তাহলে কার ওপর তার ভরণ-পোষণের দায়িত্ব—এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত হলো, এ ক্ষেত্রে দায়িত্ব সন্তানের ওপর আসবে। হাদিস শরিফে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘নিশ্চয়ই তোমাদের সন্তান তোমাদের সর্বোত্তম উপার্জনের অন্তর্ভুক্ত, অতএব তোমরা তোমাদের সন্তানের উপার্জনের থেকে ভরণ-পোষণ গ্রহণ করো। ’ (আবু দাউদ, হাদিস : ৩৫৩০)

সন্তান না থাকলে তার পরবর্তী নিকটাত্মীয় যথা মা-বাবা, নাতি-নাতনি, ভাই-বোন, ভাতিজা-ভাগ্নেদের ওপর বর্তাবে। এ ক্ষেত্রে তাদের ওপর আত্মীয়তার নৈকট্যের ভিত্তিতে ভরণ-পোষণের দায়িত্ব বর্তাবে। যদি সমপর্যায়ের একাধিক আত্মীয় থাকে, তাহলে তাদের ওপর সমভাবে দায়িত্ব বর্তাবে। (ফাতহুল কাদির : ৪/৪১৯)

নিকটাত্মীয়ের ভরণ-পোষণের খরচের পরিমাণ

ভরণ-পোষণ ও বাসস্থান প্রয়োজন অনুসারে দিতে হবে। তার পরিমাণ পরিবেশ-পরিস্থিতি, অবস্থা ও দায়িত্বশীল ব্যক্তির সামর্থ্যনির্ভর। (বাদায়েউস সানায়ে : ৪/৩৮)

সংসারে বড় ভাইয়ের দায়িত্ব

সংসারে অধিকারের ক্ষেত্রে সব ভাইয়ের অধিকার সমান। তদ্রূপ দায়িত্বের ক্ষেত্রেও বড় ভাইয়ের দায়িত্ব অন্য ভাইয়ের সমপরিমাণ। তবে নৈতিকভাবে অন্য ভাইদের চেয়ে বড় ভাইয়ের দায়িত্ব একটু বেশি। কেননা বাবার অনুপস্থিতিতে বড় ভাই মুরব্বি হিসেবে থাকেন, শরিয়ত মর্যাদার ক্ষেত্রে বাবার পর তাঁকে বাবার সমমর্যাদা দিয়েছে। হাদিস শরিফে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘বড় ভাই বাবার স্থলাভিষিক্ত। ’ (মাজমাউয যাওয়াইদ, হাদিস : ১৩৪৩৮) সে হিসেবে ছোট ভাই-বোনদের দায়িত্ব হলো—বড় ভাইকে বাবার মতো সম্মান করা, আর বড় ভাইয়ের নৈতিক দায়িত্ব হলো ছোট ভাই-বোনদের বাবার মতো ছায়া দেওয়া।

পরিবারের খরচে মধ্যপন্থা অবলম্বন করা

নিজের ও পরিবারের খরচে মধ্যপন্থা অবলম্বন করা হলো শরিয়তের নির্দেশ। অতিরঞ্জন ও অপব্যয় নিষিদ্ধ। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘তোমরা আহার করো ও পান করো, কিন্তু অপব্যয় করবে না। নিশ্চয়ই আল্লাহ অপচয়কারীকে পছন্দ করেন না। ’ (সুরা : আরাফ, আয়াত : ৩১)

অন্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর তোমাদের অর্থ-সম্পদ অপ্রয়োজনীয় কাজে খরচ করবে না। জেনে রেখো, যারা অপব্যয় করে তারা শয়তানের ভাই, আর শয়তান নিজ প্রতিপালকের ঘোর অকৃতজ্ঞ। ’ (সুরা বনি ইসরাইল : আয়াত : ২৬, ২৭)

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সঠিকভাবে বুঝে আমল করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

লেখক : ফতোয়া গবেষক ও মুহাদ্দিস

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
দয়া করে আপনার নাম লিখুন